চুলের দুশ্চিন্তার প্রেসক্রিপশন
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ ।
শহরের প্রখ্যাত এক চিকিৎসকের চেম্বারে ঢুকলেন এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। মুখভর্তি অস্থিরতা, চাহনিতে ভরপুর দুশ্চিন্তার রেখা। হাতে টুকটাক পরীক্ষা রিপোর্টও আছে, কিন্তু সেগুলো গোপনে বগলের নিচে লুকানো। যেন কাগজ নয়, আদালতের সমনপত্র।
চেয়ার টেনে বসেই তিনি হাঁপ ছাড়লেন। “ডাক্তার সাহেব, বড় দুশ্চিন্তায় আছি।”
ডাক্তার চশমার ফাঁক দিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “দুশ্চিন্তার ওষুধ তো দিচ্ছি প্রতিদিন, কিন্তু আপনার সমস্যাটা কী?”
রোগী মুখটা গম্ভীর করে বললেন, “আমার চুল পেকে যাচ্ছে।”
ডাক্তার ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। “এই বয়সে চুল পাকতেই পারে। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন কেন?”
রোগী আস্তে আস্তে গলা নামিয়ে বললেন, “এই যে চুল পেকে যাচ্ছে, ওটাই আমার দুশ্চিন্তা। ভাবুন তো, প্রতিদিন আয়নায় তাকালে দেখি কালো থেকে সাদা, সাদা থেকে রুপালি—এ যেন বিনা অনুমতিতে পেনশন স্কিমে ঢুকে পড়েছি!”
ডাক্তার হেসে ফেললেন। “মানে, আপনার দুশ্চিন্তার কারণ হলো চুল পাকা, আর চুল পাকার কারণ হলো দুশ্চিন্তা?”
রোগী হাত উঁচু করে বললেন, “ঠিক তাই! এ যেন সাপ খেয়ে লাঠি গেলার মতো। আমার মাথার চুলগুলো একেকটা দার্শনিক হয়ে গেছে—‘আমরা পেকে যাবোই, তুমি দুশ্চিন্তা কর বা না কর।’”
ডাক্তার এবার হাসি চেপে গম্ভীর ভঙ্গি নিলেন। “চুল পাকা আসলে বয়সের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।”
রোগী উসখুস করে উঠে বললেন, “ডাক্তার সাহেব, আপনি তো সবই বইয়ের কথা বললেন। কিন্তু আমার সমস্যা বইয়ের বাইরে। অফিসে বস বলছে—‘তুমি তো এখন সিনিয়র, অভিজ্ঞতা অনেক।’ অথচ আমি সিনিয়র হতে চাইনি। বাজারে গেলেই সবজি বিক্রেতা বলে—‘আসেন কাকা, তাজা বেগুন নেন।’ আমি তো কাকা নই, আমি ভাই!”
ডাক্তার এবার সত্যিই হো হো করে হেসে ফেললেন। “ভাই, এটা তো সম্মানের ব্যাপার।”
রোগী মলিন মুখে বললেন, “সম্মান নয় ডাক্তার সাহেব, এটা অবমাননা। আমার ছোট ছেলে বলছে—‘বাবা, তোমার মাথার চুলের রং আমার স্কুলের চকের মতো।’ আপনি নিজেই বলুন, আমি কি হাঁটতে হাঁটতে বোর্ড লিখতে যাবো?”
এবার ডাক্তার ভুরু চুলকালেন। “চুল কালো রাখার অনেক উপায় আছে—হেয়ার কালার, তেল, প্যাক—”
রোগী তৎক্ষণাৎ বাধা দিলেন। “তেল-টেল সব চেষ্টা করেছি। মাথায় একবার এমন তেল দিলাম, গন্ধে পাড়া-প্রতিবেশীর বিড়ালগুলো সারারাত জানালার পাশে এসে গান গেয়েছে। কালার করলে আবার বউ সন্দেহ করে—‘কার জন্য এত সাজগোজ?’”
