বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২১

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম - মাজহারুল মোর্শেদ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২১ ক’মাস ধরে তার ব্যবসায় নাই, বন্ধ হয়ে আছে সবকিছু। ধাপড়া-মেখলীগঞ্জের লোকেরা ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাকে অবরুদ্ধ করে রাখলে তারা কেউ ভারতে যেতে পাচ্ছে না, এমনকি ছোট ছোট বাচ্চারাও না। ছাবেদ আলির বড় যন্ত্রণা চিররোগা বোউটাকে নিয়ে। একদিদন ভালো থাকে তো তিনদিন বিছানায়। বিশেষকরে তার কলিজার টুকরো বড় ছেলে মাসখানেক আগে ডাইরিয়া হয়ে মারা যাওয়ার পর থেকে সে আর বেঁচে থাকতে চায় না। গ্রাম্য ওঝা-কবিরাজ- আজ এ গাছের পাতা, কাল ওগাছের পাতা পিষে খাওয়ায়, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। স্থানীয় মসজিদের ইমামকে ডেকে ঝাড়-ফুক, তাবিজ-কবজ আরও কতো কি করানো হলো কোন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। দিনের পর দিন শরীর শুকিয়ে শুঁয়ো পোকার মতো ফ্যাকাশে হতে লাগল। হাত দ’টো সরু, চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে। আজ ঘণ-ঘণ বমি করছে, বালিশ বিছানা এমনকি ঘরের মেঝেতেও বমি করে ভাসিয়ে দিয়েছে। ছোট বাচ্চাটা মায়ের পাশে শুয়ে হাত-পা ছুড়ে কাঁদছে, মনে হয় হিসু করেছে। ছাবেদ আলি বাচ্চাটার পা দ’ুটো উঁচু করে দেখে সত্যি সে হিসু করেছে। তার শ্বাশুরি মা কয়েকদিন আগে বেশকয়েকটা কাঁথা সেলাই করে রেখে গেছে আপাতত সেগুলোই একটার পর একটা করে বদলে দিয়ে দিন যাচ্ছে। ঘরের কোণে দু’চারটা বড় বড় মাছি ভনভন করে উড়ে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে তার অসুস্থ বোউটার মুখে এসে পড়ে ঠোটের নির্যাস নিয়ে একটু দুরে উড়ে যাচ্ছে কিন্তু খানিক পর আবার এসে বিরক্ত করছে। একটু বেলা হলে ছাবেদ আলি কাঁথা গুলো ধুয়ে ভালো করে রোদে শুকাতে দেয়। কাঁথাগুলো না শুকালে রাতে আবার ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে বড় মুশকিলে পড়তে হবে। ঘরে কোন খাবার নেই, রান্না করার মতো এক মুঠো চালও নেই। অসুস্থ বোউটাকে ছেড়ে সে কাজেও যেতে পারে না। মাঝে মাঝে এমনিতে তার চোখে পানি এসে যায়। গ্রামে একমাত্র ডাক্তার প্রফুল্য বাবু। রোগা চেহারা, বয়সের ধারে যেন চোয়াল দু’টো একটু বেশি বসা, তবে কোটরাগত চোখ দুটো বেশ মায়াবী, সব সময় হেসে হেসে কথা বলে। তার পড়া-লেখা কিংবা ডাক্তারি শিক্ষার ব্যাপারে কারও তেমন কোন জানার আগ্রহ নেই। কোথায় বাড়ি, কোথায় ঘর, পরিবারে কে আছে কে নাই এসকল বিষয়ে কেউ কখনো প্রশ্ন তুলেছে বলে মনে হয় না। ডাক্তার প্রফুল্য বাবু তার মিষ্টি হাসি আর মধুর ব্যবহার দেখিয়ে আস্তে আস্তে গ্রামের সবাইকে আপন করে নেয়। নয়ার হাটে তার ছোট্ট একটা দোকান ঘর, সেখনে একপাশে একটা কাঠের