বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৬
এমনি একটি দিনছিল “উনিশ শত পয়ষট্টি” সালের সেপ্টেম্বর মাস, ভারত পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে সুবিধা আদায় করতে ব্যার্থ হলে, কাশ্মীরকে নিয়ে ভারত যখন টাল-মাটাল অবস্থার মধ্যে পড়ে তখন ‘উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাঁপাতে’ ভারতীয় সেনাবাহিনী মেখলীগঞ্জের ফুলকাটা ডাবড়ী বি.এ.এফ ক্যাম্পের সহায়তায় ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার বেসামরিক অসহায় মানুষদের ওপর নির্লজ্য আক্রমণ চালায় এবং ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাকে তাদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর লক্ষ্য ছিলো এখানকার জনগণকে তাড়িয়ে দিয়ে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাকে তাদের দখলে নেওয়া এবং পরবর্তি কালে সুবিধেমত হিন্দু বসতি স্থাপন করা। কারণ সেদিন যারা নির্যাতনের শিকার হয়ে ঘর-বাড়ি থেকে বিতারিত হয়েছিল তারা শুধু মুসলমান নর-নারী ছিলো। কোন হিন্দু ধর্মালম্বির বাড়িতে আক্রমণ করা হয়নি কিংবা কোন হিন্দু ধর্মালম্বির উপর কোন নির্যাতনও করা হয়নি। এখনে স্পষ্টভাবে ভারতের দুরভিসন্ধির আভাস পাওয়া যায়। যা অনেকটা জাতিগত সহিংসতার বহিঃপ্রকাশ। পৃথিবীর বহুদেশেই যুদ্ধ বিগ্রহ হয়, কিন্তু বেসামরিক নিরিহ ও অসহায় মানুষের উপর সরেজমিনে অতর্কিত হামলার কথা খুব কমই শোনা যায়।
ডাহাগ্রাম-অঙ্গাপোতাবাসী যখন ভারতে যেতে পারে না, তাদের বন্দিদশার অবস্থা থেকে একটুখানি স্বস্থির জন্য, একে অপরের সাথে দেখা সাক্ষাত, মতবিনিময়, গল্পগুজব করার জন্য স্যাঁকোয়া নদীর পারে নয়ারহাট নামে একটি ছোটখাট বাজার বানিয়ে নেয়। মানুষজন এখানে তাদের পণ্য নিয়ে এসে অনেকটা আদিম যুগের মানুষগুলোর মতো করে পণ্য বিনিময়ের করে। কারণ তাদের হাতে তো কোন টাকা পয়সা নেই। ঘটনার দিন লোকজন এসেছিল সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় টুকিটাকি বেচা-কেনা করার জন্য। বিকেলের পড়ন্ত বেলা তার শেষ যবনিকা টানতে শুরু করে, পশ্চিম আকাশের মেঘগুলো ক্রমশ খোলস পরিবর্তন করে হলুদ রঙ ধারণ করে। স্বাবলম্বি পাখিগুলো দিনের আহার শেষে নীড়ে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে, মাঠে বেঁধে রাখা গরু-ছাগলগুলো ঘাঁস খাওয়া ছেড়ে মাথা উচু করে তাদের মালিকের আসার পথে চেয়ে আছে। এমন সময় ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার উত্তর ও পূর্বদিক হতে হৈহৈ করে লোকজন দৌড়ে আসছে, লক্ষ্যছিল তিনবিঘা পার হয়ে পূর্ববাংলার পাটগ্রামে প্রবেশ করা। কি হয়েছে? কি কারণে তারা এমন করে দৌড়াচ্ছে এসব প্রশ্ন এখন অবান্তর, আগে প্রাণ বাঁচাতে হবে।
