বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সাফল্যের সিঁড়ি

"শিক্ষণীয় গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। ভোরের আলোটা জানালার ফাঁক গলে মুখে এসে পড়তেই মাহিনের ঘুম ভাঙে। ঘড়ির কাঁটা তখন ছয়টা ছুঁইছুঁই। চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে বসে। আজও অফিসে যেতে হবে— সেই নিয়মিত ব্যস্ততা, মিটিং, রিপোর্ট আর সময়মতো কাজ শেষ করার চাপ। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আজ তার মনটা ভারী নয়, বরং হালকা। সে জানে, এই পরিশ্রমই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হবে। মাহিন ঢাকার একটি বহুজাতিক কোম্পানির প্রশাসনিক কর্মকর্তা। বয়স ত্রিশের কোঠায়, সদ্য বিবাহিত। গ্রামের সাধারণ পরিবারের ছেলে, বাবার সামান্য চাকরি আর মায়ের সেলাই মেশিনের শব্দেই বড় হয়েছে সে। ছোটবেলায় বাবা বলতেন, “বাবা, কাজ শুধু রুটি রুজির জন্য নয়, এটা তোমার চরিত্রের আয়না।” তখন কথার গভীরতা বোঝেনি, কিন্তু এখন অফিসের প্রতিটি দিনেই সে সেই কথার মানে উপলব্ধি করে। অফিসে ঢুকেই সে হাসিমুখে সবাইকে শুভ সকাল জানায়। সহকর্মীরা জানে— মাহিন যদি অফিসে থাকে, তাহলে পরিবেশটা স্বস্তিদায়ক থাকবে। তার হাসি যেন কাজের ক্লান্তির মাঝেও একটু প্রশান্তির বাতাস বইয়ে দেয়। তবু এই হাসির পেছনে কত অভ্যাস, কত আত্মনিয়ন্ত্রণ লুকিয়ে আছে, তা কেবল সে নিজেই জানে। নতুন সহকর্মী রুবাইয়া প্রায়ই অবাক হয়ে বলে, “মাহিন ভাই, আপনি তো কখনো রাগ করেন না! সবাই যখন কাজের চাপে ঝিমিয়ে পড়ে, তখনও আপনি শান্ত থাকেন কীভাবে?” মাহিন মৃদু হেসে উত্তর দেয়, “রাগ করলে কাজ কমে, সমস্যা বাড়ে। আমি বরং ভাবি— কিভাবে পরিস্থিতি সামলানো যায়। কাজের জায়গা যুদ্ধক্ষেত্র নয়, সহযোগিতার ক্ষেত্র।” তার এই মনোভাবই ধীরে ধীরে তাকে সবার আস্থার জায়গায় নিয়ে আসে। কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার সিদ্দিক সাহেব একদিন মিটিংয়ে বলেন, “মাহিন এমন একজন কর্মী, যিনি নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়েও প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেন। তার মতো মানুষই একটা দলের প্রাণ।” কথা শুনে মাহিন কিছু বলে না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে এক অপার তৃপ্তি অনুভব করে— যেন তার প্রতিদিনের সততার পুরস্কার সে পেয়ে গেছে। তবে মাহিনের জীবন সবসময় এত মসৃণ ছিল না। চাকরিতে প্রথম দিকে তাকে নানা রকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সিনিয়রদের ভুল নির্দেশনা, অযথা সমালোচনা, আর প্রতিদিনের বাড়তি কাজের চাপ— মাঝে মাঝে মনে হতো, হয়তো এই পেশা তার জন্য নয়। কিন্তু একদিন অফিসের এক প্রবীণ কর্মী, রফিক সাহেব, তাকে বলেছিলেন, “মাহিন, মনে রেখো, সাফল্য কোনো দ্রুতগামী ট্রেন নয়। এটা ধীরে ধীরে চলা এক যাত্রা— ধৈর্য আর সততার সঙ্গে যার পথে থাকো, সে-ই পৌঁছে যায় গন্তব্যে।” এই কথাগুলো যেন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর থেকে সে আর কাজকে বোঝা মনে করেনি, বরং এটাকে নিজেকে প্রমাণের সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। একদিন হঠাৎ কোম্পানির বড় একটি প্রজেক্টের দায়িত্ব আসে তার উপর। পুরো টিমটাই তখন ভয়ে