বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
শীতল ভোর। বাইরে হালকা শিশির পড়ছে। রাজীব আর তার স্ত্রী শিউলি বসে আছে বসার ঘরে। দু’জনের হাতে গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। টেবিলে বিস্কুট রাখা, কিন্তু কারোর মনেই তা নেই। গল্প জমে উঠেছে।
হঠাৎ শিউলি কৌতূহলী ভঙ্গিতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল—
—“আচ্ছা শুনো, স্বর্গে কি বিয়ে হয়?”
রাজীব প্রথমে চমকালো। তারপর হেসে গম্ভীর সেজে বলল—
—“না, স্বর্গে কোনো বিয়ে হয় না।”
শিউলি ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—
—“কেন হয় না?”
রাজীব একটু গলা পরিষ্কার করে ধীরে ধীরে বলল—
—“কারণ স্বর্গে যদি বিয়ে হয়, তবে সেটা আর স্বর্গ থাকবে না, দুদিনেই নরক হয়ে যাবে।”
এই উত্তর শুনে শিউলি কেমন যেন থমকে গেল। তারপর চোখ বড় বড় করে তাকাল স্বামীর দিকে। মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধ রাজীব করে ফেলেছে।
—“মানে কী? বিয়ে করলে নরক হবে? তুমি আমাকে নরক ভেবেছ?”
রাজীব তো গড়গড় করে এক কাপ চা খেয়ে নিল। তারপর আস্তে করে বলল—
—“শোনো, আমি তোমাকে নরক ভাবিনি। আসলেই স্বর্গ মানে শান্তি, প্রশান্তি, কোনো কাজ নেই, শুধু গান-বাজনা, ফুলের বাগান, দেবদূতরা এসে গান শোনাবে। এখন তুমি ভেবে দেখো, এই পরিবেশে যদি স্ত্রী-স্বামী ঢুকে পড়ে, তাহলে কেমন হবে?”
শিউলি চোখ রাঙিয়ে বলল—
—“কী হবে?”
রাজীব নাটকীয় ভঙ্গিতে উত্তর দিল—
—“হবে এই যে— স্বামী যদি কোনো দেবদূতের গান শুনতে যায়, স্ত্রী বলবে, ‘তুই ওই দেবদূতের দিকে কেন এত তাকাচ্ছিস?’ আবার স্ত্রী যদি ফুল তুলতে যায়, স্বামী সন্দেহ করবে, ‘ওই ফুল দেবদূত দিয়েছে নাকি?’ তারপর শুরু হবে টানা-হেঁচড়া, মনোমালিন্য, অভিমান, কাঁদাকাটি। এভাবে দুই দিনের মধ্যেই স্বর্গ নরকে পরিণত হয়ে যাবে।”
শিউলি এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল—
—“তাহলে তুমি বলতে চাও, বিয়ে আসলে পৃথিবীর শাস্তি?”
রাজীব হাত তুলে বলল—
—“না না, ভুল বোঝো না। বিয়ে পৃথিবীতে দরকার আছে। কারণ স্বর্গ তো আমরা পাইনি। আমাদের সংসারই স্বর্গের একরকম ট্রেনিং সেন্টার।”
শিউলি হেসে বলল—
—“ট্রেনিং সেন্টার? মানে আবার কী?”
রাজীব এবার নিজের চেয়ার সামনের দিকে টেনে এনে প্রায় বক্তৃতার ঢঙে বলতে শুরু করল—
“দেখো, পৃথিবীতে বিয়ে মানে হলো ধৈর্যের পরীক্ষা, ভালোবাসার পরীক্ষা, ক্ষমার পরীক্ষা। একেবারে ‘অল-ইন-ওয়ান কোর্স’। স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে যদি ধৈর্য ধরে, তবে সংসার স্বর্গ হয়ে যায়। আর যদি না পারে, তবে সংসার সত্যিই নরক মনে হয়। তাই স্বর্গে আলাদা করে বিয়ের দরকার নেই। সেখানে সবাই পাশ করা ছাত্র। পৃথিবীতে যারা ব্যর্থ, তারা স্বর্গে ভর্তি হতে পারে না।”
শিউলি এবার মজা পেয়ে গেল। একটু রাগ দেখিয়ে আবার হাসি চেপে বলল—
—“তাহলে তুমি এখনো পরীক্ষায় আছো, তাই না?”
