বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৯

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাজহারুল মোর্শেদ (০ পয়েন্ট)

X লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৯ মায়ের সাথে বেলালের কি কি কথা হয়েছে তার সবিই দরজার আড়াল থেকে কমলা শুনে ফেলেছে। তার বুকের ভেতরটা কেমন ধড়ফড় করে ওঠে। নাহিদ ছাড়া অন্য কোন ছেলেকে বিয়ে করা তারপক্ষে সম্বব নয়। কিন্তু বাড়ির সবাইতো বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। যে ভাবেই হোক বেলালকে তার দলে আনতে হবে, বিয়েটা আটকানোর আর অন্য কোন পথ নেই। প্রয়োজনে বেলালের হাত-পা ধরে, অভিনয় করে হলেও তাকে বাঁকে আনতে হবে। বেলাল অনেক রাতে বাড়ি ফেরে, তখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু কমলার চোখে ঘুম নাই, সে অপেক্ষা করে আছে কখন বেলাল আসে। যে ভাবে হোক ঐ ছেলেটাকে বাড়িতে আনার আগেই বেলালকে সব জানাতে হবে। বেলাল বাড়িতে আসা মাত্রই কমলা তাকে তার ঘরে ডেকে নিয়ে যায়। তারপর সে নাহিদ ও তার গভীর সম্পকের কথা সব খুলে বলে। কমলা এটাও বলে যে, মধ্যে স্বামী স্ত্রীর মতো সম্পর্ক বছর দুয়েক ধরে কাজেই কিভাবে সে নাহিদকে তাকে ছাড়া অন্য কাউকে চিন্তা করতে পারে? আজ থেকে প্রায় আট-দশ দিন গত হয়ে গেলো নাহিদের সাথে আমার দেখা সাক্ষাত নাই, ওর কথা মনে হলে আমার কিচছু ভালো লাগে না, আমার শরীরটা ছটফট করে, রক্ত গুলো টকবক করে ওঠে একটু শীতল হওয়ার জন্য আমি বার বার গোসল করি। আমি খেতে পারি না , ঘুমোতে পারি না। কি অসহ্য সময়, বিশেষ করে সন্ধ্যা বেলা ঠিক সূর্য ডুবার ক্ষণে যখন পৃথিবী তার সারাদিনের সঞ্চিত উত্তাপ ছাড়তে শুরু করে। আমার শরীরে অগ্নি জ্বালা শুরু হয়, যেন ভেতরে কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আমি বুক ফেটে চিৎকার করতে চাচ্ছি, নিজের চুল নিজেই টেনে ছিড়তে চাচ্ছি কিন্তু কিছুই করতে পাচ্ছি না। আমি যেন এক বৃত্তের ভেতর মায়াজালের গোলক ধাঁধাঁয় পড়ে আছি। কোথায় বাড়ি কোথায় ঘর, কে আপন কে পর ইত্যাদি ভাবনা অবান্তর। দুলাভাই আপনি আমাকে বাঁচান, নাহিদ ছাড়া অন্য কোন ছেলের সাথে আমার বিয়ে দিলে আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে। এই বলে কমলা বেলালের গলা ধরে কাঁদতে শুরু করে। গোলাপি দরজার সামনে এসে খাড়া হয়, কমলার এ কুকীর্তি দেখে তার পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়। কোন কথা না বলে গোলাপি কমলার গায়ের জামার পিছনে কাঁধের অংশে হাতদিয়ে ধরে এক হ্যাচকা টান দেয়, অমনি জামার অর্ধেক অংশ ছিড়ে হার হাতে চলে আসে। সামনের অংশটি মাটিতে পড়ে যায়। বেলাল তাড়াতাড়ি অপর পাশে ঘুরে তার হাফহাতা গেঞ্জিটা খুলে দেয় কমলাকে পড়ার জন্য। কমলা প্রচÐ রাগে, ক্ষোভে গোলাপির চুলের মুঠো হাতে