বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৭
আমজাত মিয়ার মধ্যবিত্ত সংসার। বাপের আমলের জায়গা সম্পত্তি যা ছিলো তা দিয়ে ভালোভাবেই সংসার চলতো। অবশ্য আমজাত এ সম্পত্তিতে তার মায়ের পেটের আপন বোনেরাও ওয়ারিশ ছিলো, তবে কোন বোনই এ পর্যস্ত তাদের প্রাপ্য অধিকার নিয়ে সম্পত্তির ভাগ বসাতে আসে নাই। সে কারণে আমজাতের সংসারে বছর শেষেও দু’চার মন ধান, পাট জমা থাকে। আমজাত বেশ সৌখিন মানুষ ছিলো। খুব ভালো দোতারা বাজাতে পারতো। গানের গলাটা ভালো ছিলনা বলেই তার গায়ক হওয়ার সাধটা পূরণ হয়নি। আমজাত মিয়ার তিন মেয়ে, কোনো ছেলে সন্তান নেই। অবশ্য এ নিয়ে তার কোন দুঃখ বা হা-হুতাশও নেই। বড় মেয়ে গোলাপি, মেজ কমলা আর ছোট মেয়ে টুকটুকি। আমজাত মিয়ার বউ আলেয়া বেগম খুবই ভদ্র ও ন¤্র স্বভাবের। সারাদিন রান্না-বান্না, সংসারের কাজ কর্ম আর মেয়েদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এটাই তার বেঁচে থাকার জগৎ। এর বাইরে কোন কিছু চিন্তা করার অবকাশ তার নেই। তবে কাজের ফাঁকে একটু অবসর পেলেই তিনি একা একা বসে ভারাক্রান্ত মনে ভাবেন তার ঘরে একটি ছেলে সন্তান দিলে সৃষ্টিকর্তার কি এমন ক্ষতি হতো?
আমজাত মিয়ার স্বপ্নছিল মেয়েদেরকে গান-বাজনা শিখিয়ে বড় শিল্পী বানাবে, তার মতো করে গড়ে তুলবে কিন্তু আলেয়ার জন্য সেটা করতে পারেনি। আলেয়া ছিলো এর ঘোর ঘোর বিরোধি। আলেয়া বলে-হামার ধর্মে গান-বাজনা করা নিষেদ। হুজুর কইচে, মেয়ে মানসির গলার আওয়ার পর পরুষে শুনলেও পাপ হয়। তাদের চেহারা মোবারক অন্য মানুষ দেখে আকৃষ্ট হলে সেটা আরও পাপ। গোলাপির বাপ, তোমা নিজে না হয় বাউল হয়া দোতারা ধরি রাস্তায় রাস্তায় গান কয়া বেড়াও তাতে মোর কোন আপত্তি নাই কিন্তু ছওয়াগুলাক তোমা নষ্ট করেন না।
আমজা মিয়া সুযোগ পেলে মাঝে মধ্যে ছোট মেয়ে টুকটুকিকে বলে বেটি ধরতো হারমেয়িামটা। বাবা-মেয়ে মিলে শুরু করে দেয় গানের আসর আর মেজ মেয়ে কমলা চুপ করে থাকতে না পেরে মন্দিরা হাতে নিয়ে বাবার পাশে বসে পড়ে। এভাবে সুখে-দুঃখে কেটে যায় দিন।
আলেয়া রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে ভাবে, যে যার মতো করে সংসারে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি কিন্তু পরিতৃপ্তির জায়গাটি শূন্যই থেকে যায়। আবার মনে মনে এটাও ভাবে যে. আল্লাহ যদি তার ঘরে সন্তান হিসেবে ছেলে না দিয়ে আবারও মেয়েকে পাঠিয়েদেন তাহলে কিইবা করার থাকবে তাদের? আলেয়া অনেক লোকের মুখে শুনেছে যে, অন্ধহাফেজ সাহেবের মাজারে গিয়ে কোন কিছু মান্নত করে যা চাওয়া যায় তাই নাকি পাওয়া