বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৮
একদিন পড়ন্ত বিকেলে আলেয়া আব্দুল্লাহর বাড়ি আসে। আব্দুল্লাহ ও কুলসুমকে এক সাথে নিয়ে বলে-বিয়াইসাব আল্লায় তো তোমার দুইটা ছেলে দিছে কিন্তু তোমরা তো জানেন মোর ঘরটা ছেলের জন্য খাঁ খাঁ করছে। বিয়াইসাব তোমার কাছে মুই একটা জিনিস আবদার করিম, তোমা কিন্তু না করির পাবেন না। যদি দেন তাহলে তোমাক কঁও।
জর্দা ভর্তি একটা খিলিপান সাজিয়ে হাত বাড়িয়ে আলেয়ার হাতে দিতে দিতে কুলসুম বলে-বিয়ান হামরা তো গরিব মানুষ আর কি-ই বা হামার আছে তোমাক দেওয়ার মতো কন? আত্মীয়তা তো আর এমনি এমনি হয় না আত্মায়-আত্মায় মিলি গেইলে তারপর হয়। আত্মীয় হিসেবে হামার বাড়ি আসিছেন তোমার সম্মান রক্ষা করা তো হামার কর্তব্য। কাজেই বিয়ান তোমা নির্দিধায় কবার পান, আশা করি তোমার অসম্মান হবে না।
বিয়াই-বিয়ান তোমা তো জানেন-মোক অকুল সাগরে ভাসে দিয়া তোমার বিয়াই ওপারে চলি গেলো। সংসারটা দেখা শুনার অভাবে একেবারে গোল্লায় যাবার নাগছে। এমতবস্থায় মোর সংসারের হাল ধরার জন্য কোন একজন পুরুষ মানুষের খুব দরকার। বিয়াই তোমর বড় ছেলে জামাই নয়, মোর ছেলে মনে করি তাকে বাড়ি নিয়া যাবার চাঁও। এতে কোন দিন বেলালের অসন্মান হবে না। আর মুই কোন দিন তাকে জামাইও মনে করিম না। গোলাপি যেমন মোর পেটের ছওয়া মুই বেলালকেও মোর পেটের ছওয়া হিসেবে মনে করিম।
বেলাল শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে থাক এটা কোন ভাবেই চায় না আব্দুল্লাহ। কিন্তু আলেয়ার অনুরোধ ফেলতে না পেরে সে রাজি হয়ে যায়। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বেলালও তার শাশুরীসহ চলে আসে আলেয়ার বাড়িতে।
অকালে স্বামী হারার মতো এমন একটা বীভৎস ঘটনা তার জীবনে ঘটে যাবে এটা ছিল তার কল্পনার বাইরে। সারা উঠানে যেন বইতে লাগল উত্তাল ঝড়ো হাওয়া। এভাবে একা একা জীবন সংসারের ঘাণি টানতে টানতে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আজ অনেক দূর পথের যাত্রী সে, নিঃশব্দে জীবন ইতিহাস গুনছে। গল্পের শুরুটা কোথায় তাও তার জানা নেই। অদৃশ্য এক শক্তির কঠোর শাসন তার জীবনটাকে তছনছ করছে। মাকড়সার জালে আটকে পড়া মাছির মতো আজ সে কেবলই ছটফট করছে। তার জীবনটা এভাবেই বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে? আলেয়া ভেতরের বারান্দায় একটা মাদুর বিছিয়ে বসে তার ছোট মেয়ে টুকটুকিকে পাখা দিয়ে বাতাস করছে। আর মনে মনে ভাবছে বেলাল কখন আসে। ভাবতে না ভাবতে বেলাল এসে তার সামনে উপস্থিত হয়। একটা ব্যাগে কলা আর বড় বড় দু’খানা পাউরুটি নিয়ে এসে তার শাশুরির হাতে দিয়ে বলে-মা এ্যালাও ঘুমান নাই?
না বাবা, তোমার জন্য অপেক্ষা করির নাগছু। তোমা বাড়ি না আসা পর্যন্ত যে মোর মনটা স্থিরই হয় না বাবা।
বেলাল শাশুরির পাশে যেয়ে বসে বলে-আম্মাজান একটা জরুরী কথাছিল কাইল থাকি কবার চাঁও কিন্তু সে সময়ে হয় না?
