বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -১২
বিধাব গৌরীদাসী স্বামীর রেখে যাওয়া বাগানে সারাদিন ঘুরঘুর করে বেড়ায়-পান, সুপারি, আম, কাঠাল, লিচু আতা, নারিকেল, ইত্যাদি বিক্রি করে যা পায় তা দিয়েই মা-ছেলের দু’বেলার খাবার জোগাড় হয়ে যায়। আর হ্যাঁ তার একাধিক গুণ আছে। কিশোরী বেলা থেকেই সে যাত্রাদলে অভিনয় করত। যৌবনে একসময় মঞ্চ কাঁপিয়ে সে পায় শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মান। তাছাড়াও বৃদ্ধ বয়সে এসে সে মানুষের উপকারে দাইয়ের কাজও করে। গ্রামের এমন কোন সন্তান সম্ভবা মা নাই যে তাকে দিনে একবার স্মরণ না করে থাকতে পারে।
গৌরীদাসীর বাবা ঐখ্যদাস (ঐখ্যহাড়ি) জোয়ান বয়সে সে যাত্রা গানের দলে এমন কোন বাদ্যযন্ত্র নাই যা সে বাজতে পারতো না। যাত্রা পালায় শিল্পীদের অভিনয়ের সাথে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনায় যে মিউজিক আসে সেটা ঐখ্যেদাসের অবদান।
তবে এ কথা সে কথা যাই বলা হোক না কেন, গৌরীদাসী কথাটা একটু আলাদা করে জোর দিয়ে বলতেই হবে। কারণ গল্পটা যখন একটু লোভের দিকেই ঝুকে যাচ্ছে তাই। গৌরীদাসী দেহটার লোভের কথা না বললেই নয়। তার বয়স যখন বারোর গোড়ায় পৌছায় মোটাসোটা একটা শাড়ি সাপের খোলসের মতো পেঁচিয়ে ধরে থাকে ওর দেহে। প্রতœমূর্তির গায়ে নানা বর্ণের পাথরের অলঙ্কার খচিত একটা শাড়ির আঁচলে জড়ানো থাকলেও তার মধ্য দিয়ে মুক্ত বা খোলা অংশ কাপড়ের তলায় ঢাকা আছে বলে মনে হয়, গৌরীও তেমনি দেখায়। খাবার শুঁকতে থাকা কুকুরের মতো লোভে অনেকে ওর পিছু পিছু হাঁটে, তবে নাগাল কেউ পায় বলে মনে হয় না। লালসার জিব বের করা লোভ ঠিক ওই পর্যন্ত এসে আটকে যায়। এরই মধ্যে সময় ঘোড়ার মতো দৌড়াতে থাকে আর ঘোড়ার পিছনে পিছনে ছুটছে গৌরীর দেহ-রূপ-যৌবন।
একদিন দুপুরবেলা গৌরী স্যাঁকোয়া নদী থেকে স্নান সেরে শুকনো শাড়িটা কোন রকমে শরীরে পেঁচিয়ে ডান হাতে ভেজা শাড়িটা তুলে ধরে বাড়ির দিকে হাঁটছে। তাকে দেখে সদ্য জন্ম নেওয়া একটা বাছুর তার সাথে সাথে দৌড়াতে থাকে। মা গাভিটা মনে করেছেছিল যে গৌরী তার বাছুরকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে তাই মনের রাগে পিছন থেকে তাকে জোরেশোরে একটা গুতো দিয়ে ফেলে দেয়। ঘটনাটা বুঝে ওঠার আগেই সে মাটিতে পড়ে মাগো বাবাগো বলে চিৎকার করে। সারারাত যাত্রা পালায় অভিনয় করে ঘুমঘুম চোখে অনেকটা ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে পা ফেলছিল সোনাই বিবেক। হঠাৎ একটা চিৎকার শুনে ধ্যান ভেঙ্গে থমকে দাঁড়ায়। তারপটর এদিক ওদিক তাকাতেই চোখে পড়ে জমির একটা মোটা আাইলের পাশে মেয়েটি পড়ে গিয়ে চিৎকার করছে। সে দৌড়ে গিয়ে মেয়েটিকে তুলে বসিয়ে দেয়। মেটা শাড়িটা ওকে এতোটাই শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে আছে যে তার নড়াচড়া করা শক্তিও নেই। একটা অপরিচিত যুবকের সামনে সে এভাবে পড়ে থাকবে এটা ভাবতেও ভীষণ লজ্জা লাগছে তার।
সোনাই বিবেক বলে- এই মেয়ে, লজ্জা পাচ্ছো কেন গো? তুমিতো আর ইচ্ছে করে পড়ে যাও নি?