ভারতীয় সামরিক বাহিনী ফুলকাটা ডাবড়ি (বি.এস.এফ) ক্যাম্পের সহায়তায় প্রথমে ডাহাগ্রাম-অঙ্গাপোতার ডাঙ্গা পাড়ায় হামলা শুরু করে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে বেধক মারধর করছে, গুলি করছে, মা-বোনদের গর্দানে রাইফেলের বেয়োনেট ঠেকিয়ে গুলি করার জন্য ধুমকি-ধামকি দিচ্ছে। তাজা-পোক্ত যুবকদের ধরেধরে পেটাচ্ছে। বাড়িতে ঢুকে প্রতিটি ঘর, শোয়ার খাটের তল, ধানের গোলা, তন্ন তন্ন করে খোঁজা হচ্ছে কেউ যেন লুকিয়ে থাকতে না পারে, গোপনে পিছন থেকে আক্রমণ না করতে পারে। কারণ তারা জানত ডাহাগ্রামের সৈয়দপাড়ায় পূর্বপাকিস্তানের পুলিশ ক্যাম্প ছিল, অস্ত্র-শস্ত্রে তারা সুসজ্জিত। এজন্য ভারতীয় সামরিক বাহিনী মেখলীগঞ্জের বর্ডার হয়ে অঙ্গারপোতার ডাঙ্গাপাড়া নামক স্থানে অতর্কিত ভাবে হামলা চালায়। তাদের উপর পালটা আক্রমণ হতে পারে ভেবে তারা অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গোলা বারুদে সমরসাজে সজ্জিত হয়ে এসে আক্রমণ করে।
ডাহাগ্রামের সৈয়দপাড়ায় পূর্বপাকিস্তানের যে পুলিশ ক্যাম্প ছিলো, তাতে নামে মাত্র কয়েকজন পুলিশ ছিলো আর অস্ত্র-শস্ত্রেও তারা পরিপূর্ণ ছিল না। ভারতীয় অস্ত্র ও গোলা বারুদে সজ্জিত বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার মতো কোন কিছুই তাদের ছিলো না। তাই পূর্বপাকিস্তানের পুলিশগুলো অস্ত্র ও পোশাক ছেড়ে সাধারণ জনগণের সাথে মিশে যায়। ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসী এমনিতেই পাখির খাঁচার মতো বন্দি দশায় থেকে থেকে আতঙ্কিত, তার উপরে আবার ভারতীয় সামরিক বাহিনীর রনসজ্জায় সজ্জিত অবস্থায় অতর্কিত আক্রমণে ভীত সন্ত্রস্ত ও অসহায় হয়ে পড়ে। তাই প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে তারা বেসামাল হয়ে এদিক-সেদিক ছুটো-ছুটি করতে থাকে। কি বিভৎস সে দৃশ্য! প্রাণ বাঁচানোর জন্য মানুষের কি করুণ আঁকুতি, বেঁচে থাকার কি অদম্য প্রচেষ্টা। নারী ও শিশুদের কান্নায় গোটা গ্রাম যেন নরকের নিবাসে পরিণত হয়। সবাই শুধু প্রাণের ভয়ে দৌড়াচ্ছে আর দৌড়াচ্ছে। কেউ কার কথা শুনছে না, শোনার মতো মন কিংবা অবস্থা কোনটাই এখন নেই। ভারতীয় সামরিক বাহিনী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে বেধর হারে পিটিয়ে ঘর ছাড়া করছে আর যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এতো দিনের সাজানো-গুছানো সংসার ও ঘর-বাড়ি ছাড়তে চায়নি, তাদের কপালে ছিল অমানসিক নির্যাতন। ভারতীয় বাহিনীর কাছে কোন নারী-পুরুষের বাদ-বিচার ছিলো না, চোখের সামনে তারা যাকে পেয়েছে সে নারী হোক আর পুরুষই হোক দু’ঘা না খেয়ে কেউ রেহাই পায় নি। ম্যাচ ঠুকিয়ে আগুন দেয়া হয়েছে ঘরে। তাদের চোখের সামনে দাউ-দাউ করে পুড়ে যাচ্ছে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তিল-তিল করে গড়া মাথা গোজার ঠাঁই, বেঁচে থাকার সব অবলম্বন। হাজার হাজার মানুষ একই সাথে প্রাণের ভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়াচ্ছে। তাদের বাড়ি-ঘর, এতোদিনের সাজানো সংসার আগুনে জ্বলছে, তাতেও কোন ভ্রুক্ষেপ নেই তাদের। জীবনের মায়া-সব চেয়ে বড় মায়া, মানুষ সবচেয়ে বেশী ভালো বাসে তার জীবনকে। তাই হয়তো তারা ধরে নিয়েছে আগে জীবনটা বাঁচুক তারপর না হয় বাড়ি-ঘর দেখা যাবে।
