বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
সমুদ্রের ঢেউ গর্জে উঠছে, যেন অদৃশ্য কোনো গান গাইছে। গফুর তার নাতনি মায়ার হাত ধরে সৈকতের দিকে হাঁটছিলেন। সন্ধ্যা নামছে, আকাশে নীলচে আঁধার নামতে শুরু করেছে। দূরে হোটেলগুলোর আলো জ্বলে উঠছে, তবে বালুচরের বুক যেন অদ্ভুতভাবে শূন্য। মায়া হঠাৎ থেমে বলল,
— “নানা, তোমার শৈশবের গল্প বলো না, যখন লাল কাকড়ার ঝাঁক এই বালুতে দৌড়াত?”
গফুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকালেন আকাশের দিকে।
— “মায়া, আমাদের সময়ে সমুদ্র ছিল প্রাণভরা। মনে আছে, যখন আমি ছোট ছিলাম, আমার মা আমাদের ঘুম পাড়ানোর আগে গল্প বলত। তিনি বলতেন, এই লাল কাকড়ারা সমুদ্রের রক্ষাকর্তা। যদি এরা বালুচরে নাচে, তবে সমুদ্র সুস্থ আছে। যদি হারিয়ে যায়, তবে বিপদ আসবে।”
মায়া বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল,
— “সত্যি, সমুদ্রের রক্ষাকর্তা?”
গফুর হেসে মাথা নেড়ে বললেন,
— “হয়তো লোককথা, তবে এর ভেতর সত্য আছে। কাকড়ারা ছিল সৈকতের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তারা বালুর ভেতর থেকে আবর্জনা টেনে নিত। আমাদের বালুচর সবসময় ছিল ঝকঝকে। এখন দেখো, চারদিকে প্লাস্টিক, বোতল, মোড়ক—কোনো জায়গায় পা রাখার মতো নেই।”
মায়ার চোখ ভিজে উঠল।
— “নানা, আমরা তো বিজ্ঞানে পড়ি—কাকড়ারা খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ। কিন্তু তোমাদের লোককথায় ওরা যেন দেবতার মতো। হয়তো সেই বিশ্বাসই মানুষকে প্রকৃতি রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করত।”
গফুর সায় দিলেন,
— “মানুষ যখন বিশ্বাস করত প্রকৃতি দেবতা, তখন তার প্রতি সম্মান দেখাত। এখন আমরা কেবল ব্যবসা দেখি, টাকা দেখি। এই সমুদ্র আমাদের মা, কিন্তু আমরা মায়ের বুকেই বিষ ঢালছি।”
সেদিন রাতে মায়া বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখছিল। ঢেউয়ের গর্জন যেন বারবার ফিসফিস করে বলছে, “আমাদের বাঁচাও।” মায়া অনুভব করল—এই ডাক কেবল কাকড়াদের নয়, গোটা পরিবেশের।
কয়েকদিন পর মায়া একটি প্রকল্প হাতে নিল। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের নিয়ে সৈকতে গেল। তারা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়াল: “একটা বোতল ফেলবেন না, একটা প্রাণ বাঁচান।” পর্যটকরা বিস্মিত হয়ে তাদের দেখল। কেউ কেউ হেসে বলল, “এই ছোটদের কাজ কি কিছু বদলাবে?” কিন্তু মায়া জোর গলায় উত্তর দিল,
— “পরিবর্তন একদিনে হয় না। একটা গাছ বাঁচানো মানে হাজারটা পাখি বাঁচানো। একটা কাকড়া বাঁচানো মানে সৈকতের ভবিষ্যৎ বাঁচানো।”
গফুর দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। তাঁর চোখে পানি জমল। তিনি ভাবলেন—মেয়ে যা করছে, হয়তো তাঁর শৈশবের কাকড়ার দলকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না, কিন্তু অন্তত ভবিষ্যতের বালুচরে কিছু প্রাণ ফেরাতে পারবে।
সেই রাতে গফুর মায়াকে বললেন,
— “মা, তোমাকে একটা পুরনো গল্প বলি। অনেক আগে এক জেলে প্রতিদিন সমুদ্র থেকে মাছ ধরত। একদিন সে দেখল, লাল কাকড়ারা সৈকতে নাচছে। সে ভয় পেয়ে গ্রামে ফিরে গিয়ে বলল, ‘সমুদ্রের সৈন্যরা বেরিয়েছে, আমাদের সাবধান হতে হবে।’ সেদিন থেকে গ্রামবাসী কয়েকদিন মাছ ধরা বন্ধ রাখল। পরে শুনল সমুদ্রে ভয়ংকর ঝড় হয়েছিল। তারা বেঁচে গেল। এরপর থেকে সবাই বিশ্বাস করত—কাকড়ারা আমাদের জন্য বার্তা আনে।”
মায়া গল্প শুনে মুগ্ধ হলো। বলল,
— “নানা, এই লোককথা যদি সবাই জানত, তবে তারা কাকড়াদের গুরুত্ব বুঝত। এখন শুধু বিজ্ঞানের ভাষায় বললে অনেকে ভাবে—এসব গবেষকের কাজ। কিন্তু গল্প বললে সবাই শোনে, সবাই মনে রাখে।”
গফুর মায়ার মাথায় হাত রেখে বললেন,
— “হ্যাঁ মা, তাই তুমি গল্প বলতে শেখো। শুধু তথ্য নয়, হৃদয়ের কথা বলো। মানুষ যখন হৃদয়ে অনুভব করে, তখনই বদলায়।”
মায়া প্রতিজ্ঞা করল, সে শুধু বিজ্ঞানী হবে না, হবে গল্পকথকও। সে কাকড়াদের নিয়ে শিশুদের গল্প লিখবে, নাটক করবে, গান বানাবে। যাতে শিশুরা বড় হতে হতে বুঝে—কাকড়ারা আমাদের বন্ধু, আমাদের রক্ষক।
কক্সবাজারের ঢেউ তখনো গর্জন করছিল। বালুচরের বুক শূন্য, তবে বাতাসে এক অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি। হয়তো একদিন আবার ফিরবে লাল কাকড়ারা, যদি মানুষ শিখে প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান করতে।
আর গফুর মনে মনে প্রার্থনা করলেন, “হে সমুদ্র, আমাদের ভুল ক্ষমা করো। আবার ফিরিয়ে দাও সেই দিন, যখন তোমার বুকে লাল কাকড়ারা নাচত।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now