গৌরীর চাঁদবরণ মুখখানা লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে আছে। কোন কথা না বলে সে মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে তার আঙ্গুলের নখ কাটতে চেষ্টা করছে।
সোনাই বিবেক বলে- তোমার বাড়ি কোথায় গো মেয়ে?
গৌরী ডান হাতটা উঁচু করে সামনের বাড়িগুলোকে ইশারায় দেখিয়ে দিলো।
সোনাই বিবেক বুঝে নিলো ওটা হাড়িপাড়া ঐখ্য কাকার বাড়ি ওখানে। সে আবার প্রশ্ন করল তোমার নাম কি গো মেয়ে?
এক মুর্হুত দেরি না করে ঝটপট বলে ফেলল-গৌরী--গৌরীদাসী?
ও আচ্ছা, তোমার বাবার নামটা কি বলবে আমায়?
এবার সে অন্যরকম একটা বিরক্তির ভাব নিয়ে মনে মনে ভীষণ রেগে গিয়ে মুখটা একটু বাঁকা করে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু শাড়িটা তাকে এতোটাই শক্ত করে পেঁচিয়ে রেখেছে যে সে উঠে দাঁড়ানোর সুযোগই পাচ্ছে না।
সোনাই বিবেক একটু হলেও তার বিরক্তিকর ভাবটা টের পেয়েছে। তাই সহজ হওয়ার জন্য বলল- আমি কি তোমাকে একটু সাহায্য করব গৌরী?
এবার সে নিরুপায় হয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
সোনাই বিবেক তার হাতটা ধরে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল। হরিণ সাবক শিকারি বাঘের হাত থেকে ছাড়া পেলে যেমন এক লাফে তেরো হাত দূরে যায় গৌরীও তেমনি সোনাই বিবেকের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে এক নিমিশে কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল।
কন্তিু গৌরী উধাও হয়ে গেলে কি হবে? তার পুরো স্মৃতিটাইতো সে ফেলে গেছে সেখানে, যা সোনাই বিবেকের দিবারাত্রির হাহাকারের খোড়াক হয়ে রইলো। সেই টিনটিনে নাক, ডাগড় চোখ, এলোকেশী চুল, চাঁদবরণ মুখ, শাড়ির ভাঁজে খসে পড়া অনাবৃত যৌবনের উত্তাল ঢেউ প্রতিনিয়ত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ক’ল-কীণারাহীন অথৈ জলে।
বঙ্গেরবাড়ি স্কুলমাঠে সপ্তাহব্যাপি চলে সেকালের নামকরা ‘ভারতী অপেরার’ যাত্রাপালা-আলোমতি-প্রেমকুমার, কমলার বনবাস, রূপবান, গুনাইবিবি, ‘মা মাটি মানুষ’, প্রভৃতি পালা। এ সকল লোকজ ও সামাজিক কাহিনীমূলক পালাগুলো এলাকায় এতোটাই জনপ্রিয় ছিলো যে সারারাত পালা দেখে নারী-পুরুষ কেউ না কেঁদে বাড়ি ফিরতো না। যাত্রাপালার গুরুত্বপূর্ণ একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে ‘‘বিবেক’’ আর বিবেক চরিত্রটিতে অভিনয় করে সোনাই। সে তার দক্ষতায়, অসামান্য অভিনয়ে অতি অল্পদিনেই “সোনাই বিবেক” নামে খ্যাতি পায়।
