বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বিশ্বাসের ব্যাংক ও মানবিকতার মুনাফা

"মজার অভিজ্ঞতা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X শহরে এখন দান করা মানে যেন একপ্রকার অন্ধকারে দৌড়ানো খেলা। কে সত্যিকারের অভাবী, আর কে “প্রফেশনাল ফকির”—এটা বোঝা যায় না। আগের দিনে ভিক্ষুকদের মুখে ছিল বিনয়, চোখে ছিল শ্রদ্ধা। এখনকার ফকিরদের চোখে সানগ্লাস, হাতে স্মার্টফোন, আর মুখে এমন ডায়লগ—“ভাই, বিকাশে দিতে পারেন।” এমনকি অনেকে রসিদও দেয়—“ধন্যবাদ, আপনার দান গ্রহণ করা হলো।” যেন মানবিকতারও এখন ইনভয়েস তৈরি হয়! এদের নিজস্ব সিন্ডিকেট আছে। একেকটা মোড়ে একেকজন “লিডার ফকির”, এলাকাভিত্তিক রোটেশন চলে—সকাল ৮টা থেকে দুপুর পর্যন্ত নিউ মার্কেট এলাকায়, বিকেলে শাহবাগে, রাতে বিমানবন্দর। ফকিরদের বসদের আবার নিজস্ব গাড়ি আছে, কেউ কেউ শহরের বাইরে জমিজমাও কিনে ফেলেছে। টিভিতে একদিন দেখলাম, এক ভিক্ষুকের গ্রামে রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি। পাশে পুকুরে মাছের ঘের। সাংবাদিক জিজ্ঞেস করল, “আপনি ভিক্ষা করেন কেন?” ফকির হেসে বলল, “এইটা আমার প্যাশন, পেশা না।” এইসব ঘটনা শুনে মহিউদ্দিন মাষ্টার গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিতাসপুর গ্রামের লোকেরা তাকে “মহিউদ্দিন ব্যাংক লিমিটেড” বলে ডাকে। ব্যাংক বলার কারণ, তিনি টাকা দেন—ফেরত চান না। আর তার এই মানবিক দুর্বলতার সুযোগে অনেকে পুরোপুরি “মানবিক ব্যবসায়ী” হয়ে গেছে। একদিন চায়ের দোকানে বসে মাষ্টার সাহেব বললেন, “শুনছো রইস, শহরে নাকি এখন ভিক্ষুকদের ইউনিয়ন আছে?” রইস চা খেতে খেতে বলল, “হ, ভাই। শুনেছি ওরা বোনাসও পায়। ঈদের সময় নাকি ‘দান উৎসব বোনাস’ দেয় তাদের নেতা!” মাষ্টার হেসে বললেন, “আমাদের গ্রামের ফকিররাও এখন সেই পথে হাঁটছে। আমি তো গত মাসে দেখেছি, ফকির হালিমার হাতে স্মার্টফোন। বলল, ‘দাদা, বিকাশে দিন, এখন অনলাইনে কাজ করি।’ আমি তো তখনই বুঝলাম, দান এখন ডিজিটাল হয়েছে।” তবে সবচেয়ে বড় বিপদ ঘটল যখন শহরের সেই ফকিরি ব্যবসার ধারা গ্রামে ঢুকে পড়ল। তিতাসপুরের মানুষ এখন কৌশলে সহানুভূতি বিক্রি করে। কেউ বলে, “বাচ্চার স্কুল ফি নাই”, কেউ বলে, “মায়ের অপারেশন লাগবে”, কেউ বলে, “মোবাইলের চার্জার পুড়ে গেছে”—সব অজুহাতেই মূল লক্ষ্য একটাই, মহিউদ্দিন মাষ্টারের কাছ থেকে কিছু বের করা। মাষ্টার সাহেব এখন আর সহজে বিশ্বাস করেন না। কিন্তু তখনও তিনি পুরোপুরি পাথর হননি। ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হওয়া এক ছাত্র একদিন এল, চোখে পানি, গলায় কণ্ঠনালী কাঁপানো অনুনয়— “ভাই, মেরুদণ্ডের অপারেশন, পাঁচ লক্ষ লাগবে, একটু সহযোগিতা করেন।” মাষ্টার সাহেবের মন নরম। ভাবলেন, বেচারার জীবন-মরণ ব্যাপার। তাই বললেন, “আল্লাহর নাম নিয়ে থাকো, ভাই। আমি ২০ হাজার দিচ্ছি, অফেরতযোগ্য।” তখন তিনি বুঝতে পারেননি, “অফেরতযোগ্য” মানে আসলে “অবশ্যই হারাবেন”। সপ্তাহ খানেক পরেই ফেসবুকে দেখলেন সেই ছাত্র কক্সবাজারে। ক্যাপশন—“বাঁধভাঙা আনন্দ, কক্সবাজারে প্রথম সূর্যোদয়।” মাষ্টার সাহেব একবার স্ক্রিনে তাকিয়ে, আরেকবার নিজের বুকের ভেতর তাকালেন। ভাবলেন, “মেরুদণ্ডের অপারেশন এত সফল হলো যে এখন সৈকতে লাফালাফি করছে! আমার মেরুদণ্ডেই বোধহয় ফাটল ধরেছে, বিশ্বাসের জায়গায়।” পরের দিন থেকে গ্রামের চায়ের দোকানে সবাই এই নিয়ে রসিকতা শুরু করল। রইস বলল, “ভাই, এখন ওরা ডাক্তারি