বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
একদা কুমিল্লার এক ছোট্ট গ্রামে থাকত দুজন বন্ধু—মাহবুব ও রশিদ। তারা শৈশবের খেলার সাথী, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের স্বভাব-চরিত্র ভিন্ন পথে বাঁক নিল। মাহবুবের মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি ছিল; সে সবসময় মানুষের ভালো দিক নিয়ে আলোচনা করত, কাউকে নিয়ে খারাপ কিছু বলতে চাইত না। অথচ রশিদ ছিল সম্পূর্ণ উল্টো চরিত্রের। সে মানুষের ভুল-ত্রুটি খুঁজে বেড়াত, ছোটখাটো বিষয়ে অন্যের নামে কথা বানাত, আর পরচর্চা না করলে যেন তার দিনই কাটত না। গ্রামের চায়ের দোকান ছিল তার নিত্য আস্তানা; সেখানে বসে কারও পরিবারের সমস্যা, কারও ছেলের পরীক্ষার ব্যর্থতা, আবার কারও স্ত্রীর ঝগড়াঝাঁটি—সবকিছু সে যেন নতুন করে রঙ মিশিয়ে গল্প বানাত এবং হাসাহাসি করত।
একদিন বিকেলে মাহবুব রশিদকে বলল, “বন্ধু, তোমার এতদিনের এই অভ্যাস আমাকে কষ্ট দেয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল আমাদের শিখিয়েছেন যে গিবত করা কবিরা গুনাহ। তুমি কি জানো, গিবতকারীর শাস্তি কত ভয়াবহ?” রশিদ হেসে বলল, “আরে ভাই, আমি কি মিথ্যা বলি? আমি তো সবার আসল কথাই বলি। যদি সত্যি থাকে তবে দোষ কোথায়?” তখন মাহবুব কোরআনের আয়াত ও হাদিস থেকে শোনাল, “, ‘তুমি যে দোষের কথা বলো, তা যদি তোমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তবে তুমি অবশ্যই গিবত করলে আর তুমি যা বলছ, তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তবে তুমি তার ওপর তুহমত ও বুহতান তথা মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছ।’ (মুসলিম)” কিন্তু রশিদের কানে সেই কথাগুলো তেমন ঢুকল না। সে ভেবেছিল, তার এই চর্চা শুধু বিনোদন, এর জন্য আল্লাহ কেন রাগ করবেন?
দিন যেতে লাগল। গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে রশিদের কাছে আসা-যাওয়া কমিয়ে দিল। কারণ, আজ যার নাম নিয়ে সে হাসাহাসি করছে, কাল তার নিজের কথাই হয়তো চায়ের দোকানের গল্প হয়ে যাবে। এভাবে রশিদ অজান্তেই সবার আস্থা হারাতে শুরু করল। একদিন গ্রামের একজন মুরুব্বি তাকে সরাসরি বলল, “তুই মানুষের দোষ খুঁজতে খুঁজতে নিজের মর্যাদাই হারাচ্ছিস। আল্লাহর কাছে তওবা কর।” কিন্তু ততদিনে সে বিষয়টিকে এত স্বাভাবিক করে ফেলেছিল যে আর গুরুত্ব দিল না।
এক রাতে রশিদ এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। সে দেখল, তাকে এক অন্ধকার স্থানে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যেখানে একদল মানুষ তামার নখ দিয়ে নিজেদের মুখ ও বুক আঁচড়াচ্ছে। তাদের চিৎকার আকাশ বিদীর্ণ করছে। ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে সে কেঁপে উঠল। হঠাৎ তার সামনে একজন ফেরেশতা এসে বলল, “এরা সবাই গিবতকারী। তারা দুনিয়ায় মানুষের মানসম্মান নষ্ট করেছে, তাই আজ তারা নিজেরাই নিজেদের ছিন্নভিন্ন করছে।” রশিদ চিৎকার করে জেগে উঠল, সারা শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছে। ভোরবেলা মসজিদে গিয়ে সে ইমাম সাহেবকে ডেকে স্বপ্নের কথা খুলে বলল। ইমাম সাহেব শান্ত স্বরে বললেন, “এটি নিছক স্বপ্ন নয়, আল্লাহ হয়তো তোমাকে সতর্ক করেছেন। মনে রেখো, গিবতকারীর শাস্তি দুনিয়া ও আখেরাত—দুটোতেই আছে।”
এরপর কিছুদিন রশিদ চেষ্টা করল নিজেকে বদলাতে। কিন্তু পুরোনো অভ্যাস এত সহজে যায় না। আবারও কখনো চায়ের দোকানে বসে কারও কথা শুনে হাসাহাসি করত, কখনো কারও সংসারের ঝামেলা অন্যের কাছে প্রকাশ করত। সে ভাবত, হয়তো তেমন ক্ষতি হচ্ছে না। অথচ আল্লাহর কাছে প্রতিটি শব্দ রেকর্ড হচ্ছিল। একদিন গ্রামের মক্তবের শিক্ষক একটি দারস দিলেন। তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি গিবত করে, কিয়ামতের দিন তাকে তার ভাইয়ের মৃত দেহ থেকে পচা গোশত খাওয়ানো হবে। আর আল্লাহ তখন তার দিকে তাকাবেন না।” এ কথা শুনে রশিদের বুক কেঁপে উঠল। তার মনে পড়ল, ক’দিন আগে সে স্বপ্নে ঠিক সেই দৃশ্যের আভাস দেখেছিল।
