বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
গ্রামের নাম মদিনানগর। শান্ত-শিষ্ট এক গ্রাম। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ভদ্র, ধর্মভীরু আর শান্ত মানুষের বসবাস এখানে। শুক্রবারে মসজিদের সামনে ভিড় জমে যায়, কেউ কুরআনের তিলাওয়াত করে, কেউবা দান-সদকার প্রসঙ্গে আলোচনা করে। কিন্তু পর্দার আড়ালে অনেকেই একেবারে ভিন্ন চেহারা ধারণ করে থাকে।
আব্দুল মালেক ছিলেন গ্রামের একজন সম্মানিত ব্যবসায়ী। সবাই তাকে “হাজি মালেক” নামে ডাকত। সাদা পাঞ্জাবি, হাতে তসবিহ, মুখে মিষ্টি হাসি—যেন ধার্মিকতার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যারা তার কাছে দেনাদার ছিল, তারা জানত আসল সত্য। টাকা ধার দিলে সুদ খেতেন, ব্যবসার নামে প্রতারণা করতেন, বাজারে দু’মুখো কথা বলে লোক ঠকাতেন।
তবু গ্রামের সাধারণ মানুষ ভাবত, “হাজি মালেক বড় ভদ্রলোক। সবসময় আল্লাহর কথা বলে।” আসলে তার হাসির আড়ালে লুকানো থাকত কপটতা, ভণ্ডামি আর দ্বিচারিতা।
________________________________________
একদিন মসজিদে খুতবার সময় ইমাম সাহেব সূরা নিসার আয়াত তিলাওয়াত করলেন—
“নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আগুনের সবচেয়ে নিচতলায় থাকবে, আর তুমি তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবে না।” (সূরা নিসা: ১৪৫)
এই আয়াত শুনে মসজিদের অনেকের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। কিন্তু হাজি মালেক মাথা নেড়ে এমন ভান করলেন যেন তিনি নিজেই আয়াতের প্রকৃত অনুসারী। অথচ তার অন্তরের ভেতর জ্বলছিল অন্য আগুন—অন্যের ক্ষতির বিনিময়ে নিজের লাভ।
________________________________________
সেই গ্রামে আরও অনেকে ছিল। মকবুল মেম্বার, যিনি রাজনীতিতে খুব সক্রিয়। বাইরে থেকে তিনি ছিলেন সমাজসেবক, গরিবদের পাশে দাঁড়াতেন, কিন্তু ভোটের সময় গোপনে টাকার বস্তা ছড়াতেন। সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতেন।
আরেকজন ছিল স্কুলশিক্ষক রফিকুল। পড়ানোর সময় মুখে আল্লাহর নাম নিতেন, কিন্তু পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন। গ্রামে তাকে দারুণ ধার্মিক হিসেবে দেখা হতো, অথচ তার অন্তরে ছিল ভণ্ডামির বিষ।
________________________________________
এভাবে সমাজে অনেকেই বাহ্যিকভাবে ধার্মিকতার মুখোশ পরে থাকলেও অন্তরে ছিল ফাঁপা। তাদের ভদ্রতার ভেতরে লুকিয়ে ছিল ধোঁকা, প্রতারণা আর দ্বিচারিতা।
এক রাতে গ্রামের মসজিদে কুরআন তাফসিরের আসর বসেছিল। মাওলানা কাসেম আল্লাহর রাসূল ﷺ এর হাদিস তিলাওয়াত করলেন—
“মুনাফিকের তিনটি আলামত আছে: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করে, আর আমানত রাখলে খেয়ানত করে।” (বুখারি ও মুসলিম)
আসর শেষে মানুষজন ভাবল, “এই কথাগুলো কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হলো?”
কেউ কাউকে সরাসরি বলেনি, কিন্তু সবার মনে মনে একটা নাম ভেসে উঠল—হাজি মালেক।
________________________________________
রাত বাড়ল। মালেক ঘরে ফিরে শুয়ে পড়লেন। ঘুম আসছিল না। আয়াতের শব্দ বারবার কানে বাজছিল—
“মুনাফিকরা আগুনের সবচেয়ে নিচতলায় থাকবে।”
তিনি চমকে উঠলেন। মনে মনে বললেন—“আমি কি তবে সেই মুনাফিকদের একজন? বাইরে আমি আল্লাহর নাম নেই, কিন্তু ভেতরে প্রতারণা করি। মানুষ আমাকে সম্মান করে, অথচ আল্লাহ যদি আমার অন্তর জানেন, তবে আমার গন্তব্য কী?”
তার চোখে ঘুম আসছিল না। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু মনে হচ্ছিল কেউ একজন তার বুকের ভেতরে কড়া নাড়ছে। যেন এক অদৃশ্য কণ্ঠ বলছে—“তুমি অন্তরের রোগ লুকিয়ে রেখেছো, কিন্তু আল্লাহর কাছে তা গোপন নয়।”
________________________________________
পরদিন ভোরে ফজরের নামাজ শেষে মালেক বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন—
“ভাইয়েরা, আমি সারা জীবন প্রতারণা করেছি। আমি নিজেকে ধার্মিক সাজিয়েছি, অথচ অন্তরে ছিল অন্ধকার। আমি মুনাফিক ছিলাম।”
মানুষ হতভম্ব হয়ে গেল। গ্রামের সবাই যার ভদ্রতার প্রশংসা করত, সে আজ নিজেকে মুনাফিক ঘোষণা করছে!
কিন্তু তার এই স্বীকারোক্তি সবার ভেতর আলোড়ন তুলল। অন্যরাও ভাবতে শুরু করল, “আমাদের মধ্যেও কি এমন ভণ্ডামি নেই?”
________________________________________
কুরআন ও হাদিসে মুনাফিকদের জন্য যে ভয়ংকর পরিণতির কথা বলা হয়েছে, তা ধীরে ধীরে গ্রামের আলোচনায় উঠে এল। কেউ বলল—
“মুনাফিকের জায়গা জাহান্নামের সবচেয়ে নিচে।”
কেউ বলল—
“মুনাফিকরা দুনিয়ায় কিছুদিন সুবিধা ভোগ করে, কিন্তু আখিরাতে তাদের কোনো সহায়তাকারী থাকবে না।”
এই আলোচনা মানুষের হৃদয় কাঁপিয়ে দিল। অনেকেই নতুন করে আত্মসমালোচনায় ডুবে গেল।
________________________________________
মদিনানগরের গল্পটা কেবল সেই গ্রামের নয়। আমাদের সমাজেও আছে অসংখ্য মালেক, অসংখ্য রফিকুল, অসংখ্য মকবুল মেম্বার। বাহ্যিকভাবে তারা ভদ্র, ধার্মিক, সমাজসেবক, অথচ অন্তরে তারা মিথ্যা, কপটতা আর প্রতারণায় ভরা।
এরা হয়তো সাময়িকভাবে মানুষের সম্মান পায়, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর আলোকে তাদের ভবিষ্যৎ ভয়ংকর। আল্লাহর কাছে কোনো মুখোশই লুকানো যায় না।
________________________________________
রাত যখন গভীর হয়, আরেকটি সত্য যেন বাতাসে ভেসে আসে—
“মানুষকে ধোঁকা দেওয়া যায়, কিন্তু আল্লাহকে নয়। মানুষের সামনে ভদ্রলোক সাজা যায়, কিন্তু আখিরাতে অন্তরের মুখোশ খুলে যাবে।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now