বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অভিমান ভাঙার আলো

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। ঢাকার এক শান্ত গলিতে ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটবাড়ি। তৃতীয় তলায় থাকে তানিয়া আর তার স্বামী আজহার। সংসার চলছে অনেকটা স্বাভাবিক ছন্দে—সকালবেলা অফিসের তাড়া, দুপুরে ফোনে খোঁজখবর, রাতে একসাথে খাওয়া। তবুও, তানিয়ার মনে মাঝে মাঝে একটা শূন্যতা ঘুরে বেড়ায়। হয়তো এটা দাম্পত্যের চিরচেনা ক্লান্তি, হয়তো প্রত্যাশা আর বাস্তবের ব্যবধান। আজহার মানুষ খারাপ নয়। সৎভাবে অফিস করে, সংসারের খরচ চালায়, মেয়ের স্কুলের ফি মেটায়। কিন্তু তার স্বভাবটা কিছুটা শুষ্ক। বাইরে থেকে ফেরে ক্লান্ত হয়ে, ঘরে এসে বই পড়ে কিংবা মোবাইল স্ক্রল করে। কথাবার্তা কম, প্রশংসা তো আরও কম। তানিয়ার মনে মাঝে মাঝে অভিমান জমে যায়—সে কি আর আগের মতো সুন্দর নেই? স্বামী কি তাকে আর আগের মতো ভালোবাসে না? একদিন ছোট্ট একটা ঝগড়া হলো। তেমন বড় কিছু নয়, রান্নার লবণ বেশি হয়ে যাওয়ার মতো সামান্য ব্যাপার। আজহার বিরক্ত হয়ে বলল, —“তুমি কখনো মন দিয়ে করো না। আমি এত কষ্ট করি, অন্তত এইটুকু খেয়াল রাখতে পারতে।” তানিয়া মুখ ভার করে চুপ করে গেল। বাইরে থেকে কথাটা হয়তো স্বাভাবিক মনে হয়, কিন্তু তার ভেতরে সেই আঘাত গভীর হলো। মনে হতে লাগল, আজহার সবসময় দোষটাই দেখে, কোনোদিন গুণটা দেখে না। সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে একা একা অভিমান মিটাচ্ছিল। ঠিক তখনই পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া হাসিব এসে দাঁড়াল। বয়সে কিছুটা বড়, শহরমুখী চেহারা, সবসময় পরিপাটি। পরিচয় আছে, মাঝেমাঝে সিঁড়িতে দেখা হলে কথা হয়। হাসিব হেসে জিজ্ঞেস করল, —“মন খারাপ কেন ভাবী? ঝগড়া টগড়া করলো নাকি?” তানিয়া একটু আঁতকে উঠল। তার ব্যক্তিগত বিষয় কেউ টের পেল কেমন করে? কিন্তু হাসিবের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল সেখানে এক ধরনের সহানুভূতি ভাসছে। সে বলল না কিছু, শুধু চুপ করে রইল। হাসিব আবার বলল, —“আপনার মতো এ রকম একটা মানুষের সাথেও ঝগড়া করা যায়? বিশ্বাসই হচ্ছে না! আপনি তো এত শান্ত, এত ভদ্র, আপনাকে নিয়ে কারো অভিযোগ থাকার কথা নয়।” এই কথাগুলো শুনে তানিয়ার বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান যেন হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে গেল। মনে হলো, হ্যাঁ, আমি তো আসলেই খারাপ নই। সমস্যা তাহলে আজহারেরই! স্বামী কি কখনো এমনভাবে তাকে বোঝে? না, বরং সবসময় খুঁত ধরে। অথচ এই পাশের মানুষটি মাত্র কয়েক মাসের পরিচয়েই বুঝতে পারছে তার মনের অবস্থা। এরপর থেকে তানিয়া খেয়াল করল, হাসিব সুযোগ পেলেই সহানুভূতির কথা বলে। কখনো অফিস থেকে ফেরার পথে জিজ্ঞেস করে, —“ভাবী, আজ সারাদিন একা ছিলেন? কষ্ট হয় না? আপনার মতো মানুষের তো সবসময় আদরে থাকার কথা।” কখনো তার