বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২০
মেখলীগঞ্জের পল্টু বাবু তিনকুড়ি খাঁর মহাজনী কারবারের বড় মহাজন। মাঝেমধ্যে টাকার সমস্যা হলে তিনকুড়ি খাঁ, পল্টু বাবুর কাছে টাকা নিয়ে, চড়া সুদে গ্রামের মানুষকে ধার দেয়, নির্দিষ্ট সময় শেষে আবার সে টাকা কড়ায় গÐায় আদায়ও করে নেয়। নিত্যদিনের মত তিনকুড়ি মহাজন, আজও সকালে ব্যাগভর্তি টাকা সহ নাড্ডা তাহেরকে মেকলিগঞ্জে পাঠিয়ে দেন পল্টুবাবুকে দেয়ার জন্য। দুপুর গড়িয়ে বেলা অনেকটা পশ্চিম দিকে হেলে পড়ে কিন্তু তাহেরের এখনও ফেরার কোন নাম নেই। তিনকুড়ি খাঁ একটার পর একটা হুঁক্কায় টান মারে আর মনে মনে ভাবে-‘এত্তোগুলা টাকা ধরি তাহেরকে একেলায় মেখলীগঞ্জে পাঠে দেওয়া ঠিক হয় নাই। যা দিনকাল পড়ি গেইছে আজকাইল ঘর থাকি বেড়ালেই বিপদ, যেলায়-সেলায় রাস্তায়-ঘাটে দস্যু-লুটেরা জোর করি টাকা-পাইসা কাড়ি নিয়া মানুষক মারি ফেলায়’।
তাহের আর অল্প কিছুদূর গেলেই মেখলীগঞ্জে পল্টু বাবরু কাচারিঘরে পৌছে যেত কিন্তু এরই মধ্যে পিছন থেকে একটা মালবাহি ট্রাক এসে তাকে ধাক্কা দিলে সে রাস্তা থেকে অনেক দূর নিচে ছিটকে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সেই সাথে তার টাকার ব্যাগও লাপাত্তা হয়ে যায়। কয়েকজন পথচারি এসে ধরাধরি করে তাহেরকে খুব দ্রæত সময়ের মধ্যে মেখলীগঞ্জের হাসপাতালে নিয়ে আসে। কিন্তু তাহেরের অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক যে কর্তব্যরত ডাক্তার তার প্রাণ ফিরে পেতে সন্দিহান হয়ে পড়ে।
এদিকে দিনের আলো একটু একটু করে কমে আসতে শুরু করে কিন্তু তাহেরের ফেরার কোন নাম নেই। তিনকুড়ি খাঁ টাকার চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ে আর মনে মনে ভাবে- ‘শালা নাড্ডা তাহেরের ফির মোর টাকা-টুকা ধরি পালে গেইল নাতো? গরিব মানসির উপর বিশ্বাস নাইরে দশটা টাকা পাইলে সেই দিনটাত ভাল্ যাবে, পরের দিন কি হবে সেইটার ভাবনা ওমার নাই’। তিনকুড়ি তাহেরের খবর নেওয়ার জন্য সাইকেল নিয়ে হাবাকে মেখলীগঞ্জে পাঠিয়ে দিয়ে বিছানার উপর হুক্কা নিয়ে বালিশে আধশোয়া হয়ে একটার পর একটা টান দেয় আর হাবা ফিরে আসার প্রহর গুণে। গ্রামের কোলাহল মুক্ত পরিবেশে অল্প রাত হলেই অনেকটা গভীর মনে হয়। আর অপেক্ষার প্রহর! সে-তো নরক যন্ত্রণার সমান। তিনকুড়ি ঘরের বাইরে এসে অস্থিরতার মাঝে পায়-চারি করতে থাকে। ইতোমধ্যে হাবা এসে পড়ে।
হাবাকে আসতে দেখে তিনকুড়ি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
কিরে হাবা? নাড্ডা (তাহের) কোন্টেরে?
হাবা তিনকুড়ির কাছ থেকে একটু দূরে গিয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে-মহাজন একটা দুর্ঘটনা ঘটি গেইছে-
তিনকুড়ি একলাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসে বলে- শালা গাঁধার বাচ্চা, তাড়াতাড়ি কয়া ফেলা কি হইছে?