নিজের বউ-বাচ্চাকে চোখের সামনে অন্যকেহ ধরে মারবে, অশ্লিলভাবে শারীরিক নির্যাতন করবে, শরীরে একবিন্দু পরিমাণ রক্ত থাকা অবস্থায় কোন পুরুষ তা সহ্য করতে পারে না। বাচ্চাউ বুড়ার পারে নাই, তাই স্ত্রী-সন্তানদের বাঁচাতে সে বীরের মতো এগিয়ে যায় মানুষরূপী হায়েনাদের সামনে। অমনি তারা আক্রোমনাত্মক ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাচ্চাউ বুড়ার উপর, একেবারে সামন থেকে তাক করে গুলি করে তার পায়ে। গুলি লাগার পর তার পাগুলো ঝাঁজরা হয়ে যায় বুলেটের আঘাতে। হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে যায় বাচ্চাউ বুড়া একপর্যায়ে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। বাচ্চাউ বুড়া মরে গেছে এই ভেবে তারা তাকে ছেড়ে দেয়। বাচ্চাউ বুড়াকে বাঁচাতে যারা এগিয়ে আসে তাদের উপর শুরু হয় অমানষিক নির্যাতন। রাইফেলের বেয়োনেটের গুতা আর পরনের বুটজুতো দিয়ে একের পর এক লাথি।
ভারতীয় সামরিক সৈন্যরা অন্যদিকে চলে গেলে বাচ্চাউ বুড়ার বউয়ের চোখ পড়ে যায় তার উপর সে দেখে বুড়ো বেহুস হয়ে পড়ে আছে। রক্তমাখা শরীরে শুধু চোখ দু’টো টলটল করছে, মুখে কোন কথা নেই। পা থেকে দরদর করে ঝরে পড়ছে তাজা রক্ত। বুলেটের অসহ্য যন্ত্রণায় বুড়ো বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে আর তারপাশে বসে স্ত্রী-সন্তানেরা চিৎকার করে কাঁদছে। একেতো ঘর-বাড়ি সহায় সম্বল সব আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, তার উপর আবার গুলির আঘাত কিভাবে জীবন বাঁচে? অবশেষে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার অসহায় মানুষগুলোর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে চিরদিনের জন্য চোখ দু’টো বন্ধ করে বিদায় নেয়।
গোটা গ্রামের মানুষ যেয়ে জড়ো হয় তিনবিঘার বর্ডারে কালারডাঙ্গা নামক স্থানে। সেখানে গাছের তলে, মাঠে-ঘাটে, শষ্য ক্ষেতে, খোলা আকাশের নিচে যে যেখানে পায় বসে পড়ে। তাদের লক্ষ্য একটাই যে কোন ভাবে তিনবিঘা পার হয়ে পূর্ববাংলায় প্রবেশ করা, এতে অন্তত জীবনটা রক্ষা পাবে। কিন্তু তিনবিঘায় কড়া পাহারায় রাইফেল তাক করে বসে আছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী-(বি.এস.এফ)। প্রাণের ভয়ে কেউ রাইফেলের সামনে যাওয়ার সাহস পায় না, এক পা সামনে আগায় তো দু’পা পিছু হটে যায়। এভাবে জীবনটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণতে থাকে তারা।
দিনের আলো গেলে আস্তে আস্তে নেমে আসে অন্ধকার। বাড়ে সাপ, জোঁক আর মশাদের উৎপাত। আহার নেই, নিদ্রা নেই, হাজার হাজার মানুষ এভাবে খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টিতে ভিজে বন্যপশু আর কীটপতঙ্গের সাথে সহবাস করছে। অনাহরে থেকে থেকে কোলের বাচ্চা শিশুগুলোর গলা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে, কাঁদার শক্তিও তাদের নেই। রাতের অন্ধকারে কুঁড়েঘরগুলোতে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন, অনেক দুর থেকে সেই আগুনের জ্বলন্ত শিখা যেন গৃহহারা মানুষগুলোর বুকের ভেতরটাও জ্বলে পুড়ে ছাই করে দিচ্ছে।