হ্যাঁঃ বাবা কও, কি কবার চাও?
আম্মা, করিম মাষ্টারের বড় ছেলে আরজু ভাইয়ের সাথে মোর ভালো পরিচয় আছে, খুব ভালো মানুষ সে। ব্যবসায় ভালো সুনাম আছে তার গোটা বাজারে। সততা আর ভালো ব্যবহারের জন্য সবাই তাকে খুব সম্মান করে। গতকাল নয়ারহাটে সংসারের সব খরচপাতি তার দোকান থাকি নেও। কাল খরচ নেওয়ার সময় রাজু ভাই মোক কয়, মিয়াভাই সারাদিন বাড়িত বসি না থাকি একটা দোকান-টোকান দিলেই পার, বেচা বিক্রি হলে দু’চারটা পাইসাও পকেটে ঢোকে আর নিজের সংসারেও বাজারটা হয়া যায়। বাড়িতে পরামর্শ করি আইসো, সাহায্য সহযোগিতা লাগলে করা যাবে। আরজু ভাইয়ের কথাটা মোর মনে লাগে, সারা বছর তো আর কাজ থাকেনা, অনেক দিন বসি বসি যায়। বাড়িতে বসি না থাকি বাজারে একটা দোকান দিয়া বসি থাকলে দু’চার টাকা বিক্রি হবে আর সংসারের খরচটা ওতেই চলে যাবে।
কথাটা মন্দ কও নাই বাবা, কিন্তু দোকানে মালামাল উঠাতে গেলে তো শুরুতে ম্যালা টাকা-পয়সার দরকার হবে? এতো টাকা-পয়সা কি আর হামার আছে।
আম্মা, আরজু ভাই কইচে অর্ধেক টাকা দিলে নাকি সব মালামাল বাকিতে নেয়া যাবে। আর তায় যেহেতু সাহায্য সহযোগিতা করতে চায়, মোর মনে হয় সে সুযোগটি কাজে লাগানো উচিত।
দেখ বাবা, যদি সামলিবার পারোতো মোর কোন আপত্তি নাই। গোলাপির সাথেও একনা কথা দেখ?
মা, আগে তোমার সাথেই পরামর্শ না করি গোলাপির সাথে আর কি কথা কঁও।
এরপর আরজুর সহায়তায় বেলাল একটা গালামালের দোকান দেয় বাজারে। আরজু তাকে বলে শোন বেলাল- প্রথম প্রথম সবার অপরিচিত হওয়ায় বেচা বিক্রি একটু কমই হবে, এ নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নাই। দু’এক মাস যেতে না যেতেই দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে। ব্যবসায়ের প্রধান পুঁজি হলো ব্যবহার, খরিদ্দার যত বিরক্তই করুকনা কেন তার সাথে খারাপ আচরণ করা যাবে না, প্রয়োজনে বুঝিয়ে বলতে হবে। তাছাড়া মাঠে-ঘাটে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে মাথার ঘাম পায়ে ফেলার চেয়ে ছায়ার ভিতর দোকানে বসে থাকা অনেক ভালো। আজ না হোক কাল
বিক্রি হবে, আর এমনতো নয় যে এখান থেকে রোজগার করে তোমাকে সংসারের চাল কিনতে হবে। বেলাল বলে- জী ভাই যতদিন আমি বেঁচে থাকব আপনার এ উপকারের কথা আমার মনে থাকবে।
আজ সকাল থেকেই আকাশটা একটু ভালো বেলার চকচকে মুখ দেখা যায়। আলেয়া কতগুলো ভেজা লাখড়ি রোদে শুকাতে দেবেন বলে গোছগাছ করছেন, এমন সময় বাঁশের কঞ্চির একটি ছুঁচালো মাথা এসে তার আঙ্গুলের নখের অনেকখানি ভিতরে ঢুকে যায়। নখের ব্যথায় সে চেঁচিয়ে ওঠে, কমলা শোনা মাত্র ঘর থেকে এক দৌড়ে এসে দেখে মায়ের আঙ্গুল দিয়ে দরদর করে রক্ত পড়ছে, সে মায়ের আঙ্গুলটা এমন শক্ত করে চেঁপে ধরে, যেন আর এক ফোঁটা রক্তও বেড় হতে না পারে। বেলালও বাড়িতে ছিলো শাশুড়ির এ অবস্থা দেখে সে দ্রুত বাইরে যেয়ে কতগুলো দুর্বাঘাস মুখে চিবিয়ে তুষ করে সেই চিবানো দুর্বাঘাস ক্ষতস্থানে লাগিয়ে একটা ন্যাকড়া দিয়ে পেঁচিয়ে শক্ত করে বাঁধন দিয়ে বলে- তোমা এগুলা কাজ করির গেলেন ক্যান মা? মুইতো বাড়িতে আছো।
