বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ ।
সকালের রোদটা তখনও নরম। কাগজে চা পড়ছিলো না ঠিকই, কিন্তু চায়ের কাপে ভিজে যাচ্ছিলো আমার ভেতর। সরকারি অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিলো—আজ একটু মজা করা যায়। গায়ে একটা পুরাতন শার্ট, হাতায় দু-একটা সুতো ঝুলছে। অফিসে ঢুকেই টুক করে বলে দিলাম—
“সরকারি চাকরিজীবীদের তো সারা বছরই বসন্তকাল!”
বসন্তকালের উপমা শুনেই সাহেব এমন চমকালেন, যেন হঠাৎ বসন্তের ফুল নয়, বরং কাশবনের আগুন দেখেছেন। গোঁফের ডগা কেঁপে উঠলো।
“মিয়া, ইয়ার্কি করেন? ঘরে শান্তি নাই, বাহিরেও শান্তি নাই!”
আমি মুচকি হেসে বললাম—“কেন ভাই, মিথ্যা কিছু বললাম নাকি?”
তিনি চেয়ারে ভর দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। “মিথ্যা বলবেন কেন? আপনারা যা বলেন তাই তো বাণি। কিন্তু ভাই, শান্তি বলে কিছু নাই। ঘরে যুদ্ধে নামি প্রতিদিন।”
আমি চোখ কপালে তুলে বললাম—“মানে! ভাবির সাথে যুদ্ধ?”
তিনি এমন ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বললেন, যেন যুদ্ধটা ওয়াটারলু আর তিনি নেপোলিয়ন—কিন্তু প্রতি রাতে হারেন।
“ভাই, যে বেতনটা পাই, তিন সপ্তাহও টেকে না। বউ মুখ কুঁচকে তাকায়—‘এটাই কি তোমার সরকারি চাকরি?’ পাশের বাসায় ভূমি অফিসের পিয়ন, সে নিজের জায়গা কিনে দুইতলা বিল্ডিং তুলেছে। আরেকজন গ্যাস অফিসে কাজ করে—তার বাজার খরচ দেখে মনে হয়, আমি যেন পুরোনো নাটকের কৃপণ চরিত্র।”
আমি ঠাট্টা করে বললাম—“তা হলে তো আপনার বাসাতেই বসন্তকাল, ভাই। গ্যাস অফিসারের বাসায় খাবারের বসন্ত, আর আপনার বাসায় ঝগড়ার বসন্ত!”
তিনি চোখ রাঙিয়ে বললেন—“ভাই, মশকরা করছেন কেন? বউ প্রতিদিন বলাবলি করে—‘তুমি কী চাকরি করো আর ওরা কী চাকরি করে!’ যতই বোঝাই, বুঝে না। মাঝে মাঝে তো হাত তুলতে উদ্যত হয়!”
আমি হা হা করে হেসে উঠলাম। “ভাই, আপনার মেজাজ গরম হওয়ার কারণটা এখন বুঝতে পারছি। কিন্তু একটা কথা বলেন তো, আপনার মনে কি শান্তি আছে?”
তিনি টেবিলে কলম ঠুকতে ঠুকতে বললেন—“শান্তি? শান্তি হলো কুমীরের অশ্রুর মতো—দূর থেকে দেখা যায়, কাছে গেলে কামড়ায়। বউ তো বলে, ‘আমাদের বাসায় তো কোনদিন ভাবিদের আড্ডা হয় না, আমার প্রেস্টিজ হ্যাম্পার হয়।’ ভাবিদের আড্ডা যদি যুদ্ধক্ষেত্র হয়, তবে আমি প্রতিদিন বন্দী!”
আমি আবার মজা করে বললাম—“ভাই, আড্ডা না হলে তো আর পৃথিবী ভেঙে পড়বে না। আপনার বউকে বলেন, আপনার বাসায় আড্ডা হলে বিদ্যুৎ বিল তিনগুণ বাড়বে, চা-বিস্কুট খরচে বাজার ফাঁকা হয়ে যাবে। তখন উনি নিজেই আড্ডার দরজা বন্ধ করে দেবেন।”
তিনি একটু চুপ করে তাকালেন, যেন আমি ত্রাণের ট্রাক এনে দিলাম। “ভাই, সত্যি বলেন, আমার বাসায় একদিন ভাবিদের ডাকলে কেমন হয়?”
আমি হাসতে হাসতে বললাম—“ডাকেন না কেন! তবে শর্ত আছে। ভেতরে গরুর মাংসের তরকারি, বাইরের টেবিলে পোলাও—কিন্তু সবার আগে নিজের বউকে ‘মুখ্য ভাবি’ ঘোষণা দেন। তাহলেই উনি খুশি, আর আপনার শান্তি। সস্তায় শান্তি চান তো এমন ডিপ্লোমেসি ছাড়া উপায় নাই।”
তিনি মাথা চুলকে বললেন—“তা হলে কি শান্তি আসবে?”
আমি গম্ভীর ভঙ্গিতে বললাম—“অবশ্যই। মনে রাখবেন, শান্তি মানে খরচ না কমানো—বরং কৌশলে বউয়ের হাসি বের করা। সরকারি চাকরি মানেই বসন্তকাল নয় ভাই, তবে বুদ্ধি খাটালে শীতকালে-ও আম ফুল ফোটানো যায়।”
আমার কথায় তিনি একটু গলে গেলেন। হঠাৎ চায়ের পিয়ালাটা হাতে তুলে নিয়ে বললেন—“ভাই, আপনার কথায় তো মনে হচ্ছে আপনি অফিসার নন, বরং ঘরোয়া মন্ত্রকালের উপদেষ্টা।”
আমি হেসে উত্তর দিলাম—“ঠিক ধরেছেন। আমি মানুষের মনে বসন্ত খুঁজে বের করি। বউয়ের সাথে যুদ্ধ করার চেয়ে, তাকে আড্ডার রানি বানিয়ে দিলে জীবনটাই পিকনিক।”
তিনি মাথা নেড়ে হাসলেন। “আচ্ছা ভাই, আজকে রাতে বউকে বলবো—কাল ভাবিদের ডাকবো আড্ডায়। দেখি বউ খুশি হয় কিনা।”
আমি মজা করে যোগ করলাম—“কিন্তু ভাই, আগে বাজারটা করবেন। না হলে বউ বলবে—‘ভাবিদের ডেকেছো, কিন্তু টেবিলে খাবার নাই, এ আবার কেমন আড্ডা!’ তখন আবার যুদ্ধ শুরু হবে।”
তিনি হঠাৎ টেবিল চাপড়ে হেসে উঠলেন। চারপাশের লোকজন অবাক হয়ে তাকালো। মনে হলো, দীর্ঘদিন পর অফিসের বাতাসে একটুখানি বসন্ত ঢুকে পড়েছে।
আর আমি মনে মনে বললাম—সরকারি চাকরিজীবীদের বসন্তকাল আসলে বেতনে নয়, বরং বুদ্ধিতে লুকানো। বউয়ের মুখের হাসিই হচ্ছে প্রকৃত বসন্ত, আর সেই হাসি তুলতে পারলেই শান্তি—যুদ্ধ নয়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now