বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -১৯
তিনকুড়ির বাড়ির সামনে বিশাল একটা পুকুর, সেই পুকুরের চারপাশে নানারকম গাছ গাছালিতে ভরা। পুকুরের পূর্বপার্শে অনেকটা জায়গা জুড়ে সারি সারি আম কাঠালের গাছ। তার পাশেই একটা বিশাল বাঁশঝাড়। তিনকুঁড়ি খাঁ যে সেই এলাকার জমিদার তাতে কোন সন্দেহ নেই। প্রচÐ গরমের দিনে তিনকুড়ি খাঁ খালি গায়ে পুকুরের হাঁটু পানিতে পা ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। আজও সেই পুকুর ঘাটে একটা আমগাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে তিনকুড়ির । এমন সময় পায়ের নি¤œভাগে একটা সুড়সুড়ি অনুভব হয়। চোখ খুলে দেখেন মোহন, তার পা ছুঁয়ে ছালাম করছে।
তিনকুঁড়ি খাঁ বলে- কি রে মোহন, হঠাৎ এতো ভক্তি-শ্রদ্ধা কেন রে? কোন গরম খবর-টবর আছে নাকি?
হ্যাঁ দুলাভাই, খালি গরম খবরই নয়, খুশিতে প্যাটোত ঢোল বাজার মতোন একটা ভালো খবর আছে।
সেটা কি? তাড়াতাড়ি কয়া ফেলা, অনেক দিন থাকি মুই মনের মতো কোন খবর পাঁও না। চারপাশ থাকি খালি খারাপ খবর আর দুঃসংবাদ আইসে।
দুলাভাই, হামার আড়তের পাশের খালেক মিয়ার জমিখান আছে না?
কোন খান জমির কথা কবার নাগছিস তুই।
আরে যেখান জমি দখল ধরির য্যায়া আরো খালেক মিয়াকে মারি ফেলার জন্য কাল্লু গুÐাক একমুঠি টাকা দিলেন, তোমার মনে নাই?
আরে গাধা আস্তে কথা ক’, তোর বুবু শুনি ফেলাইবে। এবার মোর মনে পড়চে কি ঘটনা সেটা কয়া ফেলা।
দুলাভাই, সেই জমিটা খালেক মিয়া বেচাবে। আজ নিজেই কাচারি আসি মোক টাকা পাইসা রেডি করি থুবার কইছে।
তাই না কি? ক্যানরে হঠাত খালেক মিয়ার আবার কি হইল যে, তায় জমি ব্যাচের চায়? তাও ফির আরো হামার কাছোত।
দুলাভাই, খালেক মিয়ার নাকি বড়বেটির বিয়া ঠিক হইছে, ছেলের বাড়ি বাংলাদেশোত, ম্যালা টাকার ডিমাণ্ড দিবার নাগবে। তাছাড়া মস্তবড় অনুষ্ঠান করিবে, গোটা গ্রামের লোককে জিয়াপত করি খাওয়াবে।
দুলাভাই আর একটা কথা, যদি তোমা রাগ না করেন তাহলে কঁও।
আরে গাধা, মুই কি তোর উপর রাগ করির পাঁওরে। তুই হলু মোর বড় কুটুম।
দুলাভাই, যেহেতু আড়তে একজন লোক সবসময় থাকা নাগে, আর মোরতো খালি এত্তি-ওত্তি দৌড়াইতে সারাদিন চলি যায়। সেই জন্যে মুই কঁও, জালালকে আনলে কেমন হয়?