রাতক্রমে ভোর হয়ে আসছে, গাছের ডালে পাখিরা কিচির মিচির করছে, সারারাত গোলাপির দু’চোখের পাতা একখানে হয় নাই। কোন ভাবেই কমলাকে কন্ট্রোলে আনা যাচ্ছে না, ভীষণ বিপাকে পড়েছে গোলাপি। একদিন, রাতে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে নাহিদের ইশারায় কমলা ঘর বেড়িয়ে যায়। গোলাপি সুযোগ বুঝে চুপিচুপি কমলার পিছু নেয় এবং সে কোথায় যায় সেটা আড়াল থেকে লক্ষ্য করে। কমলা ঠিকই তাদের আমবাগানে একটা ছোট গাছের নিছে নাহিদের সাথে দেখা করে। গোলাপি কাছে না যেয়ে একটু দূর থেকে কমলাকে ডাকে। সে সুযোগে নাহিদ পালিয়ে যায়। বাড়ি এসে গোলাপি কমলাকে অনেক মার-ধোর করে কিন্তু তাতেও কোন প্রতিকার হয় না। তার মাথা থেকে নাহিদের ভূতটা কোন ভাবে নামছে না।
নাহিদ একটা লম্পট ছেলে, মদ খায়, গাঁজা খায় আর মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করে বেড়ায় এটাই তার কাজ। প্রেমের নামে ফাঁদে ফেলে এ পর্যন্ত কতোগুলো মেয়ের জীবন যে নষ্ট করেছে সে, তার কোন হিসেব নেই। সকাল হলে গোলাপি মাকে ডেকে বলে- মা আইজ থাকি কমলাকে আর স্কুলে যাবার দেওয়া যাবে না। নইলে সর্বনাশ হয়া যাবে।
ক্যান? কি হইছে সেটা তো আগোত কোবু?
কমলা স্কুলে যাওয়ার নাম করি নুরল মুন্সির ব্যাটা নাহিদের সাথে সারাদিন কাটে স্কুল ছুটি হওয়ার সময় করি বাড়িত আইসে। এ নিয়ে গ্রামের লোকজন নানান কথা কবার নাগচে, গোটা গ্রামে সবার মুখে মুখে সে কথা
হ্যাঁরে মা, মুইয়ো তো সেটা চিন্তা করির নাকচু। কি করা য়ায় কতো? জামাইও বাড়ি আইসে অনেক রাইত করি তার সাথে কথা কওয়ারও হয় না। একটা ভালো ছেলে দেখি কমলার বিয়া দেওয়া খুব দরকার।
আঙ্গুলের ক্ষতটা অনেকটা গভীর হয়ে যাওয়ায় খুব যন্ত্রণা করছে। আলেয়ার মনটা ভীষণ খারাপ, কেন যে খাপ হলো সে নিজেও জানে না। বেলা প্রায় শেষের দিকে, ছাগল গুলো ঘরে আসার জন্য ছটফট করছে। পানির জগটা হাতে নিয়ে আলেয়া এক গøাস পানি ঢেলে গøাসটা মুখে লাগাবে এমন সময় উঠোনে কে যেন ভাবী ভাবী করে ডেকে উঠল। অর্ধেক পানি গøাসে রেখেই তাড়াহুড়ো করে বাহিরে আসেন তিনি। তারপর দেখেন দক্ষিণ পাড়ার আবুল ভাই ও তার বউ। আবুল হলো তার স্বামীর আমজাতের ঘনিষ্ট বন্ধু। আমজাতের মৃত্যুর সময় সে নিজেও মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিল তাই আসতে পারে নি। ভাবী, কি আর কওয়ার আছে, আমজাতের অকালে চলি যাওয়াটাকে মোর এ্যালাও মানি নিতে খুব কষ্ট হয়।। যাক আল্লাহ যেইটা করেন তার উপর তো আর কারও হাত নাই। ভাবি বড় ছওয়াটার নাকি বিয়াও দিয়া ফেলাইছেন?
