বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখক: মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
________________________________________
যেদিন থেকে মকবুল মিয়া স্মার্টফোন হাতে পেয়েছে, সেদিন থেকেই তার জীবনে নতুন বিপদ এসেছে—ইমেইল। আগে তার যোগাযোগের মাধ্যম ছিল মুখে বলা আর বাজারের দোকানে চায়ের কাপে ভাসানো আলোচনা। এখন সবাই বলে, “ইমেইল পাঠাও।”
একদিন ছেলে বাবুকে ডেকে বললেন,
“বাবা, ইমেইলটা কী জিনিস রে?”
বাবু বলল, “বাবা, এটা একরকম ডাকঘর, কিন্তু অনলাইন।”
মকবুল মিয়া মাথা চুলকে বললেন, “মানে পোস্ট অফিসের ভার্চুয়াল খাম?”
“ঠিক তাই বাবা, তবে ওখানে ডাকপিয়ন নেই, আছে ইনবক্স।”
মকবুল মিয়া ভাবলেন, “ঠিক আছে, আমি একটা খুলে ফেলি।”
________________________________________
পরদিন তিনি চায়ের দোকানে ঘোষণা দিলেন,
“আমি আজ ইমেইল খুলবো! এখন থেকে আমার চিঠি যাবে আকাশ পথে!”
সালাম মিয়া হেসে বলল,
“তুমি ইমেইল খুলবে? আগে চোখ খোলো!”
তবুও মকবুল মিয়া দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ছেলে তাকে বসিয়ে দিল জিমেইলে। নাম লিখলেন “Mokbul the Great”। পাসওয়ার্ড দিলেন “12345”—কেননা তিনি মনে করেন, যেটা সহজ, সেটাই নিরাপদ।
তিন ঘণ্টা চেষ্টা করে শেষমেশ জিমেইল খুলে ফেললেন। আনন্দে তিনি বললেন,
“এখন আমিও আন্তর্জাতিক মানুষ!”
________________________________________
কিন্তু আনন্দ বেশিক্ষণ টিকল না। একদিন সকালে মোবাইল খুলে দেখেন, ইনবক্সে শতাধিক ইমেইল—কেউ বলছে, “আপনার লটারিতে এক কোটি টাকা জিতেছেন”, কেউ পাঠিয়েছে “বিনামূল্যে গ্রীষ্মের ছুটি”, কেউ আবার “চুল পড়া বন্ধ করুন, এখনই অর্ডার করুন।”
মকবুল মিয়া চিৎকার করে বললেন,
“এই যে চুল পড়া বন্ধ করার মেইল পাঠাচ্ছে, আমার তো মাথায় চুলই নাই!”
ছেলে এসে বলল, “ওগুলো স্প্যাম, বাবা।”
“স্প্যাম মানে কী?”
“অবাঞ্ছিত মেইল।”
“তাহলে এরা অবাঞ্ছিত জিনিস পাঠাচ্ছে কেন? আমার তো কেউকে কিছু চাইনি!”
ছেলে মুচকি হেসে বলল,
“এটাই দুনিয়ার নিয়ম বাবা—তুমি কিছু না চাইলেও ওরা দিতে আসে।”
________________________________________
এরপর থেকে মকবুল মিয়া প্রতিদিন সকালে এক ঘণ্টা কাটান মেইল মুছে মুছে। একদিন তিনি হিসাব করে দেখলেন—দিনে মুছে ফেলছেন ৪২টা “Congratulations!” আর ১৭টা “You won!”। একবার ভেবে বসেন, “নাহ, হয়তো সত্যি কিছু জিতেছি।” কিন্তু যখনই ক্লিক করেন, আসে নতুন বিপদ—অজানা সাইট, নতুন পাসওয়ার্ড, নতুন ভয়।
একদিন এতটাই বিরক্ত হয়ে বললেন,
“এই জিমেইলটা আসলে একধরনের জাল, যেখানে আমি মাছ।”
________________________________________
ঠিক তখনই তাঁর বন্ধু রফিক একদিন এসে বলল,
“এই যে শুনছো, আমি এখন টেম্প মেইল ব্যবহার করি।”
“টেম্প মানে আবার কী?”
“অস্থায়ী মেইল, ভাই। কাজ শেষ, মেইল শেষ!”
মকবুল মিয়ার চোখে আলো জ্বলে উঠল,
“মানে, এই মেইল নিজের মতো আসে আর চলে যায়?”
“ঠিক তাই!”
“তাহলে তো আমার মতো মানুষদের জন্যই বানানো!”
রফিক হেসে বলল, “হ্যা ভাই, এর নামই তো টেম্প—মানে তামাশা নয়, সময়সীমা।”
________________________________________
সেদিন রাতেই মকবুল মিয়া প্রথম টেম্প মেইল খুললেন। ওয়েবসাইটে ঢুকেই দেখলেন—একটা মেইল ঠিকানা নিজে থেকেই তৈরি হয়ে গেছে। মনে হলো যেন কেউ তার জন্য আগে থেকেই ঘর সাজিয়ে রেখেছে।
তিনি সেই ঠিকানাটা কপি করে দিলেন এক “ফ্রি ঘড়ি পাওয়ার অফার”-এর সাইটে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই টেম্প ইনবক্সে মেইল এল—“আপনার ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়েছে!”
