বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

গুজবের গজব

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে তখন বিকেলের রোদে একটু ঝিম ধরা ভাব। বাচ্চারা একে একে ক্লাস শেষ করে ঘরে ফিরছে, কিন্তু পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের বিজ্ঞান ক্লাস তখনো শেষ হয়নি। শিক্ষক মশাই, নাম তার অমরেশ স্যার, আজ একটু অন্য মেজাজে ছিলেন। বিজ্ঞান পড়াতে গিয়ে হঠাৎই তিনি ছাত্রদের সামনে একেবারে অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন— —“পৃথিবীর মধ্যে কোন জিনিস সবচেয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ে বল তো?” ছাত্র-ছাত্রীরা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কারও মাথায় পিঁপড়ার সংখ্যা, কারও মাথায় মুদ্রাস্ফীতি, কেউ কেউ আবার গাছপালা বা শামুক নিয়ে ভাবছিল। কিন্তু ক্লাসের দুষ্টু ছেলে রাহাত হঠাৎ হাত তুলে দাঁড়িয়ে গেল। সে সবসময় এমন উত্তর দেয়, যা শোনার পর শিক্ষক হেসে ফেলেন আর পুরো ক্লাস হাততালি দিয়ে ওঠে। রাহাত গম্ভীর গলায় উত্তর দিল— —“ভাল্লুক, স্যার।” ক্লাস একসঙ্গে হো হো করে হেসে উঠল। স্যার একটু অবাক হয়ে গেলেন। —“ভাল্লুক? মানে?” রাহাত বুক ফুলিয়ে বলল— —“আমার বাবা একবার একটা ভাল্লুক শিকার করেছিলেন। তারপর থেকে তিনি যখনই কারও কাছে শিকারের গল্প বলেন, প্রতিবারেই সেই ভাল্লুকের আয়তন দু’ইঞ্চি করে বেড়ে যায়। প্রথমে ছিল দেড় হাত লম্বা, এখন নাকি চার হাত। স্যার, এই হারে চলতে থাকলে একদিন পুরো গ্রাম ঢেকে যাবে।” স্যার তো হেসে কুটিকুটি। ক্লাসের অন্য বাচ্চারা তো হাসতে হাসতে চেয়ারের ওপর থেকে পড়ে যায়। কিন্তু এখানেই গল্প শেষ হয়নি। বরং এখান থেকেই শুরু হলো গ্রামের সবচেয়ে আলোচিত “ভাল্লুককাণ্ড”। ________________________________________ সন্ধ্যায় স্কুল ছুটি হয়ে গেল। বাচ্চারা বাড়ি ফিরে গিয়ে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা জায়গায় গল্প বলতে লাগল—“আজ রাহাত বলেছে তার বাবার শিকার করা ভাল্লুক প্রতিদিন বাড়ছে।” গ্রামে গল্পের গতি বিদ্যুতের থেকেও দ্রুত। দুই ঘণ্টার মধ্যেই খবরটা চায়ের দোকান, হাটবাজার, এমনকি মসজিদের বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছে গেল। লোকজন বলতে লাগল— —“ওরে বাবা! নাহয় সত্যিই ভাল্লুকটা বেঁচে আছে নাকি?” —“হয়তো মরা ভাল্লুকটা ওদের উঠোনেই কবর দেওয়া হয়েছিল, আর সেখান থেকে প্রতি রাতে বেড়ে বেড়ে এখন হাতির সমান হয়ে গেছে।” কেউ কেউ আবার ভবিষ্যদ্বাণী শুরু করল— —“এইভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে শীতের মধ্যে ওটা হিমালয়ের সমান হবে। তখন গ্রাম তো গ্রাম, পুরো কুমিল্লাকেই গিলে ফেলবে।” ________________________________________ রাহাতের বাবা করিম মিয়া ছিলেন একটু ঢঙী মানুষ। তিনি নিজেই গল্প করতে ভালোবাসতেন। একদিন সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে সবাই তাঁকে জিজ্ঞেস করল— —“কী করিম ভাই, শোনলাম আপনি ভাল্লুক শিকার করেছিলেন? কেমন বড় ছিল?” করিম মিয়া প্রথমে গম্ভীর মুখ করে বললেন— —“আরে ভাই, তখন তো ছিল একেবারে ড্যাঙার মতো। দাঁত-নখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।” কেউ জিজ্ঞেস করল—“আয়তন কত ছিল?” করিম মিয়া একটু থেমে বললেন—“এই ধরো… আমাদের গ্রামের বড় মসজিদের দরজার সমান।” দোকানে যারা বসেছিল তারা হাঁ হয়ে গেল। কেউ চায়ের কাপ ফেলল, কেউ বিস্কুট কামড়াতে ভুলে গেল। এদিকে যারা গল্প শুনল, তারা বাড়ি গিয়ে বলল—“করিম মিয়া বলেছে, ভাল্লুক নাকি মসজিদের দরজার সমান ছিল।” পরের দিনই সেই গল্প রূপ নিল—“ভাল্লুক ছিল মসজিদের সমান।” আর তার পরদিন হলো—“ভাল্লুক নাকি গ্রামের সমান।” ________________________________________ একদিন গ্রামের এক বৃদ্ধ মোল্লা সাহেব করিম মিয়াকে ধরে বললেন— —“ভাই, শুনলাম আপনার শিকার করা ভাল্লুক প্রতিদিন বাড়ছে। এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে কিন্তু ভয়ানক বিপদ।” করিম মিয়া প্রথমে অস্বীকার করলেন, কিন্তু লোকজনের মুখে মুখে গল্প এতটাই ছড়িয়েছে যে তিনিও শেষমেশ বিশ্বাস করে বসলেন। এখন তিনি নিজেই বলেন— —“হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটা তো ছিল অসাধারণ এক দানব ভাল্লুক। আমি না মারলে আজ এই গ্রাম থাকতই না।” ________________________________________ গল্পটা এতদূর গড়াল যে পাশের গ্রাম থেকেও লোক আসতে লাগল। কেউ দেখতে চায় করিম মিয়ার উঠোনে ভাল্লুকের হাড় আছে কিনা। কেউ আবার মোবাইল হাতে নিয়ে ছবি তুলতে প্রস্তুত। মজার ব্যাপার হলো, এই সব গুজব থেকে এক অদ্ভুত ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হলো। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আর ভয় পেয়ে রাতের অন্ধকারে বাইরে যেতে কুঁকড়ে থাকল না। তারা ভাবতে লাগল—“আমাদের গ্রামে তো সেই ভয়ঙ্কর ভাল্লুককে মারা হয়েছে, তাহলে আমাদের ভয় পাওয়ার কী আছে!” অন্যদিকে গ্রামের কৃষকরা বলতে লাগল—“আমাদের ফসল তো রক্ষা হয়েছে সেই ভাল্লুকের মৃত্যুর পর থেকে।” যদিও আসলে ফসলের ভালো হওয়ার কারণ ছিল নতুন সেচ প্রকল্প, কিন্তু সবাই কৃতিত্ব দিল করিম মিয়াকে। ________________________________________ একদিন স্কুলে আবার অমরেশ স্যার ছাত্রদের জিজ্ঞেস করলেন— —“তোমরা তো এখন গ্রামে অনেক কথা শুনছ। বল তো, সত্যি সত্যি পৃথিবীর মধ্যে কোন জিনিস সবচেয়ে দ্রুত বাড়ে?” রাহাত দাঁড়িয়ে বলল— —“স্যার, গুজব!” স্যার হেসে বললেন— —“ঠিকই বলেছো। গুজব একবার শুরু হলে আর থামানো যায় না। কিন্তু খেয়াল করেছ? এই ভাল্লুকের গল্পটা আমাদের গ্রামকে আনন্দ দিয়েছে, মানুষকে এক করেছে, এমনকি আমাদের হাসির খোরাক জুগিয়েছে।” রাহাত আবার বলল— —“তাহলে স্যার, এই ভাল্লুক আমাদের গ্রামে শান্তির প্রতীক!” পুরো ক্লাস তালি দিয়ে উঠল। স্যারও মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। ________________________________________ তারপর থেকে গ্রামে যখনই কোনো বৈঠক বসে, করিম মিয়াকে সবাই অনুরোধ করে—“আপনার সেই ভাল্লুকের গল্পটা একবার শুনিয়ে দিন।” করিম মিয়াও হাসিমুখে বলেন—“ভাই, সেই ভাল্লুক যদি আজ বেঁচে থাকত, তাহলে তো আকাশ ঢেকে যেত!” সবাই হেসে লুটোপুটি খায়। কেউ আর গুরুত্ব দিয়ে নেয় না, কিন্তু সবার মন ভালো হয়ে যায়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৪৫ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now