জালালটা কায়? তার বাড়ি কোন্টে? স্বভাব-চরিত্র কেমন? সেটা আগোত খোঁজ-খবর নিয়া আয়, তারপর চিন্তা করি দেখিম এ্যালা।
হাঃ হাঃ হাঃ কি-যে কন দুলাভাই? এ খবরটা যদি এ্যালায় ছোট বুবুর কানোত যায় তাহলে তো সংসারোত আগুন ধরি যাবে। জালাল হইলো আবিয়া বুবুর বড় ভাই।
ও আচ্ছা, সেটা তুই মোক আগোত কবু নারে গাধা, মোর কি আর অতো কিছু মনে থুবার বয়স আছে-রে।
তিনকুড়ি মনে মনে ভাবে আবিয়াকে খুশি করার এটা একটা ভালো উপায়। তুই একখান জব্বর কথা কইছিস মোহন। যেটা মোর আরো আগোত চিন্তাকরা উচিত ছিল। তবে এ্যাটেকোনা এ্যাকনা ভেজাল আছে জানিস? জালাল রাজি হবে কি না সন্দেহ আছে, কারণ আবিয়ার বাপ ভীষণ রগটেড়া লোক, ভাঙ্গবে তবু মচকাবে না, না খ্যায়া মরিবে তবু কার কাছোত হাত পাতিবে না।
সেটা তোমা মোর উপর ছাড়ি দেও দুলাভাই। তোমা যদি কন তো মুই আইজে জালালোক ধরি আনির পাইম।
আচ্ছা মোহন, মুই মরি গেইলেতো গোটা সংসারটায় তোর। কাজে কোনটা করলে ভাল হয় সেটা তুই করি ফেলাবু।
আজ একটু তাাতাড়ি বাড়ি ফিরল তিনকুড়ি খাঁ। বিকেলে মস্ত বড় দুইটা ইলিশমাছ কিনে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তার ইচ্ছে ছিল আজ সবাই মিলে একসাথে বসে রাতের খাওয়াটা খাবে। দশ-পনের দিন হয়ে গেল আবিয়ার কোন সংবাদও সে নেয় নি। তার প্রতি যে অন্যায় আচরণ সে করেছে সেটা পৃথিবীর কোন মেয়ে মেনে নেবে না। আর আবিয়া তো কম বয়সের একটা মেয়ে, এখনও তার গা থেকে কৈশরের গন্ধ যায় নাই। এই বয়সে সে একটা ভুল করতেই পারে কিন্তু সেই জন্য তাকে এভাবে মারা ঠিক হয় নি। আদৌ কি সে এই সংসার করবে? নাকি সুস্থ হলে বাড়ি ফিরে যাবে, সেটা বোঝা মুশকিল। আবিয়ার মা-বাপকে সে কথা দিয়ে এসেছে যে, দেন মোহর বাবদ আবিয়ার নামে দশ বিঘা জমি লিখে দেবে। এতো দিনে সেটাও করা হলো না। জমির কাজটা করলে হয়তো এ অযুহাতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়া যাবে। এই ভেবে তিকুড়ি মিনুকে ডাক দেয়-
মিনু দৌড়ে এসে বলে, দাদাজান, মোক ডাকাইছেন?
হ্যাঁ, তোর বাপোক এ্যাকনা ডাকে আনতো, মোর কথা কইস যে এ্যালায় ডাকাইল।
মিনু এক দৌড়ে বাড়ি যেয়ে তার বাবা মতি মিয়াকে ডেকে আনে।
মতি মিঞা এসে মাথা নিচু করে তিনকুড়ির পাশে দাঁড়িয়ে বলে-মহাজন মোক ডাকাইছেন?
হ্যাঃ মতি মিয়া। তুই এ্যাকনা কাদের মুহুরির বাড়ি য্যায়া তাক ডাকে আন তো। মোর কতা কইস যে, মহাজন তোমাক খমখায় ডাকাইছে। আর কাগজ-পাতি সেইলা সঙ্গে নিবার কইস, দেরি করিস না।
আচ্ছা মহাজন, মুই খালি যাইম আর আসিম।
মিনু, এই মিনু? এই চেংড়িটা কোন্টেকেনা যে দৌড়াদৌড়ি করি বেড়ায়। কাজের সময় ওর পাত্তায় পাওয়া যায় না।
মিনু কোথা থেকে যেন দৌড়ে এসে হাফাতে হাফাতে বলে-দাদাজান মোক ডাকের নাগচেন ক্যান?
