বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
অবরুদ্ধ জীবনের গল্প- পর্ব-৩
বেলাল ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার ওদলাবাড়িতে চা বাগানে কাজ করে ক’টাকাইবা মাইনা পায়। নিজের খাওয়া খরচ বাঁচিয়ে সেখান থেকে যৎসামান্য কিছু টাকা প্রতিমাসে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। অভাবের সংসারে যদিও সেটা বিশাল সমুদ্রে এক ফোটা পানির মতো কিন্তু আব্দুল্লাহর কাছে সেটাই অনেক। মাঝেমধ্যে আব্দুল্লাহ বলে- বাবা বেলাল তুই কয় টাকাইবা বেতন পাইস, প্রতিমাসে বাড়িতে পাঠানোর দরকার নাই। বেলাল বলে-বাবা তোমরা বাড়িতে না খ্যায়া থাকলে কি মোর প্যাটোত ভাত যাবে?
যাহোক বেলাল তার গোটা মাসের বেতনের টাকা দিয়ে সাবিহার জন্য একটা টুকটুকে লাল জামা, আবিয়ার জন্য সালোয়ার কামিজ, জালালের সার্ট, মায়ের শাড়ি আর বাবার জন্য লুঙ্গী কিনে আনে। সাবিহা লাল জামা পেয়ে আনন্দে নাচানাচি শুরু করে দেয়। মেয়ের খুশি দেখে আব্দুল্লাহ চোখে পানি এসে যায়।
সারাদিনের কর্ম ক্লান্ত শরীর তার উপর ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক দিয়ে আসে শিরশির করে হাল্কা ঠাÐা বাতাস, বিছানায় শোয়া মাত্র নাক ডাকতে শুরু করে দেয় কুলসুম। পাশে শুয়ে চোখ বন্ধকরে ঘুমানোর চেষ্টা করছে আব্দুল্লাহ কিন্তু এতো চিন্তার ভিড় ঠেলে ঘুম কি আর সহজে আসতে পারে? চোখ বন্ধ করে বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে থাকে সে। এমন সময় অনেক দুর থেকে একটা কান্নার আওয়াজ তার কানে আসে। বালিশ থেকে মাথাটা তুলে ঠাহর করার চেষ্টা করে আব্দুল্লাহ কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পাচ্ছে না, তাই বিছানা ছেড়ে সে বাইরে বেড়িয়ে আসে তারপর কান পেতে শোনে উত্তর পাড়ার ঐ দিক থেকে সে শব্দটা যেন আরও জোরালো হয়ে আসছে। হয়ত কেউ মারা গেছে, কিন্তু না সেই কান্নার সাথে চোর চোর বলে চিৎকারও শোনা যাচ্ছে। হয়ত কারও গোয়ালঘর খালি করে সব গরু গুলোকে চুরি করে নিয়ে গেছে চোরেরা। সময় মত টের পায়নি বলে এখন কান্নাকাটি করছে।
কুলসুম ঠাহর করতে পারে যে, আব্দুল্লাহ এখনও ঘুমায় নাই, তার ঘুম আসছে না। আর আসবেই বা কেমন করে, যে মানূষটা জীবনে হালের মুঠো ধরে নাই, আজ সে মানুষের বাড়িতে দিন মজুরি করে, কামলা দেয়, চাকর-বাকরের মতো যে যা করতে বলে, মাথা নিচু করে সে তাই করে। জীবন, সমাজ, সংসার ও নিজের ভাগ্যের শিকলে আজ তার হাত পা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছে।
কুলসুম আব্দুল্লাকে তার বুকে টেনে নিয়ে বলে-কি আবিয়ার বাপ, তোমা আইজও ঘুমান নাই?
ঘুম যে আসে না আবিয়ার মা, কি করবার কইস মোক ?