অপারেশনে যায় না, দাতাদের বিশ্বাসের অপারেশন করে।” সবাই হেসে লুটোপুটি। মাষ্টার সাহেবও হাসলেন, কিন্তু সেই হাসিতে কষ্টের হালকা ছায়া ছিল। তবে একদিন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। বিকেলে স্কুল ছুটির পর এক বৃদ্ধা—আমেনা খালা—মাষ্টারের বাড়িতে এলো। চোখে লজ্জা, হাতে একটা ছেঁড়া ব্যাগ। বলল, “বাবা, পেটে ব্যথা, ওষুধ কিনতে হবে। তুই যদি একটু সাহায্য করিস…” মাষ্টার এবার সতর্ক। বললেন, “খালা, আগে প্রেসক্রিপশন দেখাও।” খালা বলল, “আমার প্রেসক্রিপশন নেই বাবা, বিশ্বাস আছে।” এই সরল বাক্যটা যেন মাষ্টারের মন ছুঁয়ে গেল। পকেট থেকে ৫০০ টাকার একটা নোট বের করে দিলেন। এক সপ্তাহ পর খালাকে আবার বাজারে দেখলেন। এবার খালার মুখে হাসি, হাতে ঝুড়ি ভর্তি আম। “বাবা, তোর টাকা দিয়ে আম কিনেছিলাম, বিক্রি করে লাভ করছি। এখন আমি কারো কাছে হাত পাতি না।” মাষ্টার অবাক। তিনি ভাবলেন, “মানুষটা হয়তো সত্যিই অভাবী ছিল, কিন্তু ইচ্ছাশক্তি ছিল রাজাদের মতো।” সেদিন থেকেই মাষ্টারের নীতি বদলে গেল। তিনি বললেন, “টাকা ধার দেব না, কিন্তু কাজে দান করব।” কারও বাচ্চার স্কুল ফি না থাকলে স্কুলে নিজেই ফোন দেন, কারও অসুস্থতা থাকলে ডাক্তার ঠিক করে দেন, কারও ভিক্ষা চাওয়ার অজুহাত থাকলে বলেন, “তোমার দোকান খুলে দিই, কিন্তু ধার নয়, কাজের সুযোগ।” গ্রামের লোকেরা প্রথমে ভেবেছিল, তিনি কৃপণ হয়ে গেছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে বোঝা গেল, তিনি আসলে ‘স্মার্ট দান’-এর নতুন ধারা শুরু করেছেন। এখন গ্রামের নাম তিতাসপুর নয়, সবাই বলে “স্মার্ট তিতাসপুর”—যেখানে দান মানে বিনিয়োগ, আর সহানুভূতি মানে কর্মসংস্থান। তবে “ফকির ব্যবসা” পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। একবার গ্রামের হাটে এক লোক এল, বলল, “ভাই, আমার গরু মরে গেছে, পরিবার না খেয়ে আছে।” মাষ্টার জিজ্ঞেস করলেন, “গরুটা কোথায় ছিল?” লোক বলল, “ফেসবুকে।” সবাই হেসে গড়াগড়ি। এখন মাষ্টার সাহেব নিজেও হাসতে শেখেছেন। তিনি বলেন, “যারা ভিক্ষা করে, তাদের থেকে সাবধান থাকো; কিন্তু যারা মানবিকতার মুখোশ পরে ব্যবসা করে, তাদের থেকে সাবধানের চেয়েও বেশি সাবধান থাকো।” তবুও তিনি মানবিকতার প্রতি বিশ্বাস হারাননি। মাঝে মাঝে নিজেই বলেন, “মানুষ খারাপ না, খারাপ হলো উদ্দেশ্য। কেউ অসহায়তা বিক্রি করে, কেউ বিশ্বাস কিনে। আমি কেবল সেই ভারসাম্যটা রক্ষা করার চেষ্টা করি।” আজকাল চায়ের দোকানে বসলে সবাই মজা করে বলে, “এই যে মহিউদ্দিন ব্যাংক লিমিটেড, নতুন কোনো লোন স্কিম আছে?” তিনি হেসে বলেন, “না, এখন আমি শুধু হাসি বিতরণ করি—যে ধার চায়, তাকে এক চা-চামচ রম্যতা দিই।” একদিন এক কিশোর এসে জিজ্ঞেস করল, “মাষ্টার, আপনি কি এখনও কাউকে বিশ্বাস করেন?” তিনি একটু ভেবে বললেন, “বিশ্বাস করি, তবে পুরো পকেট খুলে না।” সবাই হো হো করে হেসে উঠল। মাষ্টারও হাসলেন। তার চোখে তখন কোনো রাগ ছিল না—ছিল মমতা, ছিল অভিজ্ঞতার হালকা দীপ্তি। সেদিন সন্ধ্যায় তিতাসপুরের আকাশে লাল সূর্য ঢলছিল। বাতাসে গরম চায়ের গন্ধ। মাষ্টার মনে মনে বললেন, “দান করব, কিন্তু চোখ খুলে। বিশ্বাস করব, কিন্তু বুদ্ধি জাগিয়ে। আর হাসব—যতবারই কেউ আমাকে ঠকাবে, আমি গল্প বানাব।” এটাই তার নতুন জীবনদর্শন— যেখানে ফকিরি ব্যবসাও হাসির রসদ হয়ে ওঠে, আর প্রতারণাও শিক্ষা দেয় কেমন করে মানুষ হওয়া যায়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now