বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ছিন্ন ভিন্ন সংসারের কাহিনি

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ আজিমের জন্ম হয়েছিল এক রঙিন স্বপ্নের ভেতর। মা-বাবা দুজনই ভেবেছিলেন, তাদের সংসারে এই সন্তান আলো হয়ে আসবে। কিন্তু আলো কখনো কখনো খুব দ্রুত নিভে যায়। মাত্র দশ বছর বয়সের আজিম এখন ফুফুর ঘরে মানুষ হচ্ছে। তার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা লেগে থাকে। ক্লাসে অন্য ছেলেমেয়েরা যখন বাবার গল্প করে, নতুন জামা-কাপড় বা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কাহিনি বলে, আজিম তখন চুপ করে থাকে। মুখ নিচু করে খাতার পাতায় কিছু আঁকিবুঁকি কাটতে থাকে। তার কণ্ঠে বাবার কোনো স্মৃতি নেই, মায়ের উপস্থিতিও নেই। ফুফু যত্ন করেন, বুক ভরে ভালোবাসেন। কিন্তু মা তো মায়েরই জায়গায় থাকে। রাতের নিস্তব্ধতায় আজিম জানালার পাশে বসে ফিসফিস করে—“মা, তুমি কই?” শূন্য আকাশ কোনো উত্তর দেয় না। মায়ের বুকের টান সে বুঝতে পারে না, যদিও মা প্রতিটি মুহূর্তে তাকে মনে রেখেছেন। আসলে পরিস্থিতি মাকে ছেলেকে নিজের কাছে রাখতে দেয়নি। সংসারের ভাঙন মায়ের বুক থেকে আজিমকে ছিনিয়ে নিয়েছে। এই ভাঙনের পর শাহীনুর আবার নতুনভাবে সংসার গড়ার চেষ্টা করলেন। আশিক নামের এক ব্যক্তির সাথে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল, এ সংসার হয়তো তাকে নতুন আলো দেখাবে। কিন্তু সেই আলোও খুব বেশিদিন টেকেনি। সংসারে জন্ম নিল জমজ সন্তান—এক ছেলে সোহান, আর এক মেয়ে সোহানা। মাত্র তিন বছরের এ দুটি শিশু এখনো মায়ের আঁচল আঁকড়ে থাকে। তাদের কাছে বাবার কোনো অর্থ নেই, আছে শুধু মায়ের বুকের নিরাপত্তা। কিন্তু আশিক এই সংসারও ভেঙে দিল। শাহীনুর দ্বিতীয়বার ডিভোর্সপ্রাপ্তা হলেন। এইবার শাহীনুর বুকের ভেতর শক্ত হয়ে দাঁড়ালেন। তিনি বুঝলেন, ভাঙা সংসারের ভিতরে দাঁড়িয়েও সন্তান মানুষ করতে হয়। তাই সোহান আর সোহানাকে বুকে আগলে তিনি লড়াই শুরু করলেন। সংসার ভাঙে, কিন্তু মায়ের দায়িত্ব ভাঙে না—এটাই তার জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়াল। এদিকে আশিক তৃতীয় অধ্যায় শুরু করল। সে জান্নাতকে বিয়ে করল। জান্নাতও এক ডিভোর্সপ্রাপ্তা নারী, তার একটি ছোট কন্যা আছে। আশিক ভেবেছিল, এইবার হয়তো সংসার টিকবে। জান্নাতও মনে মনে চেয়েছিল নতুন জীবন শুরু করতে। কিন্তু সুখ যেন আশিকের হাতে ধরা দিল না। প্রথম কিছুদিন সব স্বাভাবিক থাকলেও ধীরে ধীরে আশিকের ভেতরের আসল চেহারা বের হয়ে এল। তার ছিল নারীর প্রতি অদম্য লোভ, রাগ আর সন্দেহপ্রবণ স্বভাব। জান্নাতের জীবনে প্রতিদিনই নতুন এক দুঃস্বপ্ন নেমে আসতে লাগল। নির্যাতনের ছায়া, আর্থিক অবহেলা, সন্তানের প্রতি অবজ্ঞা—সব মিলিয়ে জান্নাতের জীবন দমবন্ধ অন্ধকারে ঢেকে গেল। জান্নাত ভেবেছিল, সহ্য করলে হয়তো সব একদিন বদলে যাবে। কিন্তু না, আশিক বদলায়নি। বরং তার হিংস্রতা বাড়তে লাগল। সংসারের দেয়াল ধীরে ধীরে জান্নাতের কাছে কারাগারের মতো মনে হতে লাগল। শেষমেশ জান্নাত আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি আদালতের দ্বারস্থ হলেন। মামলার চাপে, প্রমাণ আর সাক্ষ্যের ভারে আশিক জেলে গেল। তখনই গ্রামের মানুষ তার নাম দিল “কানা আশিক।” তার চোখের আলো যেমন কমে যাচ্ছিল, তেমনি জীবনের আলোও নিভে গিয়েছিল অনেক আগেই। মানুষ তাকে নিয়ে গল্প করে, ব্যঙ্গ করে, কিন্তু সেই নামের ভেতরে লুকিয়ে আছে তার জীবনের সব ব্যর্থতা, সব ছিন্নভিন্ন অধ্যায়। আজিম এ খবর শুনে কিছুই বুঝতে পারে না। সে শুধু ভাবে, বাবারা কেমন হয়? কেন তাদের নিয়ে সবাই হাসে বা কাঁদে? জমজ সোহান আর সোহানা তখনও ছোট, তারা বাবার কোনো অভাব বোঝে না। তারা শুধু জানে, মা-ই তাদের সব। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তারাও বুঝবে বাবার অনুপস্থিতি, বাবার দায়িত্বহীনতা। জান্নাতের কন্যা অবশ্য এ সত্য অনেক আগে থেকেই জানে। সে জানে, সংসার আসলে খুব ভঙ্গুর, আর বাবাদের ভরসা কখনো কখনো মরীচিকার মতো মুছে যায়। শাহীনুরের রাতগুলো এখন একাকিত্বে ভরা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। চোখে পানি জমে, কিন্তু ভেতরে এক অদ্ভুত শক্তি খেলে যায়। তিনি ভাবেন, পুরুষেরা হয়তো সংসার ভেঙে নতুন সংসার শুরু করে ফেলতে পারে, কিন্তু একজন মা ভাঙা সংসারের ভেতর থেকেও সন্তানকে আঁকড়ে বাঁচতে শেখে। আশিক এখন জেলের অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছে। মানুষের চোখে সে অপদস্থ, কানা আশিক। কিন্তু আসল অন্ধত্ব তার চোখে নয়, তার মনে। সে দেখতেই পারেনি সংসারের সৌন্দর্য, ভালোবাসার দায়িত্ব। তার জীবন এখন এক ভাঙা আয়না—যেখানে প্রতিটি টুকরোতে ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে শাহীনুরের জীবন চলতে থাকে। তিনি জানেন, সামনে পথ কঠিন। কিন্তু সন্তানদের হাসি-কান্নার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান বাঁচার মানে। আজিম, সোহান আর সোহানা—এই তিন সন্তানই একদিন তার সংগ্রামের সাক্ষী হবে। হয়তো তারা একদিন প্রমাণ করবে, ভাঙা সংসারের ভিতর থেকেও নতুন আলো জন্ম নিতে পারে। মানুষের জীবন নদীর মতো—কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল। আশিক সেই নদীতে ভেসে গিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। আর শাহীনুর সেই নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সন্তানদের নিয়ে এখনও আলো খুঁজে চলেছেন।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৬ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now