তাহের আর অল্প এ্যাকনা হলেই বোলে মখেলীগঞ্জ পৌছি গেইল হয় কিন্তু এমন সময় একখান ট্রাক আসি তার উপরোত চড়ে, তাহের রাস্তা থাকি একেবারে নিচোত পড়ি অজ্ঞান হয়া যায়। কয়েকজন লোক দৌড়ি আসি ধরাধরি করি তাক্ মেখলীগঞ্জের হাসপাতালোত ধরি যায়। রাস্তাত এগিলা কথা শুনিয়া মুই পল্টু বাবুর ভাতিজা নরেনোক ধরি হাসপাতাল গেনু। স্যাটেকোন য্যায়া দ্যাঁখো, তাহেরোক চেনায় যায় না, তার গোটায় মুখখান পাইপ দিয়া ঢাকা।
আরে ঐ বালটা মরে মরুক, মোর টাকার ব্যাগটার কি খবর সেইটা আগোত ক’?
সেটা-তো কাঁও কবার পায় না মহাজন।
হাবার মুখের কথা শেষ হতে না হতেই টাকার চিন্তায় তিনকুড়ি বুকচেপে ধরে বিছানায় গড়িয়ে পড়ে। হুক্কার নল তার ডান হাতেই আছে। হুক্কার জ্বলন্ত তামাক বিছানায় পড়ে আগুন ধরে যায়। তিনকুড়ি খাঁর আর এক চেলা ছলিমুদ্দিন জগভর্তি পানি বিছানায় ঢেলে দেয়। আগুন নিভেগেলে কালো ধোঁয়ায় ঘর ভরে যায়। ধোঁয়ার ভেতর তিনকুড়ির কি অবস্থা হ’লো সেটি দেখারও উপায় নাই। দুই-তিনবার কাশি দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে ছলিমুদ্দিন ঘর থেকে বের হয়ে আসে। এরপর ঘরের ধোঁয়া কমে গেলে সে তিনকুড়ির কাছে যেয়ে দেখে মহাজন অজ্ঞান হয়ে মরার মতো পড়ে আছে, তার মুখদিয়ে ফ্যানা বের হচ্ছে। ছলিমুদ্দিন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। একটা চিৎকার দিয়ে দৌড়ে কাচারি ঘরের বাইরে যায় এবং আশে পাশের লোকজনকে ডাকে, তাদের মধ্যে কেউ একজন দৌড় দিয়ে যেয়ে প্রফুল্য ডাক্তারকে নিয়ে আসে।
ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার একমাত্র ডাক্তার প্রফুল্ল বাবু এসে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে যৎসামান্য কিছু ঔষধ দিয়ে তাকে খুব দ্রæত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। হাসপাতাল বলতে পুরো এলাকার মধ্যে একটাই, সেটি হল ভারতের মেখলীগঞ্জে। ডাহাগ্রাম অঙ্গারপোতাবাসী কাগজে কলমে বাংলাদেশের নাগরিক আর একদেশের নাগরিক হয়ে অন্যদেশে অধিকার প্রয়োগ করাটা যে খুব সহজসাধ্য ব্যাপার নয় সেটা সবারই জানা। তারপরও জীবন বাঁচার তাগিদে নিরুপায় হয়ে এখানকার মানুষেরা ভারতীয় লোকদের হাত পা ধরে হলেও মেখলীগঞ্জের হাসপালে জায়গা করে নিতে হয়। কিন্তু গ্রামের মানুষের চলাচলের জন্য বাহন হলো বাইসাইকেল আর গরুর গাড়ি। মোহন আর ছলিমুদ্দিন দ’জনে মিলে একটা গরুর গাড়িতে চড়ে তিনকুড়িকে মেখলীগঞ্জ হাসপালে নিয়ে যায়। পল্টুবাবুর সহায়তায় তাকে কোন রকমে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
নিয়োতির কি করুণ পরিহাস! যে তাহের তারই জন্য হাসপাতালে বেওয়ারিশ রোগী হয়ে মত্যুসজ্জায় পড়ে আছে, তার চিকিৎসা কিভাবে হচ্ছে, চিকিৎসার খরচই বা কে দেবে তা নিয়ে তিনকুড়ি মহাজন একটি বারের জন্য মুখদিয়ে উচ্চারণ করলো না আর খানিকপর সেই হাসপাতালে, সে তাহেরের পাশেই তাকে যেতে হলো মত্যুর মুখে পড়ে।