হ্যাঁ তুই কোণ্টেকেনা থাকিস? সারাদিন খালি দৌড়াদৌড়ি করি বেড়াস। শোন তোর বড়ো দাদিক এ্যাকনা আসির ক’তো।
মিনু এক দৌড় দিয়ে যেয়ে বড়দাদিকে বলে-দাদি তোমাক দাদা এল্লায় ডাকাইল। তাড়াতাড়ি যাও, দাদা রাগে ফায়ার হয়া আছে।
রহিমা জানে যে, মহাজন অনেক্ষণ ধরে পান-বিড়ি খায় নাই, তার পান-বিড়ির নেশা ধরেছে। তাই সে পানের বাট্টা সাজিয়ে নিয়ে তিনকুড়ির কাছে যেয়ে বলে-এই ধর তোমার পান? মোর এ্যালাও পাককরা শ্যাষে হয় নাই।
আরে মুইতো তোর কাছে পান চাঁও নাই বোড় বোউ। আনছিস তা ভালোই হইছে, এ্যাকখান পান সাজে দে’তো। মোর কাছোত এ্যাকনা বইসেকতো, জরুরী কথা আছে।
রহিমা চেয়ারটা তিনকুড়ি খাঁর পাশে নিয়ে বলে- মহাজন টপকরি কঁও কি কবার চান, মোর তরকারী বোধয় পোড়া নাগিল।
বড় বউ আবিয়ার জ্বর কি এ্যালাও সারে নাই?
হ্যাঁ গেলো রাইতে গাওত জ্বর আইসে নাই, তবে শরীরটা নাকি খুব দুর্বল, হাঁটার শক্তি পায় না সারাদিন বিছিনাতে শুতি থাকে।
বড়ো বোউ, মুই এ কয়দিনে ম্যালাগুলা ভাবি দেখিনু তার গায়োত হাত তোলা মোর খুব অন্যায় হয়া গেইছে। হঠাৎ করি সেদিন কোন ভ’ত যে মোর ঘাড়ে আসি বসিল আর ক্যানে যে রাগের মাথায় মুই তাক মারির গেনু।
না -না মহাজন, তোমা অন্যায় করিবেন ক্যানে? তোমা কি আর অন্যায় করিবার পান? তোমা যেটা করেন সেটাই ন্যায়, সেটাই সত্য। এতে কাঁও মরিলে মরুক আর বাঁচিলে বাঁচুক, তাতে তোমার কি? আর সারাজীবন তো মুই সেটাই দেখি আসিবার নাগচু।
না বড়ো বোউ, আসলে সেদিন মোর মাথা ঠিক ছিল না, ক্যান যে এমন হইল, সেটা ভাবলে মোর খুব খারাপ নাগে। এখন কথা হইল- দেনমোহর বাবদ তোমার দু’জনাকে পাঁচ বিঘা করি জমি লেখি দেওয়া আছে? কিন্তু আবিয়াকে সেটা দেওয়া হয় নাই। সেইজন্য কাদের মূহুরি আসিবার নাগছে আবিয়ার নামে জমি লেখি দিবার জন্য, তুই কি বলিস বড় বোউ?
তোমার জমি তোমা কাকে লেখি দিবেন আর না দিবেন সেটা তোমার ব্যাপার। এ্যটেকোনা কার কি কওয়ার আছে। তোমার সেদিনের ব্যবহারে তায় এতোবেশী কষ্ট পাইছে যে, সুযোগ পাইলেই সে গলায় দড়ি দিয়া আত্মহত্যা করি ফেলাইত।
সর্বনাস! কইস কি বড় বোউ? আত্মহত্যা! মুইতো এভাবে ভাবো নাই। মুই মনে করিছিনু অল্প বয়সের মেয়ে তো দু’ চারদিন শাসন করলে ঠিক হয়া যাবে।
না মহাজন, সবাইকে শাসন করলে সবকিছু ঠিক হয়া যায় না, হিতে বিপরীতও হয়া যায়, তোমার সেটা ভাবার বয়স পার হয়া গেইছে।
বড় বোউ, রাইতে পোলাও-ইলিশ তার সাথে মুরগীর মাংসও করিস সবাই মিলে এক সাথে বসি খাওয়া যাবে।
এই সর্দি জ্বরে কি তাকে ইলিশ খাওয়া যায়, এমনিতেই মেয়েটার উপর দিয়ে একটা বিরাট ধকল গেল। জমের হাত থাকি বাঁচি উঠিল।
আরে একদিন আধ-দিন খাইলে কিছু কিছু হবার নয়।
মহাজনের উপর ভেতরে ভেতরে যদিও রহিমার প্রচÐ একটা ইন্দ্রিয় ক্ষোভ, একটা ঘৃণা মিশ্রিত ভাবাবেক কাজ করছে। তারপরেও কাদের মুহুরি আসবে শুনে বুকের ভেতর একটা আনন্দের অনুভুতি জেগে উঠে। তার ভেতর একটা আত্মতৃপ্তি অনুভব করছে এই বলে যে, আর কিছু হোক বা নাহোক মেয়েটার ভবিষ্যতের একটা সুরাহা হবে।
এমন সময় কাদের মুহুরি এসে সালাম দিয়ে বলে, কেমন আছেন মহাজন?