তবে মানুষ অভ্যাসের দাস। একদিন হাটে গিয়ে সে হঠাৎ এক প্রতিবেশীর ব্যবসা নিয়ে সমালোচনা করল। পাশেই দাঁড়ানো মাহবুব তাকে থামিয়ে দিল। রাগে রশিদ বলল, “আমি সত্য বলেছি। মিথ্যা তো বলিনি।” মাহবুব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বন্ধু, মনে করো তুমি নামাজ পড়লে, রোজা রাখলে, দান করল; কিন্তু কারও মানসম্মান নষ্ট করলে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তোমার সব নেকি সেই ব্যক্তিকে দিয়ে দেবেন। আর যদি তোমার কোনো নেকি না থাকে তবে তার গুনাহ তোমার নামে লেখা হবে। তুমি কি এ পরিণতি চাও?” এই কথা শুনে রশিদের ভেতরে ঝড় বয়ে গেল। সে বুঝল, এতদিন ধরে সে নিজের হাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে আসছে।
সেদিন রাতেই সে আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে কান্না করতে লাগল। সে বলল, “হে আল্লাহ! আমি অজ্ঞতার কারণে বড় অন্যায় করেছি। মানুষের মানসম্মান নষ্ট করেছি। আমাকে ক্ষমা করো।” সে পরদিন থেকে একটি প্রতিজ্ঞা নিল, আর কখনো কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষ আলোচনা করবে না। তাছাড়া যার যার নাম নিয়ে সে অতীতে গিবত করেছে, তাদের প্রত্যেকের জন্য সে মাগফিরাতের দোয়া করতে শুরু করল—“হে আল্লাহ! তুমি আমার এবং তার গুনাহ মাফ করে দাও।”
প্রথম দিকে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। চায়ের দোকানে বসলে সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে যখন কারও সমালোচনা হতো, তখন চুপ থাকা কঠিন হয়ে যেত। কিন্তু সে নিজেকে সামলাত, মনে করত সেই ভয়ঙ্কর স্বপ্নের কথা, তামার নখওয়ালা মানুষের চিৎকার, মৃত দেহের গোশত খাওয়ার শাস্তি। ধীরে ধীরে তার অভ্যাস বদলাতে শুরু করল। গ্রামবাসীও বুঝল, রশিদ বদলাচ্ছে। আগে যেখানে তার কথা শুনে সবাই ভয়ে থাকত, এখন ধীরে ধীরে তার প্রতি আস্থা ফিরে আসতে লাগল।
বছরখানেক পর এক সন্ধ্যায় মাহবুব বলল, “বন্ধু, আজ তোমাকে দেখে আনন্দ হচ্ছে। তুমি জানো, আল্লাহ তাওবা কবুলকারী। যদি তাওবা আন্তরিক হয় তবে তিনি অতীতের সব গুনাহ মুছে দেন।” রশিদের চোখে অশ্রু চলে এল। সে বলল, “তুমি না থাকলে হয়তো আমি এ সত্য বুঝতাম না। আমি মানুষের আড়ালে তাদের সম্মান নষ্ট করতাম, অথচ জানতাম না, নিজের সম্মানকেই আমি কবর দিচ্ছি। আজ আমি শিখেছি, গিবত শুধু মানুষের নয়, আল্লাহর হক নষ্ট করে। কারণ, মানুষ ক্ষমা না করলে আল্লাহও ক্ষমা করবেন না।”
রশিদের কাহিনি গ্রামের তরুণদের জন্য শিক্ষা হয়ে গেল। সবাই বুঝতে পারল, গিবত হলো এমন এক ব্যাধি যা শুধু সমাজকেই নয়, আখেরাতকেও ধ্বংস করে। মিথ্যা অনুমান, পরনিন্দা, অপবাদ—এসব শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ভয়াবহ পরিণতি। মানুষ যদি সময়মতো না ফেরে, তবে সেই পরিণতি থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো পথ থাকে না। আর তাই রশিদের জীবন নতুন বার্তা দিল—যতই অভ্যাস হোক, তওবার দরজা খোলা আছে। আল্লাহ দয়ালু, কিন্তু মানুষের সম্মান রক্ষা করাও তাঁর হুকুম।
এভাবেই এক সাধারণ গ্রামীণ চরিত্রের গল্প হয়ে উঠল ইসলামের গভীর শিক্ষার প্রতিফলন। গিবত ও তুহমতের ভয়াবহতা শুধু কাগজে-কলমে নয়, বরং জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় ধরা দিল। আর সেই গল্পের শিক্ষা হলো—মানুষের মুখে যেন কেবল সত্য, কল্যাণ আর ভালোবাসার বাণী উচ্চারিত হয়; নইলে তার জিহ্বাই হবে তার জন্য জাহান্নামের দ্বার।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now