বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব- ৪
রাত কতটা গভীর হয়েছে তা বোঝার কোন উপায় নেই। বাঁশবাগানে অন্ধকারের অবসান চেয়ে রাত জাগা একটি পাখি ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। শামসুল মাস্টারের চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই, ঘুম আসবেই বা কি করে, কি দিন ছিলো আর এখন কি হলো? অতীতের সেই সোনালি দিনগুলোর স্মৃতি কোন ভাবেই ভোলা যায় না, বুকের ভেতর সিনেমার পর্দার মতো জ্বল-জ্বল করে ভেসে ওঠে। স্যাঁকোয়া নদীর দু’ধারে ছোট ছোট গাছপালা আর ঝাড়-জঙ্গলে ভরা। হাজারও পশু-পাখির অভয়ারণ্য ছিলো নদীর ধারে ভোরের শীতল বাতাস। এসব ভালো লাগার কারণে এ অবরুদ্ধ ও অবহেলিত গ্রামটাকে ছেড়ে যেতে চায় না কেউ।
এখানকার নিরক্ষর, সহজ সরল, খেটে খাওয়া মানুষগুলো এতোটাই সহজ সরল যে সামান্যতম প্রাপ্তিতে তাদের চোখে আনন্দেনর অশ্রæ চলে আসে। সেদিনের সেই মোরগ ডাকা, পাখি ডাকা ভোরের হাস্যোজ্জল প্রকৃতি, প্রতিনিয়ত সোনালী আলোয় শিশির বিন্দু ঘাসের ডগায় মুক্তোর দানা ছড়ায়। লাঙ্গল-জোঁয়াল কাঁধে নিয়ে হালের গরুর সাথে কথা বলতে বলতে কৃষক চলে যায় জমি চাষ করতে, খাওয়া সময় হলে পান্তার থালা গামছায় বেঁধে নিয়ে তার কাছে যেত ঘরের বোউ, হালের গরু দাঁড়করে রেখে আইলে বসে মনের আনন্দে পান্তাভাত খায় আর দু’জনে মিলে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে। সারাদিনের কর্মকøান্ত শরীর-মনকে একটু জুড়িয়ে নেওয়ার জন্য সন্ধ্যার পর তারা সবাই একত্রে বসে খোস গল্পে মেতে উঠে।
একটু রাত হলেই পাড়ায় মহল্লায় বয়াতিরা দলবেধে গান গেয়ে বেড়াত এদের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম নামধারি লোকদেরও আলাদা করা যেতো না। হিন্দুদের পূজা পার্বণে মুসলমান বয়াতিরা হিন্দু ধর্মের নানা কাহিনী এমন সাবলীল ও মনোমুগ্ধকর ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেন যে, উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে শোনেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বি শিল্পিরা ইসলামী সঙ্গীত ও নানা ধরণের জারিগান গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করতো। এটি ছিলো বাংলা ও বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। সারাদিন মাঠে ঘাটে পরিশ্র্যমের পর ক্লান্তি দূর করার নিমিত্তে কোন গাছের তলায়, নদীর ধারে কিংবা কোন ধোলা মাঠে তারা বসে পড়ে গানের আসরে।
হেমন্তের শেষে নতুন ধান এলে নবান্নের উৎসবে মেতে উঠত গোটা গ্রাম। কোন আত্মীয় স্বজন বাড়ি এলে মা রাত জেগে জেগে পিঠা বানাতো। নারিকেল, খেজুরের রস, পাকা তালের রস এ সকল উপাদান একত্রে মিশিয়ে বাড়ির মা বোনেরা নানান রকমের পিঠা বানাত। এ বয়সে এসেও সেই হারিয়ে যাওয়া সোনালি দিনগুলো দু’চোখের পানি ঝরায়। কি সুখ ছিল মানুষের মনে, গোটা গ্রামবাসী ছিলো একে অপরের পরিপূরক। একজনের দুঃখে-কষ্টে আর একজন এগিয়ে আসতো।
ছোটবেলায়- সেই মোরগ ডাকা ভোরে আমার মা ও বড় বোনেরা ঘুম থেকে উঠে ঢেঁকিতে ধান কিংবা চিড়া ভানছে। ঢেঁকির ক্যাঁকড় ক্যাঁকড় শব্দে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যেতো। ঘুম থেকে উঠে সেই তুষ-মিশ্রিত গরম গরম চিড়া হাতের তালুতে নিয়ে ফুঁ’ দিয়ে মুখে দিতাম কি-যে সুখের অনুভুতি জাগাত মনে।