একদিন পড়ন্ত বিকেলে সোনাই বিবেক হাঁটতে হাঁটতে ঐখ্যদাসের বাড়ি আসে। অনেকদিন পর সোনাইকে কাছে পেয়ে ঐখ্যদাসের সেই পুরোনো গল্পের সযতেœ রেখে দেওয়া বাক্সের ঢাকনা এমনি এমনি খুলে যায়। এটা সেটা গল্পের তালে সোনাই সেই গৌরী নামের মেয়েটির কথা রামলালকে বলবে বলে একটা সুযোগ খুঁজছিল, এমন সময় কোথা থেকে দৌড়ে এসে হাফাতে হাফাতে রামলালের পিছনে দাঁড়িয়ে ঘাড়ে হাত দিয়ে গৌরী বলতে শুরু করল- বাবা ঐ বড় রাস্তা দিয়া না কতোগুলা লোক মাইকদিয়া কয়া ব্যাড়ের নাগচে, বঙ্গেরবাড়ি স্কুল মাঠোত যাত্রাগানের কথা। চলো না বাবা আইজ রাইতোত সগায় মিলি গানবাড়ি যাই।
ঐখ্যদাসের সাথে যে একজন মানুষ বসে আছে এতোক্ষণ সেটা গৌরীর একবারও চোখে পড়ে নাই। হঠাত সোনাই বিবেকের চোখে সরাসরি তার চোখ পড়ে গেলে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে সে। তার আবছা আবছা মনে হতে থাকে এই মুখ, এই চোখ, এমন লম্বা চুল কোথায় যেন সে দেখেছে,- কোথায় দেখেছে? ধ্যাৎ মনে পড়ছে না কেন? বাম হাতের আঙ্গুল দিয়ে মাথা চুলকাতে থাতে আর ভাবে গৌরী। তারপর সেই রাস্তার ধারে পড়ে যাওয়ার কথা মনে হলে লজ্জায় মুখ ঢেকে সে এক দৌড় দিয়ে পালিয়ে যায়।
ঐখ্যদাসের সাথে গুনাইবিবি পালা করার সময় মঞ্চে উঠে সোনাই বিবেক তার গান ভুলে যায়। অভিনয়ের ভঙ্গিতে বারবার এদিক সেদিক তাকাতে থাকে। বই মাস্টারকে আকার ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করে কিন্ত তিনিও মঞ্চের দিকে না তাকিয়ে আনমনে বিড়ি টানতে থাকেন। বিবেকের বেগতিক অবস্থা বুঝতে পেরে ঐখ্যদাস একটা বিকট শব্দে ট্যা-ট্যা-ট্যা করে প্লাইনেট (ফুলেট) বাজাতে থাকে। দর্শকেরা কোন কিছু বুঝতে না পারলেও যাত্রা পালার সাথে সংশ্লিষ্ট যারা সবাই চমকে উঠে একে অপরের দিকে তাকাতে থাকে। এবার বই মাস্টার মঞ্চের দিকে তাকিয়ে দেখে বিবেক বারবার তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বই মাস্টার সেটা বুঝতে পেরে খুব দ্রæত বইয়ের পাতা উল্টিয়ে গানের স্থায়ী চরণগুলো বলতে থাকে সোনাই বিবেকের কানে সেই গানের কথাগুলো আসা মাত্রই তার মনে পড়ে যায় এবং সে অভিনয়ের ভঙ্গিতে গান গাইতে শুরু করে। ঐখ্যদাস সে কাহিনী বলে আর তারা দুজনে হাসতে হাসতে যেন মাটিতে গড়িয়ে পড়ে।
ঘাড়ের গামছা দিয়ে চোখ মুছিতেছে ঐখ্যদাস এমন সময় সোনাই বলে-কাকা আমি একটা কথা বলার জন্য এসেছিলাম, বলবো কি না ভাবছি-
কেন বাবা সোনাই, তুমিতো আমার ছেলের মতো আর আমরা কতোদিন সুখে-দুঃখে একসাথে ছিলাম, কতোই না আপন ছিলাম বলতো? আমার সাথে কথা ভলতে তোমার অনুমতি লাগবে কেন বাবা?