সারাদিন মানষের বাড়িত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে, রাতেও যদি তোমা একনা না ঘুমান তাহলে কি শরীর ঠিক থাকিবে? আর তোমা অসুস্থ হয়ে গেলে এই ছোট ছোট ছওয়াগুলার কি হবে? হামার মত গরিবের শরীরটাই সম্পদ, সেটা না থাকিলে হামাক না খেয়ে মরির লাগবে। ঘুম না আসিলে মনে মনে দোয়া দরূদ পড়, কলেমা পড়, এমনিতে এ্যাল্য়া ঘুম চলি আসবে।
সবই বুঝি গো আবিয়ার মা, কিন্তু আগের দিনগুলো মোর পিছু ছাড়ে না। পাগলা কুকুরের মতো তাড়া করি বেড়ায়।
কুলসুম দেখলো মানুষটা সকাল থেকে এখনও এক গøাস পানিও খায় নাই। ভাতের হাড়িটা চেঁচেমুছে দু’মুঠো পোড়া গালা ভাত পাওয়া গেল সামান্য একটু তরকারি সহ আব্দুল্লাকে খেতে দিলো কুলসুম। কিন্তু আব্দল্লাহ মনে মনে ভাবল কুলসুমও দুপুরে কিছু খায় নাই, তাই সে দু’মুঠো ভাত কুলসুমের জন্য তুলে রেখে বাকিটুকু খেয়ে পানির জগটা মুখে লাগিয়ে অর্ধেক জগ পানি ঢোক ঢোক করে গিলে ফেললো। তারপর একটু শব্দ করেই শুকুর আলহামদুলিল্লাহ বলে নদীর পারে যাওযার জন্য জালখানা হাতে নেয়। এমন সময় জালের ছেড়া অংশে তার বামহাতের একটা আঙ্গুল আটকে যায়। এবার নিজের ঘাড় থেকে জালখানা মাটিতে নামিয়ে ভালো করে দেখে যে আরও কোথাও ছেঁড়া ফাটা আছে কি না। জাল ছেঁড়া থাকলে তো মাছ সেদিক দিয়ে অনায়াসে বেড়িয়ে যাবে। তার নিজ হাতে বানানো জাল কড়া পাক দেয়া সরু নাইলোন সুতায় তৈরি। পানিতে ভিজে ভিজে সুতো যেন পচে না যায় সেজন্য নতুন জালে লাগানো হয়েছে গাবের কষ। সেটা ছিঁড়লো কিভাবে? হঠাত মনে পড়ল গতরাতে শিকার হাড়িতে দুটি ইঁদুর একে অপরকে কামড়া কামড়ি করছিল। আব্দুল্লাহ ইঁদুর দু’টোকে দেখে মনে মনে হেসে বলে- হাড়ির ভেতরে কোন খাবার না পেয়ে বেচারা ইঁদুরগুলো একে অপরকে দোষারোপ করে মারামারি করছে। কিন্তু না আজ তার মনে হয়েছে তারা খাবার না পেয়ে নিজেদের মধ্যে শুধু মারামারি করেনি প্রতিশোধ হিসেবে তার জালও কেটে দিয়ে গেছে। কি আর করার আছে সুতা হাতে নিয়ে আব্দুল্লাহ আবার সেই ছেড়া অংশটি গাঁথতে শুরু করল কিন্তু চারিদিকে এতোটাই ছেঁড়া যে মেরামত করতে গোটা দিন লেগে যায়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে আব্দুল্লাহ গোয়াল ঘরে যায়, কাশের ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁক দিয়ে রোদের ঝিলিক ঘরে ঢুকলে গরু, ছাগল গুলো আর ঘরে থাকতে চায় না, হাম্বা হাম্বা ডাক শুরু করে। গাভিটার চেয়ে তার বাছুরটা বেশী অত্যাচার করে মাথার শিং দিয়ে ঘরের বেড়া ভেঙ্গে দিতে চায়। ঘরের এক কোণে ঘাসের আঁটি বাঁধা থাকে তাদেরকে শান্ত রাখার জন্য কিন্তু সেটা সারারাত খাওয়ার পর তাতে আর সকাল পর্যন্ত রুচি থাকে না। তাই এরা বের হওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। আব্দুল্লাহর কাজ হল সকালে গরু ছাগলগুলোকে বের করে বাইরের খুঁটিতে বেঁধে রাখা। বাদ বাকি সারাদিনের দায়িত্ব কুলসুমের, কোথায় ঘাস খাওয়াতে হবে, কোথায় তাদের পেট ভরবে, কখন পানি খাওয়াতে হবে ইত্যাদি।
