বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ১০

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ১০ চারিদিকে থমথমে অন্ধকার, এতটাই অন্ধকার যে সামনের পা ফেলার জায়গাটাও দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকারের এ ভয়ংকর রূপ সে জীবনে আর কোন দিন দেখে নাই। অন্ধকার যেন পৃথিবীর সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলছে। এমন অন্ধধকারে পৃথিবীর সব কিছুকে পিছনে ফেলে চিরকালের অজানা, অচেনা, স্বপ্নের নীড়ে অর্বাচিন এক যুবকের হাত ধরে সে ভেসে চলেছে অনন্ত কালের জন্য, সৌভাগ্য প্রসূত আলোর সন্ধানে। নাহিদের কাঁধের উপর ভরকরে সে পার হচ্ছে একের পর এক বিস্তৃত মাঠ, আলের পর আল। সামনে দৃষ্টি, পিছনে তার ভাগ্য, কোন অনিশ্চয়তার ঐন্দ্রজালিক মায়াবুহো ভেদ করে, যৌবনের উচ্ছ¡সিত আবেগে, অনন্ত তৃষ্ণায় সে কোথায় ছুটে চলেছে, গন্তব্যের অজানা পথে। পাশের জঙ্গলে কয়েকটা শিয়াল একসাথে হুক্কা-হুয়া করে ডেকে ওঠে, অমনি তার বুকের ভিতরটা অজানা আতঙ্কে থরথর করে কেঁপে উঠে। আর কতদূর, তারা এখন কোথায় আছে বুঝে উঠারও উপায় নেই। আনমনে এসব কথা ভাবতে ভাবতে আবেগ প্রবণ হয়ে পড়ে কমলা, তার দ’ুচোখ দিয়ে গড়িয়ে কয়েক ফোটা অশ্রæ। কিন্তু সে নিজেও জানে না, সে অশ্রæ আনন্দের না বিষাদের, হতাশার না পূর্ণতার। কোনটা বাঞ্চিত আর কোনটা অবাঞ্চিত সেটা নির্ণয় করতে, সবকিছু উল্টে পাল্টে অগ্নি পরীক্ষার মধ্যদিয়ে নিজের অস্তিত্ব আর নাহিদের ভাগ্যকে এক করে হৃদয়ের ভিতর লালন পালন করে আস্তে আস্তে বড় করে তোলে এবং সারা জীবনের জন্য আলত করে রাখে। আজ সে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভেলায় নিজেকে ভাসিয়ে, তার অন্তিম খড় কুটো হিসেবে নাহিদকে আঁকড়ে ধরে ঝড়ের বাতাসে ভেসে যাচ্ছে। নিস্তব্ধ চারিদিক কোথাও কোন পাখির ডাক নেই, ঝিঝি পোকার শব্দ নেই, মশাদের উৎপাত নেই, আকাশে চাঁদও নেই। বাড়ির মূল দরজা দিয়ে নাহিদের ঘরে প্রবেশ করা পর্যন্ত একটা কাক পক্ষিও টের পেল না। হারিকেনের নিভুনিভু আলোয় এতোক্ষণে তারা একে অপরকে দেখতে পেল। এত বাঁধা, এত চড়াই-উৎরাই, উত্থান পতন, এতো দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যখন একটা নিশ্চিত গন্তব্য স্থলে পৌছানো যায়, তখন অতীতের অনেক কিছুই একেবারে চাপা পড়ে যায়। মানুষের মনের মন্দিরে যে কক্ষ থাকে, যে কক্ষে সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্নার মাঝে যাকে স্থান দেয়া যায় কেবল সেই প্রেমের অদ্ভুত চিহ্ন রুপে বেঁচে থাকে। নাহিদ কমলাকে জড়িয়ে ধরে জানালার কাছে নিয়ে যায়। তার অতৃপ্ত নয়ন কমলার দুটি চোখের গভীরতম অতলে তন্ময় হয়ে অনেক্ষণ ধরে তাকিয়ে দেখে, তার স্বচ্ছ দুটি আঁখির মধ্যখানে কি মায়া লুকিয়ে আছে। মেঘলা রাতের অপরূপ আঁধারের মতো এলো কেশী চুল, শরীরের ভাঁজে লুকানো নদীর মতো বিস্তৃত যৌবন। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে নাহিদ বড়ভাবির কাছে যায়। নাহিদ ভাবিকে সব ঘটনা খুলে বলে। বড়ভাবি তাকে পরামর্শ দেয়-তোমরা দু’জনে মিলে মায়ের কাছে যেয়ে তার পা দু’খানা জড়িয়ে ধরবে, মাফ না করা পর্যন্ত পা ছাড়বে না। নাহিদ আর কমলা দু’জনে মিলে মায়ের কাছে গিয়ে তার দু’পা জড়িয়ে ধরল। নাহিদের মা মলাকে দেখে মনে মনে বলে- অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে, এমন মেয়ে তাদের গ্রামে একটিও নেই। তার অপদার্থ ছেলে এবার অন্তত একটি কাজ ভাল করেছে। নাহিদের মা মনে মনে খুশি হয়ে বলে-যাও মা ঘরোত যাও। বড় বউমা, ওমারগুলাক নাস্তা দিবার ব্যবস্থা কর। নাহিদ এতক্ষণে একটা স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে। কমলাকে জড়িয়ে ধরে বলে আরকোন ভয় নেই কমলা। নূরল মুন্সির বড়বোউ আম্বিয়া তার ছোট ছেলের চাঁন্দের মতোন বউ দেখে আহলাদে আটখানা হয়ে গোয়াল ঘর থেকে দু’টো বড় বড় ছাগল বেড় করে দেয় জবেহ করার জন্য। বড় ছেলে, মেজ ছেলে, তাদের বউ বাচ্চা সহ সবাই মিলে বেশ হৈ-হল্লোর করে বিয়ের পরিবেশে কমলাকে নিয়ে আনন্দ উল্লাস করে। বড় ছেলের মেয়ে ময়না খুব মিশুক টাইপের মেয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে কমলার সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলে তারা দু’জনে মিলে গল্প গুজবে সময় কাটায়। আম্বিয়া বলে-বড় ছেলেদের বিয়াতে পাড়া-পড়শিরা যেভাবে আনন্দ করেছে এবারও তাই হবে। সে বড় বোউমাকে ডেকে -পাড়ার মাহিলাদেরকে নিয়ে গায়ে হলুদের ব্যবস্থা করতে বলে । গাও-গ্রামের এ মানুষগুলো খুবই সহজ-সরল এবং আন্তরিক। সে ভালো হোক আর মন্দ হোক, আনন্দের হোক আর দুঃখ-কষ্টের হোক তাদের কানে শুধু একটা সংবাদ পৌছানো দরকার, তারা সবাই দল বেঁধে চলে আসে। মুহুর্তেও মধ্যেই বাড়ি ভর্তি হয়ে যায় পাড়ার সব গীদাল আর নাচনেওয়ালি মহিলা দিয়ে। তারা উরুণের ভেতর কাঁচা হলুদ দিয়ে গাইন দ্বারা পিষে। সবাই একটা করে গাইন হতে নিয়ে উরুণের চারিদিকে ঘোরে আর বিয়ের গান গায়। কাঁটা হলদি বাটোরে, ওইনা উরুণ-গাইনোত দিয়ারে, কইনা কান্দে ঘরোতে বসিয়ারে। হলুদ বাটা হয়ে গেলে বাড়ির উঠানে মাদুর বিছিয়ে আসন পেতে কমলা ও নাহিদের গায়ে হলুদ দেয়। নাহিদের মাকে ডেকে এনে প্রথমে তার দ্বারাই হলুদ দেওয়ার সূচনা করে তারপর সবাই তাদের চারিদিকে ঘোরে একটু করে হলুদ মাখায় আর গান গায়- বাড়ির শোভা ভাই বোনরে---ঘরের শোভা বেটি কইনার মাও কান্দেরে---ধরিয়া ঘরের খুঁটি----- আমতলায় ঝুমুর ঝুমুর --কলাতলায় বিয়া আইসেরে সুন্দরীর দামান মুকুট মাথায় দিয়া--- এরপর তারা নাহিদের বড়ভাই ও ভাবিকে টেনে আনে। তাদের দ্বারা কমলা ও নাহিদের গায়ে হলুদ দেয়। সম্পর্কে দাদি-নানি হয় এমন মহিলারা নাহিদের ভাই ভাবিকেও হলুদে মাখা-মাখি করে এবং তাদের হাত ধরে বর-কনে আসনের চারিদিকে ঘুরে আর নেচে নেচে গান গায়- কাঁচা হলদি আনিয়া-রে, উরুণ-গাইনে পিষিয়া-রে মাখো ওইনা কইনা-গাবরুর গায়োত-রে। কালা গাবরুর গায়োত-রে হলদি মাখো ঘষি-রে হলদি হলদি গোন্দায় সর্বো গায়ো-রে। এভাবে নাচে গানে গ্রামের রীতি অনুযায়ী বর ও কনের গায়ে হলুদ দেয়ার পর্ব শেষ হয়ে গেলে মসজিদের ইমামকে ডেকে ইসলামী শরিয়া মোতাবেক কলেমা, তওবা-ইস্তেগফার পড়িয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হয়। স্বল্প সময়ে ছোট পরিসরে হলেও খুব জাকজমকপূর্ণ অবস্থায় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হয়। এতো