বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

হারানো চিঠির পুনর্জন্ম

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। নানিয়ারচরের বিকেলগুলো এক অদ্ভুত শান্তি মাখা। পাহাড়ের কোলে লাল-সবুজের খেলা, বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে আসা হাওয়ার মৃদু সুর, আর দূরে পাহাড়ি মেয়েদের গলার হাসি—সবকিছু মিলেমিশে যেন অন্য এক জগৎ তৈরি করে। মোহাম্মদ শাহজামান শুভ এবার সরকারি একটি প্রজেক্টের কাজে এখানে এসেছেন। স্থানীয় ডাকবাংলোতে তার থাকার ব্যবস্থা। দিনের ব্যস্ততা শেষে বিকেলের আকাশ যখন মেঘে-সূর্যের আঁকিবুঁকি আঁকছিল, তখন কেয়ারটেকার এসে খবর দিলো— “স্যার, একজন ম্যাডাম আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন।” শুভ খানিকটা অবাক হয়ে বললেন, “কে? নামটা জানলেন?” কেয়ারটেকার হেসে বলল, “উনি এখানকার বড় স্কুলের শিক্ষিকা। স্থানীয়ভাবে খুব সম্মানিত।” শুভ একটু ভেবে বললেন, “তাহলে ওনাকে ড্রইং রুমে বসান।” কিছুক্ষণ পরেই দরজায় মৃদু টোকা। ভেতরে ঢুকলেন এক মার্জিত নারী। কাঁধে শাড়ির আঁচল, মুখে মৃদু হাসি, চোখে অদ্ভুত শান্তি। তিনি ভেতরে ঢুকেই সালাম দিলেন— “আসসালামু আলাইকুম।” শুভ উত্তর দিলেন, “ওয়ালাইকুম সালাম। আমি মোহাম্মদ শাহজামান শুভ, প্রজেক্ট পরিচালক।” নারীটি নিজের পরিচয় দিলেন— “আমি মিনু চাকমা, সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষিকা।” শুভর ভেতরে যেন হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলক খেলে গেল। বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন— “মিনু চাকমা! আপনি কি তিন্নি নামে কাউকে চেনেন?” নারীটি হেসে উত্তর দিলেন, “স্যার, আমার নামই মিনু চাকমা তিন্নি।” শুভ চমকে উঠলেন। কণ্ঠ কেঁপে গেল, “বলেন কী! তাহলে আপনি কি সৈকত নামে কাউকে চিনেন?” মিনুর চোখে হালকা বিস্ময় ও স্মৃতির ছায়া। “জি, কলেজ লাইফে একটা পত্র-মিতালী বন্ধু ছিল। একসময় নিয়মিত চিঠি লিখতাম, গল্প করতাম। তারপর… হঠাৎ হারিয়ে গেল। এখন সবই অতীত।” শুভর গলা ভারী হয়ে এল। “আপনাদের বন্ধুত্ব এখনো আছে?” “না, নাই। মোবাইল যুগ আসার আগেই সব হারিয়ে গেছে। জীবন, পড়াশোনা, সংসার—সবকিছুতেই ব্যস্ত হয়ে গেছি। সেও আর আমার খোঁজ নেয়নি। আমি-ও খুঁজিনি। প্রায় দুই যুগ হয়ে গেছে।” তারপর মিনু নিজের স্বর বদলালেন। “স্যার, আমি আসলে আপনার খোঁজখবর নিতে এসেছি। আপনি তো আমাদের এলাকার অতিথি। কোনো কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে বলবেন। বিশেষ করে এখানে কোনো তথ্য দরকার হলে বা ল্যাপটপ ব্যবহারের প্রয়োজনে।” শুভর বুকের ভেতর তখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। চোখে ভাসছে একের পর এক হারানো চিঠি। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “ম্যাম… আমি-ই আপনার সৈকত।” শব্দগুলো যেন ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো। মিনু এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলেন। চেয়ারের হাতল চেপে ধরলেন শক্ত করে। যেন অতীত হঠাৎ করেই সামনে ফিরে এসেছে। শুভ আবার বললেন— “আমি আপনাকে অনেক খুঁজেছি। পত্রের পর পত্র লিখেছি। কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি। একসময় হতাশ হয়ে ভেবেছিলাম— হয়তো চিঠিগুলো পৌঁছায়নি। হয়তো আপনার জীবনে আমি তুচ্ছই ছিলাম। তাই ব্যর্থ প্রেমিকের মতো একা থেকে গেছি। এরপর প্রবাসে চলে গেলাম, জীবনও ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু মনের ভেতর আপনাকে খোঁজার আগুন কখনো নিভেনি।” মিনুর চোখ ভিজে উঠেছে। “সৈকত! তুমি? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি-ই আর চাওনি আমার সাথে সম্পর্ক রাখতে। একসময় ডাকপিয়ন নিয়মিত আসত, পরে আর এল না। অনেকবার ভেবেছিলাম লিখব, কিন্তু কেমন যেন অপরাধবোধে লিখতে পারিনি। নতুন যুগে মোবাইল এল, ইন্টারনেট এল, অথচ আমাদের চিঠির পৃথিবী হারিয়ে গেল।” শুভ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “জানো তিন্নি, আমি কখনোই চাইনি আমাদের সম্পর্ক হারিয়ে যাক। প্রতিটি চিঠি ছিল আমার জীবনের কবিতা। তোমার হাতের লেখা আমার কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। কিন্তু নিয়তি হয়তো আমাদের সাথে নিষ্ঠুর খেলা খেলেছে।” মিনু মৃদু হেসে বললেন— “শুভ, জীবন সবসময় কবিতার মতো হয় না। কলেজ শেষ হওয়ার পর সংসারের দায়ভার, দায়িত্ব, সময়ের হিসাব—সবকিছু আমাকে গিলে ফেলেছিল। তবুও স্বপ্ন দেখতাম—যদি একদিন দেখা হয়, যদি একদিন আবার সেই চিঠির কথা ওঠে…” ঘরে তখন নীরবতা। শুধু বাইরের গাছে বসা পাখির ডাক, দূরে বাজছে বাঁশি। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসছে ধীরে ধীরে। শুভর কণ্ঠ নরম হয়ে এলো— “তাহলে আজই তো সেই দিন, তিন্নি। আজ আমরা আবার ফিরে পেয়েছি সেই হারানো চিঠির পৃথিবী। শুধু কাগজ নেই, খামের ডাকটিকিট নেই—আছে শুধু তুমি আর আমি।” মিনু চোখ মুছে হাসলেন। “হ্যাঁ, সৈকত। হয়তো সময় আমাদের কেড়ে নিয়েছে দুই যুগ, কিন্তু মুছে ফেলতে পারেনি অনুভূতি। আজ মনে হচ্ছে, প্রতিটি হারানো চিঠি আবার খাম ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে।” সন্ধ্যার অন্ধকারে ডাকবাংলোর বাতিগুলো জ্বলে উঠল। আলো-আঁধারির খেলা যেন প্রতীক হয়ে দাঁড়াল—অতীতের অন্ধকার থেকে বর্তমানের আলোয় ফেরা। এমন এক বিকেলে, পাহাড়ের কোলে, দুই পুরনো আত্মা আবার খুঁজে পেল একে অপরকে। হারানো চিঠির পুনর্জন্ম হলো নানিয়ারচরের ডাকবাংলোর ড্রইং রুমে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৭২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now