নিয়ে একটানে মাটিতে ফেলে দেয়। তারপর বলে আজ থেকে তুই আমার বোন না, তোর মতো বোনের কোন দরকার নাই আমার। তোর কপালে হাজারটা লাথি। কোন কিছু না জেনে, না বুঝে যে ছোট বোনকে ভুল বোঝে, আর যা হোক সে বড় বোন হতে পারে না। আমি দুলাভাইকে দেখি, আমার বড় ভাই, আমার অভিভাবক হিসেবে। তোর মতো ছোট মন নিয়ে আমি চলি না। কথা গুলো বলতে বলতে কমলা হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলে। তাদের কান্নার শব্দ শুনে আলেয়া দৌড়ে আসে ততোক্ষণে বেলাল তার ঘরে চলে যায়। কমলা যে অন্যায় করেছে বিচারের মান-ডÐে তার চেয়ে বেশী অন্যায় করেছে গোলাপি। তাই সে আর কোন কথা না বলে ঘরে চলে যায়। বেলাল গোলাপির উপর প্রচল্ড ক্ষেপে যায়, সমভাবে গোপিও বেলালের উপর এতোটাই ক্ষিপ্ত যে কেবল আগুন হয়ে জ্বলে উঠার বাকি। গোলাপি একটা বালিশ হাতে নিয়ে গেল মায়ের ঘরে, সেখানে ঘুমোবে। তবুও বেলাল তাকে কোন কিছু বললো না। সারারাত গোলাপির চোখে একফোটা ঘুমও এলো না। চিন্তার চিন্তা তাকে বিচলিত করে তুললো। সে বিছানায় এপাশ ওপাশ করে রাতটা কাটিয়ে দিল। এ সব সন্দেহ, অনুমান ভিত্তিক বিষয় নিয়ে সে কেন কষ্ট পেতে যাচ্ছে? কমলা তারই মায়ের পেটের ছোট বোন, মেয়ে হিসেবে সে তো কখনই খারাপ নয়, সে নাহিদের সাথে প্রেম করে এটা তার দোষের কিছু নয়। ভরা যৌবন তার দেহে, মনে শরীরের প্রতিটি অঙ্গে প্রতঙ্গে, কাউকে না কাউকে তার ভালো লাগতেই পারে, এটা তেমন ভাবে দেখার কিছু নেই। তার এ আচরণের জন্য কমলা ও বেলাল দু’জনই কষ্ট পেয়েছে। কালকে তাদের সরি বলতে হবে। বেলাল আর কমলার মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা স্বচোখে দেখার পর তাকে ভীষণ ভাবে ভাবিয়ে তোলে। বেলাল, কমলা কেন পৃথিবীর কোন মেয়ের ক্ষতি করার মতো ছেলে সে নয়। তাহলে কি কমলা কোন ঘোর বিপদে পড়ে সেখান থেকে উদ্ধারের জন্য বেলালের সাহায্য সহযোগিতা চাচ্ছে? নাকি তার পেটে বাচ্চা? না না এতো বোকা মেয়ে কমলা নয়। বেলালের কাছে সব জানা যেত কিন্তু এখন তো বেলালও তার সাথে কথা বলবে বলে মনে হয় না। সকালে উঠে কমলা নাস্তা বানিয়ে, চা করে প্রথমে কমলাকে ডেকে সরি বলে, তার কপালে চুমু খায়, তবুও কমলার অভিমান ভাঙ্গে না। শেষে জোর করে তাকে বিছানা থেকে টেনে তুলে সোজা রান্নার ঘরে নিয়ে যায়। তারপর বেলালকে ডাকে, সে ঘুমের ভান করে বিছানায় পড়ে থাকে। গোলাপি এক গøাস পানি নিয়ে তার বেশীভাগই বেলালের মুখে ঢেলে দেয়, অমনি বেলাল লাফদিয়ে বিছানা ছেড়ে ওঠে বসে। গোলাপি তার হাত ধরে টেনে রান্না ঘরে নিয়ে আসে। গোলাপি সবাইকে একসাথে নাস্তা দেয় আর সরি বলে গতরাতের ঘটনার জন্য ক্ষমা চায়। ব্যবসায়ের খাতিরে মাঝেমধ্যে বেলালকে এখানে সেখানে যেতে হয়। তার উপর আবার আশ্রমে কোন গানের আসর বসলে ধলা বয়াতি তাকে খবর দিয়ে নিয়ে যায়। বাড়িতে বেলালের