আব্দ্ল্লুাহর জমি বলতে ঐ বাড়ির ভিটেটুকু তারই অর্ধেকটায় অতি বৃষ্টির ফলে পানি জমেছে। সকালের রোদ সেই পানির মধ্যে পড়ে চকচক করে জলছে। আব্দ্ল্লুাহ ভাবে-নিচু জমিটাতে আমন ধানের চারা গাড়লে, যদি দু’চার দোন (১২ কে.জি.=১ দোন) ধান হয় তাতেও এক মাসের ভাত হয়া যাবে। গরিবের সংসারে তাতেই বা কম কি। যে কয়দিন ঘরোত ভাত থাকে অন্তত সে দিন ক’টা নিশ্চিন্তে থাকা যায়।
তাই আব্দুল্লার মাঝে মাঝে কুলসুমকে বলে-দেখ্ আবিয়ার মা, বেটিগুলা হামার আসলে কপালি। তারা ঘরে আসিবার পর থাকি হামার অভাব অনেকটা কমি গেইছে।
কুলসুমও যে একেবারে টের পায়নি তা নয়, তবে গরিবের সংসারে বিষম অভাবের তাড়ণায় তার অনুভুতি গুলো অনেকটা ভোঁতা হয়ে গেছে। তাই মনের আবেগ আর আগের মতো তাড়া করে না।
কুলসুম বলে- ঠিক আছে আবিয়ার বাপ যেটা ভালো মনে হয়, সেটায় করেন। আজ কাজে যাবার নন?
না আবিয়ার মা, শরীরটা যেন কেমন কেমন করবার নাগচে। চাল-ডাল যা আছে তাতে কি আজ হবার নয়?
হ্যাঁ, ভাত না হয় হইলো, কিন্তু খাবেন কি দিয়া? তরকারি যে কিছুই নাই। সময় পাইলে জালখান ধরি নদীর পারোত যান। দু’একনাা মাছ পাইলেও না হয় খাওয়াটাতো হবে?
আচ্ছা ঠিক আছে, আগোত জমিখান ভালো করি তৈয়ার করি ন্যাও। তারপর না হয় জাল ধরি যাওয়া যাবে।
জমিতে হাল দিতে যেয়ে আব্দ্ল্লুাহ দেখে জমিটা একেবারে শুকনা খটখটে অথচ উপরে পানি ছপছপ করছে। বুভুক্ষু জোঁক গুলো অনেকদিন পর মানুষ পেয়ে নিজের পছন্দমত জায়গায় আব্দ্ল্লুাহকে খামচে ধরে। আব্দ্ল্লুাহ মুখের থুথু দিয়ে একটা একটা করে জোঁক ছাড়ায় আর হালের মুঠো শক্ত করে ধরে। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে লাঙ্গলের মুঠো ঠেসে ধরতে ধরতে ক্ষধুায় পেটের ভিতরটা কেমন টনটন করে উঠে। জমির মাঝখানে হাল খাড়া করে রেখে আব্দুল্লাহ বাড়ি আসে খেতে। কুলসুম মাটির সানকি ভার্তি পান্তা আর নুন তার সাথে দুটো কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াও দেয়। আব্দুল্লাহ মরিচ কামড়ে পান্তা ভাত খায় আর মুখে কিছু না বলে কুলসুমের দিকে তাকায়। কুলসুম তার চোখের ভাষা বুঝতে পারে, তাই সে একা একাই বলে-কাইল রাইতের এ্যাকনা আলুভর্তা ছিল সেটা আবিয়া ছাবিহা দু’বোনে মিলে খ্যায়া স্কুলে গ্যালো, মরিচ ছাড়া আর যে কিছুই নাই আবিয়ার বাপ। আব্দুল্লাহ মাথা নিচু করে পেটের ক্ষুধায় গোগ্রাসে পান্তা গুলো সাবার করে দেয়, তারপর সানকিটা মুখে লাগিয়ে চুমুক দিয়ে পান্তার অবশিষ্ট পানিগুলো তৃপ্তি ভরে খায়। পড়নের লুঙ্গিটা তুলে হাত মুখ মুছতে মুছতে কুলসুমকে বলে- আবিয়ার মা, জলদি করি এ্যাকনা হুক্কাটা দে’তো?
