বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
শরতের নরম রোদে ঝলমল করছে সবুজ ধানক্ষেত। বাতাসে ধানগাছের মাথা দুলছে, যেন গ্রামের প্রান্তরে কোনো অদৃশ্য সুর বাজছে। সেই সুরের মাঝখানেই ঢুকে পড়লেন শহুরে লোকটি—তাঁর গায়ে ঝকঝকে শার্ট, হাতে দামি ক্যামেরা, পায়ে চকচকে জুতো। গ্রামের লোকেরা প্রথমে ভেবেছিল, বুঝি কোনো বড় অফিসার এসেছেন পরিদর্শনে। কিন্তু পরে জানা গেল, তিনি আসলে “প্রকৃতি দেখতে” এসেছেন। শহরের লোকেরা যেমন “ভ্রমণ” বলে একটা বড় ব্যাপার বানায়, গ্রামের মানুষ সেটাকে বলে, “চলেন একটু হাওয়া খাই।”
লোকটির নাম নিতাই সেন। তিনি শহরের নামকরা বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করেন। সৃজনশীল মানুষ—তাঁর মাথায় চিন্তা এত দ্রুত আসে যে মাঝে মাঝে তিনি নিজেই ভয় পান, “এই বুঝি চিন্তা দৌড়ে মাথা ফাটাল!” তাই একটু বিশ্রাম নিতে এই গ্রামে এসেছেন।
গ্রামে এসে তিনি প্রথমেই অবাক। মানুষ এখানে হাসে, কথা বলে, চা খেতে সময় নেয়—কেউ হর্ন বাজায় না, কেউ ফোনে চেঁচায় না। যেন সময় এখানে ঘুমিয়ে আছে।
এমন সময় তাঁর চোখে পড়ে—একটি ছোট মেয়ে, খালি পায়ে, গলায় নীল ওড়না ঝুলিয়ে, হাতে একগুচ্ছ ঘাস নিয়ে ছাগলের পেছনে দৌড়াচ্ছে। ছাগলগুলোও বেশ দুষ্টু—একটা গাছে উঠছে, আরেকটা অন্যের জমিতে ঢুকে পড়ছে। মেয়েটি চিৎকার করছে, “এই বুবু! ওইদিকে যাস না রে! আবার মামার গাছ খাইলে খবর আছে কিন্তু!”
নিতাই মুগ্ধ হয়ে দেখলেন দৃশ্যটা। ছাগল সামলানোও কী একটা শিল্প হতে পারে, সেটা যেন প্রথম বুঝলেন তিনি। ধীরে ধীরে মেয়েটির দিকে এগিয়ে গিয়ে মিষ্টি গলায় বললেন,
“এই, তোমার নাম কী রে?”
মেয়েটি একটু লজ্জা পেয়ে ওড়নার কোণা মুখে ঠেকিয়ে বলল, “আজ্ঞে, আমার নাম মিতু।”
নিতাই হাসলেন, “বাহ! দারুণ নাম তো! আচ্ছা, মিতু, তুমি কী করো এখানে?”
মিতু গর্বিত গলায় বলল, “আমি মাঠে যাই, ছাগল চরাই, আর মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজ করি। দুপুরে ধান শুকাতে দিই, রাতে মাকে সাহায্য করি রুটি বানাতে।”
নিতাই মনে মনে ভাবলেন—এই বয়সে তাঁর শহরের ভাইঝি এখনো ক্যালকুলেটরে গুণ শেখে, আর এই মেয়েটা সংসারের অর্ধেক কাজ চালায়! কিন্তু মুখে বললেন, “বেশ! তুমি তো একদম পরিশ্রমী মেয়ে। আচ্ছা বলো তো, পৃথিবীতে সবচেয়ে দ্রুতগামী জিনিস কোনটা?”
মিতু একটু চোখ কুঁচকে ভাবল। তারপর এমন গম্ভীর মুখ করে উত্তর দিল, “চিন্তা।”
নিতাই চমকে উঠলেন, “চিন্তা? বাহ! খুব মজার কথা বললে। কিন্তু তুমি জানলে কী করে?”
মিতু হাসল, “কাল রাতে বাবা মাকে বলছিলেন, ‘কাল কী হবে সেটা ভাবতে ভাবতেই তো জীবনটা শেষ হয়ে গেল!’ তখন ভাবলাম, চিন্তাই বুঝি সবচেয়ে জোরে চলে, নইলে এত তাড়াতাড়ি জীবন শেষ হয় কী করে!”
নিতাই এত জোরে হেসে উঠলেন যে তাঁর ক্যামেরা প্রায় হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল। গ্রামের ছাগলগুলোও থমকে তাকাল, যেন বলছে, “শহুরে মানুষটা পাগল নাকি!”