সব সামাজিক রীতি-নীতি ও ঝুটঝামেলার মধ্য দিয়ে সারাদিন চলে গেলে সন্ধ্যায় নিজের ঘওে যেয়ে কমলা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সুখ-দুঃখ-হাসি-কান্নার মাঝে অতীতের অনেক কিছুই চাপা পড়ে যায় কেবল বেঁচে থাকার একটা আস্থা তার বুকের ভেতর জেগে ওঠে। বেলালের বোউ গোলাপির মূল অভিযোগ হলো পাঁচ ছয় বছর হয়ে গেলো তাদের বিয়ে হওয়ার অথচ বেলাল এখন পর্যন্ত একটা সন্তান তার কোলে দিতে পারলো না। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে সংসারের কোন আয় উন্নতি চোখে পড়লো না। গোলাপি ধারণা বেলাল তাকে না জানিয়ে তার বাবা মাকে টাকা পয়সা দেয়। বেলালের টাকা পয়সা দিয়ে তার বাবা মায়ের সংসার চলে। এসব কথা মনে মনে ভাবে আর তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে গোলাপি। বিছানা ঠিকঠাক করে বালিশ হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে বলতে থাকে- কত্তোবড় শয়তান বুড়া, তিনকাল যেয়ে এক কালে পড়ছে তবুও শয়তানি ছাড়ে না। নিজের সংসার তো ধুয়ে-মুছে খেয়ে এখন আর এক জনার সংসার নিয়ে টানাটানি শুরু করছে। গোলাপি বলে শোনো মা, তোমার জামাই একটা ফুজকা শয়তান। আর তার বাপ হইল বুড়া শয়তান। মিনমিন করি কথা কয় আর মনোত যতো শয়তানী। ছিঃ গোলাপি, বুড়া মানসিটাক ক্যান অমোন করি কবার নাগচিস? কি হইছে তোর? এতো রাইতোত খালি চিল্লা-চিল্লি করির নাগচিস। মা তোমাতো কিছুই জানেন না। মোর মনে হয় তোমার জামাই আইজো বাড়ি গেইছে। সেই যে সকাল বেলা এ্যাকনা চা খ্যায়া বাইরোত গেইছে, সারাদিন তার কোন খবর নাই। জলিল কইল্ যে, সকালে নাকি তাকে পশ্চিম পার্শে যাবার দেখছে। তোমায় কন মা, অয় মোক না কয়া এমন চুপকরি প্রায় বাড়ি যায়, ধান চাউল ব্যাচে টাকা পাইসা বাড়িত য্যায়া ঐ বুড়া শয়তানটাক দিয়া আইসে। তাইতো কঁও মা, সংসারের আয় উন্নতি হইতেছে না ক্যান? হামার সংসারের আয় রোজগার দিয়া যে আর একটা সংসার চলে, সেটা মুই আগোত বুঝবার পাও নাই। মা, মুই আজি এ্যার একটা বিহিত করিই ছাড়িম, হয় তায় বাড়িত থাকিবে, না হয় য্যাটে মন চায় চলি যাবে। তুই মাথা খারাপ করিস না মা? রাইতটা পোহাবারদে মুই কাইল সকালে বেলালক ডাকেয়া সব কিছু আগে ভালো করি জানি নেঁও। আসল ঘটনাটা কি? মোরতো মনে হয়, এটা তোরই ভুল। বেলাল কিন্তু এমন মানসিয়ে নয়। তোমা কি পাগল হইছেন মা, তোমা জানিবার চাইলেন আর অয় তোমাক সুরসুর করি তামানগুলায় কয়া দেইল? আর ঐ বুড়া শয়তানটাই বা ক্যামন মানসি, ছেলের শ্বশুর বাড়ির টাকা-পাইসা নিয়া নিজের প্যাট ভরায়? বেলাল দোকন থেকে এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে তার বউয়ের সব কথা শুনছিল, তার শাশুরির অনুরোধ ফেলতে না পেরে আজ শশুর বাড়িতে ঘর জামাই হিসেবে দিন কাটে তার। জামাই হিসেবে কতটুকুই বা অধীকার নিয়ে জোর গলায় কথা বলতে পারে? সে ক্ষমতা কি কোন ঘর জামাইয়ের থাকে? তার জীবনে এমন করুণ পরিণতি নেমে আসবে সেটা ভীষণ কষ্টদায়ক। এতদিন গোলাপি তাকে অনেক অপমান করেছে। মান সম্মানের ভয়ে সে কোন দিন প্রতিবাদও করে নি। কিন্তু আজ তারা তার ফেরেস্তার মত নিস্পাপ মা বাবাকে অপমান করেছে। এর