বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
বিচারকের কোর্টে এমন সব কেস আসে যে, মাঝে মাঝে তিনি ভাবেন—মানুষের সংসার আসলে আদালত ছাড়াই চলে। কিন্তু যেদিন করিম সাহেব এসে হাজির হলেন, সেদিনের কাহিনি একেবারে নতুন রঙ লাগিয়ে দিল।
করিম সাহেব কোর্টে দাঁড়িয়ে বললেন, “জজ সাহেব, আমি আমার স্ত্রীর কাছে ডিভোর্স চাই। সে থালা-বাসন ছুড়ে মারে।”
শুনেই কোর্টরুমে চাপা হাসির ঢেউ। বিচারক একটু গম্ভীর মুখে বললেন, “তাহলে সবে বাসন ছুড়ে মারতে শুরু করেছেন নাকি আগেও মারতেন?”
করিম শান্ত ভঙ্গিতে জবাব দিলেন, “আগে থেকেই।”
“তাহলে এত বছর পর হঠাৎ ডিভোর্স কেন?”
করিম এবার মুখটা গম্ভীর করে বললেন, “কারণ এখন তার নিশানা একদম ঠিক জায়গায় লাগছে।”
কোর্টরুম এবার হো হো করে হাসিতে ভেসে গেল। বিচারকও হাসি চেপে রাখতে পারলেন না।
________________________________________
সংসারের লড়াইটা আসলে শুরু হয়েছিল বছর দশেক আগে। বিয়ের প্রথম বছরেই করিমের স্ত্রী রহিমা প্রথম রাগ করে একটা থালা ছুড়েছিলেন। কিন্তু তখন থালা গিয়ে পড়েছিল টেবিলের ওপর। করিম হেসে ফেলে বলেছিল, “তুমি যদি ক্রিকেট খেলতে, তবে বোলার হয়ে যেতেই!” রহিমাও একটু পর হাসিতে ভেঙে পড়েছিল।
কিন্তু দিন গড়াতে গড়াতে ঝগড়ার তাল বেড়ে গেল। কখনও হাঁড়ি উড়ে গেল, কখনও চামচ। করিম একসময় গুনত—কোন জিনিসটা বেঁচে আছে আর কোনটা ভেঙে টুকরো হলো। সে একবার হিসাব কষে দেখেছিল, পাঁচ বছরে মোট আটাশটা প্লেট, বারোটা গ্লাস, আর চারটা হাঁড়ি বলি হয়েছে এই “বিবাহিত যুদ্ধ”-এর কাছে।
কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো—এই সব কাণ্ডে তাদের প্রেম কিন্তু কমেনি। করিম বন্ধুবান্ধবকে বলত, “দেখ, অন্য স্ত্রীরা স্বামীর সঙ্গে শুধু মুখের ঝগড়া করে। আমার স্ত্রী অন্তত শারীরিক অনুশীলনের সুযোগ দেয়। আমি প্রতিদিন স্প্রিন্ট করি, ডাইভ দিই, মাথা নামাই—স্বাস্থ্য ভালো থাকে।” বন্ধুরা শুনে হেসে মরত।
________________________________________
একদিন তো এমন হলো যে রহিমা রাগের মাথায় থালা ছুড়লেন, থালা গিয়ে সোজা জানালার কাচ ভেঙে দিল। পাশের বাড়ির ফারুক মিয়া ভয়ে দৌড়ে এসে বলল, “কি হলো? ভূমিকম্প নাকি গুলি?” করিম হেসে বলল, “না ভাই, আমার বাড়িতে প্রেমের আতশবাজি চলছে।”
গ্রামের লোকেরা আস্তে আস্তে বুঝে গেল—ওদের সংসারের বিশেষ ভাষা হলো থালা-বাসনের শব্দ। একদিন ঝমঝম শব্দ হলে বোঝা যায়, রহিমা রাগ করেছেন। আর যদি খুব নীরবতা থাকে, তবে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ে—নিশ্চয়ই তারা মিলে কোনো ষড়যন্ত্র করছে।
________________________________________
তবে করিমের অভিযোগের পেছনে ছিল একেবারে নতুন মোড়। আগে বাসনগুলো উড়ে গিয়ে দেওয়ালে লাগত, কখনও ফ্লোরে পড়ত, কখনও করিমের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেত। কিন্তু গত এক বছরে রহিমার নিশানা ভয়ানকভাবে নিখুঁত হয়ে গেছে। থালা মানেই এখন সরাসরি করিমের মাথা বা কাঁধে আঘাত।
প্রথমে করিম ভাবল, কপাল খারাপ। কিন্তু বারবার যখন এমন হলো, তখন বুঝল—এটা নিছক কপাল নয়, বরং রহিমার প্র্যাকটিস। একদিন সে দেখল, রহিমা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কলা ছুড়ে টার্গেট করছে। টার্গেট হলো দেওয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারের নির্দিষ্ট একটা তারিখ। করিম তাকিয়ে দেখে—সেটা তাদের বিয়ের তারিখ!