আলমারিতে কতোগুলো ছোট-বড় শিশি তাক করে সাজানো। সামনে একটা বসার চেয়ার টেবিল। তার ডানপাশে একটা মাঝারি রকমের র‌্যাক বসানো যার একপাশের তাকে এলোপ্যাথি ঔষধের ফাইল সাজানোআর অন্যপাশে হোমিও। মাঝখানে যাত্রার মঞ্চের মতো বড় একখানা সাদা পর্দা ঝুলানো। সেই পর্দার ওপারে একটি চৌকিতে বিছানা বালিশ সাজানো আর এটাই তার রাতে ঘুমানোর জায়গা। ডাক্তার বাবু সারাদিন এখানে সেখানে খায় আর রাত হলে দোকানের ভেতরে ঘুমিয়ে পড়ে। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীর ভারতে যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেলে তার ডাক্তারের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। সদ্য জন্মানো বাচ্চাদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রফুল্ল ডাক্তারের কোন বিকল্প নেই। এক হাত দিয়ে মুখটা চেপে ধরে অন্য হাতদিয়ে এক ফোটা তরল পানি মুখে ফেলে দিতে পারলে যেন বাচ্চা সুস্থ হয়ে যায়। গ্রামের সহজ সরল অসহায় মানুষগুলোর আত্মবিশ্বাসের কারণে কোন ভাবে রোগ মুক্ত হলে ডাক্তারের প্রতি তাদের শ্রদ্ধার জায়গাটা অনেক প্রসারিত হয়ে যায়। ডাক্তার সাব-ডাক্তার সাব বলে যখন গ্রামের মানুষ গুলো তার দোকানের সামনে ভিড় জমায় প্রফুল্য ডাক্তারের বুকটা তখন গর্বে ফুলে ওঠে। ডাক্তার প্রফুল্য বাবু এলোপ্যাথি ও হোমিও উভয় ধরণের চিকিৎসা দেন। গরিব ও অসহায় মানুষগুলো যাদের চিকিৎসা করার মতো সামর্থ নেই এবং সাধারণ সর্দিজ্বর ও ছোট খাট অসুখে হোমিও চিকিৎসাই বেশি ব্যবহার করেন। ছাবেদ আলি এসে সামনে দাঁড়ায়, ডাক্তার প্রফুল্ল বাবু একবার মাথাতুলে তার দিকে তাকিয়ে আবার ওষুধ খোঁজার কাজে মন দেয়। ছাবেদ মনে মনে ভাবে- আহারে প্রফুল্ল বাবু তুই কতোদিন এক কেজি চালের জন্য মোর দোকানে ঘন্টার পর ঘন্টা বসি আছিলু আর আজ মোর বিপদ জন্য একবার চোখ তুলিও তাকাইস না। বিপদে পড়লে বোধয় মানুষ এমনই হয়, খুব কাছের মানুষগুলাও আর দাম দেয় না, সবাই অতিরিক্ত ঝামেলা মনে করে। ডাক্তার ডাক্তার প্রফুল্ল বাবুর দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ছাবেদ আলি একবার গলা কাশে, তারপর মাথা তুলে সে বলে কি খবর ছাবেদ আলি ভাই, ভালো আছেন? না ডাক্তারসাব, ভাল্ নাই- খুব বিপদে পড়ি আছো। কেন, কি হয়েছে আপনার? ডাক্তারসাব, মোর কিছু হয় নাই। বোউটার আজ কয়েকদিন থাকি গায়োত তার জ্বরটা নড়েই না। জ্বরের তাপ এতোটাই বেশি যে, সহ্য করির না পায়া মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়া পড়ে। তাই নাকি? কবে থেকে জ্বর? তা প্রায় সপ্তাহ খানেক তো হবেই। এর বেশিও হবার পারে ডাক্তারসাব। ও-আচ্ছা, কোন ঔষধ পথ্য কি খাওয়ানো হয়েছে? হ্যাঁ- ডাক্তারসাব, হারাণ কবিরাজ ঔষধ দিচে সেগুলায় খায়। একটু দেরি হয়ে গেছে ছাবেদ ভাই। জ্বরটা পরিপক্ক হয়ে গেছে, অসুবিধা নেই আমি ঔষধ দিচ্ছি