দিগন্তের সীমানা আজ আর অন্ধকার নেই দকদকে আগুনের লেলিহান শিখা, বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে লকলক করে উপরে উঠছে আগুন। এখন আর ভারতীয় সৈন্যরা আশেপাশে নেই, লুকিয়ে তাদেরকে পাহারা দিচ্ছে কেউ যেন তিনবিঘা পার হয়ে ওপারে যেতে না পারে। পাশের বিরাট বটগাছটার উপর থেকে একটা ঝপঝপ শব্দ আসে, সবার কান খাড়া এই বুঝি ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বি.এস.এফ) এসে তাদের উপর হামলা করে, কিন্তু না কোন এক রাতজাগা পাখি ডানার ঝাপটা দিয়ে উড়ে গেল। চারিদিকের প্রতিটি শব্দ প্রত্যেকের মাথায় গেঁথে আছে কারণ কারো চোখে ঘুম নেই, বিড়ির আগুনের আলো দুর থেকে জোনাকির আলোর মতো মিটমিট করছে।
হাজার হাজার মানুষ বর্ষার কাঁদা-পানিতে আশ্রয় নিয়েছে শুধু নিজের প্রাণটা বাঁচার জন্য, এক কাপড়ে শূন্যহাতে তারা ঘর-বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসে। ভারতীয় সৈন্যরা তাদের আবদ্ধ করে রাখলেন একটা স্বল্প পরিসরের জায়গায়, যেখানে নেই খাদ্য দ্রব্য, পানি সরবরাহের ব্যবস্থা। নিরুপায় হয়ে তারা পরিবার পরিজনসহ সেখানেই অবস্থান করতে বাধ্য হয়। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় তারা ক্রমান্বয়ে কাহিল হয়ে পড়ে। নিরিহ ও নিরাপরাধ মানুষগুলো এখনো জানতে পারল না তাদের অপরাধ কি? কি কারণেই বা তাদের উপর এমন নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক হামলা। এই ন্যাক্কারজনক কাজের মাধ্যমে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায় শান্তিপূর্ণভাবে মিলেমিশে থাকা দুটি প্রধান সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হলো। দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু-মুসলমানরা এখানে মিলে মিশে বসবাস করছে, তারা পরস্পরের সুখে দুঃখে পাশে থাকত, একজন অন্যজনকে পর ভাবতে পারত না। গ্রামের কোথাও সাম্প্রদায়িক সংর্কীণতা কিংবা কোন মনোমালিন্য ছিল না, তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘিœত হওয়ার কোন সুযোগও ছিল না।
সকাল বেলা কলেবুড়োর বউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আশে পাশে যারা ছিল সবাই মনে করছে হয়তো এদিক সেদিক কোথাও ঘোরা-ঘুরি করছে কিন্তু না পূর্বাকাশে বেলা অনেকটা উপরে উঠে এলো তবুও তার দেখা নেই। আট-দশ বছর বয়সের একটি ছেলে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এসে বলে-জঙ্গলের পাশে কে যেন মাটিতে পড়ে আছে। ছোট্ট ছেলেটির কথামত অনেকেই ছুটে গেল তিনবিঘার কাছে সেই জঙ্গলে। সেখানে যেয়ে তারা শুধু রক্ত দেখতে পেলো, তাজা রক্তগুলো শুকিয়ে জমাট বেঁধে আছে। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বি. এস. এফ) কি নৃশংস-নিষ্ঠুর ভাবে গুলি করে হত্যা করে তার লাসও নিয়ে গেছে। হয়তো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য কলেবুড়োর বউ জঙ্গলের ধারে গিয়েছিল, এটাই ছিল তার অপরাধ। জল্লাদরা মনে করেছিল যে, তারা সুযোগ বুঝে তিনবিঘা পার হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বি.এ.এফ) এর এরূপ নৃশংসতার ক্ষতচিহ্ন বুকে ধারণ করে নীরবে নিভৃতে কেঁদে চলেছে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতাবাসী। আগুনের শিখা আর রাইফেলের গুলিতে প্রাণ যাচ্ছে একের পর এক নিরিহ নর-নারীর। কার দোষে কে মরে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