কোন আত্মীয় স্বজনের বাড়ি যাওয়ার আগে সারারাত ধরে মা-চাচিরা সবাই মিলে কড়াইতে খই, মুড়ি ভাঁজত, গরম গরম মুড়ির সাথে খেজুর গুড় মিশিয়ে সবাই মিলে এক সাথে বসে খেতাম। সেই খাওয়ার যে কি সুখ তা আজও ভোলা যায় না।
বাড়িতে নতুন কোন মেহমান এলে আমরা দৌড়ে গিয়ে দেখতাম কে এসেছে, আপনজন কেউ হলে হৈহোল্লা করে তাদের হাত ধরে বাড়িতে নিয়ে আসতাম। তারা মন্ডা-মিঠাই হাতে দিত, সেই মণ্ডা-মিঠাই মুখে দিয়ে নিজের পড়নের কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে খেলতে যেতাম, আনন্দে মন ভরে যেতো। পান সুপারি, তামাক হুক্কা সাজিয়ে নিয়ে বাপ-চাচারা গল্পের আসর জমাতো, প্রাণ খুলে কােত সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার গল্প। আমরা পাশে দাঁড়িয়ে কিংবা কোন গাছে হেলান দিয়ে তন্ময় হয়ে তাদের গল্প শুনতাম।
এইতো বছর কয়েক আগেও মানুষের মনে কি যে সুখছিল যা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। পূর্বপাড়ার জেলহক। যৌবনে কি তাগড়া শরীর, হাসি-খুসি মুখ ছিলো তার। সারাক্ষণ গান লেগে থাকতো মুখে। এমনকি গভীর রাতে তার ঘুম ভেঙ্গে গেলে বিছানায় শুয়ে মনের সুখে গলা ছেড়ে গান গাইতো। এ নিয়ে পাড়ার অনেকে তার নাম দেয় বাউলা জেলহক। তার নিজেস্ব সম্পত্তি বলতে বাড়ির ভিটে টুকু আর হাতীর মতো শরীরটা। জোয়ান বয়সেও বিয়ে শাদির নাম নেই, এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়, আজ এ গানের দলে, তো কাল ও-গানের দলে।
মহররম মাস এলে বাঁশ দিয়ে খুব উঁচু করে ‘ডাহা’ বানানো হতো। এই ডাহাকে কাঁধে নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতো আর লাঠি খেলা দেখাতো। গোটা মাসজুড়ে চলতে থাকে লাঠি খেলা। কোথাও মেলা বসলে কিংবা বিভিন্ন উৎসবে বেশকয়েক দিন চলতে থাকে লাঠি খেলা। গোটা গ্রামের মানুষ একখানে জড়ো হতো সেই খেলা দেখার জন্য। মাঝে মাঝে লাঠি খেলার তুমুল প্রতিযোগিতা হতো, যে দল খেলায় জিতে যেতো তাদেরকে গরু, ছাগল জবাই করে খাওয়ান হতো। কি যে উৎসব মূখর পরিবেশের সৃষ্টি হতো, কি উৎফুল্লতা মানুষের চোখে-মুখে। গোটা গ্রামজুড়ে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে যেতো।
ছোটবেলারয় খেলার সাথিরা দু’চার জন এক সাথে হলেই শুরু হয়ে যেতো হা-ডুডু খেলা। আকাশের বৃষ্টি এলে, সেই বৃষ্টিতে ভিজে গায়ে কাদা মেখে হা-ডু-ডু খেলায় যেন আরও নতুন মাত্রা যোগ হতো। কোন কোন দিন হা-ডুডু খেলতে ইচ্ছে না করলে গাছের জাম্বুরা ফল পেড়ে সেটা দিয়েই বানানো হতো ফুটবল আর তা দিয়েই খেলা চলতো সারাদিন। কি মধুময় সুখের দিনছিলো।
সন্ধ্যার পর প্রতিদিনের ন্যায় আজও শামসুল মাস্টার, মঈন উদ্দিন মেম্বার, তফিজুল মেম্বার, সাবুবর প্রামাণিকসহ কয়েকজন মুরুব্বি গোছের মানুষ এসে জরো হয় বঙ্গেরবাড়ি স্কুল মাঠে। গোধুলি সন্ধ্যার বিদায়ে অন্ধকার এসে অনেকটা জায়গা দখল করলেও পরিষ্কার আকাশে তারাদের মিটিমিটি আলোয় তাদের প্রত্যেকের মলিন মুখগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কারও মুখে কোন কথা নাই, সবার চিন্তা একটাই কি হবে আমাদের? ভবিষ্যতে কোন নরকীয় দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য?
