বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার দিনগুলোতে ডাক্তার শুভর জীবন ছিলো একেবারেই সাদামাটা। পড়াশোনা, ল্যাবরেটরির কাজ, ক্লাস, আর ইন্টার্নির ব্যস্ততা—এই নিয়েই তার দিন গড়িয়ে যেত। শুভর বন্ধুবান্ধবও তেমন ছিল না, নিজেকে গুটিয়ে রাখা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল তার। ভিড়ভাট্টার হাসি-আড্ডা তাকে টানতো না। ভেতরে ভেতরে সে ছিলো চাপা স্বভাবের, মনের অনেক কথাই বুকের ভেতর চেপে রাখতো।
হাসপাতালের ইন্টার্নি শুরুর দিনগুলোতে শুভ লক্ষ্য করলো এক অদ্ভুত রোগিনীকে। বেড নম্বর ১৭-তে ভর্তি ছিলেন তিনি। বয়স আশি ছুঁইছুঁই, কিন্তু মুখের রেখায় এখনো আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। যেভাবে চোখ তুলে তাকাতেন, বোঝা যেত—বয়সকালে তিনি ছিলেন এক অসাধারণ সুন্দরী নারী। সাধারণ বৃদ্ধাদের মতো চুলগুলো পুরোপুরি সাদা নয়, সোনালী আভাযুক্ত। মনে হতো যেন রোদের আলো লেগে চুলে মৃদু ঝিলিক দিচ্ছে।
তবে তাকে ঘিরে ছিল এক ধূসর নিঃসঙ্গতা। হাসপাতালের প্রতিটি রোগীর সঙ্গে কেউ না কেউ দেখা করতে আসতো—স্বজন, বন্ধু কিংবা আত্মীয়। কেউ ফুল আনতো, কেউ ফল, কেউ বা বসে গল্প করতো। কিন্তু এই বৃদ্ধার কাছে শুভ একবারও কাউকে আসতে দেখেনি। যেন পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্ক তার জীবন থেকে সরে গেছে।
শুভ প্রথমে বিষয়টা নিয়ে ভাবেনি। ডাক্তারি জীবনে এত অদ্ভুত রোগী তো দেখা যায় প্রতিদিন। কিন্তু ধীরে ধীরে তার মনে প্রশ্ন জাগলো—কেউ আসেনা কেন? তিনি কি একেবারেই একা? নাকি নিজের ইচ্ছাতেই সব সম্পর্ক থেকে দূরে সরে গেছেন?
বৃদ্ধার কিডনির মারাত্মক সমস্যা ছিলো। অতিরিক্ত মদের কারণে কিডনি প্রায় অচল হয়ে গেছে। শুভর অভিজ্ঞ চোখ সেটা বুঝতে দেরি করলো না। তবুও তার শরীরে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের ছাপ ছিলো। শুভ মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকতো, কিন্তু কখনো সাহস করে কথা বলতে পারতো না। শুধু জানালার ধারে বসে থাকা বৃদ্ধাকে দেখলেই এক ধরনের শান্তি অনুভব করতো।
একদিন সকালে ডিউটিতে এসে শুভ দেখলো, বিছানা খালি। রোগী নেই। তার বুক কেঁপে উঠলো। দ্রুত পাশের রোগীদের জিজ্ঞেস করলো, তারা জানালো—সকালে ঘুম থেকে উঠেই বৃদ্ধাকে আর কেউ দেখেনি। শুভর ভিতরটা অস্থির হয়ে গেল। সে ওয়ার্ডবয়কে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো, সেও কিছু বলতে পারলো না। অকারণে তার মনে ভয় ঢুকে পড়লো—যদি তিনি মারা গিয়ে থাকেন? অথচ কেন জানি মৃত্যু শব্দটা মনে আসতেই শুভর বুকের ভেতর শূন্যতা তৈরি হলো।
সেই দিন দুপুরেও বেড খালি রইলো। শুভর অস্থিরতা বেড়ে চললো। কোনো কাজেই মন বসলো না। মনে হচ্ছিলো, এক অচেনা মানুষকে হারিয়ে ফেলার ভয় তাকে আচ্ছন্ন করেছে। একজন অপরিচিত বৃদ্ধা, যার সঙ্গে একবারও কথোপকথন হয়নি, তার জন্য এত অস্থিরতা কি স্বাভাবিক? শুভ নিজেই নিজের কাছে উত্তর খুঁজে পেলো না।