হ্যাঁ ভাই, কি আর করিম মোর তো আর দেখা শোনা করার মতো কাও নাই, আল্লাহ তো একটা ছেলেও দেয় নাই। কি আর করি ভাই?
আলহামদুল্লিাহ। একটা বিরাট কাজ করি ফেলাইছেন ভাবি। মিনার মাক মাঝে মাঝে মুই কও যে দেখ, ভাবী কি ভাবে একেলায় তিন তিনটা গাবুর মেয়েকে নিয়া সংসার সামলাচ্ছে। একদিন মুই চলি গেইলে তোকেও তাই করির নাগবে।
ছিঃ ভাই, এমন কথা মুখোত আনে না তো? এমন খারাপ জীবন যেন আর কারও জীবনে না আইসে- এই বলে সে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছতে শুরু করল আলেয়া।
হালিমা বলে ভাবি একদিন হামার বাড়িত আইসেন, জীবনে তো কোন্টেও গেলেন না। হামরা তো আর পর নই।
না ভাবী, আপন পর কোন কথা নয়, সংসারটা মাথার উপর পড়ি আছে আর কোন পাশে মন যায় না।
কমলা একটা ট্রেতে বি¯ু‹ট, কয়েকটা পিঠা তার সাথে কিছু ফলমূল নিয়ে এসে ছালাম দিয়ে বলে চাচা কেমন আছেন?
আলহামদুল্লিাহ, ভালো আছি মা। তুমি কোন ক্লাসে পড়ছ?
আমাদের আবার লেখাপড়া। গ্রামের স্কুল ঘর আছে তো দুয়ার নাই, বই আছে তো মাস্টার নাই। গতবছর থেকে এস,এস,সি পরীক্ষার জন্য বই পড়ছি কিন্তু পরীক্ষা দেওয়া হইল না।
হ্যাঁরে মা, সেটাই কোন ভাগ্যের দোসে যে আমরা এখানে বাস করি সেটা আল্লাহই ভালো যানেই।
চাচা, আপনিতো আমাদের বাড়িতে আসাই ছেড়ে দিদয়েছেন। সেই যে কবে আসছিলেন। বাবা বেঁচে থাকতে, তারপর আর আসেন নাই।
হ্যাঁরে মা ঠিকই বলেছ। তাতো তিন চার বছর হবেই।
সেইবার ঈদের পরের দিন এসেছিলেন তাই না চাচা?। বাবার সাথে চা খেতে খেতে কি কথা নিয়ে যেন খুব হাসা হাসি করছিলেন, আপনার অর্ধেক কাপ চা বাবার গায়ে পড়ে পাঞ্জাবীটা ভিজে গিয়েছিল। সেটা আমার খুব মনে আছে। এতোটুকুও ভুলিনি।
আলেয়া কমলার কথাগুলো শুনে খুব আবেগপ্রবণ হয়ে যায়। তারপর হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেলে আবুলের বউ হালিমা আলেয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল। তাদের কান্না শুনে সবার চোখে পানি এসে গেল। গোলাপি টুকটুকি দু’জনে দৌড়ে ঘরে এসে দেখে সবাই কাঁদছে। হালিমা টুকটুকিকে টেনে নিয়ে তার কোলে বসালো। সেখানে এক হৃদয় বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হলো।