সময়ের হাত ধরে পাল্লাদিয়ে জীবন চলে তার গতিতে কিন্তু প্রকৃতি ও তার সৃষ্টি দু’টোই আসমান জমিন তফাত। তাই মানুষ সময়ের কাছে হার মেনে মাঝে মাঝে করুণ পরিণতির স্বীকার হয়। তিনকুড়ি খাঁ, তার জীবন চলার পথে কখনো এমন পরিস্থিতি আসতে পারে তা কোন দিনই উপলব্ধি কারতে পারে নাই।
হাবা কাচারি ঘরের দরজায় তালা দিয়ে একরকম দৌড়ে বাড়ি আসে। তার পেটে কথাগুলো গুড়গুড় করতে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না পর্যন্ত সে কাউকে বলতে পারে।
রহিমা তিনকুড়ির জন্য ভাতের গামলা নিয়ে ঘরে যাচ্ছিলো এমন সময় হাবা এসে বলে- ‘আম্মা কাচারি ঘরোত মহাজন ফিট (অজ্ঞান) হয়া পড়ি গেইছে। ছলিমুদ্দিন ভাই আর মোহন তাক গরুর গাড়িত করি মেখলীগঞ্জ ধরি গেইল’।
রহিমা তিনকুড়ির ফিট হওয়ার কথা শুনে ভাতের গামলা ফেলে দিয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। মিনুর মা চিৎকার দিয়ে দৌড়ে আসে, তার চিৎকার শুনে আবিয়া ছুটে আসে। তারা দু’জনে মিলে রহিমার মাথায় পানি ঢালতে থাকে। কিছুক্ষণ পর রহিমার জ্ঞান ফিরে এলে আবিয়া তাকে ঘরে নিয়ে যেয়ে জিজ্ঞাসা করে-বুবু কি হইছিলো তোমার? মাথা ঘুরি পড়ি গেইলেন ক্যান?
হ্যাঁরে বোইন, মোর কপাল পুড়ছে। কাচারি ঘরোত মহাজন নাকি ফিট (অজ্ঞান) হয়া পড়ি গেইছিলো। ছলিমুদ্দিন আর মোহন তাক মেখলীগঞ্জ ধরি গেইছে। আল্লায় জানে তার কি হইল্।
মোহনের কথা শুনে আবিয়ার বুকের ভেতরটা ধকধক করে উঠলো, মোহন মেখলীগঞ্জের হাসপাতালে আছে তাহলে আজকে রাতে সে আর বাড়ি আসতে পারবে না, সেটাই তার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। আবিয়া মনে মনে বলে-এমনিতো হওয়ার কথা। উপরে সৃষ্টিকর্তাতো একজন আছে। তার বিচারে কোন ভুল হয় না। তিনকুড়ি সারাজীবন অসহায় মানুষের উপর নির্যাতন করেছে। পান থেকে চুন খসলেই তাদের নির্যাতন করে, নিপীড়ন করে। এ গ্রামে মানুষের চিন্তা চেতনা বিকাশ, মত প্রকাশ করার কারও কোন শক্তি নেই। অনিচ্ছুক নারীকে প্রতিনিয়ত বাধ্য করা হয়, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেকোনো কাজ করতে। তীব্র অনাচারে গড়ে ওঠা নারী অন্দরের অসহনীয় মানসিক যাতনা, কষ্টকর দিনযাপনের কাহিনী চার দেয়ালের ভিতরেই গুমরে গুমরে দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে যাবে তখনও। কারণ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় নারীকে সংকুচিত করা বা নারীর ইচ্ছেকে মূল্য না দেওয়া বা আকাঙ্খাকে অবদমিত করে রাখা যে অন্যায়, এ সমাজ সেটাই বুঝতে পারে না। সমাজের চোখে এতে কোন অস্বাভাবিকতা নেই । কারণ দীর্ঘমেয়াদি সমাজ ব্যবস্থায় জীবনযাপনের প্রক্রিয়ায়, নারীর নিপীড়নের বিষয়টি বৈধতা পেয়েছে, সমাজ একে স্বাভাবিকভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। এসবকে অন্যায় ভাবার মানসিকতা কখনই তৈরি হয়নি। তাইতো সবকিছুই মেপে মেপে করতে হয়, চাইতে হয় ; ঠিক ততটুকু, যতটুকু চাইলে কার স্বার্থে আঘাত না লাগে। অথচ নিজের প্রয়োজনের কথা ভেবে, নিজের সুখ-শান্তি- সমৃদ্ধি, চাহিদার কথা মাথায় রেখে মানুষ গড়েছে সমাজ, নির্মাণ করেছে পরিবার, অসংখ্য ধরা-অধরা সম্পর্কের সুতোয় জড়িয়ে নিয়েছে নিজেকে। চিরকাল মানুষ বিশ্বাস করতে চেয়েছে সে পরিবারের মধ্যে, দলের মধ্যে, সমাজের মধ্যে বেঁচে থাকতে চায়। সেখানে প্রতিটি মানুষই স্বমহিমায় উজ্জ্বল। মর্যাদায় সম্মানে ভেদাভেদ থাকার কথা নয়। কথাগুলো আনমনে বলতে বলতে আবিয়া আবেগ প্রবণ হয়ে পড়ে তার দ’ুচোখ দিয়ে গড়িয়ে কয়েক ফোটা গরম অশ্রু।
সারারাত আবিয়ার চোখে এক ফোটা ঘুমও এলো না এই প্রথম মোহন বাড়ির বাইরে একটা রাত কাটাল। সকালে উঠে আবিয়া দেখে বাড়ির বাইরে কয়েকজন লোক এসে ভিড় জমায়। তাদের দেখে আবিয়া রহিমাকে বলে-বুবু বাইরে কয়জন লোক আসি বসি আছে, এ্যাকনা দেখেত কি কয়?
রহিমা বাইরে গিয়ে লোক গুলোকে জিজ্ঞাসা করে- ভাইসাব, তোমা কি মহাজনের সাথে দেখা করিবার জন্য আইচ্চেন?
হ্যাঁ ভাবিজান,
মুই পাঁচ বছর আগোত একদোন (চব্বিশ শতক) জমি বন্দক থুইয়া মহাজনের কাছোত টাকা নিছিনু। টাকা দেওয়ার সময় জমির মূল দলিলগুলা মহাজন জমা নিয়া কইছিল টাকা পরিশোধ হইলে দলিলগুলা মোক ফেরত দেবে। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরেও মহাজন হামার দলিলগুলা ফেরত দেয় না, জমির দখল ছাড়ে না, আরো দ্বিগুন টাকা দাবী করে। তোমায় কন ভাবি হামরা গরিব মানুষ দিন মিলি দিন খাই। যতো টাকা নিছিনু সুদে- আসলে তার চাইতে দ্বিগুন টাকা দিছি। ভাবিসাব মোর বাড়ির ভিটাখান ছাড়া আর এককালি জমিও নাই। ভিটাখান ব্যাচে মহাজনকে টাকা দিলে মুই ছওয়া ছোট গুলাক ধরি কোন্টে যাইম। তোমার হাত-পাঁও ধরি কঁও ভাবিসাব, মহাজনক হামার দলিলসহ জমিখান ফিরি দিবার কন।
রহিমা, তাদের সান্তনা দিয়ে বলেন- ভাই তোমা শোনো, মুইতো এগুলার কিচ্ছুই জানো না। মোর ভাইটা বাড়ি আসুক, তাক কয়া দ্যাখো আসলে ঘটনাটা কি? তবে মুই তোমাক কথা দিনু, দু’চার দিনের মধ্যেই তোমার দলিল তোমা পাবেন। ভাই-কাঁচারি ঘরোত বইসো, এ্যাকনা চা খ্যায়া যাও।
রহিমা এক থালা মুড়ি লবন তেল মেখে সাথে একটু গুড়ও মুড়ির উপরে ছিটিয়ে দেয় তারপর মিনুর মাকে বলে কাচারি ঘরে দিয়ে আসতে। তাদের নাস্তা খাওয়া শেষ হলে মিনুর মা চা দিয়ে আসে।
চা খেতে খেতে তারা বলে- আহা ভাবিসাব কি ফেরেস্তার নাকান মানুষ, চোর, বাটপার, সুদখোর এই মহাজনের সাথে তায় কেমন করি সংসার করিবার নাগছে?