প্রতিবাদ না করলে তার পুরুষত্ব থাকে না। তাই সে ঘর থেকে বেড়িয়ে তার শাশুড়িকে বলে, আম্মাজান মুই এর আগেও কতদিন তোমাক কইছিনু এই পাঁচ ছয় বছরে মুই পাঁচ দিনও বাড়িত যাঁও নাই, আর এ সংসারের কোন দিনই চার আনা পাইসাও বাড়িতে দ্যাঁও নাই। মোর বুড়া মা-বাবা না খ্যায়া মরি গেইলেও কোন দিন কারো কাছে হাত পাতিবে না। বেলারে কথায় গোলাপির নেভা আগুন আরোও জ্বলে উঠে, দাঁত কটমট করে মারমুখী ভঙ্গিতে তার সামনে গিয়ে বলে- থাক ঐ বুড়ো শয়তানটার কথা তোমা আর কোন দিন মোর আগোত কবেন না। টাকাই যদি না নেয় তবে সেদিন বাড়ি পর্যন্ত আসিল ক্যান? আর তোমার সাথে দেখা করিই বা চলি গ্যালো ক্যান? গোলাপি উদ্ধতপূর্ণ ব্যবহারে বেলালের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। সে গোলাপির গালে একটা কষে থাপ্পর মেরে বলে যে,- এতদিন একই ঘরে, একই বিছানায়, একই সাথে থেকেও যে একে অপরকে চিনতে পারেনা, পরস্পরের মধ্যে বিশ্বাস জন্মে না, সেখানে আর যা হোক তার সাথে সংসার হয় না। তার বাড়িতে থেকে তারই খেয়ে আবার তারই গায়ে হাত তোলে এতো বড় সাহস বেলালের? গোলাপির মাথায় যেন আগুন ধরে যায়। সে পিছন থেকে অতর্কিত ভাবে বেলালকে জোরে একটা ধাক্কা দেয়। আকষ্মিক এমন অপ্রস্তুত ঘটনায় বেলাল নিজেকে সামলাতে না পেরে আঙ্গিনার মধ্যে উল্টে পড়ে যায়, সেই সাথে তার পড়নের লুঙ্গিও কোমড় পর্যন্ত উঠে আসে। বেলালের এ অবস্থা দেখে তার শাশুরি মা আঁচল দিয়ে চোখ-মুখ ঢেকে ঘরে চলে যায়। গোলাপির এমন উদ্ধতপূর্ণ ব্যবহার, এমন লজ্জা, ঘৃণা আর অপমান সইতে না পেরে বেলাল রাতের অন্ধকারেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বেলাল ভাবে- একদিন তার ওস্তাদ ধলামিয়া বলেছিল, যারা ঘরজামাই থাকে তাদের এক পা নাকি বেঁচে থাকতেই কবরে চলে যায়। অন্যের গলগ্রহ হয়ে সেখানে বেঁচে থাকতে হয় অনেকটা পরগাছার মতো। তার কোন নিজেস্ব স্বাধীনতা থাকে না, মতামতের দাম থাকে না। শুরুতে এমনটা না হলেও যতোদিন যায়, বেলাল তা হাড়ে হাড়ে টের পায়। আজকের এ জঘন্য ঘটনাটা যে শুধু আজকেই প্রথম ঘটে তা নয়। এর আগেও বহুবার এমন ছোট খাট বিয়য় নিয়ে গোলাপির সাথে তার ঝগড়া ঝাটি হয়েছে, কথা কাটাকাটি হয়েছে, মনমালিন্য হয়েছে, রাতে শোয়ার বিছানা আলাদা হয়েছে। তবে বেলাল সেটাকে জীবনের অংশ হিসেবে, সংসারের ধর্ম হিসেবে ধরে নিয়েলিছ, খুব এটা পাত্তা দেয়নি। কিন্তু আজকে যা ঘটে গেল তা রীতিমত সীমা লঙ্ঘনের মতো একটা জঘন্য ঘটনা। ঘরের বউ হয়ে স্বামীর গায়ে হাত তোলা? এর চেয়ে বড় অপরাধ পৃথিবীতে আর কিই বা থাকতে পারে? এখন বড় বিষয় হলো, এতো রাতে সে যাবে কোথায়? বাড়িতে গেলে তার এ অবস্থা দেখে বাবা-মা ভীষণ কষ্ট পাবে, না বাড়িতে যাওয়া যাবে না। তাহলে সে যাবে কোথায়? বিপদে পড়লে মানুষের হিতাহিত কোন জ্ঞান থাকে না। তখন অতিরিক্ত চাপে মাথার ¯œায়ুগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ঠিকমত কাজ করতে পারেনা, ফলে সব এলোমেলো হয়ে যায়। বেলালের ক্ষেত্রেও তাই হলো। বেলার কোন কিছু কূলকিণারা না পেয়ে রাস্তার পাশে একটা গাছের নিয়ে বসে পড়ে তারপর লুঙ্গির গিঠ থেকে একটা বিড়ি বের করে আগুন ধরিয়ে পরপর কয়েকটা