বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
গরম দুপুরের এক সময়। শহরের এক জনপ্রিয় বেসরকারি হাসপাতাল। তৃতীয় তলার অপারেশন থিয়েটার তখন গোছানো, সাজানো। নার্সরা সাদা গ্লাভস পরে ব্যস্ত, একদিকে অ্যানেসথেসিয়া মেশিন গুনগুন শব্দ করছে, আরেকদিকে স্টেইনলেস স্টিলের ট্রেতে চকচকে অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম সাজানো। যাঁর অপারেশন হবে, সেই রোগী মি. কামাল, পরনের নীল গাউন, মাথায় অপারেশন থিয়েটারের ক্যাপ, মুখে কিছুটা উদ্বেগ আর কিছুটা কৌতূহল।
চিকিৎসক ড. হুমায়ুন, যার অভিজ্ঞতা বিশ বছরের বেশি, তিনি রসিক মানুষ। রোগীদের মানসিক চাপ কমানোর জন্য সবসময় একটু রসিকতা করেন। তাঁর ধারণা, অপারেশন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমন রোগীর মনের শান্তিও জরুরি।
ডাক্তার চশমা নামিয়ে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনার বয়স কত?”
রোগী হালকা গলায় বললেন,
“২৮ বছর।”
ড. হুমায়ুন মুচকি হাসলেন,
“না না, আমার কাছে বয়স লুকোতে নেই। অ্যানেসথেসিয়ার ডোজ ঠিক করার জন্য প্রকৃত বয়স জানা দরকার।”
রোগী একটু গলা পরিষ্কার করে বললেন,
“আচ্ছা, ৩২ বছর।”
ডাক্তার চোখ কুঁচকে হেসে বললেন,
“দেখুন, যদি ডোজ কম হয়, ব্যথা পাবেন। আর বেশি হলে কিডনি, লিভার ঝুঁকিতে পড়বে। বয়স সত্যি বলাই আপনার জন্য ভালো।”
রোগী নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“চলুন, ৩৭ বছর সর্বোচ্চ।”
ডাক্তার এবার নোটবুকে লিখতে গিয়ে থেমে গেলেন,
“আমার মনে হয় আপনি আরেকবার ভেবে বলুন।”
রোগীর চোখ টিপটিপ করে, তারপর লজ্জার হাসি দিয়ে বললেন,
“আসলে ৪২ বছরের একটুও বেশি না ডাক্তার।”
ডাক্তার হাতের গ্লাভস ঠিক করতে করতে বললেন,
“আমার সন্দেহ হচ্ছে, আসলটা বলুন, প্লিজ।”
রোগী এবার হাসতে হাসতে, প্রায় কান্না গলায় বললেন,
“বিশ্বাস করুন, ৪৮ বছর! এবার মরে গেলে যাব, কিন্তু আর একদিনও বাড়াতে পারব না!”
অপারেশন থিয়েটারের ভেতর হেসে উঠলো নার্সরা। এতক্ষণ যে পরিবেশটা গম্ভীর ছিল, মুহূর্তেই তা বদলে গেল। রোগীর মুখের আতঙ্ক উধাও হয়ে গিয়ে হাসির রেখা ফুটে উঠল।
নার্স শিউলি বললেন,
“স্যার, আমরা তো প্রথমেই ধরেছিলাম বয়সে গন্ডগোল আছে।”
ড. হুমায়ুন বললেন,
“হ্যাঁ, রোগীরা সাধারণত বয়স কম বলে। আরে বাবা, বয়স বাড়লে কোনো সমস্যা নেই, অ্যানেসথেসিয়ার ডোজ কিন্তু ঠিক হতে হবে।”
রোগী কামাল এবার হেসে বললেন,
“আসলে ডাক্তার, আমি আমার স্ত্রীর কাছে এতদিন বলেছি আমি ৩৫ বছর। এখন যদি ও জানতে পারে আমি ৪৮, তাহলে ও নিজেই অপারেশন করে ফেলবে!”