মোহন বাড়ি এলে রহিমা তাকে বলে, মোহন চার-পাঁচজন লোক জমির দলিল নিবার জন্য আচ্চিলো, ওমা নাকি টাকা-পাইসা তামান দিছে কিন্তু তাও মহাজন জমির দলিল দেয় নাই।
মোহন বলে- হ্যাঁ বুবু, বন্ধকী জমিগুলার আসল টাকা ও লাভের আংশ তারা দিছে এটা মুই জানো। তবে ওমার সাথে বন্ধকী চুক্তি কি ছিলো সেটা মোর জানা নাই।
থাক মোহন, অতো কড়ায় গÐায় সুদের হিসাব করার দরকার নাই, তুই ওমার দলিল গুলো ফেরত দিয়ে দিস’। ক্যান এতোদিন ওমার দলিলগুলা ফেরত দেওয়া হয় নাই সেই ভুলটাও ওমাক ভাঙ্গি দেওয়া নাগবে।
আচ্ছা বুবু কাইল ওমার দলিলগুলা ফেরত দেওয়া যাবে।
সপ্তাহখানেক পর একটু সুস্থ হয়ে ওঠে তিনকুড়ি কিন্তু তার বামপাশের হাত পা দু’টোই অবশ হয়ে যায়। এভাবে বেশকিছুদিন হাসপাতাল থেকে তিনকড়িকে ছারপত্র দিয়ে বাড়িতে রাখার পরামর্শ দেয় ডাক্তার সাহেব। ওষুধ পথ্যগুলো নিয়মিত সেবনের সাথে তাকে হুইল চেয়ার থেকে নামিয়ে ধরে ধরে একটু হাঁটানোর চেষ্টা করারও পরামর্শ দেয়।
মোহন বলে- বুবু দুলাভাইয়ের ঔষধগুলো কি সব আনা আছে?
হ্যাঁ, এ সপ্তাহতো চলিবে, তোর দুলাভাইয়ের শারীরিক অবস্থা ভালো না, যে কোন সময় তার নিশ্বাস বন্ধ হয়া যাবার পারে। মোর মনে হয় তোব আর ঔষধ পাতি কিনির নাগবে না। এই বলে রহিমা হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেলল। আবিয়া ঘর থেকে দৌড়ে এসে রহিমাকে ধরল। আবিয়া তাকে সান্তনা দিয়ে বলে- বুবু, এ্যাটেকোনা হামার কিছইু করার নাই, আল্লাহ যেটা ভালো মনে করবেন সেটাই হবে। চলো ঘরোত যাই।
প্রায় মাসখানেক বিছানার সাথে সহবাস করে আজ প্রথম বারের মতো মাটিতে পা রাখল তিনকুড়ি খাঁ। তার ডানহাত রহিমার কাঁধে আর বামহাত মোহনের কাঁধের ভর করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পাচ্ছে না। ডাক্তার পরামর্শ দেন যে, প্রতিদিন অন্ততঃ একবার হলেও তাকে বিছানা থেকে নিচে নামিয়ে একটু হাঁটা-হাঁটি করাতে হবে। নিয়োমিত এ কাজটি করতে পারলে হয়তো একসময় তিনি সুস্থ হয়ে যেতেও পারেন। রহিমা আর মোহন খুব কষ্ট করে তিনকুড়ির পাটা সামনে নেয়ার চেষ্টা করছেন কিন্তু কিছুতেই তিনি পা তুলতে পাচ্ছেন না। এভাবে কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর তাকে আবার বিছানায় শুয়ে দেয়া হল। মোহন বলে বুবু এভাবে প্রতিদিন এক-দু’বার করে দাঁড় করে রাখতে পারলেও কাজ হবে।
রহিমা বারান্দায় বসে মোহনকে বলে-শোন মোহন, বাড়িতে একটার পর একটা বিপদ-আপত নাগিই আছে। আল্লাহ হামার ওপর নাখোস হয়া গেইছে। তুই একনা নূরল মুন্সিক খবর দেতো’ একটা কুরআন খতম ও মিলাদ পড়া নাগবে । অনেকদিন বাড়িত কোন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান হয় না।
আচ্ছা বুবু, বাজারোত মুই নূরল মুন্সির সাথে দেখা করি তাক বাড়িত পাঠে দিম ।
পরেরদিন বিকালবেলা নূরল মুন্সি এসে বলে -ভাবিজান মোক ডাকাইছেন?
