বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
মফস্বলের ছোট্ট এক শহরে রাহাতের জীবন। বয়স মাত্র বাইশ। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। ওর পরিবারের আর্থিক অবস্থা মোটেও ভালো নয়। বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। সংসারের হিসাব-নিকাশে প্রতিদিনই টানাপোড়েন লেগেই থাকে। রাহাত জানে, বাবার পক্ষে সবসময় অতিরিক্ত খরচ সামলানো সম্ভব নয়। তাই যখনই বই কেনার প্রসঙ্গ আসে, ঘরে একটা অদৃশ্য চাপা হাহাকার জন্ম নেয়।
কিন্তু রাহাতের এক অদ্ভুত অভ্যাস—যেখানেই বই দেখে, তার চোখ জ্বলে ওঠে। যেন বই নয়, সামনে সোনার খনি। সে বাজারে গিয়ে কাপড়, জুতা কিংবা মোবাইলের দিকে একদম নজর দেয় না, বরং দাঁড়িয়ে থাকে বইয়ের দোকানের সামনে। পুরোনো বইয়ের দোকানগুলো তার কাছে স্বর্গের মতো মনে হয়। ধুলো জমা তাক থেকে একটি বই হাতে তুলে নিয়ে পাতা উল্টে শুঁকে দেখে সে। সেই গন্ধে রাহাতের মন ভরে ওঠে, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধন-সম্পদ হাতে পেয়েছে।
বন্ধুরা হাসাহাসি করে বলে,
—“দোস্ত, তুই এত বই কিনিস কেন? এগুলো দিয়ে কি হবে? চাকরি দেবে?”
রাহাত শুধু মুচকি হেসে উত্তর দেয়,
—“চাকরি হয়তো বই দেবে না। কিন্তু বই আমাকে তৈরি করবে চাকরির যোগ্য মানুষ হিসেবে।”
ক্লাসের টিউশনের সামান্য টাকাই ওর প্রধান উৎস। সবাই ভাবে, সেই টাকা দিয়ে সে হয়তো নতুন জামাকাপড় কিনবে, একটু ঘুরবে বা ভালো খাবে। কিন্তু না, রাহাত চলে যায় বইমেলায় বা শহরের বইয়ের দোকানে। হাতে যতটুকু টাকা থাকে, তা দিয়ে বই কিনে নেয়। অনেকসময় বাড়ি ফেরার ভাড়ার টাকা বাঁচাতে পায়ে হেঁটেই চলে আসে, শুধু একটা অতিরিক্ত বই হাতে নিয়ে ফেরার আনন্দে।
মায়ের মন খারাপ হয় মাঝে মাঝে। তিনি বলেন,
—“বাবা, এত বই কিনিস কেন? তুই জানিস তো আমাদের সংসার কতটা টানাটানির মধ্যে চলে?”
রাহাত মায়ের হাত ধরে উত্তর দেয়,
—“মা, আমি যদি একটা জামা কিনি, এক বছর পর সেটা ছিঁড়ে যাবে। আমি যদি বই কিনি, সেটা আমাকে সারাজীবন শেখাবে। তুই দেখিস, একদিন এই বইগুলোই আমাদের জীবনের বোঝা হালকা করবে।”
রাহাতের ঘর ছোট হলেও বুকশেলফে সাজানো বইগুলো যেন তার পৃথিবীর মানচিত্র। দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস—যা পায়, তাই সংগ্রহ করে রাখে। রাতের নিস্তব্ধতায় সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, সে তখন টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে বইয়ের পাতায় ডুবে যায়। শব্দের ভেতর থেকে সে যেন নতুন পৃথিবী খুঁজে বের করে।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক রাহাতকে বললেন,
—“তুমি তো বেশ পরিশ্রমী। ক্লাসের বাইরে পড়াশোনার জন্য এত আগ্রহ কোথায় পেলে?”
রাহাত মাথা নিচু করে বলল,
—“স্যার, বই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। বই কেনার সময় টাকার হিসাব করি না, কারণ আমি জানি—এগুলো আমাকে গড়ছে।”
সময় গেল। বন্ধুদের অনেকে খরচ করল ফ্যাশন, আড্ডা, কিংবা ঘোরাঘুরিতে। আর রাহাত প্রতিদিন বইয়ের সঙ্গেই কাটাল। ধীরে ধীরে তার ভেতরের জ্ঞান আর আত্মবিশ্বাস ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হতে লাগল। ক্লাসে যখন কোনো আলোচনার বিষয় ওঠে, রাহাত নির্ভয়ে কথা বলে। অন্যরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, সে কতো কিছু জানে।
রাহাতের জীবনে বড় সুযোগ এল দ্বিতীয় বর্ষে। এক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হবে। বিষয় ছিল “টেকসই উন্নয়ন ও তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা।” রাহাত দিনরাত বই পড়েছে—বাংলাদেশের ইতিহাস, বিশ্ব অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান—সব কিছুর টুকরো টুকরো জ্ঞান যেন তার মাথায় মিশে আছে। প্রতিযোগিতায় যখন সে বক্তৃতা দিল, সবাই থম মেরে শুনল। তার যুক্তি, তার উদাহরণ, তার আত্মবিশ্বাসে উপস্থিত বিচারকরা মুগ্ধ হলেন।
ফলাফল ঘোষণার দিন, রাহাত প্রথম পুরস্কার পেল। সাথে পেল বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ।
যেদিন খবরটা এলো, তার মা চোখ ভিজিয়ে বললেন,
—“বাবা, তুই ঠিকই বলেছিলি। বই আমাদের দেউলিয়া করে নাই, বরং তুই আজ সারা জীবনের জন্য সমৃদ্ধি পেলি।”
রাহাত মায়ের হাত চেপে ধরে বলল,
—“মা, আমি বিশ্বাস করি—টাকা খরচ করলে ফুরিয়ে যায়, কিন্তু বই কিনে পড়লে সেটা হাজার গুণ বেড়ে ফিরে আসে। তাই আমি কখনো বই কিনে দেউলিয়া হবো না।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now