আব্দুল্লাহ হুক্কাটা হাতে নিয়ে গোড়স গোড়স করে কয়েটা টান দিয়ে আবার হাল ধরতে যায়। জমির কাদায় পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে গেলে আব্দদুল্লাহ দাঁড়িয়ে গলার রগ টানটান করে যতোটা পারা যায় কোমড়টাকেও সোজা করে নেয়। বাড়ির পাশে হালের গরু দু’টো বেঁধে, খালে জমে থাকা পানি দিয়ে তাদের গা ধুয়ে দেয়। ঘরের বেড়ার সঙ্গে ঠেস দিয়ে লাঙ্গল, জোয়াল ও মই রেখে বিচনবাড়ি (বীজ তলা) যায়, সেখানে যেয়ে দেখে কুলসুম সব (বিচন) চারা তুলে ফেলেছে। আব্দুল্লাহ মুচকি হেসে বলে-ঘরের বউকে ঘরের কাজেই ভালো দেখায়, বাইরে কাজ করা তাদের মানায় না।
কুলসুম চোখ বড়-বড় করে আব্দুল্লার দিকে তাকিয়ে বলে-এ দুনিয়ায় মানসির ভালো করিতে নাই, রৌদোত পুড়ি কাউয়ার মতো কালো কিচকিচা হয়া গেইছে, সেই জন্য মুই আসিনু এ্যাকনা সাহায্য করিবার। আর তায় কি না উল্টা মোকেই কথা শুনির নাকচে।
আরে বোউ রাগ করিস ক্যান? মুইকি খারাপ কিছু কবার পাঁও।
ইা তোমাতো হুজুর মানসি খারাপ কি কবার পান। যেই দিন থাকি নদী হামার ঘর-বাড়ি ভাঙ্গি ধরি গেইছে, সেই দিন থাকি জীবনের সুখ-আল্লাদ তামান চুলাত গেইছে। হামা কি বড়লোকের মাইয়া-ছওয়া যে, সারাদিন মুখোত সোনো-পাউডার মাখি, নয়া নয়া জামা কাপড় পিন্দি ঘরোত বসি থাকিমো। হামার কি আর সেই কপাল আছে?
আব্দুল্লাহ কুলসুমের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে-বউরে দেখিস, আল্লায় একদিন না একদিন হামার সেই দিন ফিরি দিবে। বেলাল আর জালাল সংসারের হাল ধরির পাইলে হামারও দুঃখ থাকিবার নয়।
তোমা সেই স্বপ্ন দেখি থাকো, বাড়িত মোর ম্যালা কাম পড়ি আছে। গরু ছাগল গুলা রৌদোত থাকি একেবারে জিহŸা মেলি দেখিবার নাগচে। ওগুলাক ছায়াত আনি পানি বান্দি পানি দেঁও।
হ্যাঁঃ যা, মুই ক্ষ্যাতের কামটা আগোত শ্যাষ করো তারপর দ্যাখো কি করা যায়। আইলে বসে আব্দুল্লাহ হুক্কায় আগুন দিয়ে পরপর দু’তিনটা টান দেয় এমন সময় পিছন থেকে ল্যাংড়া হারুণ ডাকে- দুলাভাই? আরে ও দুলাভাই, ছায়াত বসি জিড়াও। এতো রৌদোত কি আর তামাক খাওয়া জমে।
কি হারু মিয়া, এতোদিন পর কোন্টে থাকি বেড়াইলেন? চেহারা কেনাতো একেবারে ফুলফুলা বানাইছেন। এমন নাদুস-নুদুস চেহারা হইল কেমন করি?