সন্তানদের ডুকরে ওঠা কান্নায় হাজারো মানুষের চোখে লোনা জলের ঢল নেমে আসে। কি বীভৎসতা, কি হৃদয়বিদারক ঘটনার অবতারণায় আকাশ বাতাস কেঁপে ওঠেছিল সেদিন। মানুষ বাদশা, ফকির কিংবা যতোই নিচু জাত হোক না কেন সে এ পৃথিবীতে একবারই জন্ম নেয়, আর মারা গেলে দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে আসে না। পৃথিবীর সব কিছুর বিনিময়েও তাকে ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই কলেবুড়োর ছেলে-মেয়েদের মায়ের জন্য করুণ আকুতি। সন্তান হিসেবে তারা মায়ের বুকে আশ্রয় হারিয়ে অনাথ হয়ে গেল। মা তাদের কোন দিন ফিরে আসবে না। গোটা গ্রামের হাজারো মানুষের বুকে শোকের মাতম।
ভারতের সৈন্যরা সেদিন শুধু বাচ্চাউ বুড়া একা নয়, এরকম শত শত মানুষের উপর করেছিল পশুসুলভ অত্যাচার। নিরাপরাধ, অসহায় মানুষদের উপর অন্যায়-অত্যাচার করা যে ঘৃণার, অমানবিক ও ন্যাক্কারজনক এ বোধগাম্যতা তাদের নেই। এরূপ নৃশংস হত্যাযজ্ঞ উন্নত মস্তকধারী মানবতার কাছে কলঙ্কের কালিমা লেপন করেছে। অবশ্য পরবর্তীকালে ভারতবাসীর কাছে নানা প্রশ্ন উঠেছে এ নিষ্ঠুর ও বিবেকহীন হত্যাযজ্ঞের পিছনে কোন যৌক্তিক কারণ ছিল কি না। ঘটনাটি যেভাবেই ঘটুক আর যার ঘাড়েই দোষ চাপানো হোক না কেন উক্ত নৃশংস হত্যাকাণ্ড যে ভারতবাসীর চরিত্র কলঙ্কিত করেছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই অপযশের হাত থেকে তারা রেহাই পেতে পারে না।
ভারতীয় সামরিক বাহিনীর এরূপ নৃশংস ও কাপুরোসচিত আচরণ ও হত্যাযজ্ঞ ডাহাগ্রাম-আঙ্গারপোতাবাসীর কাছে পয়ষট্টি সালের “রায়ট” নামে পরিচিত।
প্রায় তিনমাস ব্যাপি রিফুজি হিসেবে স্কুলঘরে থাকার পর পূণরায় ডাহাগ্রাম-আঙ্গারপোতাবাসী ফিরে আসে নিজ গ্রামে। জন্মভুমিতে পা পড়তেই যেন অতীতে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা, দুঃখ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা, একটা একটা করে দেহ থেকে ঝরে পড়ে। কিন্তু পরক্ষণে হতাশার কালো মেঘ এসে ছেয়ে যায়, অন্ধকার নেমে আসে চারিদিকে, ঝাপসা হয়ে যায় চোখের দৃষ্টি। চারিদিকে হাহাকার, গোটা গ্রামটা খাঁ খাঁ করছে, ঘর-বাড়ি, গাছ-গাছড়া পুড়ে ছাই হয়ে আছে। চারিদিকে নিদারুণ শূন্যতা বিরাজ করছে। গত কয়েকদিন আগ পর্যন্ত গোটা গ্রামের জনপদে গৃহস্থরা মনের সুখে হেটে বেড়াতো। চঞ্চল শিশু-কিশোরদের চপলতায় আনন্দ মুখরিত হয়ে উঠতো ছায়াঘেরা এই গ্রামটি। গায়ের কৃষকেরা সারাদিন ক্ষেতে-খামারে কাজ করতো আর মনের সুখে গান গাইতো। সন্ধ্যা হলে গরু বাছুর গোয়ালে রেখে তারা স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলতো। বাড়ির বাইরে সবাই মিলে একত্রিত হয়ে বিভিন্ন রকম খোস গল্প-গুজবে মেতে উঠতো। বাড়ির বোউয়েরা রান্না-বান্না শেষ করে তাদের খেতে ডাকলে পরিবারের সবাই মিলে মাটিতে গোল হয়ে বসে এক সাথে খেত। পৃথিবীর সব সুখ যেন এই কুঁড়ে ঘরে জড়ো হয়ে নাচা-নাচি করতো।