রাতে সে আরেকবার ওয়ার্ডে ঢুঁ মারলো। হঠাৎ তার চোখ পড়লো—সাদা বিছানায় নীল হাসপাতালের গাউন পরে জানালার পাশে চুপচাপ বসে আছেন বৃদ্ধা। মাথার চুল বেনুনী করে বাঁধা, জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন। শুভর বুকের ভেতর কেমন যেন আলো ঝলমল করে উঠলো। যেন আপন কেউ ফিরে এসেছে।
ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো। খুব আস্তে হাত রাখলো তার কাঁধে। বৃদ্ধা চমকে উঠে শুভর দিকে তাকালেন। চোখ ভিজে আছে। মানে তিনি কেঁদেছিলেন। দুজনের দৃষ্টি এক হয়ে গেলো। শুভর মনে হলো সময় থমকে দাঁড়িয়েছে। সেই মুহূর্তে হাসপাতালের চারপাশের কোলাহল, ওয়ার্ডবয়ের হাঁকডাক, রোগীর কাতর শব্দ—সব যেন মিলিয়ে গেলো। শুধু দুজন মানুষের নিঃশব্দ সংলাপ ভেসে বেড়াতে লাগলো।
শুভ আস্তে জিজ্ঞেস করলো,
—“আপনি কোথায় গিয়েছিলেন? আজ সারাদিন আপনাকে খুঁজে পাইনি।”
বৃদ্ধা একটু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কণ্ঠস্বর ধীর, ভারী।
—“কোথাও যাইনি বাবা। একটু বাইরে গিয়েছিলাম। কানে হেডফোন দিয়ে পাখির ডাক শুনছিলাম। শহরের এই কংক্রিটের ভেতর এখনো যদি কোনো প্রকৃতির টুকরো শোনা যায়, আমার ভালো লাগে।”
শুভ চুপ করে শুনতে লাগলো। কিছু একটা আছে এই মহিলার ভেতরে—অতল নিঃসঙ্গতা।
ধীরে ধীরে কথোপকথন জমে উঠলো। বৃদ্ধার নাম শালিনী দেবী। স্বামী বহু আগেই মারা গেছেন। দশ বছর আগে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে চলে যান। ছেলে কানাডায় থাকে, বড় একটি কোম্পানিতে চাকরি করে। মেয়ে থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। দুজনেই ব্যস্ত জীবনযাপন করছে। বছরে একবার হয়তো ফোনে কথা বলে, কখনো টাকাপয়সা পাঠায়। কিন্তু সেই টাকার সাথে সম্পর্কের উষ্ণতা পাওয়া যায় না।
শালিনী দেবী বললেন,
—“বৃদ্ধাশ্রমে থাকলে অন্তত কিছু মানুষকে পাওয়া যায়। একসাথে খাওয়া, গল্প করা যায়। কিন্তু নিজের বাড়িতে থেকে গেলে কেবল দেয়ালের সঙ্গেই কথা বলতে হয়। আমি থেকেছি, থেকেছি আর বুঝেছি—নিঃসঙ্গতা কাকে বলে।”
শুভর বুকটা কেঁপে উঠলো। সে ভাবলো, সম্পর্ক যদি এতটাই শিথিল হয়ে যায়, তবে জীবনের শেষ প্রান্তে মানুষ বাঁচে কিসের ভরসায়?
শুভ তার কাঁধে হাত রেখে বললো,
—“আপনার তো কথা বলার মতো কেউ নেই। আমাকে বলতে পারেন। আমি থাকবো।”
বৃদ্ধা হেসে তাকালেন। চোখের কোণে আবারো জল জমলো।
—“তুমি কি জানো, বাবা? এই প্রথমবার মনে হচ্ছে কেউ আমার শূন্যতার ভেতরে উঁকি দিয়েছে।”
শুভ কিছু বললো না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো। আকাশে চাঁদ উঠেছে, হালকা মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে। মনে হলো এই হাসপাতালের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা আর এক তরুণ ডাক্তার একে অপরের ভেতর আশ্রয় খুঁজে পেলো।
সেই রাতে শুভ আর পড়াশোনায় মন বসাতে পারলো না। বারবার মনে পড়তে লাগলো বৃদ্ধার ভেজা চোখ, নিঃসঙ্গ কণ্ঠস্বর, আর তার কথাগুলো। অচেনা হলেও যেন সম্পর্কের এক নতুন সেতু তৈরি হয়ে গেছে।
জীবন কখনো কখনো এমন অদ্ভুত বাঁক নেয়, যেখানে রক্তের সম্পর্ক নয়, আত্মার সম্পর্কই হয়ে ওঠে সত্যিকারের আশ্রয়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now