যায়। অনেক নিঃসন্তান ব্যক্তি সেখানে যেতে মান্নত করে সন্তানের মা-বাবা হয়েছেন। তাই সে ঠিক করে, যে করেই হোক একদিন সে গোলাপির বাবাকে বলে-কয়ে রাজি করিয়ে অন্ধ হাফেজ সাহেবের মাজারে নিয়ে যাবে। তারপর সেখানে মাজার জেয়ারত করে একটা কিছু মান্নত রেখে অন্ধহাফেজ বাবার কাছে একটি ছেলে সন্তানের আব্দার করবেন। তার বিশ্বাস পীরবাবা তাকে কখনো খালি হাতে ফেরাবেন না। একদিন তারা খুব সকাল সকাল উঠে গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে চলে যান অন্ধ হাফেজ বাবার মাজারে। মাজারের দানবাক্সে কুড়ি টাকা ফেলে একটি ছেলে সন্তানের জন্য আলেয়া খুব কান্না কাটি করে বলে- অন্ধ হাফেজ বাবা যদি তার কোলে একটা ছেলে সন্তান দেন তাহলে আগামি বছর বাৎসরিক ওরস শরিফ মাহফিলে একটা খাসি কিনে দিবেন।
চৈত্রমাসের কাঠফাটা রোদ, মাথার উপরে র্সূয্য। রোদের তাপ এতটাই প্রখর যে পৃথিবীর সবকিছুই যেন আজ জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। মাঠে বাঁধা গরু-ছাগলগুলো রোদের তাপে জিভ বেব করে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। আমজাত মিয়া মাঠে যায় গরু-ছাগলগুলোকে এনে ছায়ায় বেঁধে পানি খাওয়ানোর জন্য। কিস্তু যেয়ে দেখে যে, ধান ক্ষেতের মধ্যে অনেকগুলো বড় বড় আগাছা জন্মে ধানের চারার চেয়ে বেশি লম্বা হয়ে গেছে। সে ধানক্ষেতে নেমে আগাছাগুলোকে তুলে ফেলে একটু ছায়ায় দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই গরুগুলো তাকে দেখে হাম্বা হাম্বা ডাক শুরু করে। প্রচÐ রোদের তাপে ছায়ার খোঁজে ছুটোছুটি করতে গিয়ে কয়েকটা গরু একসাথে জটলাবেঁধে রশিগুলোর এমন শক্ত গিঠ পাঁকিয়েছে যা কোন ভাবেই খোলা যাচ্ছে না। অনেক্ষণ যাবত সেই গিঠ খোলার চেষ্টা করছে আমজাত মিয়া। রোদের প্রখরতা এতটাই বেশীছিল যে, তাপে আমজাত মিয়ার মাথার মগজ যেন গলে পড়ে। হঠাৎ তার মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে, দু’চোখ ঝাপসা হয়ে যায়, চারিেিক অন্ধকার দেখে। তাই সে টলতে টলতে কোন রকমে গাছের নিচে এসে বসে পড়ে একটু জুড়ানোর জন্য। অনেকক্ষণ তার কোন সাড়া-শব্দ না পাওয়ায় আলেয়া বাড়ির বাইরে এসে মনে মনে আমজাতকে খোঁজে। কিন্তু কোথাও তাকে দেখতে না পেয়ে একটু এগিয়ে যায় মাঠের দিকে। হঠাৎ চোখে পড়ে গাছতলায় কে যেন বসে আছে। গোলাপির বাপ কিনা সেটা দেখার জন্য কাছে যায়। আমজাত মিয়া আমগাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে।
কি গোলাপির বাপ? তোমা এ্যাটেকোনা বসি বাতাস খাবার নাগছেন? আর মুই তোমাক সাড়াবাড়ি হয়রান হয়া খুঁজি বেড়াবার নাগচু?