শামসুল মাস্টার বলেন- নিরক্ষরতা একটি মারাত্মক ব্যাধি, যা একজন নিরক্ষর ব্যক্তি প্রতি মুহূর্তে, প্রতি পদে পদে বয়ে বেড়ায়। এ থেকে যেভাবেই হোক আমাদের কোমল মতি শিশুদের মুক্ত করতে হবে। শিক্ষাই মানুষকে সত্যিকার মানুষ রূপে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হলে মানুষ ভালো-মন্দ বুঝতে পারে। এ সকল ভবিষ্যত প্রজন্ম যদি পড়াশোনা শিখতে না পেরে নিরক্ষর থেকে যায় তাহলে তাহলে তো পুরো গ্রামটা অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। শিক্ষা সবার জন্মগত অধিকার কিন্তু আমাদের সন্তানদের ভাগ্যে সেটা নেই। এ অধিকার আমাদেরকে তৈরি করে দিতে হবে। তারা যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদেও অধিকার আদায় করতে পারে, সত্যিকারের মানুষ হতে পারে।
আমাদের সন্তানেরা অভাবের তাড়ণায় বই খাতার পরিবর্তে লাঙ্গল-জোঁয়াল কাঁধে নিচ্ছে। সংসারের কজে নিয়োজিত হতে গিয়ে শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যে বয়সে ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে তারা পেটের ক্ষুধা মেটাতে মা-বাবার সাথে ক্ষেত-খামারের কাজ করছে। যেখানে দু’বেলা পেটের ভাত নেই সেখানে অধিকার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান দেয়াটা অমুলক। অস্পষ্ট ক্রন্দন আর চাপা কষ্টের যন্ত্রায় ছানিপড়া চোখে সৌভাগ্য প্রসূত কোন সোনালি ভোরের প্রত্যাশায় পূর্বদিগন্তে চেয়ে চেয়ে, ক্ষণস্থায়ী জীবনের সীমানা পেরিয়ে কতজন যে ওপারে চলে গেছে তার কোন হিসেব নেই। হয়তো তাদের প্রেতাত্মাগুলো এখনও দীর্ঘশ্বাসে আমাদের চারিেিক হা-হুতোশ করে ঘুরে বেড়ায়। গ্রামে অনেক দরিদ্র পরিবার রয়েছে, যারা দু'বেলা পেট ভরে ভাত খেতে পারে না। ঠিকমতো খাবার যোগাতে পারে না। যাদের দিন কাটে অনেক কষ্টে, তাদের ছেলে মেয়েরা কিভাবে স্কুলে আসবে?