হ্যাঁ কাকা, সে দিনগুলো কি আর ভোলার যায়। আচ্ছা কাকা গৌরীতো বাড়িতে বসেই থাকে। ওকে আমাদের দলে নিয়ে গেলে কেমন হয়? মানে আমি বলছি- যেহেতু আমি ওখানে আছি ওর কোন অসুবিধা হবে না।
সে আমি জানি বাবা, আর এ ভরসা আমি তোর উপর করতে পারি। তাছাড়া ওর শরীরেতো আমারই রক্ত মিশে আছে, সেটা যাত্রাগানেরই রক্ত।
হ্যাঁ কাকা, সেটা কি আর অস্বীকার করা যায়? কাকা তাহলে কাল সকালে স্কুলমাঠে গৌরীকে নিয়ে আসেন। আমি ত্রিদিপ দাদাকে আপনার কথা বলেছি। উনি আপনাকে চায়ের নিমন্ত্রণও করেছেন।
আচ্ছা বাবা, কাল সকালে গৌরীকে নিয়ে আসবো।
মাত্র দু’চারদিন রিহার্সেল করে চিরকালের জনপ্রিয় সেই রূপবান পালায় রূপবান চরিত্রে অভিনয় করে গৌরী প্রথমবারেই যেন দর্শকের মন কেড়ে নিয়েছে। সেই থেকে গৌরীর যাত্রাগানে অভিনয়ের পথ চলা শুরু। চিরকালের জনপ্রিয় সেই রূপবান পালায় রূপবান চরিত্রে অভিনয় করে গৌরী প্রথমবারেই যেন দর্শকের মন কেড়ে নেয়। রূপবানের কষ্ট দেখে এমন কোন দর্শক নেই যার চোখের জল আসে নাই। সকলের মুখে মুখে একই কথা আহা! মেয়েটি কি অভিনয়ই না করলো।
এরপর কিছুদিন যেতে না যেতেই সোনাই বিবেকের সাথে গৌরীর বিয়ে হয়ে যায়। অবশ্য মুসলমান ছেলের সাথে বিয়ে হওয়ায় বেশ কিছুদিন তাকে পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়। তাদের একমাত্র সন্তান ধলা। জন্মের পর ছেলের গায়ের রঙ ধবধবে সাদা হওয়ায় তার নাম রাখা হয় ধলা। ছেলের কৌশোর পার হতে না হতেই সোনাই বিবেক বসন্ত রোগে আক্রন্ত হয়ে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়।
সোনাই বিবেকের অকাল মত্যুতে গৌরী দিশেহারা হয়ে পড়ে। সংসারে দুটি মাত্র প্রাণি মা আর ছেলে। মা-বাপের হাল ধরে ধলা মিয়া যাত্রাগানের দলে ভিড়লেও তেমন সুবিধা করতে পাচ্ছিলো না। কারণ যাত্রা নিয়ে বাঙালির সেই উন্মাদনা আজ আর নেই। শীত পড়লেও যাত্রার আসরগুলো সব ফাঁকা এক সময়ের লোকসংস্কৃতির ধারক ও বাহক যাত্রাগান এখন অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়েছে। বছর দশেক আগেও কিন্তু গ্রামগুলিতো বটেই, শহরতলিও ছেয়ে যেত যাত্রার রঙিন পোস্টারে, মাইকে ঘোষণা চলত নির পুজোর পর পরই যাত্রার আসর বসে যেতো চায়ের দোকান থেকে অন্দরমহল সর্বত্রই চলতো তার আলোচনা।
প্রযুক্তির উন্নয়নে বিনোদনের হরেক উপাদান এখন মানুষের হাতের নাগালে। তাই অন্য বিনোদনের সন্ধান মানুষকে যাত্রা থেকে দূরে সরিয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে তথ্য-প্রযুক্তির দ্রæত উত্থানের সঙ্গে খুব অল্প সময়ে যাত্রা তার নিজের জায়গাটা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে এর সাথে সংশ্লিষ্ট অভিনয় শিল্পী ও কলাকৌশুলীরা বেকার হয়ে পড়ে।
গৌরী দাসী, ধলা মিয়াকে নিয়ে ফিরে আসে তার স্বামীর ভিটায়। ধলা মিয়ার কোন কাজ-কাম নাই সারাদিন ঘুরে বেড়ায় আর সন্ধ্যা হলে বৈষ্ণবদের আশ্রমে যেয়ে মিশে যায় গানের আসরে।
নিতাই বাউল ঠাট্টা করে তাকে ‘কলির কানাই’ বলে ডাকে। কিন্তু কানাইয়ের সাথে তার তার একটি যায়গায় বরাবরই অমিল দেখা যায় নারীদের প্রতি এ ‘কলির কানাই’ নিরাসক্ত। নিতাই বাউল তাকে বৈষ্ণবদের দলে পেয়ে খুব খুশি।