কিন্তু আমজাত মিয়ার কোন সাড়াশব্দ না পাওয়ায় তার মাথায় হাত দিয়ে একটা আলতোভাবে ধাক্কা মারে আলেয়া। অমনি সে হুড়মুড় করে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ তার এমন অবস্থায় সে হতভম্ব হয়ে যায়। ঠিক এ মুহুর্তে তার কি করা উচিত, সেটি মাথায় আসে না। গোলাপিকে একটা চিৎকার দিয়ে ডেকে সে বাড়ির দিকে দৌড় দেয়। মায়ের ডাক শুনে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে গোলাপি, কমলা ও টুকটুকি। সবাই মিলে কেউ পানির বালটি, কেউ হাত পাখা নিয়ে আমজাতের কাছে যায়। আলেয়া তার মাথায় পানি ঢালে কমলা বাবার মাথায় পাখা দিয়ে বাতাস করে। অনেক্ষণ পানি ঢালার পর আমজাত চোখ খুলে তাকায় তারপর কি হয়েছে তার সে জানতে চাইলে আলেয়া বলে-চলো আগে ঘরে যাই, বিছানায় শুয়ে আরাম কর তারপর তোমাকে সব বলব। কিছুক্ষণের মধ্যে আমজাতের গায়ে প্রচÐ জ্বর ওঠে। সেই জ্বরের তাপমাত্রা এতো বেশি যে, সে আবোল-তাবোল বকতে থাকে। ডাহাগ্রামের প্রফুল্ল ডাক্তার এসে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলেন- হঠাৎ তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। তার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো বলে এ যাত্রায় তিনি বেঁচে যান। এরপর তাকে খুব সাবধানে চলতে হবে, অন্যথায় ভবিষ্যতে খুব খারাপ পরিণতির সৃষ্টি হতে পারে।
আমজাত মিয়া সেই যে বিছানায় পড়ে গেলো আর সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে পারলো না। অবরুদ্ধদ ডাহাগ্রামে না আছে ডাক্তার, না আছে কোন হাসপাতাল। তার ওপর চারিদিক থেকে ভারতের লোকেরা ডাহাগ্রাম-আঙ্গরপোতাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। এভাবে কয়েক মাস শয্যশায়ী হয়ে থাকা পর বিনা ওষুধে, বিনা চিকিৎসায় একদিন পৃথিবীর সব মায়া-মমতা ত্যাগ করে আমজাত মিয়া চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আমজাতের লাসের উপরে পড়ে তার আদরের তিন মে কাঁদতে লাগলো কিন্তু কি আর হবে কেঁদে, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। পাড়া পড়শি সবাই এসে হা-হুতাশ করে, আফসোস করে বলে আহারে! বেচারা একেবারে মাটির মানুষ ছিল। বড় ভালো লোক ছিল, সে জীবনে কোন দিন কার ক্ষতি করেনি, কাউকে একটা গালমন্দ পর্যন্ত করেনি। সারা জীবন গান বাজনা আর তার দোতারা নিয়েই কাটিয়ে দিল। নূরল মুন্সি এসে বলে-আসলে এ পাপের দুনিয়ায় আল্লাহ তাঁর খাঁটি বান্দাদের বেশীদিন রাখেন না। যে যতো তাড়াতাড়ি দুনিয়া ছেড়ে যাইতে পারে ততোই তার পাপ কম হয়।
জীবনে অনেক হারিয়েছে আলেয়া, এখনও মাঝে মধ্যে সেই হারানোর ভয়টা তার পিছু ছাড়ে না। কিছু হয়তো সাময়িক কালের জন্য হারিয়ে য়ায় আবার ফিরেও আসে। কিছু চিরকালের জন্য পথের ধুলায় লুটিয়ে পড়ে। এরই মাঝে জীবনের নিত্য নতুন গল্প সাজে নতুন স¤ভাবনায়। এটুকুই আমার নিজেস্ব পুঁজি, যাকে খুজে বেড়ানোর ব্যস্তায় কাটে দিন মাস, বছর। হার-জিতের খেলা খেলি নিজেই নিজের সাথে, নিজের ভাগ্যের সাথে। অতর্কিত ভাবে এসে পড়া দুঃখবোধ ঝেড়ে ফেলে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করি।
একদিকে স্বামীগত হওয়ার শোক, আর অন্যদিকে মাথার উপর বিবাহযোগ্য দুইটা যুবতী মেয়েকে নিয়ে আলেয়া বেগম চারিদিকে অন্ধকার দেখতে শুরু করে। নিজেকে যতোই এসব চিন্তা ভাবনা থেকে দুরে রাখতে চায় কিন্তু মাথার মধ্যে এমনিতে চিন্তার ভুত এসে গিজগিজ করে। বিকাল বেলা অলস সময়টিতে তিন মেয়েকে নিয়ে আলেয়া বাহিরের বারান্দায় বসে গল্পগুজব করছে। এমন সময় হারুন মিয়া ছাতা মাথায় দিয়ে হেটে যাচ্ছে। আলেয়র তিন মেয়েকে এক সাথে দেখে হারুন মিয়া একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে- আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন ভাবিসাব?
আলহামুলিল্লাহ-ভালো আছি ভাই। অনেকদিন দেখি না। হামাল্লার কথা কি ভুলি গেইছেন ভাইজান?
না ভাবিসাব সেটা কি হয়? আসলে মোকতো চাইরো পাশে দৌড়া নাগে, সেই জন্য টাইমে হয় না।
অনেকদিন পর এই পাশে, তা কোন্টেকেনা যাবার নাগছেন ভাই?
জসমুদ্দিন ভাইয়ের বোউ, লোক মারফত ম্যালাদিন থাকি খবর দিবার নাকচে, আইজ কয়া পাঠাইছে, খমকায় যদি মুই না যাও তাহলে নাকি আর কোন দিন মোক ডাকাবে না।
অপরিচিত মানুষকে আসতে দেখে গোলাপিরা তিন বোনই উঠে বাড়ির ভিতরে চলে যায়। এই সুযোগে আলেয়া হারু ঘটককে একটা টুল এগিয়ে দিয়ে বলেন, বইসো ভাই, এ্যাকনা পান খাও । ম্যালা দিন তোমাক খুঁজি ব্যাড়ের নাকচু।
গোলাপিকে ডেকে পান আনতে বলে-আলেয়া ঘটকের দিকে ঘুরে বসে এক রকম তার কানের কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বলে-
ভাইসাব, তোমাতো মোর সমন্ধে তামানে জানেন, গোলাপির বাপ মোক অকুলে ভাসে দিয়া চলি গ্যালো। ঘরে গাবুর দুইটা ছওয়াক ধরি মুই খুব চিন্তায় আছো। সারারাত মোর নিন্দে আইসে না। এদিক-সেদিক যে এ্যাকনা ছেলে দেখা দেখি করি বেড়াবে মোরতো সেই লোকটাও নাই। তোমার উপর মোর অনুরোধ, একটা ভালো ছেলে দেখি মোর বাপমরা ছওয়াটার একটা গতি করি দ্যাও।
আরে না ভাবিসাব, এমন করি ক্যান কবার নাগচেন, এগুলাতো হামারে ছওয়া। আচ্ছা ভাবিসাব, জসমুদ্দিন ভাইয়ের বড় ছেলেটাক তোমা চেনেন না?
জসিমুদ্দিনের ছেলের কথা শুনে আলেয়া হঠাৎ চমকে ওঠে। তারপর একটু স্বাভাবিক হয়ে বলে-হ্যাঁ ভাইসাব, একই পাড়ায় থাকি না চিনার কি আছে, খুব ভালো করি চিনি। জসমুদ্দিন ভাইয়ের বউ মাঝে মধ্যেই মোর কাছোত আইসে। গল্পগুজব করে গুয়া-পান খ্যায়া যায়।
তাহলেতো কথাই নাই। ভাবিসাব, ওমার ঘরোত কি সাগাই করা যায় না? ছওয়া হামার বাড়ির বগলোতে থাকিল হয়, যেলায় মন চায় টপকরি এ্যাকনা ভালো-মন্দ খবরও নিবার পাইলেন হয়। সবায় জানা শোনা মানুষ হামার।
আলেয়া এবার ওঠে দাঁড়াল, এদিক-ওদিক তাকিয়ে ভালো করে দেখেনিল কেউ আশে-পাশে আছে নাকি তারপর বলতে শুরু করল- ‘শোনো ভাইজান, ঐ বেয়াদপ চেংড়ার ব্যবহারে তার মা একেবারে মাটিত মুখ নাগাইছে। এদিক দিয়া কোনটে গেইলে, ভাবি মোর কাছোত না বসি যায় না। তার সুখ-দুঃখের সব কথা মোক কয়া নিজে বোধায় এ্যাকনা হালকা হয়।
একদিন এইটে কোনা বসি ভাবি মোক কয় যে- তোমার বেটাছেলে না হয়া তোমা বাঁচি গেইছেন ভাবি, একেবারে বেহেস্তে আছেন। যতো জ্বালা হইছে মোর, ক্যান যে আল্লাহ ঐ কুপুত্রটাকে মোর ঘরোত পাঠাইল।
