বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
গ্রামের বাতাসে বিয়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ডোল-ঢোলের শব্দ, তালপাতার সাজসজ্জা, ঝালর টাঙানো উঠোন—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে এ বিয়েটা একটু অন্যরকম, কারণ বর মহাশয় মনের দিক থেকে বেশ লোভী। যৌতুক সরাসরি চাওয়াটা এখন আইনত অপরাধ, আবার সামাজিকভাবে বেশ অপমানজনকও বটে। তাই বর মহাশয় অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করলেন—চাহিদাটা কায়দা করে চাপানো যায় কিনা।
সন্ধ্যার আড্ডায়, যখন সবাই পানের খিলি মুখে দিয়ে খিলখিল করে হাসছে, তখন বর সাহেব সুযোগ বুঝে ভবিষ্যৎ শ্বশুরের পাশে গিয়ে বসলেন। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন—
—“বাবা, আমি তো আপনার জামাই হচ্ছি। আমার একটা ছোট্ট অনুরোধ আছে।”
শ্বশুর, যিনি গ্রামের সবচেয়ে চালাক মানুষ হিসেবে পরিচিত, সঙ্গে সঙ্গে বললেন—
—“বলো জামাই বাবাজি, কী চাইছ?”
বর কিছুটা লাজুক ভঙ্গি করে, আবার চোখের কোণে লোভের ঝিলিক ঝরিয়ে বলল—
—“আমায় এমন একটা উপহার দিন, যা পেট্রোলে চলে।”
শ্বশুর চশমাটা নামিয়ে এনে ভ্রুর উপর রাখলেন, তারপর ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটিয়ে বললেন—
—“বেশ তো, একটা ভালো লাইটার দেব।”
মুহূর্তেই আশপাশে উপস্থিত আত্মীয়স্বজনরা হো হো করে হেসে উঠল। বরর মুখ হাঁ হয়ে গেল, যেন খাওয়া দাওয়ার পরে থালায় মাছের কাঁটা আটকে গিয়েছে। সে তো ভেবেছিল শ্বশুরমশাই হয়তো একটা মোটরবাইক কিংবা অন্তত একটা স্কুটি কিনে দেবেন। কিন্তু শ্বশুরের মাথায় যে চালাকি আর রসিকতা লুকিয়ে আছে, সেটা বেচারা অনুমানই করতে পারেনি।
বিয়ের দিন এলো। চারদিকে আলোর ঝলকানি, ডুগডুগির বাজনা, মিষ্টির গন্ধ—সব মিলিয়ে জমজমাট আয়োজন। বর তো ভেতরে ভেতরে এখনো আশা করছিল, হয়তো শ্বশুরমশাই সত্যি লাইটার না দিয়ে শেষমেশ কিছু “বড়সড়” উপহার বের করবেন। কিন্তু বরের সেই স্বপ্ন ভেঙে গেল কনের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়েই।
কনে যখন শ্বশুরের হাতে চিরাচরিত ধুপকাঠি আর প্রদীপের পাত্র তুলে দিচ্ছিল, তখন শ্বশুর হাসিমুখে জামাইকে একটা ঝকঝকে ছোট্ট বক্স দিলেন। খুলতেই ভেতর থেকে বেরোল সোনালি রঙের চমৎকার লাইটার। সঙ্গে ছোট্ট কাগজে লেখা—
“যৌতুক নয়, এটি ভালোবাসার আগুন। জ্বালাতে পারলে সংসার আলো করবে, না পারলে ধোঁয়ায় চোখ জ্বলবে।”
সবাই আবার হেসে উঠল। বরর মুখে তখন এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি—না পুরো খুশি, না পুরো রাগ। যেন মাছ ধরা ছিপে টোপ আছে, কিন্তু মাছ নেই।
বিয়ের পর জামাই যখন গ্রামে ফিরল, তখন গ্রামবাসী লাইটারটা দেখতে ভিড় করল। কেউ বলল—
—“এই লাইটারে বউয়ের প্রতি ভালোবাসা জ্বালাও।”
আবার কেউ খোঁচা দিয়ে বলল—
—“জামাই বাবাজি, আপনার বাইকের স্বপ্ন এখনো আগুন ধরাতে পারল না নাকি?”
সংসার শুরু হলো। বউ বুঝে গেল, স্বামী একটু লোভী প্রকৃতির। তাই সে প্রতিদিন রান্নাঘরে নতুন নতুন পদ রান্না করত, কিন্তু মজার ছলে স্বামীকে বলত—
—“এই দেখো, আজ পেট্রোলে চলে এমন তরকারি রাঁধলাম!”
স্বামী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করত—“ওটা আবার কী?”
বউ হেসে উত্তর দিত—“তেলের তরকারি! এও তো একরকম পেট্রোলে চলে।”
এভাবে দিন চলতে লাগল। স্বামী ধীরে ধীরে বুঝতে পারল—লোভ করলে শ্বশুর বা বউ দুজনেই তাকে হাসির পাত্র বানিয়ে দেবে। একদিন বউ খুব আন্তরিকভাবে বলল—
—“দেখো, সংসার মানে মোটরবাইক বা গাড়ি না। সংসার মানে দুইটা হৃদয়ের একসাথে চলা। তুমি যদি আমার দিকে তাকিয়ে হাসো, সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে দামী উপহার। আর আমি যদি রান্নাঘরে একটু অতিরিক্ত লবণ দিয়েও ফেলি, তুমি যদি সেটা হাসিমুখে খাও, তবে সেটাই সত্যিকার ভালোবাসা।”
সেদিন থেকে বর বুঝে গেল, পেট্রোলে চলা উপহার চাওয়া মানে শুধু নিজের লোভের আগুন বাড়ানো। বরং যে লাইটারটা শ্বশুর দিয়েছিলেন, সেটাই তাকে শিক্ষা দিল—আসল আগুন হলো ভালোবাসার আগুন।
ধীরে ধীরে বর গ্রামের সবার চোখে বদলে গেল। লোভী জামাই থেকে হয়ে উঠল আদর্শ স্বামী। কেউ তাকে খোঁচা দিলে সে নিজেই হেসে বলত—
—“হ্যাঁ রে ভাই, আমায় এখনো শুধু লাইটারই আছে, তবে তাতেই সংসারের প্রদীপ জ্বলে।”
শেষমেশ গ্রামে একটা প্রবাদ ছড়িয়ে গেল—
“যে লোভে বউ হারায়, সেই লাইটারও জ্বলে না। আর যে ভালোবাসায় সংসার চালায়, তার লাইটার থেকে আলোকিত হয় পুরো পরিবার।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now