এমন অনুপস্থিতি গোলাপির মনে সন্দেহের দানা বাধে। গোলাপির ধারণা যে বেলাল দোকান করার নামে টাকা পয়সা নিয়ে বাড়ি যেয়ে তার বাবাকে দিয়ে আসে। এখন তার বাড়ির পুরো সংসার চালায় বেলাল। গোলাপি তার চাচাত ভাই জলিলকে পরের দিন পাঠিয়ে দেয় বেলালের বাড়িতে তার খোঁজ খবর নেয়ার জন্য। জলিল বেলালের বাড়ি যেয়ে জানতে পাওে যে, বেলাল একবছর ধরে বাড়িতে আসে না। আজ আলেয়া একটু বেলাকরে বিছানা ছেড়ে উঠে। রাতে বৃষ্টি বাদলে উঠোনজুড়ে গছের পাতাগুলো ঝরে পড়ে আবর্জনা হয়ে আছে তাই একটা ঝাড়– হাতে নিয়ে কেবল পরিষ্কার করতে শুরু করেছে। এমন সময় দেলজান বুড়ি ভিক্ষার জন্য আসে। তাকে ভিক্ষা না দিয়ে কেউ খালি হাতে ফেরায় না। এর কারণ হলো একটাই যে একটু বেশি করে ভিক্ষা দেয় সে জগতের ভালো আর যে ভিক্ষা দেনা তার মতো খারাপ লোক কেউ নেই। গোটা গ্রামে তার দুর্নাম করে বেড়ায়। সে বুড়ি আবার জাদুটোনা, তাবিজ-কবজ, ঝাড়-ফুঁক ইত্যাদি কাজেও বেশ পাকা। এজন্য অনেকে তাকে ডাইনি বুড়ি বলেও ডাকে। দেলজান বুড়িকে আলেয়া আজ বেশ আদর করে বাড়িতে ডেকে আনে, পানের বাট্টা এগিয়ে দেয়। তারপর বলে-চাঁচি, তোমাক যে একনা কাম করি দিবার নাগবে। সে কামটা খুব জরুরি এবং গোপনে করিবার নাগবে। যেন কাক-পক্ষিও টের না পায়। মুই জানো চাঁচি তোমা করির পাবেন? কামটা কি সেইটা আগোত কও মা? তারপর দেখো করিবার পাইম কি না। চাঁচি মোর কাছোত আইসো, এই বলে আলেয়া, আলেকজান বুড়ির কানের কাছে যেয়ে বলে-চাঁচি, তোমাতো তামানে জানেন নূরল মুন্সির ঐ বেজন্মা ছেলেটা বলতে মোর কমলা একেবারে অজ্ঞান। চাাচি কি করলে তার মনটা একনা ঘুরি আনা যায়, সেই কামটা তোমাকে করা নাগবে। এমন কাজ করি দেবেন যেন মোর বেটি ঐ নাহিদের নামটা আর কোনদিন মুখোত না আনে। আলেয়ার কথা শুনে আলেকজান বুড়ি মনে মনে ভাবে যে, সে রাস্তার ফকির হলেও এখন সবাই তাকে বাড়িতে ডাকে আদর করে খাওয়ায়। অবশ্য এ নিয়ে আজ তার বেশ গর্বও হচ্ছে। শুন মা, তোর বেটির মন ঘুরি কি লাভ হবে, চ্যাংরা যদি তার জন্য পাগল হয়? সে যদি তোর বেটিকে রাইতে পালে ধরি যায়, সেলা কি করার থাকবে তোর? না চাচি, মোর বেটিক যেন পালে ধরি যাবার না পারে সেই জন্য তো মুই তোমাক ডাকানু। সেটা অবশ্য তুই ঠিক কথাই কইছিস মা। তবে শোন, কমলার মাথার চুল, গোসলের পানি, সে যে ঘরে থাকে তার দুয়ারের মাটি, আর যে জামাগুলা সবসময় পড়ে তার সামান্য একনা কাপড় জোগাড় করি থোইস। মুই কাল পরশু একবার আসিম। আর তার সাথে যে সমস্ত জিনিস লাগবে সেগুলা মুই সঙ্গে নিয়া আসি তোর কাজটা করি দিয়া জাইম। খালি চ্যাংরা ক্যানে, ওর বাপও কমলার পাশ দিয়া হাঁটির সাহস পাবে না। খালি মোক একনা বেশী করি খরচপাতি দেইস মা। এইলা কাজের জন্য ম্যালা জিনিস জোগার করা নাগে, খুব হয়রানী হয়। আচ্ছা ঠিক আছে চাঁচি সেটা নিয়া তোমা চিন্তা