বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
তিতাস গ্রামের শেষপ্রান্তে এক সময় একটা বাঁশঝাড় ছিল। ঝাড় মানে ঠিক এক-দুইটা বাঁশ নয়, যেন সবুজের সৈন্যদল—একটা দাঁড়ালে আরেকটা নত হয়, আবার পরেরটা মাথা নাড়ায়, যেন সবাই মিলে গোপনে সভা করছে। গ্রামের লোকেরা বলত, ওরা নাকি “বাঁশের স্কুল” চালায়। কে জানে, হয়তো সত্যিই তাই—প্রতিদিন সকালে বাতাস এলে কচি বাঁশগুলো দুলে দুলে শেখে, “কেমন করে মাথা নত রাখতে হয়, কিন্তু ভিতরে শক্ত থাকতে হয়!”
এই বাঁশঝাড়ের মাঝখানে বাস করত এক “বাঁশলাল”—একটা বিশেষ বাঁশ, যে নিজের জাতের মধ্যে খানিকটা দার্শনিক। ওর মতে, বাঁশ কেবল ঘাস নয়, “ঘাসের রাজা”। সে বলত, “আমরা ঘাসের মতো নম্র, কিন্তু কাঠের মতো টেকসই। অন্যরা ফুল ফোটায়, আমরা ফুঁ দিয়ে বাঁশি বাজাই!”
একদিন সকালে কচি বাঁশগুলোর মধ্যে একটা নতুন বাঁশ গজাল—নাম রাখা হলো “বাঁশু।” জন্মের পর থেকেই তার একটাই প্রশ্ন, “আমি কে?” মা-বাঁশ বলল, “তুই আমাদের মতো বাঁশ।” কিন্তু বাঁশু তো সেই উত্তর নিয়ে তৃপ্ত নয়। “আমরা গাছ না ঘাস?”—এই প্রশ্নে সে সারাদিন চিন্তিত। গ্রামের ছেলেরা তাকে দেখে বলত, “এই যে ঘাসের গাছ, কেমন লম্বা হয়েছে রে!”
বাঁশু ভাবল, এ কোন দ্বৈত জীবন! গাছও নয়, ঘাসও নয়—মাঝামাঝি এক রহস্যময় পরিচয়।
তারপর একদিন হঠাৎ ঝড় এলো। সব গাছগুলো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। কিন্তু বাঁশগুলো শুধু একটু নুয়ে গেল, আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। তখনই বাঁশলাল হাসতে হাসতে বলল, “দেখলি বাঁশু, এটাই আমাদের আসল পরিচয়—ভাঙব না, বাঁকব!”
ঝড় থামার পর গ্রামের মানুষরা এসে বাঁশঝাড়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই বাঁশগুলো না থাকলে তো ঝড়েই সব উড়ে যেত!” তারা কিছু বাঁশ কেটে নিল—কে ঘরের খুঁটি বানাবে, কে মই, কে বাশি। বাঁশু ভয় পেল, “আমাকে কেটে ফেলবে না তো?”
বাঁশলাল বলল, “না রে, ভয় করিস না। বাঁশ যদি ঘরের খুঁটি হয়, সেটা কোনো ক্ষতি নয়। মানুষ যখন কারও ওপর ভরসা করে দাঁড়ায়, তখন সেই বাঁশই তো মানুষ হয়ে ওঠে।”
তবু বাঁশু ভাবতে লাগল—“আমি যদি মানুষ হতাম, তবে আমাকেও কি কেটে নিয়ে যেত?” সে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “না, আমি বাঁশ হয়েই থাকব। অন্তত মানুষদের মতো অহঙ্কারে শুকিয়ে যাব না!”
এমন সময় বাঁশঝাড়ে এলো এক অদ্ভুত অতিথি—একজন কবি। কাঁধে ব্যাগ, চোখে স্বপ্ন। তিনি বসে পড়লেন ঝাড়ের পাশে, তারপর বললেন, “বাহ, তোমরা তো বেশ সাহসী। তোমাদের মতো মানুষ হলে কত শান্তি হতো!”
বাঁশলাল ফিসফিস করে বাঁশুকে বলল, “এই লোকটা বিপজ্জনক। ওদের ভাষায় আমরা ‘প্রতীক’ হয়ে যাই। একটু পরেই দেখবি, ওর কবিতায় আমরা মাথা উঁচু করে থাকব, তারপরই কেউ না কেউ এসে আমাদের কেটে নিয়ে যাবে।”
কবি হাসতে হাসতে নিজের খাতায় লিখলেন:
“বাঁশ—নম্রতায় দৃঢ়,
নিরবতায় প্রাজ্ঞ,
গাছ নয়, তবু সব গাছের শিক্ষক।”
বাঁশু অবাক হয়ে বলল, “আমরা নাকি শিক্ষকও?”
