বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
একটা গ্রামে কাজী সাহেব আর ঘটক মিলে ছিল অদ্ভুত জুটি। গ্রামের মানুষ মজা করে বলত—“একজন হলেন নৌকার মাঝি, আরেকজন নৌকার বৈঠা।” কারণ, ঘটক ছাড়া কাজীর কাজ চলে না, আবার কাজী ছাড়া ঘটকের বিয়ের প্রস্তাব পাকা হয় না। একদিন মসজিদের বারান্দায় বসে তারা চা খাচ্ছিলেন। তখনই কাজী সাহেব একগাল দাঁড়ি নেড়ে বললেন,
—“বুঝলে রমিজ মিয়া, অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে তালাকের সংখ্যা কম।”
ঘটক সঙ্গে সঙ্গে হাসতে হাসতে বলল,
—“তাই তো দেখতাছি হুজুর।”
কাজী সাহেব কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—“কিন্তু কেন, তা বলতে পার?”
ঘটক চায়ের পেয়ালা নামিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
—“যারা সাহস কইরা নিজের ইচ্ছায় বিয়াটাও করতে পারে না; তারা আবার তালাক দিবো কোন সাহসে?”
শুনে কাজী সাহেব চায়ের চুমুক দিতে দিতে থমকে গেলেন, তারপর হো হো করে হেসে উঠলেন। সেই হাসি যেন বাজারের মাইক বেজে ওঠার মতোই দূরে দূরে ছড়িয়ে গেল। গ্রামের কয়েকজন ভাবল, হয়তো আজকে কাজীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
এই আলাপের সূত্র ধরে গ্রামে শুরু হলো এক রম্য গবেষণা। কাজী-ঘটক জুটি সিদ্ধান্ত নিল, তারা যাচাই করবে আসলেই অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে তালাক কম হয় নাকি। তাই তারা শুরু করল “বিবাহতত্ত্ব অনুসন্ধান প্রকল্প”। গ্রামে যাদের বিয়ে হয়েছে, তারা সবাইকে ধরতে লাগল।
প্রথমে গেল পাশের বাড়ির মজিদ মাস্টারের কাছে। মাস্টারের বিয়ে হয়েছিল কড়া অ্যারেঞ্জড, বউকে দেখেনইনি। শুধু বউয়ের বাবার হাতে রঙিন একটা ছবি দেখে হ্যাঁ বলে দিয়েছিলেন। কাজী জিজ্ঞেস করলেন,
—“তালাকের চিন্তা করেননি কখনো?”
মজিদ মাস্টার মৃদু হেসে বললেন,
—“কী যে বলেন কাজী সাহেব! আমি তো বউয়ের সাথে আজও প্রেম করার চেষ্টা করি, আর তিনি এখনো আমার সাথে ঝগড়া করেই সুখ পান। তালাকের সময়ই বা কোথায়? সকাল থেকে রাত অবধি বউয়ের বকুনি শুনতে শুনতেই তো দিন শেষ হয়ে যায়!”
ঘটক বলল,
—“এই যে দেখলেন, ভয়ে না, ব্যস্ততায় তালাকের চান্সই নাই।”
তারপর তারা গেল গফুর চাচার বাড়ি। গফুর চাচা গ্রামের সবচেয়ে অভিজ্ঞ স্বামী। ত্রিশ বছর হলো বিয়ে করেছেন। কাজী প্রশ্ন করলেন,
—“চাচা, আপনার বিয়েটা তো অ্যারেঞ্জড ছিল, তাই না?”
গফুর চাচা গম্ভীর হয়ে বললেন,
—“হ, তাই তো। আমি শুধু বউয়ের রান্না করা ভাতের গন্ধে রাজি হইছিলাম।”
কাজী আবার কৌতূহলী হয়ে বললেন,
—“তালাকের কথা মাথায় আসছে না কখনো?”
গফুর চাচা হেসে ফেললেন,
—“তালাকের কথা আসছিল বহুবার। কিন্তু বউয়ের হাতে যতবার হাঁড়ি-পাতিল উড়ত, ততবারই আমার মাথা নিচু হয়ে যেত। তখন ভাবতাম, জীবন যদি যুদ্ধ হয়, আমি তো সৈনিক না; আমি তো বন্দি। বন্দির হাতে আবার তালাকের পাওয়ার থাকে নাকি?”
ঘটক মজা করে বলল,
—“এই জন্যই বলি হুজুর, অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ মানে হলো—তুমি যদি ডুবো, দুজন একসাথে ডুববা। কিন্তু ভেসে উঠলে, সেই আনন্দও একসাথে।”
এভাবে তারা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করল। সবাই একই কথা বলল—অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে তালাকের ভয় নেই, কারণ সাহস নেই।
এই খবরে পুরো গ্রামে হাসির ঝড় উঠল। লোকজন বলতে লাগল, “আমাদের গ্রামে সাহসী লোক নাই, তাই তালাক নাই। কিন্তু ঝগড়া প্রচুর!”
শেষমেশ কাজী-ঘটক মিলে উপসংহার টানল। তারা ঘোষণা দিল—
“সংসারের সোনার সূত্র হচ্ছে: যারা নিজেরা প্রেম করে বিয়ে করে, তারা সাহসী হয়ে ওঠে, তাই ঝগড়ার সাহসও বেশি। আর যারা অ্যারেঞ্জড ম্যারেজে পড়ে, তারা শুরুতেই সাহসহীন, তাই ঝগড়ার আগুন থাকলেও তালাকের আগুন লাগে না। শেষমেশ সব সংসারই হাসি-আনন্দে টিকে যায়।”
এরপর থেকে গ্রামে বিয়ের সময় কাজী আর ঘটক দুজনেই কনে-বরকে উপদেশ দিত,
—“ঝগড়া করবা, কিন্তু ভাঙবা না। কারণ থালা-বাসনের শব্দই হলো সংসারের সিম্ফনি।”
আর গ্রামের লোকজন এই কথাই প্রবাদ বানিয়ে ফেলল—
“যে বিয়ে ভাঙে না, সেটা ঘটকের টিকিট আর কাজীর সিলের চেয়েও শক্ত।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now