করেন না। তবে দেরি করা যাবে না, পাইলে তোমা কাইলে চলি আইসো। দেলজান বুড়ি চলে যাওয়ার পর আলেয়া মনে মনে ভাবে, তার এমন পোড়া কপাল যে, একটা ছেলেও নেই। একটা ছেলে থাকলে আজ তাকে কমলার বিয়ে নিয়ে ভাবতে হত না। তার মনে অনেক দুঃখ, মাঝে মাঝে একাই হা-হুতাশ করে। নাহিদ রাস্তার ধারে গাছের তলে বসে অপেক্ষা করতে থাকে কখন কমলা আসে কিন্ত এখনতো আর স্কুল নেই যে কমলা যখন তখন বেড় হয়ে আসবে। এভাবে কয়েকদিন কেটে যাওয়ার ফলে কমলার যখন কোন পাত্তাই পাওয়া যাচ্ছেনা তখন অরুণ নামে তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কথা মনে পড়ে। একমাত্র সে-ই পারে তাকে সাহায্য করতে। সমস্যা হলো- যদিও তারা একই পাড়ায় বসবাস করে কিন্তু রাষ্ট্র নামক সীমানা তাদেরকে আলাদা করে দিয়েছে। যখন বর্ডারে বি.এস.এফ (ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী) পাহারা শিথিল হয়, তখন তাদের চলাফেরাও স্বাভাবিক হয়। কিন্তু যখন কোন গণ্ডগোল বাঁধে বি.এস.এফ (ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী) কড়া পাহারা দিতে শুরু করে, দিনরাত তারা বর্ডারে পড়ে থাকে একটা পশু পাখিও এদিক সেদিক যেতে পারে না, তখন একই আত্মার বন্ধু অরুণও পৃথক হয়ে যায়। নাহিদ মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় যেভাবে হোক অরুণের সাথে তার দেখা করতেই হবে। সূর্যডুবার সাথে সাথে নাহিদ যেয়ে বসে থাকে বাঁশের আড়ায়। কিন্তু বি.এস.এফ আজ কিছুতেই নড়ছে না, তাদের ডিউটিও বদল হচ্ছে না। এভাবে অপেক্ষা করতে করতে অনেক রাত হয়ে যায়। একসময় নাহিদ দেখল যে, গোটা এলাকা ফাঁকা হয়ে গেছে, বি.এস.এফ আর নেই। সুযোগ বুঝে নাহিদ এক দৌড় দেয় অরুণের বাড়ির দিকে। কিন্তু দু’জন বি.এস.এফ গাছের আড়াল থেকে এসে তাকে ধরে ফেলে। চোরাকারবারি মনে করে তাকে খুব মারধর করে, সে যতোবারই বলার চেষ্টা করেছে আমি চোরাকারবারি নই আমি ছাত্র, অরুণের দেখা করার জন্য তার বাড়ি যাচ্ছিলাম। কিন্তু বি.এস.এফ তার কোন কথাই কর্ণপাত করেনি। মারতে মারতে তাকে অজ্ঞান করে ফেলে। রাত পোহালে বি.এস.এফ এর হাতে নাহিদ ধরা পড়ার ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে। তারপর গ্রাম পঞ্চায়েতকে সঙ্গে নিয়ে অরুণ বি.এস.এফ ক্যাম্প থেকে নাহিদকে ছাড়িয়ে নিয়ে মেখলীগঞ্জ হাসপালে নিয়ে যায়। কয়েকদিন হাসপাতালে থাকার পর নাহিদ সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হলে অরুন তাকে বাড়ি পৌছে দেয়। বি.এস.