আজ যেন কিছুই নেই, নেই তাদের আনন্দ প্রাণের স্পন্দন। ঘর নেই, বাড়ি নেই, বাগান নেই, গরু-ছাগল নেই, শুধু নেই আর নেই। গোটা গ্রামজুড়ে নির্জনতা, কেবলি শূন্যতা, চারিদিকে শুধু হাহাকার। পোড়া ভিটার দুর্গন্ধময় ছাইয়ের স্তুপে মাংসহীন প্রাণির অস্থি। আগুনে পুড়ে যাওয়া পত্র-পল্লবহীন উঁচু গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষি হয়ে। পাশের ক্ষেতগুলো কালো ছাইয়ে ঢেকে আছে, সেগুলোতে যে কোন কিছু রোপন করা হয়েছিল তার কোন চিহ্ন নেই। মানুষের কষ্টের হাহাকারে আর উত্তপ্ত নিঃশ্বাসের চারিদিকের বাতাস কেমন ভাড়ি হয়ে আছে। বাতাসের উগ্র দুর্গন্ধ নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘœতার সৃষ্টি করে। পোড়া গাছের পাতাহীন ডাল-পালায় প্রাণহীন গলিত মাংস, লোসহীন ছিন্ন-ভিন্ন চামড়াগুলো ঝুলছে। ছাইয়ের ভেতর দকদকে পোড়া মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে জ্যান্ত শকুন, হার-হাড্ডি নিয়ে শেয়াল আর কুকুরের চলছে মহা উৎসব। সৃষ্টিসেরা জীবের এমন জঘন্য খেলা, যা পশুকেও বরাবরে হার মানিয়েছে। এমন অচিন্তনীয় দৃশ্য কেউ কোন দিন ভুলে থাকতে পারবে কিনা আমার জানা নেই। গতরাতের নির্লিপ্ত-নৃশংস ঘটনায় সবার মন ভেঙ্গে যায়, গোটা গ্রাম জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ভারত সরকার ডাহাগ্রাম-আঙ্গারপোতাবাসীকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ সহ পূর্ণবাসন ও প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রি পাঠিয়ে দেয়। যতোদিন না এখানকার দরিদ্র কৃষকেরা একটা ফসল ঘরে তুলতে পারে। চাল ডাল থেকে শুরু করে সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রি ভারত সরকার বহন করে। বিদ্ধস্ত গ্রামটি আবার পূর্ণ গঠনের কাজে হাত দেয় ডাহাগ্রাম আঙ্গরপোতাবাসী।
ওমর আলি প্রধানের মুখে ডাহাগ্রাম-আঙ্গারপোতার দুঃখের কাহিনী শুনে স্তব্ধ ও নির্বাক হয়ে যায় সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন।
তথ্যসূত্র-
**ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার’ ইতিহাস ও উইকিপিডিয়া। **ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত তথ্যাদি। **বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস-১৯৪৭-১৯৭১। **একাত্তর করতলে ছিন্নমাথা-হাসান আজিজুল হক। **দৈনিক আজাদ, ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮।
আজকের বিকেলটায় মেঘমুক্ত আকাশে ঝলমল করছে বিদায় বেলার সূর্য। ভাঙ্গা ভাঙ্গা মেঘের ফাঁকে ডুবন্ত সূর্যের হলুদ আভা এসে মেঘগুলোকে যেন বাহারী রঙে সাজিয়ে তুলেছে। গ্রামের অনেক মানুষ রেডিও বি.বি.সি এর সংবাদ শোনার জন্য বঙ্গেরবাড়ি স্কুল মাঠে এসে জমা হয়েছে। বাংলাদেশে থেকে সাংবাদিক এসেছে তাদের একনজর দেখার জন্য অবরুদ্ধ এ মানুষগুলোর আগ্রহের শেষ নেই। কারণ এখানকার শতকরা পঁচানব্বইভাগ মানুষই বাংলাদেশ অর্থাত নিজের মাতৃভ’মিটাকে দেখে নাই, সেখানকার লোকজনকেও দেখে নাই, তাদের সাথে কোন যোগাযোগ নাই। আর দেখবেইবা কেমন করে তাজা-তাগড়া-জোয়ান মাপনুষ ছাড়া বি.এস.এফ এর সাথে দৌড়ে কুলাতে পারে? বি.এস.এফ এর সাথে দৌড়ে পাল্লা দিয়ে যারা তিনবিঘা পার হতে পারে কেবল তারাই বাংলাদেশ যাওয়ার সাহস দেখায়। কাজেই শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ এবং মহিলাদের জন্য বাংলাদেশ একটা স্বপ্নের রাজ্য হিসেবেই থেকে যায়। যদিও সেটা তাদের মতিৃভ’মি। কাগজে, কলমে কিংবা বইয়ের পাতায় তারা সেটাই জেনে এসেছে।