ধলা মিয়া সারাদিন গান-বাজনা নিয়ে পড়ে থাকে আর বিকাল হলে বৈষ্ণবদের আশ্রমে যেয়ে ভাবের জগতে ডুবে যায়। সংসারে তার কোন মন নাই। গানের গলাটা খুবই ভালো বলে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন রকম গানের আসরে তার ডাক পড়ে।
মানুষ তাকে ডেকে নিয়ে যায় আর বেশ মোটা রকমের সম্মানীও দেয় এতেই তার সংসার চলে যায়। ধলা মিয়া সারাদিন গান-বাজনা নিয়ে পড়ে থাকে বলে গ্রামের মানুষ তাকে ধলা বয়াতি বলে ডাকে।
গৌরীদাসীর ধারণা-ছেলের ঘাড়ে জোঁয়াল তুলে দিতে পারলে হয়তো সে সংসারি হয়ে যাবে। তাই ধলার বিয়া দেবার জন্য সে উঠিপড়ি লাগে। মরার আগে তার ছেলের বউয়ের মুখ দর্শন করি, তার হাতের রান্না খাওয়ার সখ। বিধাতা যেন গৌরীদাসীর সদয় হয়। বছর খানেকের মাথায় ছেলের বিয়েও হয়ে যায়। কি সুখের সংসার ছিলো তার। ধলা মিয়া গরিব মানুষ, বাড়ির ভিটের আশেপাশে যেটুকু জমি সেটাই তার সম্পদ। এতেই সে মহাখুশি কারণ তার সম্পদের প্রতি তার কোন লোভ নাই, ঘরের খাবার নিয়ে কোনদিন তার মাথা ব্যথা ছিলো না। বিধাতা যেভাবে চালায় তাতে সে মহাখুসি। কিন্তু প্রদীপ চারিদিকে আলো ছড়ালেও তার নিচে যেমন অন্ধকার থাকে, ঠিক তেমনি ধলা মিয়ারও চারিদিকে আলোয় পরিপূর্ণ থাকলেও একটি জায়গায় অন্ধকার। সেটা হলো বিয়ে হওয়ার কয়েক বছর গতো হলেও তার সংসারে কোন সন্তান নাই। অবশ্য এ নিয়ে তার কোর মাথ্ াব্যথা না থাকলেও তার বোউ আমেনার মনটা সবসময় ভারি থাকে। বিধাব গৌরীদাসীও মাঝে মধ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
একদিন পড়ন্ত বিকেলে ধলা বয়াতি দোতারা নিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে বসে। সূর্যটা পশ্চিম দিকে হেলে পড়লে চারিদিকে আবছা আবছা অন্ধকার নেমে আসছে। চোখের দৃষ্টি আর খুববেশী দুরে যেতে পাচ্ছে না। এমন সময় একটা শিশুর কান্না তার কানে ভেসে আসে। প্রথম বার এটাকে মনের ভ্রম বলে উড়িয়ে দেয় সে। কিন্তু পরক্ষণে এবার বেশ জোরে-শোরে সেই কান্নার আওয়াজটা আসতে লাগলো।
ধলা বয়াতি দোতারা রেখে এক পা দু’পা করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। হঠাৎ তার চোখে পড়ে একটি ছোট শিশু নদীর কিণারে পা দু’টো পানিতে ছোঁ-ছোঁ করছে আর মাথাটা বালুর উপরে। গোধুলির আবছা আবছা অন্ধকারের মাঝেও সন্ধ্যাতারার মিটিমিটি আলোয় শিশুটির নিষ্পাপ মুখখানা চকচক করে জ্বলছে। তবে সে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, কান্না করার শক্তিও নাই। ধড়ফড় করে যেয়ে সে বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নেয় এবং এক মুহুর্ত দেরি না করে বাড়ি চলে আসে। আমেনার কোলে শিশুটিকে তুলে দিয়ে বলে- বোউ বাচ্চাটাকে আগে খাওয়ার ব্যবস্থা কর।