হ্যাঁ ভাইসাব আইসেন।
রহিমা নূরল মুন্সিকে তিনকুড়ি খাঁর ঘরে নিয়া যায়। বসার জন্য একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলে-ভাইসাব একটা কুরআন খতম ও মিলাদ শরিফের ব্যবস্থা করিবার নাগবে। মুই তোমাক সেই জন্যে আসির কইছিনু।
আলহামদুলিল্লাহ, খুবই উত্তম কাজ ভাবিজান, এমন ধর্মের কাজেতো এ্যালা মানসের মনই নাই, সগায় ঝামেলা মনে করে। ধর্ম-কর্ম ছাড়া দুনিয়াদারির কোন দাম নাই ভাবিসাব, তাতে আল্লাহ নারাজ হয়। যা হোক ভাবিসাব, কুরআন খতমের জন্য ছ’হি তেলাওয়াত করতে পারে এমন পনের-বিশজন হজুরক ডাকলেই হবে। ওমারগুলার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা আর তার সাথে দশ-বিশ টাকা নজরানা দিবার নাগবে। তোমা যদি আশে পাশের ময়-মুরুব্বির ঘরোক ডাকের চান, সেটাও করির পান, মানসিক খাওয়ানোর মতো ছওয়াব আর একটাও নাই। ভাবিসাব শুক্রবার আল্লাহর রহমতের দিন, গরিবের হজ্জের দিন, এই দিন দোয়া খায়ের কবুল হওয়ার দিন। তাহলে শুকুরবারে সবাইকে দাওয়াত করি।
ভাইসাব, কাক্ কওয়া নাগবে, কয়জন হুজুর নাগবে সেটা তোমায় কন।
আচ্ছা ভাবিসাব আজ তাহলে উঠি আস্সালামু আলাইকুম।
শুক্রবার সকালে নূরল মুন্সি চলে আসে, মোহন হুজুরদের কুরআন পড়ার জন্য বাহিরের ঘরটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখে। কসাই এসে মাংস দিয়ে যায়। পুকুর থেকে মাছ ধরা হয়। উত্তর পাড়ার ছাবেদ আলি এসে সব রান্না-বান্না করে ফেলে। কুরআন খতম হয়ে গেলে সবাই নামাজে যায়। নামাজ শেষ করে এলাকার কম-বেশি সবাই চলে আসে দাওয়াত খেতে। যে মুরুব্বি আসতে পারেন নাই তার ছেলে এসেছেন বাপের বদলে। গোটা উঠান জুড়ে মাটিতে পোয়াল খড় বিছিয়ে দিয়ে সবাইবে বসতে দেওয়া হয়, কলার পাতায় ভাত দিয়ে সবাইকে বেশ আদর যতœ করেই খাওয়ানো হয়। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই চলে গেলে আশে-পাশের দু’চারজন লোক গাছের নিচে বসে বিড়ি টানতে টানতে গল্প গুজব করে। ওয়াজেদ আলি তার গরুটিকে গাছের ছায়ায় বেঁধে রাখে এমন সময় তমিজ উদ্দিন তাকে ডাকে, ও বাহে ওয়াজেদ আলি, এত্তিকোনা আয়, একটা নাসা (বিড়ি) টানি যা। ওয়াজেদ আলি এসে একটা নাসা নিয়ে তাতে আগুন লাগায়।
তমিজ উদ্দিন বলে- ওয়াজেদ আলি, তুই দাওয়াত খাবার আসিলু না যে ?