বাঁশলাল বলল, “হ্যাঁ রে, আমরা শেখাই—কেমন করে মাথা নিচু রেখেও আকাশ ছোঁয়া যায়।”
তারপর বাঁশু দেখল, সত্যিই মানুষগুলো আমাদের শেখে। কেউ ঘর বানায়, কেউ পাটখড়ি তোলে, কেউ বাঁশের বাশিঁ বাজায়। গ্রামের ছেলে রতন তো বাঁশ কেটে বাঁশি বানিয়ে প্রেমপত্র পাঠায় পাশের গ্রামের ফুলিকে।
একদিন বাঁশলাল দেখল, বাঁশু একটু বেশি বড় হয়ে গেছে—ঝাড়ের অন্যদের চেয়ে মাথা উঁচু। সে গর্বে ফুলে উঠল। বাতাস এলে বাঁশু নিজের দুলুনি কমিয়ে দিল—ভাবল, “আমি এখন প্রাপ্তবয়স্ক বাঁশ, আমার তো শোভা মানায় না সবসময় নাচতে।”
তখনই পুরনো বাঁশ একদম নিচু স্বরে বলল, “ওরে, যত উঁচু হবি, তত নিচু হতে শিখ। না হলে বাতাস তোকে শিক্ষা দিয়ে দেবে।”
কয়েকদিনের মধ্যে ঠিক সেটাই হলো। এক বিকেলে হালকা ঝড় উঠল। সব বাঁশ দুলে দুলে বাতাসের সঙ্গে নাচল, কিন্তু বাঁশু গোঁ ধরে সোজা দাঁড়িয়ে থাকল। ফলাফল—মুচকে গেল। বাঁশলাল হাসল, “এই যে, এটা তোদের পরীক্ষার খাতা, বাতাস হলো শিক্ষক, আর নম্রতা হলো পাশ নম্বর।”
বাঁশু বুঝল, জীবনে শক্ত হওয়া দরকার, কিন্তু নম্রতাই টিকে থাকার গোপন সূত্র।
এরপর থেকে বাঁশু শুধু দুলত না, সে বাতাসের ছন্দে গান গাইত। গ্রামের লোকেরা বলে, “এই বাঁশঝাড়ে নাকি রাতে গান শোনা যায়।” কেউ বলে, “ওটা নাকি বাঁশের আত্মার সুর,” কেউ আবার বলে, “ওই কবির কবিতা এখন বাঁশের কণ্ঠে বাজে।”
একদিন গ্রামের স্কুলের শিক্ষক বাঁশঝাড়ে এলেন ছাত্রদের নিয়ে। তিনি বললেন, “বাচ্চারা, এই বাঁশগুলোকে ভালো করে দেখো। জীবনের শিক্ষা এখানেই লুকানো আছে। যে বাঁশ ঝড়ের সময় নুয়ে পড়ে, সে-ই বেঁচে থাকে। যে বাঁশ গর্বে সোজা থাকে, সে ভেঙে যায়।”
ছাত্ররা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। এক ছোট্ট ছেলে চুপিচুপি বলল, “স্যার, তাহলে বাঁশই তো মানুষের মতো!”
শিক্ষক হেসে বললেন, “না রে, মানুষ যদি বাঁশের মতো হতে পারত, তাহলে এই পৃথিবীটা আরও সবুজ হতো।”
বাঁশঝাড়ে হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। বাঁশলাল বলল, “দেখেছ বাঁশু, আমাদের স্কুলে এখন মানুষও ভর্তি হয়েছে।”
তারপর থেকে ওই বাঁশঝাড়ে প্রতি বছর “বাঁশ উৎসব” হয়। গ্রামের লোকেরা বাঁশ দিয়ে নানা কিছু বানায়—চালুনি, চেয়ার, খাট, এমনকি খেলনা। সবাই বলে, “বাঁশ না থাকলে আমাদের গ্রামই তো খাঁচা ছাড়া পাখি হয়ে যেত।”
বাঁশু এখন বৃদ্ধ। মাঝে মাঝে সে বাতাসের সঙ্গে কথায় কথায় হাসে। বলে, “আমরা না গাছ, না ঘাস—আমরা দুইয়ের মিলন। গাছের উচ্চতা আর ঘাসের নম্রতা—দুটোই আমাদের মধ্যে আছে।”
বাতাসও যেন সায় দেয়, হাওয়ার কণ্ঠে মৃদু হাসি শোনা যায়—
“তুমি সত্যিই মিলনের প্রতীক বাঁশু,
মানুষের অহঙ্কার আর প্রকৃতির বিনয়কে
তুমি একসঙ্গে বেঁধে রেখেছো।”
তখন বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে আলো নেমে আসে, পাতাগুলো নাচে, আর গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সেই হাসির শব্দ—
একটা রম্য সত্যের হাসি—
যে বাঁশ গাছ নয়, ঘাসও নয়,
কিন্তু সবার শিক্ষক,
নম্রতায় দৃঢ়, দুলে দুলে জেগে থাকা জীবনের নাম “বাঁশের স্কুল।” ????
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now