রাজীব নিঃশ্বাস ফেলে বলল—
—“হ্যাঁ, প্রতিদিন পরীক্ষা দিচ্ছি। প্রশ্নপত্রও খুব কঠিন। কখনো বলে, ‘আজকে বাজার থেকে আনবে কী?’ আবার কখনো বলে, ‘আমি মোটা হচ্ছি না তো?’ ভুল উত্তর দিলে সঙ্গে সঙ্গে নম্বর কাটা যায়।”
শিউলি এবার আর হাসি ধরে রাখতে পারল না। খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে বলল—
—“তাহলে আমি তোমার পরীক্ষক?”
রাজীব গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে বলল—
—“হ্যাঁ, তুমি পরীক্ষক। তবে তুমি নম্বর দাও খুব কৃপণভাবে। আমি যদি এক প্লেট ভাত খাই, তুমি বলো—‘তুমি বেশি খাচ্ছো।’ আমি যদি কম খাই, তুমি বলো—‘তুমি আমাকে ভালোবাসো না।’”
শিউলি এবার থামল না, পেট ধরে হাসতে লাগল। তারপর চায়ের কাপ টেবিলে রেখে হেসেই বলল—
—“আচ্ছা, সত্যি বলো তো, সংসারে তোমার সবচেয়ে বড় কষ্ট কী?”
রাজীব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
—“সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, সংসারের ইতিহাসে কোনো স্বামী সাহস করে নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারে না। যদি বলে, সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী উত্তর দেয়—‘আমার কষ্ট কি তুমি বুঝো?’ ফলে পুরুষের যন্ত্রণা ইতিহাসে লুকানো থাকে।”
শিউলি মজা করে বলল—
—“তাহলে আজ লিখে রাখো— ‘পুরুষের নরক যন্ত্রণা’।”
রাজীব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
—“ঠিক তাই। পৃথিবীতে পুরুষের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হলো, সে নরকে গেলেও বলে—‘আমি সুখে আছি।’ কারণ সত্যি বললে সংসার ভেঙে যাবে।”
দুজনেই হো হো করে হেসে উঠল।
গল্প জমে উঠল আরও। রাজীব বলল—
—“তবে একটা কথা সত্যি, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া ছাড়া সংসার জমে না। যদি একেবারেই ঝগড়া না হয়, তাহলে সংসার কেমন জানি বেস্বাদ লাগে। যেমন লবণ ছাড়া রান্না।”
শিউলি সম্মত হলো—
—“সত্যি বলেছো। তবে ঝগড়ার শেষে যদি মিলন হয়, তখন সংসারই আসল স্বর্গ।”
রাজীব হাসতে হাসতে বলল—
—“তাহলে বুঝলে তো, স্বর্গে বিয়ে না হওয়ার কারণ? কারণ সেখানে ঝগড়া করার সুযোগ নেই। ঝগড়া না করলে মিলনের মজা কোথায়?”
শিউলি এবার চুপ করে স্বামীর দিকে তাকাল। তার চোখে একধরনের উজ্জ্বল হাসি। বলল—
—“তাহলে আসলেই তুমি স্বর্গে থাকতে চাও না?”
রাজীব মিষ্টি হেসে বলল—
—“আমি তো স্বর্গেই আছি, তোমার সঙ্গে এই সংসারেই।”
শিউলি শুনে একটু লজ্জা পেল, আবার হাসলও। দুজনের চোখে মিলল সেই অদ্ভুত ঝিলিক, যা স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, অভিমান, কষ্ট, সব কিছু ছাপিয়ে যায়।
তারপর থেকে রাজীব-শিউলির সংসারে ঝগড়া হলে দুজনেই মজা করে বলে উঠত—
—“দেখো, স্বর্গ নরকে পরিণত হচ্ছে।”
আবার কিছুক্ষণ পর হাসতে হাসতে বলত—
—“চলো, নরক থেকে আবার স্বর্গে ফিরি।”
এভাবেই সংসার চলতে লাগল। ঝগড়া হলো, মিলন হলো, আবার হাসি হলো।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now