টান দেয়, বিড়ির সেই ধোঁয়াগুলো খালিপেটের ভেতরে ঢুকে যেন কিছু একটা খুঁজতে থাকে। হালকা নেশায় এবার মাথাটা একটু ঝিমঝিম করে ওঠে। হঠাৎ তার মনে পরে যায় ওস্তাদ ধলা বয়াতি ও নিতাই বাউলের কথা, গতকাল তাকে আশ্রমে রেখে এসেছে। আপাতত সেখানে যেয়ে রাতটা থাকা যাক, কালকে না হয় একটা কিছু ভাবা যাবে। কিন্তু এখন তার উঠতে ইচ্ছে করছে না। র্দীঘ দিনের একটা বন্ধন যেখানে কতো মুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার স্মৃতি, সব কিছুকে পিছনে ফেলে সামনে আগাতে চায় না মন। এ জাগতিক সংসার বড় কঠিন জায়গা, মানুষের মনটা আরও বেশী কঠিন, আরও বেশী জঠিল। বছরের পর বছর একই ঘরে, একই ছাদের তলে বসবাস করে কেউ কাউকে চিনতে পারে না। অথচ আকাশের বুকে কতো মেঘ বাতাসে নেচে বেড়ায়, সেটাও ক্ষণিকের দাপা-দাপি, ক্ষণকালের জন্য। আয়ু শেষে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। দিনের আলো, সেও স্থায়ী নয় সময় ফুরিয়ে গেলে আঁধারে মিশে যায়। নদী যৌবনে বান ডাকে, কুল ভেঙ্গে একাকার করে ফেলে, খরার টানে আবার শুকিয়ে যায়। কতো বৃক্ষ একশ’বছর, দুইশ’বছরও বাঁচে কিন্তু তার পড়েও তাকে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়। কেউ বাঁচে না, কেউ চিরদিন থাকে না। হাতের কাছে তার বাঁশিটা পড়ে আছে, তুলে নিয়ে পড়নের লুঙ্গি দিয়ে ভালো করে মুছে তাতে ফুঁ দেয়। অনেক দিনের ভুলে যাওয়া একটি গান অযাচিতভাবে বাঁশির ভেতর সুর হয়ে আসে। অমনি তার দু’চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে দু’ফেটা গরম অশ্রæ। আর কালবিলম্ব না করে সে লম্বা লম্বা পায়ে হাঁটতে শুরু করে সোজা সুজি আশ্রমের দিকে। বৈশাখ মাসের আকাশ, পñিম দিকে জমে আছে ঘণ কালো মেঘ, মাঝে মাঝে আকাশে বিদ্যুতও চমকাচ্ছে, হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে ঝড়ও এসে যাবে। বিপদের রাস্তা অনেক লম্বা হয়, যেন ফুরাতেই চায় না। ছন্দহীন জীবনে আবেগের আধিক্যপ্রযুক্ত কষ্টে বেদনায় একরাশ ক্লান্তির পশরা সাজিয়ে সে আজ বেরিয়ে পড়েছে প্রকৃতির খোঁজে। অসন্দিগ্ধচিত্তে জীবনের সর্বস্ব খোয়ে দৈব কোন অশরিরী আহŸানে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। জীবনের সমস্ত সুখ শান্তি ধীরে ধীরে গৃহকোণ হতে বহুদিনের অনাদৃত বাঁশির সুরের দিকে ধাবিত হতে লাগল। বিশাল আকাশের নিচে কতো মানুষ অথচ তার আপন কেহ নাই, আপন পরের গোলক ধাঁধায় সে কতোদিন নিজেকে গুলিয়ে ফেলেছে তার কোন হিসেব নেই।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প-৩১
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ১১
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৯
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৬
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৮
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৭
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প-পর্ব-৫
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৪
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব-৩

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now