আরে না দুলাভাই, তোমরা যে কি কন? মুই আগোত যেমন ছিনু, এলাও তেমনে আঁছো। খালি কয়দিনের জন্য এ্যাকনা ওদোলাবাড়িত (ভারত) ব্যাড়েবার গেছিনু। গ্রামের মায়া ছাড়ি হঠাৎ অন্য জায়গাত য্যায়া ভালে লাগে না দুলাভাই, আর মনও টেকে না। খালি বাড়ির কথা মনোত পড়ে।
হামারগুলারতো সেইটায় দোষরে হারু। বাড়ির মায়া ছাড়ি কোনটেও য্যায়া থাকির পাই না। সেই জন্যে হামার জীবনে আয় উন্নতিও হয় না, আইজো যেমন ঐ কাইলও তেমন। যা হোক, তা কি মনে করি এই ভরদুপুরে এত্তিকোনা?
দুলাভাই, মকবুল চাচা দু’তিন দিন ধরি খবর দিবার নাগচে, ক্ষমখায় মোক দেখা করির কইছে। মোরতো মনে হয় দুলাভাই, তার বড় বেটার বিয়া শাদি দিবে, সে জন্য এতো ঘণঘণ ডাকেবার নাকচে।
হবার পারে রে হারু, মোকও সেদিন কইছিল, বাড়িতে ভাত পাক করার লোক নাই। তাছাড়া বেটাও গাবুর হইছে বিয়াশাদি না দিলে নাকি কাজ কার্মে তার মন বসাতে পারে না। উড়ায়-ফাড়াং করি বেড়ায়।
যাক দুলাভাই, যে জন্য মুই তোমার কাছোত আসিনু সেটা হইলো হামার আবিয়ারও তো বিয়া-শাদি দেওয়া দরকার নাকি?
হ্যাঁ-রে ভাই, সেটাতো ঠিকই কইছেস কিন্তু মুই গরিব মানসি, চাইলে কি আর বেটির বিয়া দিবার পাঁও। সেই সাধ্য কি মোর আছে?
আচ্ছা দুলাভাই, মকবুল চাচার ঘরোত হামার আবিয়াক দেওয়া যায় না? একবার ভাবি দ্যাখো তো?
হারু, মুই গরিব মানসি, দিন আনি দিন খাঁও। বাড়ি নাই, ঘর নাই, মকবুল ভাই কি আর মোর ঘরোত তার সাগাই করিবে?
কথা কইতে তো আর দোষের কিছু নাই দুলাভাই, মুই এ্যাকনা কথা কয়া দ্যাখো। মোর তো মনে হয় যে, মকবুল চাচা এ্যাক কথায় রাজি হয়া যাবে। কারণ হামার আবিয়ার মতো দেখতে শুনতে চেহারা ছুরোত, চাল-চলন, আচার-ব্যবহার এই গ্রামোত আর এ্যাকটাও নাই।
আজ সকাল থেকে পেটের ভেতরে কেমন ঝিমঝিম করে একটু ব্যাথা অনুভব হচ্ছে, এ রকম ব্যথা এর আগেও বহুবার হয়েছে কিন্তু তা আব্দুল্লাহকে কাবু করতে পারে নাই। তবে আজকের ব্যথাটা একটু অন্য রকম। পেটের ব্যথার সাথে সারা শরীর কেমন টনটন করছে, মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে সে পড়ে যাবে। তাই আব্দুল্লাহ ঘরে এসে বিছানায় আধশোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। এমন অবেলায় আব্দুল্লাহকে বিছানায় দেখে কুলসুম প্রথমত একটু ঘাবড়ে যায়। হঠাত একটা অজানা আতঙ্ক এসে তার বুকের ভেতর প্রচণ্ড ভাবে আঘাত হানে। তাই সে আব্দুল্লাহর কাছে এসে তার কপালে হাত দিয়ে বলে- আবিয়ার বাপ, তোমার কি শরীর খারাপ? অবেলায় বিছিনাত শুতি আছেন যে?