ভাইজান তোমা বোধায় জানেন না, জবেদ আলির বেটি ময়নাক বিয়া করির কথা কয়া তার সাথে রাইতের পর রাইত কাটায় সেই লম্পট খলিল। ময়না গর্ভবতী হয়া গেইলে এদিক ওদিক সব জানা-জানিও হয়া যায়। জবেদ আলি মনের দুঃখে তার অসুস্থ বেটিকে ধরি দুই তিনদিন মার-ধোরও করে। মান সম্মানের ভয়ে বেচারা কাকো কোন কবারোও পায় না। শুধু রাইতের অন্ধকারে ললিত মেম্বরের বাড়ি য্যায়া তাক বিচার দিয়া আইসে। ললিত মেম্বার, খলিলের একপালা টাকা খ্যায়া বিচার না করি চুপ করি থাকে। নিজের জাত-কুলমান বাঁচাতে ময়না, খলিলকে বিয়ার জন্য চাপ দেয়, কিন্তু লম্পট চ্যাংরা তাক বিয়া না করি বাড়ি থাকি পালে যায়। ময়না সমাজে মুখ দ্যাখের না পায়া একদিন গভীর রাইতোত মনের দুঃখে, লজ্জা, ঘৃণা, অপমানের সব কলঙ্ক নিজের মাথায় নিয়া তিস্তা নদীত ঝাঁপ দেয়।
ভাইসাব, তোমা মোর গোলাপির জন্য অন্য ছেলে দ্যাখো, হোউক সে গরিব ঘরের ছেলে, আচার ব্যবহারে যেন সে হয় একেবারে খাঁটি সোনা। দরকার হইলে তাক আনি মুই আলাদা বাড়ি করে দিম।
ঠিক আছে ভাবিসাব, আজ তাহলে উঠি, কাইল বিকালে মুই একবার আসি তোমার সাথে দেখা করি যাইম।
লোকটিকে এর আগে না দেখলেও তার ছাতা ধরার স্টাইল আর চাল চলনের ভঙ্গি দেখে গোলাপির মনে অনেকটা সন্দেহের দানা বাঁধে। তাই সে জানালার কাছ ঘেঁষে একেবারে কান লাগিয়ে দেওয়ার মতো করে দাঁড়িয়ে মায়ের সাথে তার কি কথা হচ্ছে তা শোনার চেষ্টা করে। তার মা ঘটককে ছেলে দেখার কথা বললে সেটা নিজ কানে শুনে মনে মনে ভীষণ লজ্জা পায় গোলাপি। বুকের ভেতর একটা নতুন আমেজ শিরশির করে ওঠে। বিয়ের বয়স তার যদিও হয় নাই কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর কেন জানি আর ভালো লাগে না। সবসময় কোথায় যেন একটা শূন্যতা বিরাজ করে, চারিদিকে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কেন জানি মনে হয় শূন্য এ বুকটায় কাউকে জড়িয়ে ধরতে পারলে হয়ত এ শূন্যতা অনেকাংশে কমে যেত। সম্মুখে লজ্জা পেলেও ভেতরে ভেতরে সে বিয়ের জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ে। কিন্তু কেমন হবে সেই ছেলেটা যদি তার মনের মত না হয়, তখন কি হবে? গতোবছর শীতকালে ফিরোজা নামে তার এক ঘনিষ্ট বান্ধবীর বিয়ে হয়। তার কাছে সে শুনেছে বিয়ের প্রথম রাতটাকে নাকি খুব ছোট মনে হয়, নিজের অজান্তেই সকাল হয়ে যায়। এসব কথা ভেবে নিজে নিজেই যেন লজ্জায় লাল হয়ে যায়। আয়নায় নিজেকে দেখতেও লজ্জা লাগে। অন্য মানুষ তো দুরের কথা নিজের মায়ের সামনে আসতেই তার লজ্জা লজ্জা ভাব আসে। বিয়ের পর একটা ছেলের সাথে এক ঘরে একই বিছানায় শুয়ে রাত কাটাতে হবে। আবার পরের দিন সকালে সবার সাথে দেখা হবে, ছিঃ কি যে লজ্জার বিষয়। কেন যে এই বিয়ে বিয়ে খেলার প্রথাটা দুনিয়াতে শুরু হলো? আবার বান্ধবীর কথা গুলো মনে পড়লে মনটা ভীষণ চঞ্চল হয়ে ওঠে, আর তর সয় না।
হারু ঘটককে বিদয় দিয়ে বাড়িতে ঢোকা মাত্রই গোলাপি তাকে জিজ্ঞাসা করে, লোকটা কে মা? কেন এসেছিল?