আছিরে ভাই, দিন দিন বয়স হয়া যাবার নাগছে না?
সেটা অবশ্য ঠিকই কইছেন মহাজন।
আচ্ছা কাদের শোন-ঐ বড় রাস্তার বগলের লম্বা আশিটায় কয় বিঘা জমি আছে কাগজগুলা বাহির করি একনা দেখতো?
হ্যাঁ মহাজন সেটা দশ বিঘার অল্প একনা বেশি আছে।
আরে কতোকোনা বেশি সেটাতো কবু?
এই খতিয়ানমূলে দশ বিঘা, আট শতক।
আচ্ছা হোক, ঐ দাগের গোটায় জমিটা ছোট বোউ আবিয়ার নামে একেবারে ছাব কবলা করি দিবার চাঁও। কাগজ পাতি সব ধরি আসছিস তো?
হ্যাঁঃ মহাজন সব আনছি, তবে দলিটা ছাব কবলা না করি দানপত্র করলে ঝামেলা কম হতো আর খরচও অনেকটা বেচে যেত।
আচ্ছা কাদের তুই যা ভালো মনে করিস তাই কর। মুই অতোসতো বোঝ না।
এই মিনুর মা, হামাক চা দিয়া যাও।
বাহিরে পড়ন্ত বিকেলের মিষ্টি আলো। একটা টেবিল আর কয়েকটা চেয়ার রাখা আছে। টেবিলে মুড়ি মুড়কি, আম, কলা ইত্যাদি সব নাস্তা খেতে খেতে দু’চারটা মুড়ি এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ে। তাই দেখে ঘরের চাল থেকে দু’টো শালিক পাখি একই সাথে উড়ে এসে মুড়ি গুলো খাচ্ছে। হঠাৎ জোড়া শালিক দেখে রহিমার মনের ভিতরটায় একটা খুশি খুশি ভাব এলো। কারণ জোড়া শালিক নাকি সৌভাগ্যের প্রতিক। তাহলে কি তাদের জন্য ভবিষতে কোন সৌভাগ্যের বিষয় অপেক্ষা করছে?
রহিমা পানের বাটায় সুন্দর করে পানমসলা দিয়ে বেশকয়েকটা পান বানিয়ে এনেছে। চা খাওয়া হলে একটা পান মহাজনের হাতে দিয়ে বলে-
মহাজন তোমাক অনেকদিন থাকি একটা কথা করার চাও কিন্তু সে সুযোগটাই তো হয় না। আইজ যখন সুযোগ হইল কথাটা কঁও এ্যাকনা মন দিয়া শোনেন- মোহন তো হামার কাছোতেই ছওয়ার মতো বড়ো হইলো, তার নিজের বাড়ি কোনটা সেটা তায় জানে না। তোমাকে সে বাপের মতোয় মান্য করে। তার জন্য তোমার কিছু করা দরকার না?
হ্যাঃ হামার কাছোত ছোটবেলা থাকি তায় বড়ো হইল, যদিও মুই মরি গেইলে তামানে তার হবে কিন্তু তার তো নিজের কিছুই নাই। আচ্ছা বোউ একটা কাজ করলে কেমন হয়?
কি কাজ?
চাউলের আড়ত তো মোহনই দেখে, অটেকোনা প্রায় সাত-আট বিঘা জমিও আছে। ওঠা মোহনের নামে করি দেঁও। মোর অবর্তমানে ছেলেটা করি মিলি খাবার পাবে।
মুহুরি কতদুর লেখা হইলো তোর?
সব লেখা শেষ মহাজন, এখন শুধু স্বাক্ষর লাগবে।
মুহুরি আরও একটা যে দলিল করির নাগবে?
সেটাও লেখা শেষ মহাজন?
কোনটা?