নিয়োমিত খাওয়ালে জ্বর ছেড়ে যাবে। ভালোকরি ঔষধ দ্যাও ডাক্তারসাব। বোউটা মোর জ্বরোত এ্যাকেবারে কাবু হয়া গেইছে। চোখ মেলিও দ্যাখে না। ঔষধ নিয়ে ছাবেদ আলি চিন্তায় মগ্ন হয়ে মাথা নিচু করে পথ হাঁটে আর মনে মনে ভাবে, এবার বুঝি আল্লায় তার দিকে মুখ তুলে তাকাইছে। ডাক্তার সাব যেভাবে কথা কইল তাতে তো জ্বর ক্যান ওর বাপকেও সারির নাগবে। বাড়ি এসে ছাবেদ আলি আল্লাহর উপর ভরসা রেখে মসজিদে একটা মিলাত মান্নত করে বোউকে ঔষধ খাওয়ায়। এভাবে দুই-তিনদিন চলে যায় কিন্তু জ্বরটা এ্যাকেরারে নাছোর বান্দা কিছুতেই ছাড়তে চায় না, যে মজা পাইছে তার শরীরে? বাইরে ভীষণ অন্ধকার, আকাশে কোন তারাও নেই। হয়তো আজ অমাবশ্যা হবে তাই চাঁদেরও দেখা নেই। ছাবেদ আলি একটা বিড়িতে আগুন দিয়ে ঘণ-ঘণ দু’চারটা টান মারে তারপর ফু’দিয়ে ধোঁয়াগুলোকে আকাশের দিকে ছুড়ে দেয়। হালকা বাতাসে কুণ্ডলি পাঁকিয়ে ধোঁয়াগুলো আকাশের দিকে উড়ে যায় আর সেই ধোঁয়ার ভেতরে ঝাপসা চোখে সে তার বোউটাকে উড়ে যেতে দেখে। ছাবেদ আলি মাথাটাকে একবার প্রচণ্ড একটা ঝাকুনি দেয়, আর মনে মনে ভাবে খালি পেটে বিড়ির নেশাটা হয়তো একটু কড়া হয়ে মাথায় ধরেছে তাই এমন মনে হচ্ছে, কিন্তু না আবারও সে ভালো করে দেখে ঐ একই ভাবে তার বোউটা ধোঁয়ার কুণ্ডলির ভেতর দিয়ে আকাশে উড়ে যাচ্ছে এবার হাত নেড়ে নেড়ে তাকে বিদায় জানাচ্ছে। তোমাদের পৃথিবীর নিষ্ঠুর লোকেরা আমাকে বাঁচতে দিল না। একটু ওষুধ পথ্য, একটু খানি সুচিকিৎসার অভাবে আমাকে কলিজার টুকরো সন্তানটিকে ছেড়ে যেতে হচ্ছে। বিড়ির আগুন ছাবেদ আলি আঙ্গুলের ফাঁকে এসে ছ্যাকা দিলে তার মগ্নতা ভেঙ্গে যায়। বিড়িটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে এক দৌড়ে ঘরে এসে বোউটার কাছে বসে হাতটা ধরে। কিন্তু না তার দেহে এখনও প্রাণ ধুকধুক করছে বৈরী বাতাসে কেরসিনহীন ক’পির সলতের মতো নিভুনিভু করছে। মাটির ক’পির আবছা আবছা আলোয় তার রক্তহীন ফ্যাকাশে মুখখানা যেন শেষ রাতের আলোহীন চাঁদের মতো দেখাচ্ছে। নিজের অজান্তেই কখন যেন চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে এক ফেটিা ঘরম অশ্রু। ভারতের প্রশাসনের সহায়তায় ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসীর উপর থেকে অবরোধ অনেকটা হালকা করে নেয়া হয়। বড়রা যেতে না পারলেও ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা ধাপড়া-মেখলীগঞ্জের হাটে যেয়ে নুন-তেলের মতো সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য কিনে আনতে পারে। দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষগুলোর মধ্যে দু’চারজন সীমানা পার হয়ে যাদের সাথে সম্পর্ক ভালো এমন লোকের বাড়িতে কাজ কর্ম শুরু করে। মহাজন নগেন সাহা ওয়াজেদ আলিকে লোক মারফত খবর দিয়ে পাঠায় কাজ শুরু করার জন্য কিন্তু ছাবেদ আলি মনে প্রচণ্ড ঘৃণা জন্মে মহাজনের উপর। তার বোউ যখন মৃত্যুশয্যায় একদিন রাতের চুপি চুপি মহাজনের কাছে যেয়ে তার হাত-পা ধরে বলেছিল বউয়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য। নগেন সাহাও আশ্বাস দিয়েছিল ডাক্তার পাঠানোর জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডাক্তার পাঠায় নাই। এরা সবাই এক, নিজের স্বার্থ ষোল আনা বোঝে। অন্যের জীবনের কোন দাম নেই তাদের কাছে। একজন মানুষ কতোটা জঘন্য, কতোটা নিকৃষ্ট মনের হলে মৃত্যুশয্যার একটা মানুষের মৃত্যু কামনা করতে পারে। ছাবেদ আলি মনে মনে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে, প্রয়োজনে না খেয়ে মরবে তবুও সেই নরপিচাশ নগেন মহাজনের কাছে যাবে না। বাংলাদেশ থেকে সাংবাদিক আসায় বঙ্গেরবাড়ি স্কুলের মাঠ থেকে অনেক রাত করে বাড়িতে আসে আব্দুল্লাহ। কুলসুম, আবিয়া ও সাবিয়া ঘুমিয়ে পড়ে। এতোরাতে কুলসুমকে ঘুম থেকে না ডেকে সে হাতমুখ ধুয়ে রান্না ঘরে যায়। ক্ষুধায় পেট চোঁ-চোঁ করছে, হাড়ি-পাতিলগুলোকে খালি পড়ে থাকতে দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়। ক’য়ো থেকে বালতি দিয়ে পানি তোলার শব্দে কুলসুমের ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে বিছানা থেকে উঠে দেখে আব্দুল্লাহ রান্না ঘরে খাবার খুঁজছে। কুলসুম ভালো করে জানে যে সে খাবার খুঁজে পাবে না। কারণ রান্না ঘরে কোথায় কি থাকে সেটা আব্দুল্লাহ কোন দিনও দেখেনি। তার দৌড় ঐ ভাতের হাড়িটা পর্যন্ত। কুলসুম রান্না ঘরে যেয়ে আব্দুল্লাহকে বলে, আবিয়ার বাপ মোক ডাকালেন না ক্যান? কোনটে কোন জিনিস থাকে সেটা কি তোমা জানেন? তুই ঘুমোত যে নাক ডাকিবার নাকচিস তোক ফির ডাকাও কোন আক্কেলে। তাহলে মুই উঠি না আসিলেতো তোমাক আইজ রাইতোত না খ্যায়া থাকির নাগিল হয়। রেজেকের মালিক আল্লাহ, আইজ রাইতোত মোর রেজেক যদি থাকে তাহলে মুই ঠিকই খুঁজি পানু হয়। তোমা পাকের ঘরোত কোন দিন কি খুুঁজ পাইছেন মোক কও তো? “মোল্লার দৌড় ঐ মসজিদ পর্যন্ত” মুই জানোতো তোমার দৌড় কতোদূর। ঘরোত আসি বইসো, তোমাক আর ভাত খুঁজির নাগবে না। কুলসুম শুকনা খড়খড়ে একথালা ভাত আর একটু আলু ভর্তা এনে দিলে আব্দুল্লাহ কুলসুমের দিকে তাকায়। কুলসুম বলে- মোর ভিত্তি দেখি তোমা কি করেন আবিয়ার বাপ, খালি এককৌটা চাউলে ছিলো, গোলামের বউয়ের কাছ থাকি দুইটা আলু আনি সেদ্ধ করি ভর্তা করি থুনু। ছওয়াগুলা শুকনা ভাত খাবার না প্যায়া ভাতোত পানি ঢালি দিয়া পান্তা করি খাইল। খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে জাল হাতে নিয়ে আব্দুল্লাহ চলে যায় নদীতে। নদীর পানি অনেকটা কমে গিয়ে মাঝে মাঝে চর জেগে আছে। আব্দুল্লাহ নদীতে নেমে জালটাকে গোছগাছ করে তার একাংশ কনুইর ওপর চড়ায়, বাকিটা দু’ভাগ করে দু’হাতের মুঠোয় নেয়। তারপর পানির দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝাঁকি মেলে ছুড়ে দেয় পানিতে। দুরে গিয়ে অনেকটা জায়গার ওপর সেটা ঝপ করে ছড়িয়ে পড়ে। জালের নিচের দিকে পুরোটা ঘের জুড়ে রয়েছে মাছ আটকে যাওয়ার ফাঁদ। প্রতিটি ফাঁদের গোড়ায় লোহার কাঁঠি লাগানো আছে। কাঁঠির ভারে ভারী হয় বলে জালটা মাছ পালিয়ে যাওয়ার আগেই পানির নিচে একেবারে তলানিতে পড়ে মাটির ওপর চেপে বসে যায়। জালখানা টেনে তোলার সময় কাঁঠির ভারের জন্য ফাঁদগুলো মাটির ওপর দিয়ে গড়গড়িয়ে গুটিয়ে আসে। ফলে মাছগুলো আর পালানোর জায়গা না পেয়ে ফাঁদে ঢুকে যায়। আব্দুল্লাহ মনে মনে হতাশ হয়ে যায় কারণ স্রোতের টানে তার জাল সঠিক জায়গায় না পড়ে অনেকটা জড়ো হয়ে যায়। তবুও তার হাতের কব্জিতে বাঁধা রশি ধরে আস্তে আস্তে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে জালটাকে টেনে তোলার চেষ্টা করে। জালের মধ্যে ছড়ছড় আওয়াজ দৈত্যের মতো কি যেন একটা জালে আটকা পড়ে জালটাকে মোচড় দিয়ে একটা হ্যাঁচকা টান দেয় আর সেই টানের বিপরীত ধাক্কা সামলাতে না পেরে হুড়মুড় করে সে নদীতে পড়ে যায়। উপর থেকে পানিতে পড়ে যাওয়ার ধাক্কাটা সামলে নিয়ে, আব্দল্লাহ মনে মনে ভাবে এটা কোন হাঙ্গর-কুমির নয়তো? পানির মধ্যে বাস করা কোন মাছের এমন শক্তি থাকতে পারে না। ছোট বেলা থেকে এই নদীতে মাছ ধরতে ধরতে আজ তার বয়স ভাটির দিকে চলে গেল, এমন আজগুবে কাÐ তার জীবনে একটিও ঘটে নাই। যাহোক, জালে আটকে পড়া সেই প্রাণিটি হাঙ্গর-কুমিরই হোক আর বোয়াল-বাগাড়ই হোক, তার সাথে এমনি এমনি পারা যাবে না, যতক্ষণ না তাকে বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে ঘায়েল করা যায়। এভাবে শুরু হয় অজানা জলজ প্রাণির সাথে খেলা। একবার প্রাণিটি নদীর গভীরে টানে আব্দল্লাহও যতোদুর যাওয়া সম্ভব নদীর গভীরে যায়। আবার আব্দল্লাহ তাকে ডাঙ্গার দিকে টানে সেও আস্তে আস্তে চলে আসে। এভাবে তার সাথে খেলতে খেলতে বেলা পড়ে যায় এবার আব্দল্লাহ ভাবে সে যতোবড়ই হোক আর যতো শক্তিশালী প্রাণি হোক না কেন তার তেজ এতক্ষণ থাকার কথা না। তাই আল্লাহর উপর ভরসা করে সেটিকে দু’হাতে পাঁজাকোলা করে ধরে একবারে ডাঙ্গায় ফেলে দেয়। তারপর হাতের স্পর্শে অনুভব করতে পারে যে এটি কোন হাঙ্গর-কুমির নয়, এটি একটি বিশাল আকৃতির মাছ। জালে মোড়ানো অবস্থায় মাছটি ঘাড়ে নিয়ে সে বাড়ি চলে আসে। আব্দল্লাহর ঘাড়ে বিশাল একটা কিছু জাল দিয়ে মোড়ানো তাই বোঝা যাচ্ছে না, সেটা মাছ নাকি কাঠের গুড়ি। আব্দল্লাহ উঠানের মধ্যে ধুপ করে ঘাড়ের বোঝাটি মাটিতে ফেলে দিল আর অমনি মাছটা ব্যথার চোটে লাফ দিয়ে উঠল। ছাবিহা ভয়পেয়ে চিৎকার দিয়ে তার মাকে জড়িয়ে ধরল। আব্দল্লাহ খুব সাবধানে আস্তে আস্তে জাল থেকে মাছটাকে বের করার চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত আব্দল্লাহ বুঝতে পারছে না