এফ এর হাতে মার খাওয়ার পর প্রেমের ভুতটা আপাতত কয়েকদিনের জন্য নাহিদের মাথা থেকে সরে যায়। কিন্তু সরে যাওয়া আর ভুলে যাওয়াতো এক জিনিস নয়, মানুষ ইচ্ছে করলেই সব কিছু ভুলে যেতে পারে না। অবসরে কিংবা একাকিত্বে সেই সব হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো এসে ভিড় করে মনের পর্দায়। তাই কিছুদিন যেতে না যেতেই রাস্তার মোড়ে কমলাকে দেখে সে অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু কমলা তো এখন স্কুলে যায় না। কিভাবে তার দেখা পাওয়া যায় সে ভাবনায় পাগলের মতো দিনরাত ভাবতে থাকে। বড়ভাবী তাকে ভীষন ভালোবসে, খুব আদর করে, আপন ছোট ভাইয়ের মতো দেখে। যদিও আলাদা সংসারে থাকা। তারপরেও ভালো-মন্দ কিছু রান্না হলে নাহিদকে ছেড়ে সে কোন দিন খায় না। নাহিদ জানে বড়ভাবি কিছু না কিছু একটা উপায় বের করে দেবে। তাই কমলার বিষয়ে সে বড়ভাবিকে আগাগোড়া সব কিছু খুলে বলে। নাহিদের মুখে সব শুনে বড়ভাবি তার কান ধরে ঘরের ভিতর তিন পাক ঘুরিয়ে বলে- ওরে আমার সোনার চানরে, পড়া শুনার নাম নেই, মেয়েদের পিছনে ঘুর ঘুর করে বেড়ানো হচ্ছে। দেবো নাকি বাবাকে বলে, মেরে হাড়-হাড্ডি সব গুড়ো করে মাথা থেকে প্রেমের ভুতটা ছাড়িয়ে দেবে এখন। না ভাবি, তোমার পায়ে পড়ি এমটি করো না প্লিস!। তাহলে কিন্তু আমি তোমার ঘরে এসে বিষ খেয়ে মরে যাব। বিষ খাওয়ার কথা শোনে বড়ভাবি চমকে ওঠে, মনে মনে ভীষণ ঘাবড়ে যায়। এই বয়সে তাদের দ্বারা সবই করা সম্ভব। তাকে বুঝে-সুজে বাঁকে আনতে না পারলে হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। শোন নাহিদ, তোদের মতো এ বয়সটাতো একদিন আমাদেরও ছিল, আমি যে একদম বুঝিনা সেটা নয়। কাউকে মন দিয়ে সত্যিকারে ভালোবাসার মতো কঠিন কাজ এ পৃথিবীতে আর একটিও নেই। আমি জানি, মনুষের মনের ভেতর কেউ যদি একবার স্থান দখল করে তাকে আর কোন ভাবেই সেখান থেকে সরানো যায় না। শতচেষ্টা, শতসাধনার মাধ্যমেও একচুল পরিমাণ সরানো যায় না। উঠতে বসতে, চলতে ফিরতে, খেতে ঘুমাতে, এমনকি ঘুমানোর পড়েও স্বপ্নের মাঝে সে এসে ঘুরঘুর করে। পড়তে বসলে বইয়ের পাতায় সিনেমার পর্দার মতো তার ছবি ভেসে উঠে। পড়া শুনায় মন বসেনা, সার্বক্ষণিক কেবল তার চিন্তাই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়, সে এখন কি করছে, বসে বসে আমার কথা ভাবছে কি না, কালকে দেখা হলে এটা বলবো, সেটা বলবো, এটা করবো, সেটা করবো কিন্তু দেখা হওয়ার পর কোন কিছুই মনে আসে না। না বলা কথা গুলো কিন্তু কিছুতেই কিছু মনে হয় না। আবার সে চলে যাওয়ার পর মনে হয় ধ্যাৎ-এটা কেন বললাম, সেটা কেন করলাম না ইত্যাদি। আচ্ছা নাহিদ, তুই মণিকে যেয়ে বল যে, বড়ভাবি তোকে ডেকেছে। মণি আর কমলার একই ক্লাসে পড়ে আবার দু’জন খুব ঘনিষ্ট বান্ধবীও তাই নাহিদ কমলাকে একটা চিঠি লিখে মণির দ্বারা পাঠিয়ে দেয়- প্রিয় “কে” জানি না কেমন আছ, আমি ভালো নেই। সেদিন বি.এস.