মঈন উদ্দিন মেম্বার বলেন- আমরা যে অবস্থায় আছি, ভবিষ্যতে যে এর চেয়ে ভালো দিন আসবে সেটা আশা করা বোকামি। কাজেই আমাদের এ ভবিষ্যত প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে এর মধ্য থেকেই কিছু করতে হবে। আর যদি আমরা করতে না পারি তাহলে এর ব্যর্থতার দায়ভার কড়ায়-গÐায় আমাদেরকে বুঝে নিতে হবে। কাজেই দিনের বেলা না হোক সন্ধ্যার পর হলেও পাড়ায় পাড়ায় কারও বাড়িতে হোক আর কোন খোলা ঘরেই হোক আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে একত্রিত করে শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে সবাই না হোক কিছু না কিছু ছেলে-মেয়ে শিক্ষার আলোয় গড়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।
তফিজুল মেম্বার চেয়ারটাকে একটু পিছনের দিকে সরে নিয়ে সবার মুখগুলো যেন দেখা যায় ঠিক সেভাবে বসে বলতে শুরু করলেন- বাহ! ভাইজান একটা দারুণ একটা কথা বলেছেন। যে কোন কিছুর বিনিময়ে হোক আমাদের সে চেষ্টার কোন কমতি রাখা যাবে না। অন্যথায় আমাদেও ভবিষ্যত প্রজন্ম অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে থাকবে। কিন্তু আমরাতো প্রতি পদে পদে হোচট খাচ্ছি, বাঁধার সম্মুখিন হচ্ছি ফলে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। তাহলে আজকে সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া যাক যতো বাধাই আসুক না কেন আমাদের সন্তানদের পড়া-লেখার ব্যবস্থা করতে হবে।
সাবুবর প্রামাণিক-কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় যুবক বয়সের অপরিচিত দু’জন লোক হাঁপাতে হাঁপাতে তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। তাদের উভয়ের পড়নে ফুলপ্যান্ট হাটু পর্যন্ত মোড়ানো, পায়ে এখনও ভেজা কাঁদা লেগে আছে। গায়ের শার্টে নিচ থেকে দু’তিনটি বোতাম লাগানো বাকি সবগুলো বোতাম খোলা। কাঁধে একটা ব্যাগ ঝোলানো। কথায় আছে-“ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখেও চমকে ওঠে” অপরিচিত আগন্তকদের দেখে প্রথমে দস্যুলোক ভেবে সবাই চমকে ওঠে। কিন্তু তাদের চোখে-মুখে ক্লান্তি ও নমনীয় ভাব দেখে সবাই বুঝতে পারে যে আর যা হোক লোকগুলো দস্যু প্রকৃতির নয়।
শাসছুল মাস্টার অতি বিনয়ের সাথে নম্রভাবে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন- ভাই, আপনারা কারা? আপনাদেরকে যে চিনতে পারলাম না? দয়া করে আপনাদের পরিচয় দিন-
আগন্তকেরা নিজেদের পরিচয় দেয়- আমি সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন আর ও আমার সহকারী। আমাদের বাড়ি রংপুর। গত কয়েকদিন আগে “ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা সংগ্রাম কমিটি” সাংবাদিক সম্মেলন করে এখানকার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমাদেরকে অবগত করে এবং এখানে আসার জন্য বিনিত অনুরোধ জানায়। কোন কিছু না জেনে, প্রত্যক্ষদর্শী না হয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেষণ করা যায় না। তাই আপনাদের কাছে চলে এলাম, আপনারা অনেক সমস্যার মাঝে আছেন। আপনাদের সমস্যা গুলো এখন জীবন-মরণ সমস্যা, কাজেই এগুলোকে দেশবাসী তথা সারা বিশ্বের মাঝে তুলে ধরতে না পারলে এর কোন সমাধান আসবে না, আজীবন সমস্যাই থেকে যাবে। আপনাদের কাছে অনুরোধ এখানে যেহেতু কোন হোস্টেল নেই, থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা নেই, সেহেতু আমাদেরকে একটু থাকা- খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আর যাবতীয় তথ্য সংগ্রহে আমাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগীতা করতে হবে।
শাসছুল মাস্টার সাহেব বলেন- সাংবাদিক ভাই, আমি কি বলে যে আপনাদেরকে ধন্যবাদ জানাব সেই ভাষা আমার নেই। শুধু এতটুকুই বলবো যে আপনারা আমাদের পরম আত্মীয়, আমাদের আপনজন। এখানে আপনারা যতদিন ইচ্ছে হয় থাকবেন, আপনাদের থাকা-খাওয়া নিয়ে কোন চিন্তা করতে হবে না। আমরা জীবন দিয়ে হলেও আপনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনারা এসেছেন, দু’দিন থাকলে বুঝতে পারবেন এ গ্রামের সহজ সরল খেটে খাওয়া মানুষগুলো আপনাদেরকে কতোটা আপন করে নিয়েছে।
মাস্টার সাহেব উপস্থিত সবার সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে-সাংবাদিক মোনাজাত হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলেন- সাংবাদিক ভাই, বর্তমান বর্ডারের পরিস্থিতিতো খুবই খারাপ। বি.এস.এফ এখন মারমুখি ভুমিকায় সারা রাত কড়া পাহায় থাকে। আপনারা আসলেন কি ভাবে?
“ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা সংগ্রাম কমিটি” আমাদেরকে সে ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তারা আমাদে সঙ্গে কয়েকজন যুবককে দিয়েছেন, যারা এক রকম পাহারা দিয়ে আমাদেরকে নিয়ে আসে। সেই যুবকদের একজন আমাকে বলেছিল যে, সন্ধ্যার পরই বি.এস.এফ (ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স) টহলে আসে। তারা টহলে আসার আগেই আমাদের এক দৌড় দিয়ে তিনবিঘা পার হয়ে যেতে হবে তানাহলে সারা রাত গাছের নিচে বসে থাকতে হবে। সকাল হলে তারা ক্যাম্পে ফিরে যায় হয়তো তখন একটা সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। তাদের পরিকল্পনা মতো তিনবিঘার খুব কাছে একেবারে বর্ডার লাইনে গিয়ে একটা গাছের নিচে আমরা বসে পড়লাম সন্ধ্যা হওয়ার অপেক্ষায়। এরপর তাদের একজন তিনবিঘার ভিতরে ঢুকে খুব ভালো করে দেখে এসে বলে যে বি.এস.এফ এখনো টহলে আসে নাই চলেন আমরা পার হয়ে যাই। তাদের দু’জন একেবারে সামনে আমরা মাঝখানে, আমাদের পিছনেও দু’তিনজন যুবক। আমরা সবাই সামনের দু’জনকে অনুসরণ তার পিছে পিছে খুব দ্রæত হাঁটছি, আবার কখনো দৌড়ও দিচ্ছি। মিনিট দুয়েকের মাথায় আমরা ডাহাগ্রামের সীমানায় পৌছে গেলাম কিন্ত কোথা থেকে যেন দু’জন বি.এস.এফ এসে পিছন থেকে আমাদের ধাওয়া করলো। তারা ডাহাগ্রামের ভিতরে অর্ধ কিলোমিটার পর্যন্ত আমাদের পিছে আসে। আমাদের হাতে কোন কিছু না থাকায় তারা নিরিহ মানুষ মনে করে ফিরে চলে যায়।
শাসছুল মাস্টার বলেন-আচ্ছা ভাই- আপনাদের প্রতি অশেষে কৃতজ্ঞতা জানাই জীবনের ঝুকি নিয়ে এখানে আসার জন্য, আমাদের মতো ভাগ্যহত মানুষদের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য। একটু বসেন ভাই, হাত মুখ ধুয়ে নিন তারপর চা খেতে খেতে আমরা কথা বলি।
স্কুলের পিয়ন জহির আলি চা বিস্কুট এনে দিলে তারা চা খেতে খেতে সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন, শাসছুল মাস্টারকে উদ্দেশ্য করে বলেন- স্যার, আমি ‘ডাহাগাম-অঙ্গারপোতা’ সিটমহলের নাম অনেক শুনেছি কিন্তু যাতায়াতের এই সমস্যার কারণে আসা হয় নাই। বাংলাদেশ ও বিশ্বের যে কোন গণমাধ্যমে ‘ডাহাগাম-অঙ্গারপোতা’কে তুলে ধরতে হলে এর খুঁটি-নাটি বিষয়গুলো জানা খুব বেশি প্রয়োজন। মূলত এ জন্যই আমার আসা। স্যার, আপনারা অনেক বড় মাপের মানুষ, একরকম যুদ্ধ করে গ্রামের এই সহজ সরল মানুষগুলোকে সাহস যুগিয়েছেন, তাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন। যতদিন তারা বাঁচবে ততদিন এ গ্রামের প্রটিতি মানুষ আপনাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