মোনাজাত সাংবাদিকের কথা ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতায় একটি শিশু থেকে শুরু করে আবাল-বৃদ্ধ সবার মুখে মুখে। বাংলাদেশ থেকে সাংবাদিক এসেছে তারা অবরুদ্ধ গ্রামের মানুষের বন্দিদশা, দুঃখ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা বাংলাদেশ সরকারকে জানাবে তাহলে দেশের সরকার তাদের বন্দিদশা থেকে মুক্তির জন্য তিনবিঘার রাস্তার ব্যবস্থা করে দেবে। এটা শোনার পর গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো দলে দলে বঙ্গেরবাড়ি স্কুল মাঠে আসে সাংবাদিকদের শুধু একনজর চোখের দেখা দেখার জন্য। অনেক উৎসুক মহিলা এসে স্কুলঘরের ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক দিয়ে চুপিচুপি দেখে বাংলাদেশের মানুষ দেখতে কেমন হয়। কারণ মহিলাদের কাছে বাংলাদেশ একটা অন্য জগত। তারা কোন দিনও সেখানে যেতে পারে নাই।
এতোগুলো মানুষের উপস্থিতি দেখে মোনাজাত উদ্দিন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করে তারা কি সবাই রেডিও বি.বি.সি এর সংবাদ শোনার জন্য এসেছে?
শামসুল মাস্টার হেসে ফেলে, মোনাজাত উদ্দিন সাংবাদি কে বলে- না ভাই, এরা বেশি ভাগ মানুষ আপনাকে দেখার জন্য এসেছে।
কেন? আমাকে দেখার জন্য এসেছেন কেন?
সে আপনি বুঝবেন না ভাই, গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো দলে দলে এসেছেন আপনাকে একনজর দেখার জন্য। তারা শুনেছে যে, বাংলাদেশ থেকে সাংবাদিক এসেছে, তারা আমাদের বন্দিদশা, দুঃখ-কষ্টের কথা সরকারকে জানাবে। এরপর সরকার তাদের জন্য তিনবিঘার রাস্তার ব্যবস্থা করে দেবে।
ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার সহজ-সরল মানুষগুলোর দিকে চেয়ে মোনাজাত সাংবাদিকের চোখের পানি ঝরঝর করে পড়তে লাগলো। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সবার উদ্দেশ্যে বললেন-আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন এ জীবনে আমি তা ভুলতে পারবো না। আমার পিতৃতুল্য অনেক মুরুব্বি এখানে আছেন আমি সবার পা ছুঁয়ে ছালাম করলাম আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। আপনাদের সামান্যতম উপকার করতে পারলে আমার জীবনটা ধন্য হবে। আমাকে আজ চলে যেতে হবে আগামি পরশু থেকে আমার একটা ট্রেনিং আছে। নইলে আমি আপনাদেও সাথে থেকেই যেতাম। আমি সুযোগ পেলে আগামি মাসে আমি আবার আসবো। আমি আপনাদের সব কথা ধারাবাহিক ভাবে লিখবো এবং উপরমহলে যোগাযোগ করবো। আপনাদের ভাবনা আমার নিত্য সঙ্গী হয়ে থাকবে। আপনারা শুধু আমার জন্য দোয়া করবেন। এ কয়েকদিনে আপনাদের আদর-যত্ন ও স্নেহ-ভালোবাসায় আমি ধন্য হয়েছি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now