এফ এর হাতে আমার প্রাণটা তো চলেই গিয়েছিল। হয়তো তোমাকে দেখবো বলেই বেঁচে আছি। মণির কাছে শুনেছিলাম তুমিও নাকি খুব কেঁদেছিলে আমার জন্য। তোমার ভালোবাসার প্রতিটি অশ্রæ কণা হয়তো বিষাক্ত শায়কের মতো বিঁধেছিল অর্ন্তজামির বুকে তাই অত্যন্ত করুণা করে আবার আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে তোমার কাছে। তুমিহীনা আমি কিভাবে বাঁচি বলো? যদি আমার ভালোবাসা তোমার হৃদয়ে বিন্দু মাত্র স্থান দখল করে থাকে তাহলে আগামি কাল সকালে চলে এসো স্যাঁকোয়া নদীর ধারে হেলে পড়া সেই শিমুল গাছের তলে। তোমার সান্নিধ্যে প্রাণহীন অবয়বে হয়তো আবার নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে। ঝিমিয়ে পড়া পত্র-পল্লবহীন বাগিচা আবারও ভরিয়ে উঠবে ফুলে-ফুলে। ততোক্ষণ তুমি খুব ভালো থেকো জান আমার। ইতি তেমারই -“এন”। দিনের আলো ক্রমশ সরে গিয়ে গোধূলির সাথে মিশে যাচ্ছে। দূরের বাঁশ বাগানটি হাজারো পাখির কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠছে। ঝিঁঝিপোকাগুলো গলা ছেড়ে ডাকছে। সমস্ত বাগানে জোনাকির মিটি-মিটি আলোয় ভরে গেছে। মানুষের ভয়ে বের হতে না পারা দু’টো খেকশিয়াল কি মনের সুখে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে। এসব দেখতে দেখতে কখন যে আঁধার নেমে আসে কমলা বুঝতে পারে না। আজকের চাঁদটাকে কি সুন্দর দেখাচ্ছে, চারদিকে কি অপরূপ জোছনা। পুরো আকাশটায় এক ফোঁটা মেঘও নেই। আজ মনে হয় পূর্ণিমা হবে। বাইরের আমগাছটার তলে বসে কমলা ভাবছে। নিজের কোন মতামত, স্বাধীনতা বা আকাঙ্খার কোন মূল্য নেই আজ তার। নিজের ব্যাক্তিগত জীবন বলতে এখন কিছু নেই। যা আছে তার সবটুকুই পরাধীন। আপন জনদের সজ্ঞানে প্রবঞ্চনা করে, নিপীড়ন করে, নিজের সুখকে হাতের মুঠোয় ভরার কোন ইচ্ছে তার কোন দিন ছিল না। কিন্ত দিনে দিনে সে উপলব্ধির পথ ক্রমশঃ রোধ হয়ে যাচ্ছে। স্কুল ছুটি হলে বাড়িতে যাই, ফিরতে মন চায় না। কোনোভাবেই ফিরতে মন চায় না। সার সময় হলেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে। কিন্তু জীবন তো জীবনই। আবেগ দিয়ে তো আর জীবন চলে না। মনকে বোঝাই মন, এটাই তোমার আবাস, এখানেই থাকতে হবে। তাই মায়াময় স্মৃতি বাক্সে বোঝাই করে বারবার ফিরতেই হয়। দিন গড়াতে থাকে। জীবন কখনও রঙিন হয়, কখনও ফিকে। ঘাত প্রতিঘাতে চলতে থাকে জীবনের পথচলা দীর্ঘসময় থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠা। বুঝতে পারি, যে স্বাপ্নিক কল্পনায় জীবন আসলে তা নয়। প্রয়োজন নিজের মনকে প্রসারিত করতে প্রচুর পড়াশোনা শুরু করি, কিন্তু আমাদের ভাগ্যহত জীবনে সেটাও স্বাভাবিক হয় না। অন্য দেশের স্কুলে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে লাখার অনেক বিড়ম্বনা আছে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে অনুভব করি, ভালো আছি। তাই কল্পনায় ফিরে যাই ঐন্দ্রজালিক স্বপ্নের সেই মায়াবী সেই দিনগুলোতে। যেন সুখ এসে আছড়ে পড়ে কূলের কাছাকাছি, সেটাই প্রত্যাশা এবং জীবনের পরম প্রাপ্তি। সত্যিই