বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
ঢাকার জ্যাম এখন জাতীয় সম্পদ—যে পাইছে সে ভাগ্যবান, না পাইলে যেন দেশপ্রেমের কোটা পূর্ণ হয় না। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের রোদে গলে যাওয়া অ্যাসফাল্টের ওপরে গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে একেকটা পাকা আমের মতো নরম হয়ে। ড্রাইভাররা চুলকাচ্ছে, হকাররা গলা ফাটাচ্ছে, আর বাচ্চাগুলো... ওরা ঘুরছে, ছুটছে, কাঁদছে—আর গাড়ির জানালায় টোকা মারছে। ছোট ছোট হাত, চোখে মায়া, গলায় আবেদন—“একটু দেন ভাই, খাই নাই।”
এই দৃশ্যটা প্রতিদিনের, কিন্তু আজ একটু অন্যরকম লাগল মফিজ মাষ্টারের কাছে। ওনার সদ্য রিটায়ারমেন্ট, পেনশনের কিছু টাকা হাতে এসেছে, মনটাও তাই একটু দয়ালু। ভাবলেন, “আল্লাহর রাস্তায় খরচ করি।” গাড়ির জানালা নামাতেই এক পাঁচ বছরের ছেলে এগিয়ে এল। ছেলেটার গায়ের রঙ কালচে, গলা শুকনো, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত বুদ্ধির ঝিলিক। মফিজ মাষ্টার বললেন, “তোমার নাম কী রে?”
ছেলেটা একটুখানি থেমে বলল, “আলম মিয়া। মা বলে, নাম শুনলেই সবাই কিছু না কিছু দেয়।”
মফিজ মাষ্টার হাসলেন, পকেট থেকে দশ টাকা বের করলেন। কিন্তু ছেলেটা নেয় না—“ছোট নোট লাগে না ভাই, পাঁচশ টাকার উপর দিলে তারপর কৃতজ্ঞতা।”
মফিজ মাষ্টার একটু থতমত খেয়ে বললেন, “এ কী! তুই ভিক্ষা করছিস না?”
ছেলেটা বলল, “না ভাই, আমরা এখন ব্যবসা করি। আমাদের ফাতেমা বেগম আছে, উনি সিইও।”
মফিজ মাষ্টারের মাথা চক্কর খাওয়ার উপক্রম। জানালার পাশে তাকিয়ে দেখেন, একটু দূরে মাঝবয়সী এক মহিলা ছায়ায় বসে চা খাচ্ছেন। পাশে তিন-চারটা বাচ্চা রোদে ঘুরছে, আবার ওর কাছে গিয়ে হিসাব দিচ্ছে। মহিলাটা তখন মোবাইলে কারও সঙ্গে কথা বলছে, “হ্যাঁ, আজকে সাতটা গাড়ি থেকে উঠছে, বিকালে শাহবাগে শিফট দিব।”
মফিজ মাষ্টারের মন খারাপ হয়ে গেল। ভাবলেন, “এই ফাতেমা বেগমরা যদি চাকরি প্রতিযোগিতায় নামত, হয়তো এখন ব্যাংকের এমডি হত!”
গাড়ি একটু এগোয়, আবার থামে। এবার পাশে বসা পুলিশ অফিসার বললেন, “এই মহিলাগুলা সব নেটওয়ার্ক। ফাতেমা বেগম আসলে ‘মায়ার ব্যাঙ্ক লিমিটেড’-এর ম্যানেজার। এই ব্যাঙ্কে বিনিয়োগ করলে শুধু সহানুভূতিই ফেরত আসে, টাকা না।”
মফিজ মাষ্টার হাসলেন, “তাইলে বুঝি দানও এখন সিআরএম ম্যানেজমেন্টের আওতায় চলে গেছে।”
গাড়ি থেকে নেমে তিনি ফুটপাথে গেলেন, ফাতেমা বেগমের সামনে দাঁড়ালেন। বললেন, “আপনার ছেলেমেয়েরা তো খুব পরিশ্রম করছে, স্কুলে দেন না কেন?”
ফাতেমা বেগম বলল, “স্কুলে দিলে তো ইনকাম বন্ধ হবে। খাইব কী?”
“তুমি নিজে কিছু কাজ করো না?”
“ভিক্ষা করি না ভাই, আমি তো ব্যবসা চালাই। আপনারা অফিসে বসে পেনশন খাচ্ছেন, আমি রোদে বসে প্রজেক্ট চালাই। এই বাচ্চাগুলা আমার অ্যাসেট।”
মফিজ মাষ্টার মাথা নাড়লেন, “বাহ! এখন বুঝি ভিক্ষাও স্টার্টআপ হয়ে গেছে। নাম দিও—StreetSmart Limited।”
এই কথায় আশেপাশে কিছু পথচারী হেসে উঠল। এক তরুণ সাংবাদিক ছবি তুলছে, বলল, “স্যার, আপনি ঠিক বলেছেন। আমি ফিচার লিখব, ‘ফাতেমা বেগম: রাস্তাঘাটের উদ্যোক্তা’। সমাজসেবায় অবদান রাখছেন, করছাড়ও পেতে পারেন।”
ফাতেমা হেসে বলল, “আরে ভাই, আমিও চাই আমার ছেলেমেয়েরা বড় হোক। কিন্তু স্কুলে দিলে দুপুরে কে গাড়ির জানালায় টোকা দেবে?”
