বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শেষ জীবনের গল্প : (পর্ব–০৯)
✍️ নাফিজ আহমেদ
বাবাকে জড়িয়ে ধরে একাধারে কাঁদতে শুরু করল ইমা।
কখনো কল্পনাও করেনি—একদিন এমন নিরালা দুপুরে হঠাৎ তার বাবা এসে দাঁড়াবেন তার বাড়িতে। বাবাকে শেষ কবে দেখেছিল, তা ইমার মনে পড়ে না। আজ ত্রিশ বছর পর চোখের সামনে দেখে সে সত্যিই আবেগে আপ্লুত হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে সবাইকে ঘরে বসার আমন্ত্রণ জানাল ইমা। ভেতর থেকে শাশুড়ির কণ্ঠ ভেসে এলো—
—“কে এলো রে, বউমা?”
—“মা, একবার বাইরে আসেন, দেখে যান কারা এসেছে।”
বৃদ্ধা শাশুড়ি ধীরে ধীরে বাইরে এসে দূর থেকে তাকালেন। নাফিজ, সিয়াম, তালহা—তাদের চিনতে পারলেন। কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা এক লোককে দেখে প্রশ্ন করে উঠলেন—
—“বউমা, ওই লোকটা কে রে? চিনতে পারছি না তো।”
ইমা লজ্জা মেশানো গলায় বলল,
—“মা, উনি আমার জন্মদাতা পিতা।”
বৃদ্ধা অবাক হয়ে তাকালেন।
—“তাই নাকি! আচ্ছা দেখি, আমার বিয়াই সাহেব! আসেন, ঘরে এসে বসেন। যদি আমার স্বামী বেঁচে থাকতেন, তিনি আজ খুব খুশি হতেন। মাঝেমধ্যেই বলতেন, ‘আমার বউমা খুব ভালো মেয়ে, সব সময় আমাদের খেয়াল রাখে তবে জানি না ওর বাবা কেমন মানুষ!’”
এ কথা শুনে ইমন সাহেব কিছুটা হকচকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
—“বিয়াই সাহেবের কী হয়েছিল?”
ইমার শাশুড়ি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—“কিছু হয়নি… হঠাৎ করেই গতবছর চলে গেলেন।”
ইমন সাহেবের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো—
—“আহা! আসলেই, পৃথিবী তো কারো জন্য স্থায়ী নয়। সবাইকেই একদিন চলে যেতে হবে। এই যে দেখুন না, কে ভেবেছিল আমি আবার আমার ছেলে-মেয়ের সাথে দেখা করতে পারব? সৃষ্টিকর্তাই আমাকে আবার ফিরিয়ে দিয়েছেন আমার আপন জায়গায়, আপন মানুষদের কাছে।”
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আলাপের পর সবাই ভেতরে গেল। তালহা মিষ্টির প্যাকেটটা ইমার হাতে দিল, আর ছোট্ট বোনের সাথে গল্প জমিয়ে তুলল।
—“কেমন আছিস ইমা? তোর ছেলে,মেয়ে,স্বামী সবাই কেমন আছে?”
—“ভালো আছি ভাইয়া। ওরাও সবাই ভালো আছে। নেহা-তানভীর মাদ্রাসায় গেছে, একটু পরেই ফিরবে। আর ওদের বাবা বাইরে গেছে, সেও আসবে। আজ সকালে বলেছিলাম, নাফিজ কাকারা আসবে, তাই তাড়াতাড়ি আসতে। কে জানত, তোরাও-ও আসবি!”
ইমা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
—“আচ্ছা ভাইয়া, বাবা এতদিন পর কোথা থেকে এলো?”