কাঁপছে— নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা প্রায় অসম্ভব। মাহিন সবাইকে একত্র করে বলে, “আমরা যদি একসাথে পরিকল্পিতভাবে কাজ করি, অসম্ভবও সম্ভব।” তারপর সে কাজ ভাগ করে দেয়, প্রতিদিন অগ্রগতি পর্যালোচনা করে, সবাইকে উৎসাহ দেয়। দুই মাসের সেই দমবন্ধ করা পরিশ্রম শেষে যখন প্রজেক্ট শেষ হয়, তখন বোর্ড মিটিংয়ে সবাই হাততালি দেয় মাহিনের নেতৃত্বের প্রশংসায়। সেদিন রাতে বাসায় ফিরে জানালার পাশে বসে চাঁদের আলোয় সে চুপচাপ ভাবছিল— সাফল্য মানে হয়তো এটাই। শুধুমাত্র নিজের উন্নতি নয়, বরং অন্যদেরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আনন্দ। রুবাইয়া তখনও অফিসে নতুন। তার কিছু ভুলের কারণে মাঝে মাঝে কাজের গতি নষ্ট হয়ে যেত, কিন্তু মাহিন কখনো রেগে যেত না। বরং বলত, “ভুল মানে শেখার সুযোগ। ভয় পেও না, আবার চেষ্টা করো।” কয়েক মাসের মধ্যেই রুবাইয়া নিজেই একদিন বলে ওঠে, “আপনি আমার কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা, মাহিন ভাই।” এমনই একদিন সন্ধ্যায় মাহিন অফিস থেকে বের হচ্ছিল। বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি, রাস্তার বাতিগুলো যেন জলমগ্ন শহরের চোখে অজানা স্বপ্ন জ্বালিয়ে রেখেছে। সে ভিজতে ভিজতে হাঁটতে থাকে, মনে পড়ে যায়— কতবার এই শহরের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে বসেছিল, তবু হাল ছাড়েনি। তার ফোন বেজে ওঠে— মায়ের কণ্ঠ, “বাবা, আজ তোমার ছোট ভাইটা তোমার মতো হতে চায় বলেছে।” মাহিনের চোখে জল চলে আসে। সে বলে, “মা, আমি তো কেবল নিজের দায়িত্বটা পালনের চেষ্টা করছি। যদি তাতেই সে অনুপ্রাণিত হয়, তবে এটাই আমার সাফল্য।” সময়ের সঙ্গে মাহিন আরও দায়িত্ব পায়, পদোন্নতি হয়। কিন্তু কখনো অহংকারের ছোঁয়া তাকে স্পর্শ করে না। প্রতিটি সাফল্য তার কাছে নতুন দায়িত্বের সূচনা। সে জানে, নিজের অবস্থানে থেকেও মানুষ অন্যের জীবন আলোকিত করতে পারে, যদি মনটা ইতিবাচক থাকে। বছর শেষে অফিসে সেরা কর্মীর পুরস্কার ঘোষণার দিন সবাই নিঃশ্বাস ফেলে অপেক্ষা করছে। সঞ্চালক নাম ঘোষণা করলেন— “এই বছরের সেরা পারফরমার, আমাদের সহকর্মী— মাহিন হাসান!” তুমুল হাততালিতে মুহূর্তেই ভরে যায় হলরুম। কিন্তু মাহিন উঠে গিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে শুধু বলে, “আমি একা কিছুই নই। এই পুরস্কার আমার দলের, আমার সহকর্মীদের, যারা আমাকে প্রতিদিন কিছু না কিছু শেখায়। আমি কৃতজ্ঞ সেই মানুষগুলোর প্রতি, যারা আমার ভুল ধরিয়ে দিয়েছে, আর যারা আমার পাশে থেকেছে।” তার কথায় সবার চোখ ভিজে ওঠে। সেদিন শুধু একজন কর্মী নয়, বরং একজন সত্যিকারের মানুষ জয় করে নেয় সবার হৃদয়। বাড়ি ফিরে আয়নায় নিজের মুখ দেখে মাহিন মৃদু হেসে বলে, “সাফল্য মানে শুধু উচ্চ পদ বা বড় বেতন নয়। সাফল্য মানে— প্রতিদিনের সততা, প্রতিদিনের দায়িত্ববোধ, আর প্রতিটি ছোট অর্জনে আনন্দ খোঁজা।” রাত গভীর হয়, শহর নিস্তব্ধ। জানালার পাশে বসে সে ভাবতে থাকে— আগামীকালও ভোর হবে, আবারও শুরু হবে নতুন দিন। কিন্তু আজকের দিনটা তার জীবনের এক অধ্যায় হয়ে থাকবে— যেখানে প্রমাণিত হয়েছে, যে কাজের প্রতি আন্তরিক, সময়নিষ্ঠ আর সততার পথ ধরে চলে, সাফল্য তার দোরগোড়ায় ঠিকই এসে দাঁড়ায়।????


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now