বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সেই ভয়াল রাত

"রহস্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান নুর মোহাম্মদ (০ পয়েন্ট)

X নিঃশ্বাস নিতেও যেন ভয় হচ্ছে আমার। রাত গভীর হচ্ছে, আর আমার চারপাশে যেন জমাট বাঁধছে এক শীতল আতঙ্ক। সেই ২০১০ সালের কথা... ঢাকার তেজগাঁওয়ের পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, আমার নতুন ঠিকানা। প্রথম বর্ষের ছাত্র আমি, চোখে রঙিন স্বপ্ন আর বুকভরা উদ্দীপনা। কিন্তু কে জানতো, এই স্বপ্ননগরীই এক রাতে পরিণত হবে দুঃস্বপ্নের জনপদে? ছাত্রাবাসে সিট পাওয়া তখন সোনার হরিণ পাওয়ার মতো। রাজনীতির মারপ্যাঁচে নতুনদের জন্য জায়গা মেলা ভার। তবু এলাকার এক বড় ভাইয়ের তদবিরে পশ্চিম শাখার দোতলায় একটা সিট জুটেছিল আমার। রুমে ঢুকে দেখি, আমার রুমমেটরা সবাই সিনিয়র। তাদের গম্ভীর মুখ আর চাপা স্বভাব দেখে প্রথম থেকেই একটা অদৃশ্য দূরত্ব অনুভব করতাম। কোরবানির ঈদ সামনে আসতেই ছাত্রাবাস ফাঁকা হতে শুরু করল। মুসলিম ছাত্ররা যে যার বাড়ির পথে। রয়ে গেল শুধু কিছু অমুসলিম শিক্ষার্থী, আর আমি... সেই দুঃস্বপ্নের রাতের জন্য। নির্ধারিত ছুটি কাটিয়ে যখন ফিরলাম, সূর্য তখন ডুবুডুবু। সন্ধ্যার আবছা আলোয় ছাত্রাবাসের বিশাল কাঠামোটা যেন এক অশুভ ছায়া ফেলছিল। ভবনে ঢুকতেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। আমার ফ্লোর! সম্পূর্ণ ফাঁকা। বিশাল করিডোর জুড়ে দশটা রুম, আর শেষ মাথায় সাধারণ টয়লেট-বাথরুম। সবকটা দরজাই বন্ধ, কিন্তু কেমন যেন একটা নীরব আর্তনাদ ভেসে আসছিল। চারতলা ভবনের হাতেগোনা কয়েকটি রুমে টিমটিম করে আলো জ্বলছে, যেখানে ঈদের ছুটিতে বাড়ি না যাওয়া দু-একজন অমুসলিম শিক্ষার্থী হয়তো আছে। কিন্তু আমার ফ্লোর... একেবারেই জনশূন্য। রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে, কোনোমতে রাতের খাবারটা গিললাম। প্রতিটা গ্রাসে যেন একটা অজানা অস্বস্তি। মোবাইলে গান শুনতে শুনতে ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিলাম। রুমে কেউ নেই, নিজের মতো আরাম করে ঘুমানো যাবে ভেবে ফ্যানের নিচে তোশক পেতে শুয়ে পড়লাম। বাতি নিভিয়ে কানে হেডফোন গুঁজে চোখ বুজলাম। ঘুমের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ধীরে ধীরে শরীরটা শিথিল হয়ে আসছিল। ঠিক তখনই, কানের পাশ দিয়ে যেন এক খচখচ শব্দ ভেসে এল। গানের সুরের মধ্যেও সেই বিচিত্র শব্দটা বড় বেমানান লাগল। বিরক্ত হয়ে হেডফোন খুলে ফেললাম। চারপাশ নিস্তব্ধ। ঘড়িতে তখন প্রায় রাত বারোটা। হয়তো মনের ভুল ভেবে আবার শুয়ে গান শুনতে শুরু করলাম। কিন্তু ভুল ছিল না। এবার আরও স্পষ্ট, আরও তীক্ষ্ণভাবে কানে এল—কেউ যেন ফিসফিস করে আমার নাম ধরে ডাকছে! বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। লাফিয়ে উঠে বসলাম। গাঢ় অন্ধকারেও যেন অনুভব করতে পারছিলাম আমার দ্রুত স্পন্দিত হৃদপিণ্ডের প্রতিটি ধ্বনি। কে ডাকছে আমাকে এত রাতে? এই ফ্লোরে তো আমি ছাড়া আর কেউ নেই! ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে দরজা খুলে করিডোরে উঁকি দিলাম। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার! কেউ নেই। শুধু দীর্ঘ করিডোরের শেষ প্রান্তটা যেন এক অতল গহ্বরে মিশে গেছে। দ্রুত দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম, কিন্তু ততক্ষণে ভয়ের শীতল স্পর্শ আমার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে গেছে। ভয় আর অস্বস্তির মাঝেই প্রকৃতির ডাক এল। যেতেই হবে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে সাবধানে করিডোর ধরে টয়লেটের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বুকের ধুকপুকানিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। টয়লেটের কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়ল এক ছায়ামূর্তি! টলমল পায়ে যেন টয়লেটের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। আমি স্তম্ভিত! কে এটা? এই মুহূর্তে? নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম—চোখের ভুল, হয়তো কোনো রাতের প্রহরী বা