ঐ চাতাল সহ চাউলের আড়তের জমিগুলা মোহনের নামে একটা দলিল হয়া গেইছে।
আরে, কইস কি মুহুরি? তুইতো এক নিমিশে মোর তামান সম্পত্তি লেখি নিবার পাবু।
হ্যাঁ মহাজন, তা হয়তো পাওয়া যাবে কিন্তু সই? আসল জিনিসটা তো আপনার হাতে, ওটা না হলে গোটা দুনিয়াটা লিখে কি কোন কাম হবে মহাজন?
সেটা অবশ্য ঠিক কইছেস মুহুরী।
আচ্ছা মহাজন, এখানে আপনার সই লাগবে। আর এখানে ভাবির সই লাগবে।
ঊড় বোউ তুই আবিয়াক ধরি আয়।
এ কয়েকদিনে রহিমা, আবিয়াকে অনেক বুঝিয়েছে শোন আবিয়া, তোর মতো এতো সুন্দরী একটা মেয়ে যদি সারা জীবন কোন গরীবের ঘরে অনাহারে, অর্ধারে, পরনে ছেঁড়া কাপড়, মাথায় উসকো খুসকো চুলে জীবন কাটায় সেটা হতো আরও কষ্টের, আরও অবমানাকর। মুই তোর মনের কষ্টটা দূর করির পাইম না, তবে মোর বিশ্বাস আছে দিনের পর দিন একটু সামান্য সচ্ছলতার জন্য কতো যে দুর্ভাবনায় তোকে ভুগতে হইছিল সেটা মুই বুঝিবার পাইছু। তোর বাবা গরীব হবার পারে কিন্তু তার আভিজাত্যের ভাবটা সে কোন দিনই খোয়াতে চায় না, এটা মুই অনেকবার শুনছিনু। অসুখে তোর মাও মরি যাবার ধরছে তবুও তোর বাপ কারকাছে হাত পাতে নাই। আবিয়া তার রহিমা বুবুর কথাগুলো খুব মনোযোগের সাথেই শুনছিল। যেহেতু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তার এ পরিনতি কাজেই সব কিছুকে মেনে নিয়ে জীবনের পথ চলতে হবে অন্যথায় বিড়ম্বনা আরও বাড়বে।
আবিয়া এক-দু’মিনিট মাথা হেঁট করে চুপ করে রইল তারপর আস্তে আস্তে মুখ তুলে বললো- দু’বোনের মধ্যে সুন্দরী রুপসীটাই যদি যায় বুড়োর হাতে, তাহলে জীবনের বিচার বিবেগে এ রকম উপলব্ধি নিয়ে বাদ বাকিটা যাবে কোন দিকে বুবু?
এতো কঠিন প্রশ্নের মুখো-মুখি জীবনে কখনো হয় নি রহিমা, তার কাছে এর কোন সদোত্তর জানা নাই। সে একটু ইতস্ততঃ বোধ করলেও মনে মনে সান্তনা খুঁজে পেয়েছে এই বলে যে- আবিয়া আস্তে আস্তে সব কিছু ভুলে স্বাভাবিক হতে চলেছে। রহিমা আলমারি হতে একটা নতুন শাড়ি, বøাউজ, পেটিকোট বেড় করে আবিয়াকে দিয়ে বলে-তাড়াতাড়ি এটা পরে নে, তোকে বাইরে মুহুরির কাছে যাবার নাগবে।
হালকা জলপাই রঙের শাড়িতে আবিয়াকে দেখে আর এ জগতের কেউ বলে মনে হয় না। মনে হচ্ছে কোন হুর-পরী -যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছে।
আবিয়াকে দেখে মোহন উঠে দাঁড়াল, নিজের চেয়ারটা ছেড়ে দিয়ে অন্য একটি চেয়ারে গিয়ে বসল। আবিয়া চেয়ারে বসে টেবিলের দিকে মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে। সেখানকার পরিবেশ টা এমন হয়েছে, যেন বরপক্ষের কেউ আবিয়াকে দেখতে এসেছে।
এই নীরবতাকে ভেঙ্গে দিয়ে পরিবেশটাকে একটু স্বাভাবিক করতে মোহন দুষ্টুমি শুরু করল। সে তার চেয়ারটা দুলাভাইয়ের পাশে নিয়ে সোজা সুজি আবিয়ার দিকে মুখ করে বসে বলল- এই যে মা, মাথাটা একটু উপরে তোল তো দেখি?