তালহা হেসে বলল,
—“সে অনেক ঘটনা, পরে সব বলব। এখন তো আমাদের কিছু খেতে দে,খুব খিদে লেগেছে।”
—“আচ্ছা, তোরা ঘরে বস, আমি নাস্তা নিয়ে আসছি। তোর ভাগ্নে-ভাগ্নী আর ওদের বাবা আসলে একসাথে খাওয়াবো।”
ইমা দ্রুত ভেতরে গিয়ে নাস্তার ব্যবস্থা করল। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যই তো—মেহমান এলেই হালকা পাতলা হলেও কিছু খেতে দিতে হয়। ভাগ্য ভালো, ইমা আগে থেকেই সেমাই, নুডলস আর পায়েস রান্না করে রেখেছিল। এখন সেটাই তুলে ধরল সবার সামনে।
ইমন সাহেব জীবনে প্রথমবার মেয়ের হাতের রান্না খেলেন। এক চামচ মুখে দিয়েই থমকে গেলেন।
—“আহা! একেবারে ঠিক তোমার মায়ের হাতের মতো রান্না…! ত্রিশ বছর পর যেন আবার সেই স্বাদ ফিরে পেলাম।”
আনন্দে চোখ ভিজে এলো তার। মেয়ের দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন,
—“জানিস ইমা, তোর মায়ের হাতের রান্নাও ঠিক এমনই ছিল। তুই একেবারে ওর মতো শিখেছিস।”
ইমার চোখও ছলছল করে উঠল।
—“খাও বাবা, আজ তৃপ্তি করে খাও। জীবনে কখনো তোমাকে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতে পারিনি। এবার থেকে যা খেতে চাইবে, আমি তোমার জন্য রান্না করব।”
খাওয়ার পর কিছুক্ষণ সবাই বিশ্রাম নিল। এদিকে মাদ্রাসা থেকে নেহা আর তানভীর ফিরে এলো। তালহা তাদের জড়িয়ে ধরল, কিন্তু ইমন সাহেবকে তারা চিনল না। ইমা ধীরে ধীরে তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিল—
—“ইনি তোমাদের নানা, আমার বাবা।”
নেহা অবাক হয়ে বলল,
—“আম্মু, তুমি তো বলেছিলে নানা হারিয়ে গেছেন?”
ইমা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
—“হ্যাঁ মা, নানা হারিয়েই গিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহর রহমতে তিনি আবার ফিরে এসেছেন।”
শিশু দুটি ধীরে ধীরে নানার সাথে মিশতে শুরু করল। ইমন সাহেবও তাদের পেয়ে যেন মনে করলেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছেন।
এমন সময়ে নুরু মিয়া বাড়ি ফিরল। গোসল সেরে মেহমানদের সাথে দেখা করল। তালহার সাথে করমর্দন করে ইমন সাহেবকে জড়িয়ে ধরল। আবেগে বলল—
—“আপনার কথা তো ওদের নানির মুখে অনেক শুনেছি।”
তারপর সবাই মিলে দুপুরের খাবার খেল। ইমন সাহেবের কাছে মনে হলো, যেন আবার তার স্ত্রী তার জন্য রান্না করেছেন। ইমার হাতের স্বাদে তিনি স্ত্রীর স্মৃতি খুঁজে পেলেন।
খাওয়ার পর যখন সবাই একটু বিশ্রামে যাবে, তখন নেহা আর তানভীর বায়না ধরল—
—“নানা, এতদিন আপনি কোথায় ছিলেন, সেটা আমাদের গল্প করে শোনাতে হবে।”
ইমন সাহেব স্নেহভরে তাদের মাথায় হাত রেখে বললেন—
—“আচ্ছা, খাওয়ার পর একটু ঘুমাই। বিকেলে আমরা সবাই একসাথে বসে গল্প করব। তখন শোনাবো সব।”
নাতি-নাতনি আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল,
—“আচ্ছা, ঠিক আছে নানা!”
ঘরের ভেতর ভরে উঠল আনন্দের হাসি, স্নেহ আর দীর্ঘ ত্রিশ বছরের হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের পুনর্মিলন।
চলবে…
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now