বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
কোর্টঘরে সেদিন গমগমে ভিড়। যেন নাটকের মঞ্চ, সবাই অপেক্ষা করছে হাস্যকর ট্র্যাজেডি আর ট্র্যাজিক হাসির খেলা দেখার জন্য। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে গোপালগঞ্জের বিখ্যাত ‘চোর মজনু’। তবে গ্রামের মানুষ তাকে কেবল চোর বলেই ডাকে না; তার উপাধি আরও জমকালো—“বুদ্ধিমান চোর”। কারণ সে যখনই ধরা পড়ে, তখনই এমন সব যুক্তি দেখায় যে বিচারক থেকে শুরু করে দারোয়ান পর্যন্ত মাথা চুলকাতে থাকে।
সেদিনও তেমনই এক মামলা। বাজারের প্রসিদ্ধ দোকানদার কালাম মিয়ার দোকান থেকে দামি ঘড়ি উধাও হয়েছে। সাক্ষী আছে পাঁচজন, প্রত্যেকে হাত নেড়ে বলছে—“আমরা নিজের চোখে দেখেছি, মজনুই ঘড়িটা নিয়ে পালিয়েছে।”
অন্যদিকে উকিল সাহেব ছিলেন ঢাকার নামকরা, তবে নামকরা বললেই ভুল হবে, গ্রামের চোখে তিনি ছিলেন ‘চশমাধারী মহাশয়’। গলার সুরে দারুণ নাটকীয়তা, যেন মঞ্চের অভিনেতা। তিনি গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন,
“মজনু, তুমি বলছ তুমি নির্দোষ, অথচ পাঁচজন সাক্ষী বলছে, তারা তোমাকে দোকান থেকে ঘড়ি চুরি করতে দেখেছে। তুমি কী বলবে?”
মজনু বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে হাত কচলাতে কচলাতে বলল,
“হুজুর, আমি তো শুধু বলতেই পারব না, আমি এমন পাঁচশো জন সাক্ষী হাজির করতে পারব, যারা শপথ করে বলবে যে তারা আমাকে চুরি করতে দেখেনি।”
কোর্টঘরে এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা। তারপর হো হো করে হাসি ফেটে পড়ল। বিচারক কপালে হাত দিলেন, উকিল টেবিল চাপড়ে বসে পড়লেন, আর দর্শকরা মনে করল—এমন বুদ্ধির লড়াই তারা জীবনে দেখেনি।
কোর্টঘরের হাসির মাঝে বিচারক গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন,
“চুরি না করলে তো পাঁচশো লোক দেখবে না, সেটা স্বাভাবিক। আর দেখলেও তো দেখবে না। তা বলে কি সেটাই প্রমাণ?”
মজনু আবারও হাসল। তার চোখে যেন অদ্ভুত আলো।
“হুজুর, যদি পাঁচজনের দেখা সত্যি হয়, তাহলে পাঁচশো জনের না-দেখাও তো সত্যি হতে পারে! যদি দেখা গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে না-দেখাও গুরুত্বপূর্ণ। আমার দোষ বা নির্দোষ নির্ভর করছে ক’জন আমাকে খেয়াল করেছে তার ওপর, ক’জন করেনি তার ওপর নয় কেন?”
আবারও হাসির রোল উঠল। উকিল মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবলেন, এই আসামিকে বাঁচানো যাবে কিনা কে জানে! তবে লোকটা কথা বলে এমনভাবে, মনে হয় যেন দর্শনের ক্লাস চলছে।
বিচারক এবার হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন,
“ঠিক আছে, তুমি বলো, তুমি যদি ঘড়ি না চুরি করে থাকো, তাহলে কারা করল?”
মজনু ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে উত্তর দিল,
“হুজুর, আমি জানি না কে করেছে। তবে একটা কথা জানি—চোরের মনোভাব মানুষের মধ্যে তখনই জন্মায়, যখন সে ভাবে, তার হাসি–খুশি বা খাওয়ার দায়িত্ব কেউ নেবে না। আমি যদি সত্যিই চোর হতাম, তবে এতক্ষণে পালিয়ে যেতাম। কিন্তু আমি তো দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যেই প্রমাণ আছে।”
শুনে সবাই স্তম্ভিত। দোকানদার কালাম মিয়াও খানিকটা নরম হয়ে গেলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, যদি ছেলেটা সত্যিই নির্দোষ হয়, তবে অকারণে তাকে বিপদে ফেলা কি ঠিক হবে?
উকিল সুযোগ বুঝে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললেন,
“মহামান্য বিচারক, অপরাধ কখনোই একতরফা প্রমাণে নির্ধারিত হয় না। আমরা আজ দেখছি, অভিযোগ আছে পাঁচজনের, কিন্তু নির্দোষ প্রমাণে আছে পাঁচশো জনের সম্ভাবনা। এর মানে এই নয় যে সত্যিই সে চোর। বরং এর মানে হলো, মানুষের দোষ নির্ধারণে কেবল চোখের দেখা যথেষ্ট নয়, অন্তরের বিচারও প্রয়োজন।”
বিচারক এবার খানিকটা হাসলেন।
“তাহলে কী করবে আদালত? অভিযোগ আছে, যুক্তিও আছে। কিন্তু সমাধান?”
তখন মজনুই কথা বলল—
“হুজুর, আমি প্রমাণ দিতে পারি না, তবে আমি প্রতিশ্রুতি দিতে পারি। যদি আমি চোর হই, তাহলে আমাকে শাস্তি দিন। কিন্তু যদি আমি নির্দোষ হই, তাহলে আমাকে নতুন করে সুযোগ দিন কাজ করার, মানুষের উপকার করার। কারণ মানুষকে বিশ্বাস না করলে সমাজে শান্তি আসে না।”
এই সরল কথায় আদালত নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর বিচারক হাসিমুখে রায় দিলেন,
“অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হয়নি। তবে শর্ত হলো, মজনু আর কখনো বাজারে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি করবে না। বরং সে গ্রামের মানুষের কাজে সাহায্য করবে।”
বিচার শেষ হলো, মানুষ হাততালি দিল। কালাম মিয়া এগিয়ে এসে মজনুর কাঁধে হাত রাখলেন,
“যদি তুই চুরি না করে থাকিস, তবে তুই আমার দোকানে কাজ করবি। এভাবে তোদের মতো বুদ্ধিমান ছেলেকে অপচয় হতে দেওয়া যায় না।”
মজনুর চোখে জল চলে এলো। সে বলল,
“হুজুর, আমি আজীবন এই দোকানের পাহারাদার হয়ে থাকব। যাতে কোনোদিন আর কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ না ওঠে।”
গ্রামের মানুষ এরপর থেকে তাকে আর “চোর মজনু” ডাকত না। তার নতুন নাম হলো “সাক্ষীর দোকানের মজনু”—যে মানুষকে শিখিয়েছিল, শুধু অভিযোগ শুনে কাউকে বিচার করা যায় না। মানুষকে বিশ্বাস করতে হয়, সুযোগ দিতে হয়। আর সেই সুযোগই একদিন অপরাধীকে নাকি নির্দোষকে আলাদা করে দেয়।
এভাবেই হাসি আর রসিকতার মধ্য দিয়ে এক চোরাকাণ্ডের বিচার পরিণত হলো মানুষের প্রতি আস্থা, ক্ষমা আর মিলনের এক ইতিবাচক শিক্ষায়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now