আমেনার কোলের উষ্ণতা পেয়েই শিশুটি নড়েচড়ে ওঠে, বুকের দুধ খাওয়ার জন্য চেষ্টা করে। এবার আমেনার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে তার স্তনে বাচ্চার মুখ লাগিয়ে দেয় কিন্ত তার তো পোড়া কপাল, এ পর্যন্ত কোন সন্তানই হলো না আর বুকে দুধ আসবে কোথা থেকে? স্তন চুষে দুধ না পেয়ে ক্ষুধার্ত বাচ্চাটি গলাফেটে কান্না শুরু করে। একটা দুঃচিন্তার কালোমেঘ এসে তার আকাশ ছেয়ে যায়। আমেনারও দু’চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। এখন সে বাচ্চাকে খাওয়াবে কি? বুকের দুধ না পেলে আর বেশিক্ষণ বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। হঠাত তার মনে পড়ে গেলো, ওপাড়ার ওয়াজেদ আলির বোউয়ের তিন-চার দিন আগে বাচ্চা হয়েছে। আনন্দে তার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো, সে আর এক মুহুর্ত দেরি না করে বয়াতিকে বলে- বয়াতি তোমা এ্যাকনা বাড়িত থাকো মুই বাচ্চাটাক ধরি ওয়াজেদ আলির বাড়ি যাঁও, তার বোউয়ের বুকের দুধ আছে। একটু খাওয়ালে বাচ্চা এ্যালায় ভালো হয়া যাবে।
আচ্ছা বোউ যা, তাড়াতাড়ি কর, আহারে কয়দিন থাকি যে এই নিস্পাপ ছওয়াটা খায় নাই সেটা আল্লায় ভালো জানে।
ওয়াজেদের বোউয়ের বুকের দুধ চুঁষে প্রাণ ফিরে পেল নিষ্পাপ শিশুটি। আমেনা মনে মনে ভাবে আল্লাহ তাদের চাওয়া পূর্ণ করেছে। সত্যি সত্যি তাদের ঘরে একটি সন্তান পাঠিয়েছে। শিশুটি নদীর উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে ভেসে তাদের কাছে আসে বলেই তার নাম রাখা হয় ভাসানি। কে তার বাবা, কে তার মা, হয়তো কোনদিনও হুদিস মিলবে না, নদীতে তারা ভেসে গেছে তাদের কেউ বেঁচেও নেই।
ভাসানি তার জীবদ্দশায় জানে ধলা মিয়া তার বাবা আর আমেনা তার মা। সে তাদের আদর যতেœ দিন দিন বড় হতে লাগলো। বিশেষ করে গৌরীদাসী ভাসানিকে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলো। একটা মুহুর্তেও জন্যও সে ভাসানিকে চোখের আড়াল করে না। ধলা মিয়া ঘরে পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে একটু একটু করে বড় হতে লাগলো ভাসানি। অভাব-অনাটনের সংসার তবুও হাট-বাজার গেলে খরচের পয়সা বাঁচিয়ে ধলা বয়াতি মেয়ের জন্য সওদা নিতে ভুল করে না। কারণ বাড়ির উঠোনে পা রাখতে না রাখতেই ভাসানি এক দৌড়ে এসে বাবার কোলে ওঠে মুখের দিকে চেয়ে থাকে। মুখে কিছু না বললেও তার চোখের ভাষা বুঝিয়ে দেয় যে, সে তার জন্য কিছু এনেছে কি না। কাগজে মোড়ানো সওদার পোটলাটি হাতে পেলেই বাবার কোল থেকে নেমে খুশিতে এক দৌড় দিয়ে দাদির কাছে যায়। সওদার পোটলাটি খোলার কাজটা আবার তাকেই করতে হয়। ধলা বয়াতি কিংবা আমেনা সেটা খুলে দিতে চাইলে ভাসানি তা করতে দেবে না। এভাবে সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায় কেটে যায় তাদের দিন। ভাসানিও বড় হতে থাকে তাদের আদর যতেœ।
ধলা বয়াতি একদিন দুপুর বেলা মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়ে দেখে একটি টিয়ে পাখির ছোট্ট বাচ্চা মাটিতে পড়ে কাঁতড়াচ্ছে। ছোট বাচ্চাটি হয়তো অসুস্থ বলে সে উড়তে পাচ্ছে না। ধলা বয়াতি বাচ্চাটাকে নিয়ে অনেক্ষণ ধরে মা পাখিটার জন্য অপেক্ষা করলো কিন্তু না, মা পাখিটা এলো না। তাই সে নিরুপায় হয়ে বাচ্চা পাখিটার জীবন বাঁচানোর জন্য তাকে বাড়িতে নিয়ে এলো। ভাসানি সহ খুব আদর যতœ করে সেই টিয়ে পাখির বাচ্চাটিকে সুস্থ করে তুললো। ধলা বয়াতি ভাসানিকে বলে-মা টিয়ে পাখিকে বোল শেখালে সে কিন্ত আমাদের মতো কথা কথা বলতে পারে।
বোল কি বাবা?