মেয়ের এমন প্রশ্নে আলেয়া থতোমতে হয়ে য়ায়, তাকে কি বলবে এখন। হঠাত তার স্বামীর কথা মনে পড়ে যায় তাই পাশকাটিয়ে বলে-লোকটা তোর বাবার বন্ধু। অনেক দিন দেখা হয় না, তাই এ্যাকনা সুখ-দুঃখের গল্প করিনো।
বাবার বন্ধুতো বাড়ির ভেতরে ডাকালে না ক্যান?
একটা মিথ্যাকে চাঁপা দেওয়া যে কি কষ্টের, হাজারো মিথ্যার আশ্রয় নিয়েও তার শেষ রক্ষা হয় না। মেয়ের সামনে অপদস্ত হওয়া থেকে বাঁচার জন্য সে মাথা ঠাÐা রেখে বলে--আরে না তার সময় নাই, বসিবারে চাইছে না। চা খাবার কথা কইলে আর একদিন আসিবার কথা কয়া চলি গ্যালো।
গোলাপি তার মার মুখ থেকে কোন কথা বের করতে পারলো না। তাই মনে মনে বললো দেখি কালকে ঘটক আসে কি না। বিয়ের কথা যতোবার ভাবে ততোবারই একটা গোপন লজ্জায় বুকের ভেতরটা ধুক-ধুক করে ওঠে। কখনো কখনো সুখের অনুভুতি শরীরের রক্তের ভেতর শিরশির করে। আবার কখনো কখনো হতাশা ও ভয়ের একটা বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন চোখর সামনে দুলতে থাকে।
সপ্তাহখানেকের মাথায় গোলাপির বিয়ে হয়ে যায় বেলালের সাথে। কোন রকম ধুম-ধাম ছাড়াই খুব সাদামাঠা ভাবেই বিয়ের কাজ সম্পন্ন হলো। কুলসুমের খুব ইচ্ছে ছিলো বড়ছেলের বিয়ে খুব ধুম-ধাম করেই দেবে কিন্তু এখন তাদের কি আর সেই দিন আছে? ঘর আছে তার দুয়ার নাই, নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন অবস্থায় সংসার থেকে দু’চারটাকা খরচ করাই কষ্টকর। আর ছেলের বিয়েতে অতিরক্ত খরচ আসবে কোথা থেকে?
বিয়ে যেভাবে হয় হোক, এ নিয়ে হারু ঘটকের গাল-গপ্পের শেষ নেই। তার ভাব খানা এমন যে, পৃথিবীর এমন কোন কাজ নেই যা সে করতে পারে না। এ বিয়েতে তার আসা যাওয়া ও এদিক সেদিক দৌড়া দৌড়ি জন্য খরচ বাবত আলেয়ার কাছ থেকে কড়কড়া হাজার টাকাও সে বুঝে নেয়। আর আলেয়াও বেলালের বেলালের মতো একটা ভদ্র, শান্তশিষ্ট জামাই পেয়ে মহাখুশি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now