করিম হেসে বলল, “তুমি তো একেবারে আর্চারি প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছ।” রহিমা গম্ভীর মুখে বলল, “না, প্রস্তুতি নিচ্ছি তোমাকে সঠিকভাবে শাসন করার জন্য।”
________________________________________
কোর্টে বিচারক হেসে বললেন, “কিন্তু দেখুন করিম সাহেব, এতো বছর আপনি সহ্য করলেন, এখন কেন বিচ্ছেদ চাইছেন?”
করিম গলা নামিয়ে বললেন, “স্যার, আগের দিনগুলোতে আমি বেঁচে যেতাম। এখন আর বাঁচার সুযোগ পাচ্ছি না। একদিন যদি হাঁড়ি লাগে, তো হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। তাই ডিভোর্স চাই।”
রহিমা কিন্তু কোর্টে দাঁড়িয়ে একদম শান্ত। সে বলল, “স্যার, স্বামী আমার প্রতিদিনই আমার ধৈর্য পরীক্ষা করে। আমি না ছুঁড়লে সে ঘর গোছায় না, না থালা ভাঙলে বাজার করে না। আমি যদি থালা ছুড়ি, ওর ভেতরে একটা রোমান্টিক জোশ জেগে ওঠে। এতে সংসার চলে মসৃণভাবে।”
বিচারক একটু ভেবে বললেন, “মানে, থালা-বাসনই তোমাদের সংসারের গোপন কূটনীতি?” রহিমা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন।
________________________________________
শেষ পর্যন্ত কোর্টের বাতাবরণ একেবারে নাটকের মতো হয়ে গেল। দর্শকেরা হেসে গড়িয়ে পড়ছে। বিচারক বললেন, “আসলে তো আমি দেখছি, তোমাদের মধ্যে ডিভোর্স নয়, বরং প্রেমই বেশি। শুধু প্রেমের প্রকাশের মাধ্যম একটু ব্যতিক্রমী।”
করিম মাথা নিচু করে হাসলেন। রহিমাও হেসে ফেললেন। বিচারক বললেন, “তাহলে সমাধান হলো—আর থালা-বাসন ভাঙা যাবে না। এর পরিবর্তে বালিশ যুদ্ধ করতে হবে। ঝগড়া হলে একজন আরেকজনকে বালিশ ছুড়ে মারবেন। এতে কারও মাথা ফাটবে না, বরং ঘর ভরে যাবে হাসিতে।”
কোর্টে হাততালি পড়ল। সবাই খুশি হয়ে উঠল।
________________________________________
ঘরে ফিরে করিম হাসিমুখে বলল, “শোনো, এখন থেকে বালিশে নিশানা ধরো। আমি অন্তত আহত হব না।” রহিমা মিষ্টি হেসে বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু মনে রেখো, বালিশের ভেতর আমি তুলো নয়, কিছু কাঁকর ঢুকিয়ে দেব।”
করিম ভয়ে মুখ গম্ভীর করলেও, দুজনেই হেসে লুটোপুটি খেল। আসলে তাদের সংসারের আসল শক্তি ছিল ঝগড়ার ভেতর লুকোনো মজা, ভাঙা বাসনের ভেতরও যে মিলনের সুর বেজে ওঠে।
তাই শেষে গ্রামে রটল—“ওই যে করিম-রহিমার সংসার, ওরা ঝগড়াতেই প্রেম খুঁজে নেয়। থালা-বাসন যদি মুখে না লাগে, তবে তাদের প্রেমের গল্পই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।”
আর করিমের বন্ধু-বান্ধব মজা করে বলত, “তুই ভাগ্যবান রে! অন্যদের স্ত্রী শুধু মুখের বুলি ছোড়ে, তোর স্ত্রী ছোড়ে বাস্তব জিনিস। অন্তত প্রেমটা চোখে দেখা যায়।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now