মফিজ মাষ্টারের মনটা এক মুহূর্তের জন্য ভারী হয়ে গেল। তিনি ছেলেটাকে ডাকলেন, “আলম, তুই স্কুলে যেতে চাস?”
আলম মাথা চুলকিয়ে বলল, “স্কুলে গেলে খাওন কমে যাবে ভাই।”
“তোর মা দেবে না?”
“ওনি মা না ভাই, ম্যানেজার। আমি ওনার প্রজেক্ট!”
এই উত্তর শুনে মফিজ মাষ্টারের ভিতরে হঠাৎ এক অদ্ভুত হাসি উঠল—একটা তিক্ত অথচ মায়াময় হাসি। তিনি ভাবলেন, “বাহ, আমাদের সময় ‘ছাত্র’ মানে ছিল স্কুলের মানুষ, এখন ‘স্ট্রিট প্রজেক্ট’। উন্নয়নের যুগ, কী সুন্দর!”
পরের সপ্তাহে তিনি আবার ঐ পথে গেলেন। এবার হাতে কিছু নতুন বই—বাচ্চাদের গল্পের বই, কলম, খাতা। আলমকে ডেকে দিলেন, “এই নে, তোর জন্য।”
আলম বই দেখে খুশি হলেও চুপ করে থাকে। একটু পর বলে, “ভাই, এই বই বিক্রি করলে কত পাবো?”
মফিজ মাষ্টার হেসে ফেললেন, “না রে, এই বই বিক্রি না, তুই পড়বি।”
“পড়লে খাইব কী ভাই?”
এই কথায় পাশের রিকশাওয়ালাও হাসল। এক বৃদ্ধ বললেন, “বাবা, এখনকার শিশুরা বাস্তববাদী। আগে যেমন আমরা বলতাম, ‘চলো স্কুলে,’ এখন ওরা বলে, ‘চলো ইনকামে।’”
তিন মাস পর হঠাৎ মফিজ মাষ্টার দেখতে পেলেন, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ওই জায়গায় বাচ্চাগুলোর দেখা নেই। জায়গাটা ফাঁকা। ভাবলেন, হয়তো কোথাও পুলিশ ধরেছে। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর হঠাৎ আগারগাঁওয়ের এক পার্কে দেখলেন, আলম বই নিয়ে বসে আছে, পাশে আরও কয়েকজন বাচ্চা, আর ফাতেমা বেগম—হাতে একটা বোর্ড ঝুলছে—“পথশিশুদের ফ্রি স্কুল: শিক্ষা মানে মুক্তি।”
মফিজ মাষ্টার চমকে গেলেন, “তুমি!”
ফাতেমা হেসে বলল, “হ্যাঁ ভাই, এবার আমি এনজিও চালাই। মায়ার ব্যাঙ্ক লিমিটেড থেকে এডুকেশন ট্রাস্টে রূপান্তর করেছি। ভাবলাম, ভিক্ষার ব্যবসা টেকসই না। এখন দানও পিআর দিয়ে আসে, তাই নতুন ব্র্যান্ড খুলেছি।”
মফিজ মাষ্টার মাথা নেড়ে হেসে ফেললেন। বুঝলেন, সমাজ বদলায় না—শুধু ফরম্যাট পাল্টায়। ভিক্ষা থেকে ট্রাস্ট, ট্রাস্ট থেকে ফাউন্ডেশন—সব একই মায়ার জালে বাঁধা।
তিনি নিজের পকেট থেকে হাজার টাকা বের করলেন। ফাতেমা বলল, “দিচ্ছেন কেন ভাই?”
“এবার দিচ্ছি বিনিয়োগ হিসেবে। সুদ চাই না, শুধু ফল চাই—এই বাচ্চাগুলা যেন একদিন কাউকে জানালা দিয়ে হাত না বাড়ায়।”
আলম মিয়া খুশি হয়ে বলল, “ভাই, আমি একদিন নিজে শিক্ষক হইব।”
মফিজ মাষ্টার হাসলেন, “তা হলে ঠিক আছে, আমি হব তোর প্রথম ছাত্র।”
রোদ তখন ম্লান, বাতাসে শহরের ধুলা-মায়া উড়ছে। মফিজ মাষ্টার জানলেন, দান মানে টাকা নয়—বিশ্বাস ফেরত পাওয়া। “মায়ার ব্যাঙ্ক লিমিটেড”-এর সেই প্রথম ডিপোজিট আজ সত্যিকারের সুদে ফিরল—একটা শিশুর চোখের স্বপ্ন হয়ে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now