পাশের ফ্লোরের কোনো ছাত্র। পাত্তা না দিয়ে আমিও ভেতরে ঢুকলাম। কাজ শেষে কল ছাড়তেই কানে এল পাশের টয়লেট থেকেও পানি পড়ার শব্দ। আমি কল বন্ধ করতেই ওদিক থেকেও শব্দ থেমে যায়। আমার হাতের কল থেকে পানি পড়ছে, আর পাশের টয়লেট থেকেও সেই একই ছন্দে পানি পড়ার শব্দ! আমার হাত থেমে যেতেই ওখানেও নিরবতা। এ কী অলৌকিকতা! আমি আবার কল খুললে সেখানেও শব্দ শুরু। এভাবে বারবার কয়েকবার হলো। ভয়ে আমার প্যান্ট ভেজার অবস্থা! হঠাৎ মাথায় বিদ্যুৎ চমকের মতো খেলে গেল—এই ফ্লোরে তো আমি ছাড়া আর কেউই নেই! তাহলে পাশের টয়লেটে কে? এই প্রশ্নটা মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে শুরু করল। ভয়ে শরীর জমে পাথর হয়ে গেল। বুক ধড়ফড় করছে, পা দুটো যেন শিকলে বাঁধা! দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার। অনেক সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে এলাম। করিডোর তখনও গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। কিন্তু যা দেখলাম, তা দেখে আমার মুখের রক্ত শুকিয়ে গেল। সব টয়লেটের দরজা হাট করে খোলা! ভেতরে কেউ নেই। এক বিন্দুও জল পড়েনি কোথাও। কিন্তু আমি স্পষ্টই শুনেছি পাশের টয়লেট থেকে পানি পড়ার শব্দ... কিভাবে সম্ভব? আমার শরীরের রক্ত যেন হিম হয়ে গেছে। প্রতিটি লোমকূপ যেন দাঁড়িয়ে গেছে। পা দুটো যেন অবশ হয়ে গেছে ভয়ে। কেমন করে যেন আমার পা ছুটল রুমের দিকে। টয়লেট থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে শরীরে এক ঝাপটা গরম হাওয়া লাগল। মনে হলো কেউ যেন ছুঁয়ে গেল আমার পিছনটা। সেই মুহূর্তে আমার দম ফুরিয়ে আসছিল। দৌড়ে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলাম। বুকের ভেতরটা যেন আছড়ে পড়ছে পাঁজরের দেওয়ালে। বিছানায় বসে হার্টবিট টের পাচ্ছি—মনে হচ্ছে বুক ফেটে বেরিয়ে আসবে। আয়াতুল কুরসি পড়তে চাইছিলাম, কিন্তু ভয়ে মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হচ্ছিল না। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করে আস্তে আস্তে পড়তে শুরু করলাম। অদ্ভুত এক শান্তি নেমে এল মনে। ভয়টা কিছুটা কমল। কিন্তু তখনই আবার শিহরণ! খালি পায়ে কারও হাঁটার শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দটা কখনো রুমের ভেতর থেকে, কখনো করিডোর থেকে আসছে বলে মনে হচ্ছিল। আমার সারা শরীর যেন কাঁটা দিচ্ছিল! ভয়ে জমে গিয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলাম—নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ছাড়া আর কাউকে দেখলাম না। তবুও সেই শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল কেউ যেন আমার রুমের ভেতরেই পায়চারি করছে! আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। রাত গড়াতে গড়াতে আমি শুধু দোয়া পড়েই যাচ্ছিলাম। আমার প্রতিটি সেকেন্ড কাটছিল মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতে। একসময় ফজরের আজান ভেসে এলো। সেই মধুর ধ্বনি কানে পৌঁছাতেই মনে হলো বুকের ওপর থেকে একটা বিশাল পাথর নেমে গেল। চারপাশ শান্ত হয়ে গেল, আমি কিছুটা হালকা অনুভব করলাম। ভোরের আলো যেন আমার জন্য নতুন জীবন নিয়ে এল। ভোর হয়ে আসতেই সিদ্ধান্ত নিলাম—আজই বাড়ি ফিরব। এই নরকে আর এক মুহূর্তও নয়। সকাল সাতটার বাস ধরলাম। যখন ব্যাগ হাতে ছাত্রাবাস থেকে বের হচ্ছিলাম, দারোয়ান মামা অবাক হয়ে বলল— “মামা, গতকালই তো বাড়ি থেকে ফিরলেন! আবার এত সকালে ব্যাগ নিয়ে কোথায়?” আমার মুখে তখন এক ফ্যাকাশে হাসি। মিথ্যা বলতে হলো— “চাচার বাসায় যাচ্ছি মামা, রুমে একা একা ভালো লাগছে না। সবাই এলে ফিরব।” মামা কিছু না বুঝে চুপ করে গেল। আর আমি ব্যাগ হাতে ছাত্রাবাস ছেড়ে বের হয়ে গেলাম—এক অজানা ভয়াল রাতের অভিজ্ঞতা বুকে নিয়ে। সেই রাতের স্মৃতি আজও আমার বুক কাঁপায়। আজও আমি একা ঘুমাতে ভয় পাই। সেই ভয়াল রাতের প্রতিটি মুহূর্ত যেন আমার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে গেছে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ভয়াল সেই রাত

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now