বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পাখির ডানায় লেখা প্রতিশ্রুতি

"ক্রাইম" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X শীতকাল। কুয়াশায় মোড়ানো ভোরের বাংলাদেশি গ্রাম। মাঠের ধানগাছগুলো ঝকঝক করছে শিশিরে, দূরে নদীর তীরে গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়ছে। ঠিক সেই সময়েই স্কুলপড়ুয়া রাফি বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হাঁটছিলো মাটির বাঁধ ধরে। হঠাৎই কানে এল তীব্র ডানা ঝাপটানোর শব্দ। খড়ের গাদার আড়াল থেকে উঠে এলো কয়েকটা শালিক, বুলবুলি আর এক জোড়া ডাহুক। রাফি থমকে দাঁড়ালো। মনে হলো যেন প্রকৃতি তাকে ভোরবেলার শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। রাফির দাদু ছিলেন নামকরা শিকারি। বহু বছর আগে শীতের মৌসুম এলে নদীর ধারে বসে হাঁস শিকার করতেন তিনি। বন্দুক কাঁধে নিলে গ্রামের লোকজন তাকে “নায়ক” ভাবতো। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে, বিশেষ করে যখন পরিবেশ রক্ষার আলোচনা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো, তখন দাদুর দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেলো। এখন তিনি প্রতিটি সন্ধ্যায় উঠোনে বসে গ্রামের শিশুদের গল্প শোনান— — “বাবারা, পাখিরা শুধু আমাদের চোখ জুড়ায় না, তারা আমাদের জীবনের সাথী। তারা ধানক্ষেতে পোকা খেয়ে কৃষকের উপকার করে, বীজ ছড়িয়ে বনায়ন ঘটায়। আর মনে রেখো, একেকটা প্রজাতি হারিয়ে গেলে আমাদের পরিবেশের একেকটা স্তম্ভ ভেঙে পড়ে।” এক বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পথে রাফি দেখলো, গ্রামের কয়েকজন কিশোর ঝোপের আড়ালে জাল পেতেছে। তারা উচ্ছ্বাসে হাসাহাসি করছে, সামনে এক দল বুনোহাঁস নামবে বলে অপেক্ষা করছে। দৃশ্য দেখে রাফির বুক ধক করে উঠলো। সে সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে গিয়ে বলল— — “ভাইরা, তোমরা এই কাজটা করো না। পাখিদের বাঁচতে দাও।” একজন কিশোর হাসতে হাসতে বলল, — “আরে তুই বইপড়ুয়া ছেলে, এসব বুঝবি কী! পাখি ধরি, খাই—এই তো আনন্দ।” রাফি চুপ করে রইল কিছুক্ষণ, তারপর দাদুর শেখানো কথা মনে করে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, — “তোমরা জানো না, আইন আছে। ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পাখি মারা, ধরা বা খাওয়া অপরাধ। জরিমানা, এমনকি জেলও হতে পারে। আর শুধু আইন নয়, স্বাস্থ্যের জন্যও ভয় আছে। বার্ড ফ্লু বা স্যালমোনেলা ছড়াতে পারে।” ছেলেগুলো প্রথমে উপহাস করলেও, ওদের মধ্যে একজন থমকে গেলো। বলল— — “শোনো, গত বছর পাশের গ্রামে তো একজন পাখি খেয়ে অসুস্থ হয়েছিলো। ডাক্তারেরা বলছিলো ভাইরাস ছড়িয়েছে।” ঠিক তখনই বন বিভাগের এক কর্মী সাইকেলে চড়ে গ্রামে প্রবেশ করলেন। খবর পেয়ে তিনি জাল বাজেয়াপ্ত করলেন এবং ছেলেদের সতর্ক করলেন। তিনি বললেন— — “পাখিরা আমাদের ফসল রক্ষা করে। পর্যটকরা এই পাখি দেখতে আসে, এর মাধ্যমে গ্রামের আয়ও বাড়তে পারে। তোমরা যদি শিকার করো, তাহলে শুধু আইন ভাঙবে না, নিজেদের ভবিষ্যৎও নষ্ট করবে।” ঘটনাটা গ্রামে আলোড়ন তুললো। পরের শুক্রবার মসজিদের ইমাম সাহেব খুতবায় এ প্রসঙ্গ তুললেন। তিনি বললেন— — “আল্লাহর সৃষ্ট কোনো প্রাণীকে অহেতুক হত্যা করো না। জীবের প্রতি দয়া দেখানোই আসল মানবিকতা। তোমরা ভাবো, যদি তোমাদের জীবন হঠাৎ কেড়ে নেওয়া হয়, তবে কেমন লাগবে? পাখির জীবনও তেমনি মূল্যবান।” গ্রামের লোকজন চুপচাপ শুনলো। ধীরে ধীরে সবাই বুঝতে শুরু করলো, পাখি রক্ষা করা শুধু সরকারের আইন মানা নয়, ধর্মীয় দায়িত্ব এবং নৈতিক কর্তব্যও। রাফির দাদু এক রাতে উঠোনে বসে তাকে বললেন— — “বাবা, আমি একসময় ভেবেছিলাম শিকার মানে সাহস। এখন বুঝি, আসল সাহস হলো কাউকে বাঁচানো। যে জীবন রক্ষা করে, সে-ই প্রকৃত নায়ক।” এরপর থেকে গ্রামে নতুন এক ধারা তৈরি হলো। শিকারের বদলে ছেলেমেয়েরা শুরু করলো পাখি দেখা। তারা হাতে দূরবীন নিয়ে ধানক্ষেতে যায়, ছবি তোলে, ডায়েরিতে লেখে কোন পাখি কোথায় দেখা গেলো। স্কুলে পাখি নিয়ে ছোট প্রদর্শনীর আয়োজন হয়। এমনকি কিছু বিদেশি পর্যটকও আসতে শুরু করলো গ্রামে, শুধু পাখি দেখতে। গ্রামের দোকানদার খুশি হয়ে বলল— — “আগে শিকারের পর মাংস বিক্রি করতাম, এখন পাখি দেখতে আসা লোকদের জন্য চা-বিস্কুট বিক্রি করে আয় করি। সত্যিই, পাখিরাই আমাদের নতুন জীবিকার পথ খুলে দিয়েছে।” অবশেষে আন্তর্জাতিক পাখি দিবসে স্কুলে বড় অনুষ্ঠান হলো। রাফিকে বক্তব্য রাখতে বলা হলো। সবার সামনে দাঁড়িয়ে সে বলল— — “বন্ধুরা, আমরা যদি পাখিদের রক্ষা করি, তারা আমাদের প্রকৃতিকে রক্ষা করবে। তারা ফসলকে বাঁচাবে, বনকে বাঁচাবে, আমাদের জীবনকে নিরাপদ রাখবে। তাই আসুন, আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি—বন্য পাখিকে আর কেউ ধরবো না, মারবো না, খাবো না।” তার কথায় উপস্থিত শিক্ষক, অভিভাবক, গ্রামের মানুষ সবাই হাততালি দিলো। রাফির চোখে তখন এক স্বপ্ন ঝিলমিল করছিলো—সবুজ মাঠে, নীল আকাশে অবাধে উড়ে বেড়াচ্ছে হাজারো পাখি, আর মানুষ তাদের শত্রু নয়, বন্ধু। সেদিন পুরো গ্রাম একসাথে প্রতিশ্রুতি দিলো— “পাখির ডানায় লেখা প্রতিশ্রুতি, প্রকৃতি রক্ষার শপথ।”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৬০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now