অনেক্ষণ নীরব থেকে হালিমা বলল- ভাবী যা হবার সেতো হয়া গেইছে, এ্যালা আর কিই বা করার আছে। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছোত তার জন্য দোয়া করেন। বাচ্চা-কাচ্চা গুলোতো বড় হয়া গেইছে। দেখবেন একসময় সব ঠিক হয়া যাবে। এরপর নাস্তা খেতে খেতে আবুল বলে- ভাভি, শুনেছেন বোধহয় হামার বড় ছেলে রাজু পাটগ্রাম সরকারি কলেজে পড়া শোনা করতো না, ওর চাকরি হইছে লালমনিরহাটে থাকে। ছেলেমানুষ একেলায থাকে নিজে নিজে রান্না করি খায়। অর মা শুধু দিন-রাত চিন্তা করে। হাজার হলেও মায়ের মন তো? তাছাড়া এখন যা দিনকাল পড়ছে। কখন কোন দুর্ঘটনা ঘটি য়ায়। যদিও ছেলেটা হামার ও রকম নয়, তারপরেও মন থাকি তো আর দুর্ভাবনা যায় না। তাই রাজুর মা কইলোÑমেয়ে হামার নিজেদের ঘরেই আছে। জানাশোনা মেয়ে, চোখের সামনে বড় হইল কাজেই হামরা খুঁজির যাই ক্যান? কমলা মায়ের কথাটা মোর এক বারের জন্যও মাথায় আইসে নাই। যাহোক ভাবি হামারতো আর বেটি নাইÑ কমলা মা হামার ঘরে গেইলে মোর বেটির মতোই থাকবে।
হ্যাঁ, ভাই বিবাহযোগ্য ছওয়া ঘরে থাকলে মা-বাবার মাথায় তো একটা ভারের বোঝা সব সময় থাকে। মুইও যে কমলার বিয়ের ব্যাপারে একেবারে চিন্তা করো না, সেটা নয়। তবে ঘরে-বরেতো আগোত মিলা নাগবে।
যা হোক ভাবি, আজ উঠি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হামার বাড়ি আইসেন। তখন বসি কথা কওয়া যাবে। আসি ভাবি, আসসালামুআলাইকুম।
আবুল দম্পতিকে বিদায় দিয়ে আলেয়া একটা তৃপ্তির নিঃশ^াস ফেলল। তারপর মনে মনে ভাবলো, আবুল ভাই যে প্রস্তাবটা দিয়েছে তা করতে পারলে মন্দ হয় না। তবে তার ছেলেটা একটু খাট গায়ের রং ময়লা, কালোও বলা যেতে পারে। কমলা যে তাকে পছন্দ করবে কি না সেটাও দেখার বিষয়। কিন্তু ছেলে মানুষ কালো হোক আর যাই হোক, তবুও সে তো ছেলে, তার উপর আবার সে সরকারি চাকরি করে তার দামই আলাদা।
সকাল থেকে আকাশে কালোমেঘ জমে আছে কখনো আবার মেঘ সরে গিয়ে হালকা রোদও উঠছে। ভাদ্রমাসের তালপাকা রোদ আর ভ্যাপসা গরমে চারিদিক থমথম করছে। গরম হলেও রোদটাকে কাজে লাগানোর জন্য আলেয়া, মাটির কলসিতে রাখা চিকন চাল, এক গাদা চিড়া, কাচের পাত্রে কতগুলো পূরোনো আমের আচার বের করে উঠোনের মধ্যে রোদে শুকাতে দেয়। কুকুর-বিড়াল এসে যেন মুখ না দিতে পারে সে জন্য বারান্দায় একটা মাদুর বিছিয়ে যাঁতি দিয়ে সুপারি কাটে আর কুকুর-বিড়াল পাহারা দেয়।
আকাশ ভালো দেখে বেলাল তাড়া-হুড়া করে বের হয় দোকানে যাওয়ার জন্য, বেলালকে বাহিরে দেখে আলেয়া ডাকে-বাবা বেলাল, একনা বইসো তো? তোমার সাথে কথা আছে।
বেলাল শাশুড়ি মায়ের পাশে বসে। একটা পানে একটু সুপারি দিয়ে খিলি বানাতে বানাতে বেলাল বলে-মা, আকাশটা আইজ ভালো, মোর তাড়াতাড়ি দোকানে যাওয়া দরকার।