মেয়ের কথা বলে, —“আপনার মেয়ে একদম আপনার মতো সুন্দর হয়েছে। আল্লাহর দয়া, আপনার সংসার তো আলোকিত হয়ে উঠেছে। শুধু আপনিই হয়তো ঠিকমতো কৃতজ্ঞতা পান না।” তানিয়া ভিতরে ভিতরে টের পাচ্ছিল, সে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে। মিষ্টি প্রশংসা, সহানুভূতির সান্ত্বনা—এসব শুনতে ভালোই লাগে। তার মনে হতে থাকে, হাসিবই যেন সেই মানুষ যে তাকে সত্যিকার অর্থে বোঝে। অথচ প্রতিবারই মনের গভীর থেকে একটা কণ্ঠস্বর বলে ওঠে, “এটা ফাঁদ। এটা শুধু প্রশংসার আসর, এর ভেতরে কোনো স্থায়িত্ব নেই।” তবুও তানিয়া প্রতিরাতে বিছানায় শুয়ে আজহারের দিকে তাকিয়ে ভাবে—কেন সে একদিনও বলে না, “তুমি আমার ভরসা”? কেন সে একবারও চোখ মেলে বলে না, “তুমি সুন্দর”? অবশেষে একদিন পরিস্থিতি ভাঙল। তানিয়া মেয়েকে নিয়ে বাজারে যাচ্ছিল। হঠাৎ রাস্তায় আজহারের এক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হলো। সহকর্মী হাসিমুখে বলল, —“ভাবী, আপনার কথা তো আজহার সবসময় বলে। প্রতিদিন অফিসে বসে বলে, আমার বউ না থাকলে আমি এতটুকু টিকতে পারতাম না। বলে, আমার মেয়ের মুখটা ভেবে আমি সব কষ্ট ভুলে যাই।” তানিয়া হতবাক হয়ে গেল। এ কেমন কথা! আজহার কখনো তো এমন কিছু বলেনি। সে শুধু অভিযোগই করেছে, খুঁত ধরেছে। অথচ বাইরে গিয়ে তার সহকর্মীদের কাছে স্ত্রী-সন্তানের প্রশংসাই করেছে! সেদিন রাতে সে আর অভিমান গোপন করল না। সরাসরি আজহারকে বলল, —“তুমি আমাকে কখনো ভালো কিছু বলো না। সবসময় দোষ দেখাও। অথচ বাইরে গিয়ে বলো আমি নাকি তোমার ভরসা! আমাকে একটু বললে ক্ষতি কী?” আজহার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার হাত ধরল। বলল, —“তুমি ঠিক বলেছো। আমি মুখে কম বলি, কিন্তু মনে অনেক কিছু জমে থাকে। সারাদিনের ক্লান্তি, টেনশন—এসবের ভেতর তোমার প্রতি ভালোবাসা আড়াল হয়ে যায়। আমি জানি এটা আমার ভুল। আমি তোকে সত্যি বলতে কখনো ছোট করে দেখি নাই। তুই আমার ভরসা, আমার সব।” তানিয়ার চোখ ভিজে উঠল। সে বুঝল, ফাঁদে পা দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আল্লাহ যেন তাকে সত্যটা দেখিয়ে দিলেন। সহানুভূতির নামে অন্য পুরুষের মিষ্টি কথায় যতটা সুখ মনে হয়েছিল, তার এক ফোঁটা সমানও নেই এই স্বামীর সরল স্বীকারোক্তির মধ্যে। তারপর থেকে তানিয়া আর কখনো ফাঁদে পা দেয়নি। সে বুঝে গেছে, সম্পর্কের মধ্যে অভিমান জমতেই পারে, কিন্তু সমাধানটা বাইরে নয়—ভেতরেই। প্রশংসা বা সহানুভূতি যদি সত্যিই মূল্যবান হয়, তবে তা স্বামী-স্ত্রীর কাছ থেকেই আসবে। বাইরের কেউ সেটা দিয়ে শুধু বিভ্রান্তি বাড়ায়। ঢাকার ব্যস্ত ফ্ল্যাটবাড়ির আলো-আঁধারির ভেতর তানিয়া আবার খুঁজে পেল সংসারের আসল আলো। অভিমান ধীরে ধীরে গলে গিয়ে জায়গা করে নিল বোঝাপড়ায়। আর সেই বোঝাপড়াই হলো তার দাম্পত্যের নতুন ভিত্তি।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২১৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now