বোল মানে ‘কথা’, হামা যেমন করি তাক শেখামো সেটাই ‘বোল’। তুই আদর-যতœ করি ওর সাথে কথা কইলে তায়ও তোর সাথে কথা কবে।
সেই থেকে ভাসানি তার টিয়ে পাখিকে সঙ্গে নিয়ে খায়, রাতে সঙ্গে নিয়েই ঘুমায়। ভাসানি আদর করে তাকে কুসুমপরী বলে ডাকে।
কথায় বলে-“সুবাতাস বেশিক্ষণ বহে না” বিধবা গৌরীদাসী বেলাতেও তাই হলো। একদিন কাঠাল পাড়তে গিয়ে হাত ফসকে একটা কাঠাল তার মাথায় এসে পড়ে- এতেই বুড়ির বিধি বাম হয়ে যায়। সেই যে বিছানায় যেয়ে পড়ল গৌরীদাসী আর উঠতে পারল না। তার কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে গেছে। ধলা বয়াতি মাকে মেখলীগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করে, ডাক্তার সাহেব বলেছেন বুড়ো মানুষ সেরে উঠতে একটু সময় লাগবে, আপনাদের ধৈর্য্য ধরতে হবে।
ধলা মিয়া জানে, ধৈর্যের ফল সবসময় মিষ্টি হয় কিন্তু সৌভাগ্যের আকাশে যখন কালো মেঘ জমে ঝড়ের রূপ ধারণ করে তখন সে মিষ্টি ফলও ঝরে পড়ে। মেখলীগঞ্জ হাসপাতালে দিন দশেক মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হার মেনে গৌরীদাসী এ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে পরপারে চলে যায়।
মাসখানেক পরে আমেনা একদিন ভাসানিকে সঙ্গে নিয়ে মায়ের দেখা করার জন্য বাড়ি যাচ্ছিল। ভাসানি আমেনার আঙ্গুল ধরে হাটে আর রাস্তায় তার চোখের সামনে যা পড়ে সাথে সাথে সেটা নিয়ে প্রশ্ন করে। শেষে একটু বিরক্ত হয়ে আমেনা বলে - ভাসানি তুই এবার এ্যাকনা চুপ করি থাকতো, তোর সাথে বকবক করতে করতে মোর মাথা ঘুরির নাগচে। মোর আঙ্গুলটা ছাড়ি দিয়া এ্যাকনা আগে আগে হাঁটেকতো।
ভাসানি মায়ের কথায় রাগ করে তার আঙ্গুল ছেড়ে দিয়ে রাস্তার মাঝখানে বসে পরে। আমেনা পিছন ফিরে দেখে ভাসানির চোখ পানি, অমনি সে দৌড় দিয়ে যেয়ে তাকে কোলে তুলে নেয়।
তিনকুড়ি মহাজন নয়ারহাটে যাওয়ার জন্য বের হয়। হাবা তার মাথার উপর ছাতা ধরে সাথে সাথে হাঁটছে। হঠাত দেখে ধলা বয়াতির বোউ আমেনা কোথায় যেন যাচ্ছে। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি হওয়ার মতো। তিনকুড়ি মহাজন-একটু জোরে হেঁটে আমেনার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে- আরে বয়াতির বোউ যে, তা কোন্টেকোনা যাবার বেড়াইছেন?
এ্যাকনা মার সাথে দেখা করির যাঁও। মহাজন তোমার শরীর স্বাস্থ ভালো আছে?
হ্যাঁ আমেনা আছি ভালোই। আমেনা, এ্যালা ক্যান জানি বয়াতির দেখায় পাওয়া যায় না। ওয় কি বাড়িত নাই?