মোহনের ইচ্ছাকৃত দুষ্টুমিটা আবিয়ার বোধকে ফাঁকি দিতে পারে নাই। তাই সে মাথাটা উঁচু করে একেবারে সোজা সুজি মোহনের দিকে মুখ করে ঘুরে বসে।
মোহন আবিয়ার কাছে কখনোই এতোটা আশা করে নি, যা সে করে দেখালো। নতুন কিছু বলার জন্য মোহনের সুযোগটা আরও বেড়ে গেলো- তাই সে একেবারে স্বাভাবিক হয়ে প্রশ্ন করলো- আচ্ছা মা, আলহামদু -সুরাটা একটু তেলাওয়াদ করে শুনাও তো? দেখি পার কি না।
মোহনের সহজ সরল চেহারার মধ্যে যে এতোটা রসিকতা লুকিয়ে ছিল সেটা রহিমা কিংবা তিনকুড়ি কেহই এর আগে টের পায় নাই। রহিমা কোন ভাবেই তার নিজেকে সামালাতে পারল না। উচ্চ স্বরে হিঃ হিঃ হেসে উঠলো।
কাদের মুহুরিও হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিল, মহাজনের পাশে বসায় তিনি চেয়ারটা খপকরে হাতদিয়ে ধরে ফেললেন। তিনকুড়িও হাসছে। এ বাড়িতে অনেকদিন পর এমন একটা হাসি-তামাশার পরিবেশ ফিরে আসলো।
এবার কাদের মুহুরি পকেট থেকে রুমাল বের করে তার চোখ মুছে একটু স্বাভাবিক হয়ে, পানির গøাসটা মুখে দিয়ে দু’ঢোক পানি খেলো। তারপর খাতাটা আবিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো- ভাবীসাব এখানে একটা সই করে দিন তো?
আবিয়া কোন কথা না বলে সই করে দিলো।
কাদের মুহুরি আবিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো- আচ্ছা ভাবীসাব একবার জিজ্ঞাসাও করলেন না যে, এখানে কিশের সই নিলাম?
আবিয়া এই প্রথম একটা কথা বললো- না ভাই, আপনারা এতোগুলো মুরুব্বী এখানে বসে নিশ্চয়ই আমার অমঙ্গল করবেন না? এই বিশ্বাসটুকু আমার আছে।
যা হোক ভাবিসাব, আপনাকে জানানোটা আমার দ¦ায়িত্বেও মধ্যে পড়ে তাই বলি- মহাজন দশ বিঘা জমি আপনার নামে লিখে দিলো, এটি হচ্ছে সেই দলিল। আর চাতাল সহ সেখানকার স্থাবর সম্পত্তি মোহনের নামে লিখে দেয়া হলো। ভাবিসাব কিছু বললেন না যে?
ভাই, আমার কোন কিছু পাওয়ার আকাঙ্খা নাই। পানি উপযুক্ত শাপলা ফুলের জন্য, গোলাপ ফুলের জন্য নয়। গোলাপ ফুলকে পানিতে রাখলে সে পঁচে যায়। যদিও সৃষ্টি জীবের বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদান হলো পানি, যা নাহলে তারা একদিনও বাঁচতে পারে না, আবার সেই পানিতেই ডুবেই মানুষ প্রাণ হারায়। কাজেই আমার এসবের উপর কোন লোভ নেই ভাই।
ভাবিসাব, আমরা আমাদের জীবনটাকে নিয়ে সবাই নিজের মতো করে ভাবি, সামগ্রিক ভাবে ভাবার কোন অবকাশ পাই না। আমাদের ভাবনার পরিসর সীমাবদ্ধ, তাই এতোটুকু- ক্ষুদ্র। উঠতে মন চাচ্ছে না ভাবিসাব কিন্তু না উঠে উপায় নেই, অনেক কাজ বাকী, কালকে সকাল সকাল ফাইলগুলো অফিস পার করাতে হবে, আমি তাহলে এবার উঠি ভাবিসাব, উঠি মহাজন।
আরে উঠবু ক্যান মুহুরি? আইজ ভালো খাওয়া দাওয়া আছে মিয়া। এই জন্য তো তোক বাড়িত ডাকে আনা হইলো। বড় বোউ খাবার দাবার যা আছে আনো কাদেরের তাড়া আছে।