আলেয়া বলে- বাবা বেলাল, কমলাকে নিয়ে তো আর পারা যাইতেছেনা, কি করা যায় কওতো।
নূরুল মুন্সির ব্যাটা নাহিদের সাথে কমলা সারাদিন গাছের তলে বসে কল্প করে। কমলা স্কুলের নাম করে প্রয়ই নাহিদের সাথে দেখা করে। এ নিয়ে গ্রামের লোকজন নানান কথা বলে, গোটা গ্রামে সবার মুখে মুখে তাদের কথা। কোন ভাবেই কমলাকে কন্ট্রোলে আনা যাইতেছে না। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর বিয়ে দেওয়া দরকার।
হ্যাঁ মা, মুইও চুপকরি বসি নাই, মনে মনে একটা ভালো ছেলে খুঁজবারে নাগচু। ডাঙ্গাপাড়ার খলিল চাচার ছেলে খোকন, সব সময় দোকানে আইসে। ছেলেটা খুবই নম্র-ভদ্র, ঠাণ্ডা মেজাজের, উচা-লম্বা প্রায় মোর মতই হবে, গায়ের রং একেবারে ফর্সা না একটু ময়লা ধরণের, শ্যামলাও কওয়া যায়। তোমা অনুমতি দিলে মুই তার খোঁজ খবর নিয়া একদিন তাক বাড়ি আনির পাও।
আচ্ছা বেলাল, তোমা কি দক্ষিণ পাড়ার আবুল ভাইকে চেনেন?
হ্যাঁ মা, চিনি। সে তোমার শ্বশুরের খুব আপনজন ছিলো। এমন এক দিন ছিলো যখন ওমা এক কাপ চাও এক সাথে দুইভাগ করি খাইছিলো। আবুল ভাই ও ভাবি আজ বাড়ি আচ্চিলো। কমলাকে দেখি ওমার খুব পছন্দও হইছে। আবুল ভাইয়ের তিনটায় ব্যাটা কোন বেটি নাই। বড় ব্যাটা সংসারের হাল ধরে তাতে সংসারের আয় উন্নতিও করে। এখন তার সংসারে কোন অভাব নাই। আবুল ভাইয়ের খুব ইচ্ছা কমলাক তার বড় বোউ করি নিয়া যাবে। যাওয়ার সময় বারবার তার বাড়ি যাবার কথা কয়া গেলো। মুই তার বাড়ি গেইলে হয়তো এমনও হবার পায় যে, সেদিনই বিয়ার দিন তারিখও ঠিক হয়া যাবার পারে। সেই জন্য ছেলেটার একনা খোঁজ খবর নেওয়া দরকার, তোমার কি মনে হয় বাবা?
সবই ঠিক আছে মা, তবে রাজুকে দেখলে যে তোমা পছন্দ করবেন কিনা সন্দেহ আছে। কালো কিচকিচে খাটো একনা চ্যাংরা, এতটাই হালকা পাতলা শরীর যে, এ্যাকনা জোরে বাতাস আসিলে মনে হয় উল্টি পড়ি যাবে।
সে জন্যই তো মুই তোমার অপেক্ষায় বসি আছো বাবা, আসলে এ্যালা কি করা যায়, সেটা একনা ভাবি দেখো। শোন বাবা বেলাল, মানুষ কি আর এক জনমে সব পায়? তাছাড়া পুরুষ মানুষের আবার চেহারা ছুরত কি দেখো, ন¤্র-ভদ্র, আচার ব্যবহারে ভালো হইলেই হয়। মানুষ যেন কবার না পাায় যে, অমুকের জামাইটার ব্যবহার খারাপ। বাবা তাহলে আর দেরি করা যাইবে না, যতো তাড়াতাড়ি হয় কমলার বিয়া দিয়া মোক এ্যাকনা চিন্তা মুক্ত করো।
আচ্ছা মা, রাত পোহাইলে আগে ছেলেটার একনা খোঁজ খবর ন্ওে। মা-মুই এলা দোকানে যাও।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now