সবাই আবার হেসে উঠল। ড. হুমায়ুন হেসে বললেন,
“ঠিক আছে, এখানে কোনো স্ত্রী নেই। এখানে শুধু ডাক্তার-নার্স আর আপনি। আমরা আপনার বন্ধু। আপনার বয়স আমরা জানলাম, এখন ঠিকমতো ওষুধ দেব। কিন্তু আপনি নিজেও মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সত্যি বলা জরুরি।”
রোগী একটু সাহস পেলেন। এবার তিনিও রসিক হয়ে গেলেন,
“ডাক্তার সাহেব, আপনি কি ওষুধের সঙ্গে সঙ্গে আমার বয়সও কমিয়ে দিতে পারেন? মনে হয় অ্যানেসথেসিয়া দিয়েই আমি ২৮ হয়ে উঠব!”
ড. হুমায়ুন বললেন,
“তা হয়তো পারবো না, তবে মনে হবে আপনি আবার স্কুলের বেঞ্চে বসে আছেন!”
সবাই হাসতে হাসতে রোগীর শিরায় ক্যানুলা সেট করলো। ড. হুমায়ুন গম্ভীর অথচ স্নেহময় কণ্ঠে বললেন,
“আপনি টেনশন নেবেন না। আমরা আছি। বয়স তো কেবল একটা সংখ্যা। সাহস আর বিশ্বাস থাকলেই অপারেশন সহজ হয়।”
রোগীর চোখ বুজে আসতে লাগলো। অ্যানেসথেসিয়ার প্রভাব পড়ছে। তিনি আধো ঘুমে বললেন,
“ডাক্তার সাহেব… আমি আসলে বয়সের কথা মিথ্যা বলেছিলাম শুধু ভয় থেকে। আপনি আমাকে এভাবে বন্ধুর মতো কথা বলে সাহস দিলেন… ধন্যবাদ।”
ড. হুমায়ুন মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন,
“সবাই ভুল করে। কিন্তু সত্যি বলার পরেই ভয় কমে যায়। আপনি ভালো হয়ে উঠবেন।”
নার্সরা তখন রোগীর পালস, প্রেশার সব মাপছে। বাইরে রোগীর ছেলে মেয়ে বসে আছে। তারা জানে, ভেতরে হয়তো ভয়ঙ্কর নীরবতা, কিন্তু ভেতরে যে এমন হাসির দুনিয়া চলছে, তা তারা জানে না।
অপারেশনের পর যখন কামাল সজাগ হলেন, তখন তাঁর মুখে প্রশান্তি। ড. হুমায়ুন এসে বললেন,
“সব ঠিক হয়েছে। বয়স যাই হোক, আপনি এখন নতুন উদ্যমে বাঁচবেন। মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সত্যি বলা আর মনের সাহস রাখা—এ দুটোই সবচেয়ে বড় ওষুধ।”
রোগী এবার হাসলেন,
“ডাক্তার সাহেব, আজ থেকে আর কোনো মিথ্যা বয়স বলব না। বয়সটা যেমন তেমন থাকুক, কিন্তু মনের বয়সটা যেন তরুণ থাকে।”
ড. হুমায়ুন হেসে বললেন,
“দারুণ বললেন! মনের বয়স তরুণ থাকলে অ্যানেসথেসিয়ার দরকার হয় না, জীবনটাই মিষ্টি হয়ে যায়।”
বাইরে পরিবারকে যখন জানানো হলো যে অপারেশন সফল হয়েছে, তখন সবার মুখে তৃপ্তির হাসি। রোগীর স্ত্রী এসে বললেন,
“ডাক্তার সাহেব, ওর বয়স আপনি জানলেন তো?”
ড. হুমায়ুন কৌতুক করে বললেন,
“জানলাম তো বটেই, ও কিন্তু এখন দশ বছর ছোট হয়ে উঠেছে—হাসির কারণে!”
সবাই হেসে উঠল। আর অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হওয়ার সময় রোগী কামাল ফিসফিস করে বললেন,
“ডাক্তার সাহেব, আমি ভাবি, যদি সব ডাক্তার এভাবে রসিকতা করে রোগীর ভয় কাটিয়ে দেন, তাহলে অর্ধেক রোগ তো হাসতেই সেরে যাবে।”
ড. হুমায়ুন বললেন,
“ঠিক তাই। ওষুধের সঙ্গে হাসি আর সত্যি থাকলে রোগ শরীরের বাইরে চলে যায়। মনে রাখবেন, বয়স শুধু কাগজে থাকে, প্রাণের বয়স হাসির ভেতরেই লুকানো।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now