শাসছুল মাস্টার বলেন- সাংবাদিক ভাই? এভাবে বলে আমাকে আর লজ্জা দেবেন না। আপনাকে পেয়ে আমরা কি যে খুশি হয়েছি সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। গ্রামবাসী ঠিক এ মুহুর্তে যদি আপনার পরিচয় পায়, তাহলে তারা আপনাকে ঘাড়ে নিয়ে নেচে বেড়াবে। মোনাজাত ভাই আমি কিন্তু মোটেও বাড়িয়ে বললাম না। অথৈ পানিতে হাবুডুবু খেলে বাঁচার জন্য মানুষ যেমন একটা খড়কুঁটোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়, ঠিক তেমনি এ গ্রামের মানুষ তাদের ভবিষ্যত বেঁচে থাকার আশা ভরসার প্রতিক হিসেবে আপনাকে দেখছে।
আচ্ছা স্যার, এই যে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা একই জায়গার দু’টি ভিন্ন নাম। সে সর্ম্পকে যদি একটু বলতেন?
ও আচ্ছা, ভাই আপনারা জানেন যে, অবিভক্ত ভারত বর্ষে ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান এলাকা। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নিরিবিল পরিবেশে মুগ্ধ হয়ে অনেককে মায়ার টানে বসতি স্থাপন করে এবং এখানেই থেকে যায়। ফলে বিভিন্ন সময়ে এখানে বিভিন্ন রকম পেশার মানুষের আবির্ভাব ঘটে। ডাহাগ্রাম ও অঙ্গারপোতা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে অনেক প্রবীণ ও জ্ঞানী-গুণীব্যক্তিদের অভিমত হল যে, প্রতি বছর হিজরি সনের মহররম মাস এলে এখানকার মানুষের বাঁশ দিয়ে ডাহা নামে একটি উঁচু মিনারের মতো জিনিস বানায় এবং পুরো মাসটাই এ ডাহাকে কেন্দ্র করে লাঠিখেলা হয়। এই ডাহা বানানোর পারদর্শীতা, চারিদিকে ছড়িয়ে পড়া সুনাম এবং সর্বাধিক ডাহার ব্যবহারের কারণে এ গ্রামের নাম করণ করা হয় ডাহাগ্রাম।
আর বৃটিশ শাসকের খাজনা আদায়কারিরা এ অঞ্চলের কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের জন্য অঙ্গারপোতা নামক স্থানে তাবু খাটিয়ে রাত্রি যাপন করত। এসময়ে তারা রান্নার জন্য আশে-পাশের এলাকা থেকে কাঠ সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করত। এসব জ্বালানি কাঠ থেকে যে কয়লা উৎপন্ন হতো তারা চলে যাওয়ার সময় এগুলোকে মাটিতে পুঁতে রেখে যেতো। কয়লা বা অঙ্গার পূঁতে রাখার এই স্থানের নাম থেকেই কাল ক্রমে এ এলাকার নাম করণ হয় “অঙ্গারপোতা”। আমরা বাপ-দাদার কাছ থেকে এতোদিন ধরে এটাই জেনে এসেছি।
শামসুল মাস্টার চায়ের কাপটা মুনাজাত সাংবাদিকের হাত থেকে নিয়ে বলেন- ভাই, পান খাওয়ার অভ্যাস আছে না কি?
না স্যার পানে তেমন আসক্তি নেই তবে সবাই মিলে একসাথে খাইলে একটু আধটু মুখে দিয়ে চিবানো যায়।
শাসছুল মাস্টার পানের পোটলাটা তার হাতে দিয়ে বলতে শুরু করলেন-মুনাজাত ভাই, আপনাদের জীবনের উপর দিয়ে আজ অনেক ধকল গেছে। চলেন আগে
আপনাদের বিশ্রাম দরকার।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now