ডাক্তার চেয়ারে হেলান দিয়ে হাসলেন। “আচ্ছা, আপনি আসল সমস্যা বুঝতে পারছেন না। আপনার দুশ্চিন্তা চুল নয়, মানুষের দৃষ্টি।”
রোগী দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। “ডাক্তার সাহেব, বউ যখন বলে—‘তুমি তো এখন দাদুর মতো লাগো’ তখন দৃষ্টি তো কেবল নয়, হৃদপিণ্ডও কেঁপে ওঠে। শ্বশুরবাড়ির অনুষ্ঠানেও গেলাম একদিন, ভাতিজি আমাকে সবার সামনে বললো—‘কাকা, কবে অবসর নেবেন?’ আমার তো তখন অবসর নেয়ার বয়স না, অবসর নেয়ার মনও না!”
ডাক্তার এবার নোটপ্যাড খুললেন। “তাহলে প্রেসক্রিপশন দিচ্ছি।”
রোগী আগ্রহভরে এগিয়ে এলেন। “কি দেবেন ডাক্তার সাহেব? কোনো শক্তিশালী ভিটামিন? না কি হেয়ার টনিক?”
ডাক্তার গম্ভীর গলায় লিখলেন—“প্রথমত, প্রতিদিন সকালে আয়নায় তাকিয়ে জোরে বলবেন—‘আমার চুল পাকা, তাই আমি অভিজ্ঞ।’ দ্বিতীয়ত, যেখানেই যাবেন, নিজেকে বলবেন—‘এই রঙ হলো জ্ঞানের আলো।’ তৃতীয়ত, বউকে বলবেন—‘তুমি তো সৌন্দর্যে রূপকথা, আমি তাই পাকা চুলে মহাকাব্য।’”
রোগী অবাক হয়ে গেলেন। “ডাক্তার সাহেব, এ কি প্রেসক্রিপশন হলো?”
ডাক্তার মুচকি হেসে বললেন, “ভাই, আপনার সমস্যার ওষুধ ফার্মেসিতে পাওয়া যাবে না। এটা মানসিক প্রেসক্রিপশন। মনে রাখবেন, কালো চুলে দুনিয়া ভরে গেছে, কিন্তু পাকা চুলের ভেতরেই আসল সম্মান।”
রোগী একচোখে তাকালেন। “মানে আমি সম্মানজনক দেখাচ্ছি?”
ডাক্তার হেসে মাথা নেড়ে বললেন, “অবশ্যই। আপনি এখন হাঁটলে সবাই বলবে—‘ওই যে জ্ঞানী মানুষটা যাচ্ছে।’”
রোগীর মুখে তখন আলোকিত হাসি ফুটে উঠলো। যেন চুলের রংও হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে গেছে। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ডাক্তার সাহেব, আপনার প্রেসক্রিপশন আমার জীবনটাই পাল্টে দিলো। আজ থেকে আমি আর চুল নিয়ে দুশ্চিন্তা করবো না। বরং বলবো—চুল পেকেছে মানে আমি জীবনের বসন্ত থেকে শরতের কবিতা লিখছি।”
ডাক্তারও হেসে বললেন, “সেটাই আসল কথা। জীবন হলো রঙ বদলের খেলা। আপনার চুল সাদা হয়ে গেছে মানেই আপনি হেরে গেছেন না, বরং আপনি আলোকিত হয়েছেন।”
রোগী বেরিয়ে গেলেন হালকা মনের হাসি নিয়ে। পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চুলে হাত বুলালেন। মনে হলো, চুল আর পাকা নয়, বরং জ্ঞান-অভিজ্ঞতার সাদা মুকুট।
এভাবেই চুলের দুশ্চিন্তার গল্প হয়ে গেলো হাসির রংয়ে ভরপুর জীবনের নতুন অধ্যায়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now