অতীত আর বর্তমান মিলেমিশে এক অপার্থিব আনন্দে চলছে জীবন আমার। গভীররাত সবাই ঘুমিয়ে পড়ছে কোথাও কোন সারা শব্দ নেই, চারিদিকে নীরবতা। ঘরের উপরে আমগাছটা থেকে একটা কোন এক রাত জাগা পাখি ডানার ঝাপটা দিয়ে উড়ে গেল। কমলার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল তার মনে হলো এই বুঝি নাহিদ এসে তাকে ডাকে। কমলার দু’চোখের পাতা কোন ভাবে একখানে হচ্ছে না কারণ কয়েকদিন আগে তার বান্ধবী মণি এসে কানে কানে বলে গেছে সে যেন তৈরি হয়ে থাকে। যে কোন রাতে সুযোগ পেলেই নাহিদ এসে তাকে নিয়ে যাবে। বান্ধবী মণির মুখে এ কথা শোনার পর থেকে কমলার চোখের ঘুম হারাম হয়ে যায় শুরু হয় অপেক্ষার পালা। বিশেষ করে নিঝুম রাতের প্রহরগুলোর প্রতিটিক্ষণ তাকে সজাগ করে তোলে। ঘরের পিছনে কোথাও একটা পাতা পরার শব্দ হলেও সে চমকে উঠে, তার মনে হয় এই বুঝি নাহিদ আসল তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু প্রতিরাতের এমন প্রতিক্ষা যেন তার জীবনটাকে বিষিয়ে তুলছে, অতিষ্ট করে তুলছে তার বেঁচে থাকা। এখন তার মনে হচ্ছে যে-কারো জন্য অপেক্ষা করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। এর চেয়ে মরণই ভালো। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে উঠল হয়তো কারও আগমন সে টের পেয়েছে। কুকুরটার উপর কমলার ভীষণ রাগ হলো, এই বুঝি বাড়ির সবাইকে জাগিয়ে দেয়। আর সবাই জেগে গেলে নাহিদ আসবে কি করে। কমলার মা ঘর থেকেই দুর দুর করে কুকুরটাকে জানিয়ে দিল যে, সে জেগে আছি। আলেয়ার গলার আওয়াজ পেয়ে প্রভুভক্ত কুকুরটা শান্ত হয়ে গেল। অল্প কিছুক্ষণ পরে, নাহিদ এসে ঘরের পিছনের জানালায় আলতো করে দু’বার আঙ্গুলের টোকা দিল, তাতেই কমলা টের পেয়ে গেল যে নাহিদ এসে গেছে। কমলা এমন ভাবে বিছানা থেকে উঠল যেন পাশে শুয়ে থাকা টুকটুকি টের না পায়। সে একটা ছোট্ট কাগজে মায়ের উদ্দেশ্যে দু’লাইন লিখে দিল-“মা আমি নাহিদের সাথে চলে গেলাম, আমাকে ক্ষমা করে দিও। জন্মের পর থেকে আমি কোনদিন তোমার অবাধ্য হইনি কিন্তু আজ হতে বাধ্য হলাম। কারণ তোমরা কেউ আমার কথা শুনতে চাও নাই”।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প-৩১
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ১১
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ১০
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৬
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৮
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৭
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প-পর্ব-৫
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৪
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব-৩

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now