আসলে এটা কি মাছ। জালের অনেকটা অংশ সে পেঁচিয়ে রেখেছে কাজেই জাল কেঁটে কেঁটে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেখে এটি একটি মস্ত বড় বাগাড় মাছ। এতক্ষণে স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে সে বলল- আবিয়ার মা, আল্লায় এবার হামার দিকে চোখ তুলে তাকাইছে। কিন্তু তার মাছ কিনবে কে? এই ভেবে আর এক মুহুর্ত দেরি না করে আব্দল্লাহ সুধারামের বাড়ি যাওয়ার জন্য বেড় হয়। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার’ অবরোধ কেবল মাত্র মুসলমানদের জন্য হিন্দু ধর্মাবোলম্বিরা দিব্বি যাতায়াত করে। হিন্দু ধর্মাবোলম্বিদের সাথে যাদের সম্পর্ক ভালো তারা জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র তাদের কাছে এনে নেয়। সুধারাম (ভ্যারকেসা) জেলের সাথে আব্দুল্লাহর খুব ভালো সম্পর্ক। তার সুখে দুখে সে সব সময় পাশে থাকে। ডাহাগ্রামের সীমানা থেকে এক কিলো মিটারের মধ্যে ভারতের ধাপড়ার হাট নামে একটি বাজার আছে। শনি ও বুধবার সপ্তাহে দু’দিন হাট বসে। সেখানে একটি বি. এস.এফ ক্যাম্প এবং তার পাশে একটি প্রাইমারি স্কুলও আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ডাহাগ্রামে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বই খাতা হাতে নিয়ে এ স্কুলে যায়। যাহোক সুধারাম (ভ্যারকেসা) জেলে এসে মাছটি নিয়ে যায় ধাপড়ার হাটে। অনেক বড় মাছ হওয়ায় বেশ চড়া দামে সেটা বিক্রি হয়। সুধারাম মাছ বিক্রি করে অর্ধেক টাকা সে নেয় আর বাকিটাকা দিয়ে আব্দুল্লাহর জন্য চাল-ডাল, লবন, কেরসিন যা লাগে নিয়ে আসে। আব্দুল্লাহ তাতেও সুধারাম (ভ্যারকেসা) জেলের উপর খুশি, তা নাহলে তার মাছতো ঘরেই পঁচে যেতো। গত কয়েকদিন আগে একটি বকরি ছাগল দড়ি ছিঁড়ে সৈয়দ বাড়ির কাছে যায়, ছাগলটি নিয়ে আসার সময় সৈয়দ বাড়ির পোলাও ভাতের গন্ধ ছাবিহার নাকে ভীষণ ভাবে সুড়সুড়ি দেয়। সেই দিন থেকে ছাবিয়ার কোমলমতি মনে পোলাও ভাত যেন একটি স্বপ্নের উপকরণ হয়ে যায়। ছাবিয়া প্রতি রাতে স্বপ্নের ভেতর পোলাও ভাত খায়। আর সকালে উঠে মাকে সেই স্বপ্নের কথা বলে। দুর থেকে আব্দুল্লাহ বুঝতে পারে মেয়ের কথায় কুলসুম নীরবে আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলছে। ছোট্ট মেয়েটির মুখে আনন্দের হাসি আর চঞ্চল প্রাণের উচ্ছ্বাস দেখে আব্দুল্লাহ মনে মনে ভাবে-হায় আল্লাহ! মুই কি অপরাধ করেছিনু তোর কাছোত যে, তুই মোর সব কিছু কাড়ি নিলু? নিস্পাপ ছওয়াটার মুখে হাসি ফুটানোর সাধ্যটুকু মোক দিলু না। গরিব মানসি এক মুঠি ভালো খাবার পাইলে দুনিয়ার সব দুঃখ কষ্ট ভুলি য্যায়া তোর শুকরিয়া আদায় করে। হে আল্লাহ তুই সেইটাও মোক করির দিলু না?


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৫ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now