মিতুর সরল মুখ দেখে তিনি মুগ্ধ। মনে মনে ভাবলেন, “এই ছোট মেয়ে যদি শহরে যেত, তাহলে ‘মোটিভেশনাল স্পিকার’ হয়ে যেত।”
পরদিন নিতাই সিদ্ধান্ত নিলেন, মিতুকে আরও একটু জানবেন। তিনি তাঁবু ফেলে গ্রামের চায়ের দোকানে বসে থাকেন, আর মিতু প্রতিদিন ছাগল চরাতে আসলে তার সঙ্গে গল্প করেন।
মিতু খুব কথা বলে—তবে সব কথা সরল, মাটির গন্ধে ভরা। সে বলে, “আমাদের ছাগলগুলা খুব চালাক। ওরা জানে কার গাছের পাতা মিষ্টি, আর কারটাতে লাঠি পড়বে।”
নিতাই হেসে বলেন, “তাহলে ওরা তোমাদের গ্রামের রাজনীতি বোঝে!”
মিতু বোকার মতো তাকিয়ে থাকে, “রাজনীতি মানে কী?”
নিতাই গম্ভীরভাবে বলে, “যেখানে সবাই অন্যের পাতায় মুখ দেয়, কিন্তু নিজে ফল ফলায় না।”
মিতু মাথা নাড়ল, “তাহলে আমাদের ছাগলগুলা রাজনীতিবিদ!”
এবার হাসতে হাসতে নিতাইয়ের পেট ব্যথা। সে বলল, “তুমি তো একদম দার্শনিক মিতু!”
মিতু কিছু না বুঝে হাসে, “দার্শনিক মানে কি ছাগল সামলায়?”
দিনগুলো এমন আনন্দে কাটতে লাগল যে নিতাই ভুলে গেলেন, তিনি শহরের মানুষ। দুপুরে খেজুরপাতার ছায়ায় বসে খেতেন মুড়ি আর কলা, মিতুর মা আনতেন দুধ-চা। রাতে তিনি নদীর ধারে বসে তারার আকাশ দেখতেন—যে আকাশ শহরে দেখা যায় না, কারণ সেখানে আকাশও যেন বিল্ডিংয়ের নিচে আটকা পড়ে।
একদিন নিতাই ভাবলেন, মিতুকে একটা উপহার দেবেন। তাই তিনি শহর থেকে আনা চকোলেটের একটা প্যাকেট বের করে বললেন, “এই নাও, তোমার জন্য।”
মিতু অবাক হয়ে তাকাল, “এটা কী?”
“চকোলেট! খেলে মিষ্টি লাগে।”
মিতু একটা মুখে দিয়ে চিবোতেই মুখ বিকৃত করে বলল, “ইস! দই-এর মতো টক মিষ্টি!”
নিতাই হাসলেন, “ওটা ভালো জিনিস রে। আমরা শহরে ওটা খাই সুখে।”
মিতু বলল, “তাহলে সুখও টক?”
এইবার নিতাই সত্যিই বোবা হয়ে গেলেন। সে মৃদু হেসে ভাবলেন, “এই মেয়ে তো আমাকে জীবন দর্শন শেখাবে!”
তৃতীয় দিন সকালে মিতুর বাবা এলেন দেখা করতে। লোকটা মাটির মতো রঙের, চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মুখে স্নিগ্ধতা। বললেন, “বাবু, শুনছি আপনি মিতুর সঙ্গে কথা বলেন, ও খুব খুশি। আমি ভাবছি, মেয়েটাকে পড়াশোনা শেখাতে চাই। কিন্তু স্কুলে পাঠালে কাজ কে করবে?”
নিতাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর পকেট থেকে একটা কলম বের করে মিতুর হাতে দিলেন। “এই কলমটা রাখো। এটা শুধু লেখার জন্য না, এটা ভাবার জন্যও। যেদিন তুমি চিন্তা লিখে ফেলতে পারবে, সেদিন দেখবে—তোমার চিন্তাই তোমাকে কোথায় নিয়ে গেছে।”
মিতু হাসল, “তাহলে চিন্তা সত্যিই দ্রুতগামী!”
নিতাই চলে যাওয়ার সময় গ্রামের সবাই হাত নেড়ে বিদায় জানাল। মিতু দূর থেকে চিৎকার করে বলল, “শহুরে কাকা! আবার আসবেন, ছাগলগুলো আপনাকে মনে রাখবে!”
নিতাই হেসে বললেন, “আর তুমি আমার চিন্তায় থাকবে, মিতু!”
শহরে ফিরে এসে নিতাই যখন অফিসে ঢুকলেন, সহকর্মীরা বলল, “দোস্ত, কেমন কাটল ছুটি?”
তিনি হেসে উত্তর দিলেন, “চমৎকার! আমি খুঁজে পেয়েছি পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগামী জিনিস—চিন্তা না, সরলতা!”
সেদিন রাতেই তিনি তাঁর নতুন বিজ্ঞাপনের জন্য লিখলেন—
“যেখানে মানুষ ধীরে বাঁচে, সেখানেই জীবন দ্রুত সুন্দর হয়।”
আর তাঁর ডেস্কে রাখা ছোট্ট চিঠিটা—মিতুর লেখা, কাঁপা হাতের অক্ষরে—
“চিন্তা দ্রুত যায় ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসা আরও দূরে যায়, কাকা।”
সেই থেকে নিতাই যখনই কোনো জটিল বিজ্ঞাপন নিয়ে ভাবেন, মনে পড়ে ছোট্ট মিতুর কথা। আর হাসতে হাসতে নিজেই বলেন,
“চিন্তার গতি যতই দ্রুত হোক, সরল বুদ্ধির কাছে হার মানবেই।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now