নাসার ধোয়া আকাশের দিকে ছাড়তে ছাড়তে ওয়াজেদ বলে-এমন করি হুজুরের ঘরোক ডাকে আনি আদর করি খাওয়াইলে কি কোন লাভ হবে বাহে তমিজ চা? সারাজীবন সুদ-ঘুষ আর গরিব মানুষক ঠকে খ্যায়া, মানসির জমি দখল করি তাক রাস্তার ফকির বানে দেওয়া, জোর করি মানসির বোউয়োক তুলি আনি বিয়া করা, মানসির ঘরোত আগুন ধরে দিয়া নিজের ঘর ভালো করা, এ্যামন কোন জঘন্য কাজ নাই যা মহাজন করে নাই। আর মরার আগোত ঐ হারামি টাকা দিয়া দোয়া-দরূদ পড়ে আল্লাকে ডাকা-ডাকি করি কি হইবে চাচা, তোমায় কঁও? মহাজনের এইলা কুকিত্তির কথা গোটা গ্রামের কায় না জানে। সত্যি কথা কি চাচা, মোর মনটা ক্যানেভালা সুদখোরের বাড়িত ভাত খাবার চাইলো না। আর সেই জন্য মুই দাওয়াত খাবার আইসো নাই,
জমির আলি বলে-ওয়াজেদ ঠিক কথাই কইছে তমিজ ভাই। সুদখোরের ব্যাপারে মোর একটা কথা মনে পড়ি গ্যালো। গ্যালো বছর মোর নাল বলদটার ঠ্যাংগের খুড়ায় পোকা নাগছিল। এ্যামন তাগড়া গরুটা মোর দিন দিন শুকি এ্যাকেবারে কাঁটা হয়া যাবার নাগছে। মুই এ্যালা কি করো, খুব চিন্তায় পড়ি গেনু। গরিব মানসি মুই, জমি জায়গা মোর কিছুই নাই এই গরুটাই সম্বল, সেটারও যদি কিছু হয়া যায় তাহলে মোর তামান শ্যাষ। মোর মনটা খারাপ দেখি সাইদুল মুন্সি মোক কয়- জমির ভাই, তোমার জ্বর-টর হইছে নাকি? মনটা ক্যানেভালা খুব খারাপ। মুই সাইদুল মুন্সিকে তামান খুলি কনু। সাইদুল মুন্সি মোক ডাকে কয়- জমির ভাই তোমা এ্যাকনা কাইল সকালে মোর বাড়ি আইসেনতো। পরের দিন সকালে মুই তার বাড়ি গেইলে একটা তাবিজ আনি মোর হাতে দিয়া কইলো- ভাইজান- “এই তাবিজটা গরুটার গলায় বান্দি দ্যান, আর কিছু করা নাগবে না, পোকা এমনিতে সারি যাবে”।
মুন্সির কাছ থাকি তাবিজ আনি গরুটার গলায় বান্দি দিবার পরের দিনই গরু মোর উঠি ঘাস খাবার নাগচে। পোকা আসতে আসতে সারি যাবার নাগচে, গরুটা মোর আগের মতো তাগড়া হবার নাগছে। তারপর মুন্সিকে একদিন রাইতোত মুই দাওয়াত করনু। একসাথে ভাত খাইতে খাইতে মুই মুন্সিকে কনু, আচ্ছা হুজুর তোমা কি জাদু করিলেন যে মাত্র এক রাইতের ভিতরে মোর গরুটা এ্যাকেবারে টনটনা হয়া গ্যালো? হুজুর মনে মনে হাসি মোক কইল ভাই, তেমন কিছু না জমির ভাই,-‘সাতজন খাঁটি সুদখোর মানুষের নাম লিখে গরুর গলায় বান্দি দিলে পোকা এমনিতে ছাড়ি পালায়’। সাইদুল মুন্সির কথা শুনে মুই সেদিন চমকি উঠছিনু ভাই। সেই দিন থাকি মুই আর কোন সুদখোরের বাড়িতে খালি ভাত ক্যান, এক গøাস পানিও খাও না।