মকবুল মিয়া উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন,
“বাহ! আমার নামে এখন আমেরিকা থেকে ঘড়ি আসবে!”
ছেলে হেসে বলল,
“বাবা, ঘড়ি না আসলেও স্প্যাম আসবে না, এইটুকুই সান্ত্বনা।”
________________________________________
পরদিন সকালেই মকবুল মিয়ার চেহারায় আনন্দের জোয়ার।
“বাবা, আজ আমার কোনো মেইল নাই! কেউ কিছু পাঠায়নি! একদম শান্তি!”
ছেলে বলল, “বাবা, ওই মেইল তো গতরাতে মুছে গেছে।”
“তাতেই তো সুখ! না মুছলে নতুন মুছতে হতো!”
এরপর থেকে তিনি যেকোনো সাইটে ঢোকার আগে টেম্প মেইল খোলেন। রেজিস্ট্রেশন করেন, কোড নেন, তারপর বলেন,
“তোমরা এখন চাও, আমি নাই!”
________________________________________
একদিন বাজারে গেছেন। চায়ের দোকানে বসে গর্বভরে বলছেন,
“এখন আমি এমন মেইল ব্যবহার করি, যেটা নিজেই আত্মহত্যা করে!”
দোকানদার সালাম মিয়া অবাক হয়ে বলল,
“মানে?”
“মানে, এক ঘণ্টা পর নিজেই মরে যায়!”
“তুমি নিশ্চয়ই কোনো গুপ্তচর?”
মকবুল হেসে বললেন,
“না রে ভাই, আমি এখন আধুনিক মানুষ। আমার মেইলও জানে কবে মরতে হয়।”
________________________________________
এই খবর ছড়িয়ে পড়ল পাড়ায়। সবাই টেম্প মেইল খুলতে শুরু করল। কেউ বলল, “এটা গোপন প্রেমের কাজে লাগবে।” কেউ বলল, “এতে চাকরির আবেদন দিলে বস ধরা পড়বে না।”
একদিন গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেবও এলেন মকবুলের কাছে।
“ভাই, তোমার ওই টেম্প মেইল কি দোয়ার জন্য ব্যবহার করা যায়?”
মকবুল বললেন,
“দোয়া করলেও ঘণ্টাখানেক পর মুছে যাবে হুজুর!”
“তাহলে তো দোয়া মাকবুল হওয়ার আগেই বাতিল হয়ে যাবে!”
________________________________________
এরপর একদিন বিপদ ঘটল। মকবুল মিয়া ব্যাংকে গেলেন নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে। ব্যাংক কর্মকর্তা বললেন,
“আপনার ইমেইল ঠিকানা দিন।”
তিনি আত্মবিশ্বাসে বললেন,
“এই নেন—mokbul@temp-mail.org।”
কর্মকর্তা অবাক হয়ে বললেন,
“স্যার, এই ইমেইল তো টিকে না!”
“টিকবেই বা কেন? আমি এখন অস্থায়ী মানুষ!”
কর্মকর্তা চোখ বড় করে তাকিয়ে রইলেন।
________________________________________
তবে সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটল এক বিকেলে। তাঁর মেয়ে বিয়ের জন্য প্রস্তাব এসেছে। ছেলেপক্ষ থেকে মেইল এসেছে, কিন্তু সেটা টেম্প মেইলে! মেয়ের মা চিৎকার করে বললেন,
“এই যে প্রস্তাবটা এলো, এক ঘণ্টা পর হারিয়ে যাবে না তো?”
মকবুল গম্ভীর হয়ে বললেন,
“যদি ভালো ছেলে হয়, টেম্প মেইলেও টিকে যাবে!”
________________________________________
এভাবেই টেম্প মেইল মকবুল মিয়ার জীবনে এক নতুন দর্শন এনে দিল।
তিনি বলতেন,
“জীবনে কিছু জিনিস স্থায়ী না হলেই ভালো। যেমন—রাগ, দুঃখ, আর ইমেইল!”
পাড়ার মানুষ এখনো হাসে, যখনই তাকে দেখে বলে,
“ওই যে যাচ্ছে মকবুল মিয়া—যার ইমেইল বেঁচে থাকে ১০ মিনিট, কিন্তু গল্প বেঁচে থাকে ১০ বছর।”
________________________________________
আজকাল মকবুল মিয়া নিজের ছেলের ফোনে লিখে রাখেন—
‘Permanent ঠিকানা: বাড়ি ফুলতলা,
Temporary ঠিকানা: টেম্প মেইল।’
তিনি বিশ্বাস করেন,
যে মেইল নিজে থেকেই মুছে যায়,
তার চেয়ে বুদ্ধিমান আর কেউ নয়।
কারণ জীবনে যত আবর্জনা জমে,
একটু “ডিলিট” হলেই মুক্তি!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now