হ্যাঁ আবিয়ার মা, শরীরটা কেমন ম্যচ-ম্যাচ করির নাকচে, প্যাটের ভিতরোত ঝিমঝিম করি বিষও হরার নাগছে। এক গøাস ঠাÐা পানি দে’তো।
এমন সময় সাঁকোয়া নদীর দিকে একটা হট্টগোল ও চেঁচামেচির শব্দ শোনা যায়। কুলসুম ঘরের দরজায় এসে ভালো করে মনোযোগ দিয়ে শোনে সেখানে মহিলা মানুষের কান্নার শব্দও পাওয়া যাচ্ছে। আব্দুল্লাহকে বলে- আবিয়ার বাপ, মুই বাইরে য্যায়া একনা শুনি আইসো নদীর পারোত কিশের গণ্ডগোল হবার নাগছে।
থাক, ওত্তিকোনা যাওয়ার দরকার নাই, কায় কি করে করুক।
আরে মুই ওত্তিকোনা যাবার নও, এমনি এ্যাকনা হামার খুলিবাড়ি থাকি দ্যাখো।
কুলসুম বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখে দু’তিন জন লোক গোলাম আলিকে ঘাড়ে করে নিয়ে যাচ্ছে, তার মাথা থেকে দরদর করে তাজা রক্ত ঝরছে। তার গায়ের গেঞ্জি ও পরনের লুঙ্গি রক্তে ভিজে যাচ্ছে। গোলাম আলির বউ বাচ্চা কাঁদতে কাঁদতে পিছে পিছে দৌড়াচ্ছে ।
মূল ঘটনাটা হলো গোলাম আলি তিনকুড়ি মহাজনের কাছে জমি বন্দক রেখে সামান্য কিছু টাকা নিয়েছিল এবং সময়মত সুদে-আসলে সেই টাকা পরিশোধও করেছে। কিন্তু তিনকুড়ি মহাজন এখন সেটা অস্বীকার করে আরও টাকা দাবি করে এবং সেই জমির দখল ছাড়ে না। গোলাম আলি গ্রামের মেম্বর সহ অন্যান্য মান্যগণ্য ব্যাক্তিবর্গকে ডেকে তার জমি ফেরত দেওয়ার জন্য তিনকুড়ির বিরুদ্ধে বিচার দেয়। কিন্তু তাতেও কোন ফল না হওয়ায় গোলাম আলি তার জমিতে হাল দিতে গেলে তিনকুড়ি মহাজনের লোকজন এসে বাঁধা দেয়। এতে উভয়ের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বাঁধে এক পর্যায়ে তিনকুড়ি মহাজনের লোকজন এসে মেরে গোলাম আলির মাথা ফাটিয়ে দেয়। গোলাম আলির বড় ভাই আমির পাড়ার লোকজন সহ লাঠিসোঁটা নিয়ে আসে ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে শুরু হয় তুমুল মারা মারি। বেশ কয়েকজন অল্প-স্বল্প আহত হলেও গোলাম আলি একেবারে গুরুতর আহত হয়।
সবাইমিলে ধরাধরি করে তাকে প্রফুল্ল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়, কিন্তু মাথা থেকে এতটাই রক্ত ক্ষরণ হয়েছে যে ডাক্তারের কাছে পৌছানোর আগেই তার প্রাণ পাখি উড়ে যায়।
তিনকুড়ি মহাজনের বিরুদ্ধে কারো কথা বলার সাহস নাই। যৌবন কালে সে নিজেও একজন নামকরা ডাকাত ছিলো। চুরি-ডাকাতি করে, মানুষের সম্পদ লুট করে, মানুষকে ঠকিয়ে নিজে সম্পদের পাহাড় গড়ে। টাকার জন্য পৃথিবীর এমন কোন কাজ নেই যা সে করতে পারে না। গ্রামের মেম্বার-চেয়ারম্যান সহ সবাই তাকে ভয় পায়। তার সামনে কেউ জোর করে কথা বলা তো দূরের কথা, চোখ তুলে তাকারও সাহস পায় না। যার সাথে একবার টক্কর লাগে দিনের বেলা কিছু না বললেও গভীর রাতে তার মাথা কেটে নিয়ে তিস্তা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এ জন্য গ্রামের সবাই তাকে খুব ভয় পায়, সমীহ করে কথা বলে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now