“ওয়াজেদ বলে-‘আল্লাহর মাইর দুনিয়ার বাইর” লুচ্ছা ,বদমাইশ, চোর ,বাটপারদের আল্লাহ এমন করি শাস্তি দেয়। তিনকুড়ি মহাজনের কপালোত যে কি আছে সেটা আল্লাহ ছাড়া কাঁও জানে না। তায় যে কতো মানসিক মারি ফেলাইচে, কতো মানসির সংসার ভাঙ্গিচে, কতো মানসিক রাস্তার ফকির বানাইচে সেটা আল্লায় জানে। মোরে চোখের দেখা- ধলা বয়াতির সোনার সংসারটাক নষ্ট করিল, আয়নাল হককে মারি ফেলাইল, করিমন বেওয়াক ধর্ষণ করি গ্রাম ছাড়া করিল, আব্দুল্লাহ পরীর মতো বেটিটার জীবনট্াক ধ্বংস করিল তমিজ ভাই এইলাতো হামায় দেখিনো।
ছাবেদ আলি তিস্তা নদীর চরে গিয়েছিল কাশখড় কাটতে। মাথার বোঝাটা বাড়ির আঙিনায় ধপাস করে ফেলে দিয়ে
রাত থেকে পেটে একটু দানা-পানিও পড়েনি, তাই নাড়ি-ভুঁড়িগুলো কেমন চিনচিন করে উঠছে। লুঙ্গির দু’ভাঁজের গিঠটা খুলতে খুলতে বসে পড়ল মাটিতে। কয়লার আঁচের মতো গন-গন করে জ¦লছে পেটের ভেতরটা। মাথায় কাশের বোঝা নিয়ে অনেকখানি পথ হেটে এসেছে সে তাই পায়ে আর বশ নাই। জোয়ান-তাগড়া শরীরও আজ ক্ষুধার যন্ত্রণায় কেমন কাতর হয়ে পড়েছে। খোঁচা খোঁচা কাশের মুড়ো পায়ে বিঁধে রক্ত বের হচ্ছে সেদিকে তার কোন খেয়াল নেই। একেতো ক্ষুধার যন্ত্রণা তার ওপর মাথায় কাশ খড়ের বোঝা। যন্ত্রণার পাল্লাটা পায়ের চেয়ে পেটেই বেশি ভাড়ি, তাই পায়ের ক্ষত থেকে রক্ত বের হওয়ার কথা তার মনে আসে না। শরীরের জ্বালা জুড়াতে ছাবেদ আলি পুকুরে যেয়ে ঝাপিয়ে পড়ে, পুকুরের ঠাÐা জলে তার সমস্ত শরীরের যন্ত্রণা অনেকাংশে কমিয়ে যায়। চোখ-মুখ মুছে হাটু জলে পা ডুবিয়ে পুকুরের ধারে বসে একটা বিড়ি টানে, এতে খাটুনির ক্লান্তি অনেকটা তরল হয়ে যায়। তারপর তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে নাক চেঁপে ধরে ডুব দেয় পুকুরে। চারিদিকে খাঁ খাঁ রোদ্দুর, পুকুর পারে তালগাছের পাতাগুলো রোদে নরম হয়ে কাঁপছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে আশে পাশে কেউ নেই, তাই কোমর পর্যন্ত পানিতে নেমে পরনের লুঙ্গি খুলে গা-মাথা ভালো করে মুছে নিয়ে বাড়ি আসে।
ছাবেদ আলি ভারতের ধাপড়ার হাটে মহাজনের চালের আড়ত থেকে চাল কেনে নয়াহাটে বিক্রি করে। এতে যে দু’চার টাকা লাভ হয় তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলে। মাঝে মাঝে মহাজনের লোক বাটখারার কেরামতি দেখায়, প্রতি পাল্লায় যদি একমুঠো করে চাল মারতে পারে তাহলে দু’আড়াই মন চালে লাভের অংশটাই চলে যায়। কিন্তু নীরবে চেয়ে থাকা ছাড়া সে কোন কিছু বলতে পারে না, একে তারা অন্য দেশের লোক সেখানে যে কর্ম করে খায় সেটাইতো অনেক বেশি। প্রতিবাদ করতে গেলে শেষে কিনা গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। তার চেয়ে একটু কম লাভ হলে হোক, এতে অন্তত সংসারটা তো চলে যাচ্ছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now