তিনকুড়ি খাঁ, আবিয়ার দিকে একদৃষ্টে নিমগ্ন হয়ে তাকিয়ে থাকে আর মনে মনে ভাবে তার প্রতি যে জুলুম, যে অমানষিক অত্যাচার সে করেছে তার কোন মাফ নেই, কোন ক্ষমা নেই। যে সন্তানের জন্য সে আবিয়াকে বিয়ে করে আগের সূত্র অনুযায়ী “প্রথম রাতেই বিড়াল মারতে চেয়েছিল”, কিন্তু দিন বদলের পালায় এখন আর সেই সূত্র খাটে না। এটা বড়ো বোউ রহিমা কিংবা মেজ বোউ আমেনা নয়, এ হচ্ছে দু’দশক পরের নতুন প্রজন্মের আবিয়া। এর গায়ে আছে আধুনিকতার গন্ধ, পেটে স্কুলে পড়ার বিদ্যা, রক্তে মিশে আছে বিদ্যার কালি। একে শাসন করলে বিদ্যার আগুন আরও জ্বলে উঠবে, কাজেই শাসন নয়, সোহাগ করে, ভালোবাসা দিয়ে সে আগুন দমিয়ে রাখা সম্ভব।
মহাজন একেবারে মাটিতে মিশে গিয়ে মাথা নতো করে বিনয়ের সাথে, নরম সুরে আবিয়াকে বলে- ছোট বোউ মুই জানো, তোর সাথে সেদিনের দুর্ব্যবহার ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হইছে। মন থেকে কোন দিনই মোক ক্ষমা করিবার পাবু না। তুই মোর চোখ খুলি দিলু ছোট বোউ। যতোদিন মুই বাঁচি থাকিম আর কোন দিন কার সাথে খারাপ ব্যবহার করিম না। তুই মোক মাফ করি দেইস।
হঠাৎ ক্ষমার প্রসঙ্গ আসলো কেন মহাজন? আপনারা বড়লোক মানুষ নিজের ঘাড়ে দোষ চাপালে মান সম্মানের হানি হবে। এখন আর এসব বলে কি লাভ? জীবনের সুতোয় যেহেতু গিঠ পড়েই গেছে এখানে ঘুড়ি আর কতো দুরেই বা যেতে পারে, আজ না হোক কাল তাকে ফিরে আসতেই হবে।
ছোট বোউ, এ সমাজের মানুষগুলা মহাজন, মহাজন কয়া মোর সামনে মাথা নিচ করি থাকে। মোর আগোত মাথা তুলি কথা করার সাহস কারো হয় না। কিন্তু এতোদিন পর মুই বুঝনু যে, সমাজের মানুষ আর ঘরের মানুষ এক নয়।
জীবনের এই অভিজ্ঞতা আজ মোক ম্যালাকিছু শিখাইল। মোর জীবনের কষ্টের অতীত, দিনের পর দিন না খ্যায়া থাকা, না খ্যায়া বাপ- মা মরি গেইলে মান্সির জমিত মাটি দেওয়া, এক মুষ্টি ভাতের জন্য সারাদিন মান্সির বাড়িত কাজ করা, গরুরপাল ধরি সারাদিন কাশিযা বাড়িত পড়ি থাকা-কি যে কষ্টের সেটা মুই কাউকে বোঝাবার পাও না।
পাথরে পাথর ঘষে যেমন আগুনের ফুলকি বেড় হয় কিন্তু সেটা স্থায়ী হয় না, আলো ছড়াতে পারে না, তিনকুড়ির এসব আবেগময়ী বানোয়াট কাহিনী আবিয়ার বুকে সাময়িক আগুনের ফুলকি বের হলেও সেটা আলো ছড়াতে পারলো না। আবিয়া মাথা নিচু করে নির্বাক হয়ে বসে রইল। আবিয়ার এ নীরবতার মাঝে সম্মতি খুঁজে পায় তিনকুড়ির খাঁর সুচতুর চোখ তাই সে ভেতরে ভেতরে চঞ্চল হয়ে ওঠে। বিয়ের পর এই প্রথম তার সামনে আবিয়ার মুখ দিয়ে একটা বাক্য বের হলো। তার ধারণা আবিয়া একটু একটু করে হলেও সেদিনের ঘটনাটা মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now