আছে মহাজন, সারাদিন একনা সেকনা কাজ-কাম করে আর বিকাল হলে আশ্রমোত য্যায়া পড়ি থাকে। ঠিক আছে মহাজন, মুই এপাশের সোজা রাস্তা দিয়া যাইম।
আচ্ছা যাও, এ্যাকনা দেখি-শুনি যান।
শেষ বিকেলের মিষ্টি আলো, ঝিরিঝিরি দক্ষিণা হওয়া আকাশের অলসতায় ঝিমিয়ে পড়া দিনের আলো আমেনার মুখে যেন শতবর্ষী বসন্তের পুস্পমঞ্জরী রঙ মেখে দিয়েছে। যেমনি উঁচা-লম্বা, তেমনি ধবধবে ফর্সা, চান্দের মতো মুখের গড়ন। দেখে মনে হয় আকাশের পরী। সদ্য বৃষ্টিস্নাত টসটসে রসালো পাকা আঙ্গুর ফলের মতো যৌবন আমেনার। বকের পালকের মতো ধবধবে শরীর, তার হৃৎপিÐটা কেঁপে উঠে। সমস্ত শরীরে বিদ্যুত চমকে যায়। দেহ-মনে শরাবের নেশা লাগে। যৌবনের উচ্ছ্বাসিত আবেগে অন্তহীনরুপে কাম্য হয়ে ওঠে তার দেহ-মন, মাথার চুল থেকে শুরু করে পায়ের নখ পযর্ন্ত সমস্ত শরীর। চঞ্চলা হরিণীর নাভিমূলে কস্তরির ভেতর গুপ্ত সুগন্ধি যেন ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। তার নাকের ভেতর সুড়সুড়ি দেয়, সেই গন্ধে তিনকুড়ি মাতাল হয়ে যায়। সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমেনার দিকে। হালকা জলপাই রঙের শাড়ি ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক, আমেনাকে দেখে আর এ জগতের কেউ বলে মনে হয় না। মনে হচ্ছে কোন হুর-পরী যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছে। তার সাত জন্মে এমন লাবন্যময়ী ললনা অপরূপ অবয়ব প্রত্যক্ষ হয়েছে কিনা জানা নেই। সে দিন থেকে তিনকুড়ি মহাজনের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। দিনে রাতে সে কেবল একটা কৌশল খুঁজতে থাকে কিভাবে আমেনাকে পাওয়া যায়। কিভাবে তাকে বিয়ে করা যায়।
তিনকুড়ি খাঁ জীবনের নীতি-নৈতিকতা ভুলে গিয়ে বিয়ে পাগল হয়ে ওঠে। সংসারের সুখের চেয়ে এখন তার নিজের সুখটাই মূখ্য। নিজের যৌন ক্ষুধা ও কামনা বাসনা চরিতার্থ করার নিমিত্তে যতো প্রকার অন্যায় কাজ আছে সবই সে নির্বিঘ্নে করতে পারে। এতে কারও লাভ হোক, কারও ক্ষতি হোক, কারও জীবন ধ্বংস হোক তাতে তার কিছু আসে যায় না।
তিনকুড়ি মহাজন এই মাত্র বাড়ি থেকে আড়তে এসে পাঞ্জাবীটা খুলে হাবার হাতে দিয়ে গদিতে হেলান দিয়ে বসে বলে-‘তামাকটা দে’।
হাবা হুক্কায় নতুন তামাকে আগুন দিয়ে, হুক্কার নল মহাজনের হাতে দেয়। তিনকুড়ি মহাজন হুক্কায় একটা সুখের টান দিয়ে ধোঁয়া গুলো আকাশের দিকে ছেড়ে দেয়, তারপর বলে-আহারে ধলামিয়া! তুই হলু শালা বাউল মানুষ, তুই সারাদিন রাস্তায়-ঘাটে, বনে জঙ্গলে ঘুরি বেড়াবু, আর রাইত হইলে আশ্রমোত য্যায়া পড়ি থাকিবু, তোর অতো সুন্দরী বউয়ের দরকার কি?
তিনকুড়ি মহাজন চোখ বড় ভয়ানক, নারীর বয়স চৌদ্দ হোক কিংবা চল্লিশ-যাই হোক না কেন তার লোলুপ দৃষ্টি কোনটা থেকেই বাদ পড়ে না। নারীদেহ মানে তার কাছে ভোগের জিনিস এর চেয়ে বেশী কিছু না। ধলা বয়াতির বোউ আমেনাকে চোখে দেখার পর এখন তার দুনিয়া বলতে আমেনা। যে করেই হোক আর যেভাবেই হোক আমেনাকে তার পেতেই হবে, তাকে চাই আর চাই। আর এ যন্ত্রণা থেকে তাকে উদ্ধার করতে পারে একমাত্র কাল্লু চোর। যতোবারই তিনকুড়ি মহাজন কোন সমস্যায় পড়েছে কাল্লুই তাকে উদ্ধার করেছে। সে বুদ্ধি দিয়েই হোক আর কাউকে মেরে ফেলেই হোক।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now