বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ - মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
রাজশাহীর গ্রীষ্মের দুপুর। আকাশে আগুনের লেলিহান শিখা যেন নেমে এসেছে। সূর্য মাথার ওপরে দাঁড়িয়ে যেন দাউ দাউ করে জ্বলছে। সারা শহর ভিজে গেছে ঘামে আর ক্লান্তির ধোঁয়াশায়। পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সামনের রাস্তা তখনো ভরপুর ভিড়ে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে, কিছু অভিভাবক অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে।
শিক্ষক নওশাদ স্যার মোটরসাইকেলে বসে হেলমেটটা ঠিক করলেন। তিনি ছিলেন মধ্যবয়সী একজন মানুষ—বেশ শান্ত, বিনয়ী, এবং তার ছাত্রছাত্রীদের কাছে খুবই প্রিয়। দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা জীবনে তিনি চেষ্টা করেছেন ধৈর্যকে ঢাল আর নীতিকে তরবারি করে পথ চলতে। তবে শিক্ষকতার জীবন মানেই সহজ জীবন নয়। তিনি জানতেন, শিক্ষক মানেই এক অদৃশ্য কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা, যেখানে ছাত্ররা ভুল করলেও সমাজের চোখে অপরাধী সবসময় শিক্ষকই হয়ে যান।
দুই বছর আগে এক মেয়ে, নাম ধরো রিমি, স্কুলে বারবার অসদাচরণ করত। ক্লাসে চিৎকার, ঝগড়া, সহপাঠীদের মারধর, এমনকি শিক্ষকদের সাথে অশোভন ব্যবহার। বহুবার সতর্ক করার পর অবশেষে কর্তৃপক্ষ তাকে টিসি দিয়ে দেয়। সমাজে তখন অনেকে নানা কথা বলেছিল—“অমুক স্যারের স্কুলে মেয়েটা টিকল না,” কিংবা “শিক্ষকরা নাকি বেশি কড়া ছিলেন।” অথচ সত্যিটা আর কেউ দেখেনি।
রিমি এখন অন্য স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী। কিন্তু প্রতিদিনই সে যেন প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকে। শিক্ষকদের শাস্তি দেওয়ার হুমকি, নানা কৌশলে ওত পেতে থাকা—সব মিলিয়ে তার জীবন যেন এক অন্ধকার প্রতিশোধপরায়ণতার মঞ্চ।
সেদিন বিকেল গড়াচ্ছিল। স্কুল শেষে নওশাদ স্যার মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাৎ সামনের এক মোড়ে তিনি শুনলেন করুণ আর্তনাদ—
—“হেল্প! হেল্প!”
আশেপাশে মানুষজন সরে দাঁড়িয়েছে, কেউ যেন কাছে আসতে সাহস করছে না। স্যার মনে করলেন হয়তো কোনো মেয়ে বিপদে পড়েছে। শিক্ষক হৃদয় তো কোমল, তিনি দ্বিধা করলেন না। মোটরসাইকেল থামিয়ে ছুটে গেলেন মেয়েটির দিকে।
কিন্তু যেই মুহূর্তে তিনি মেয়েটির সামনে পৌঁছালেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই আকাশ ফেটে পড়ল। চোখের পলকে মেয়ে—যে কিনা রিমি—তার হাতে লুকানো ধারালো ছুরি দিয়ে শিক্ষকের ঘাড়ে বসিয়ে দিলো ভয়ানক আঘাত।
স্যার মুহূর্তেই আতঙ্কে পেছনে সরে গেলেন। রক্ত ঝরতে শুরু করেছে। তিনি আত্মরক্ষার জন্য হাতে চাপ দিলেন, কিন্তু তাতেও হাত কেটে গেল। চারপাশে চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ, বিশৃঙ্খলা। মানুষ এগিয়ে আসছে, কেউ ফোন করছে অ্যাম্বুলেন্সে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—শিক্ষক কোনো নালিশ করলেন না। থানায় মামলা করেননি, মিডিয়ায় কাউকে দোষারোপ করেননি। বরং আহত শরীর নিয়ে তিনি রিমিকে ধরে তার অভিভাবকের কাছে পৌঁছে দিলেন।
কেউ হতবাক হয়ে গেল। কেউ ভাবল—“স্যার হয়তো দুর্বল।” আবার কেউ বলল—“তিনি বুঝি খুব সরল।”
কিন্তু এর পেছনে ছিল এক গভীর বেদনা। নওশাদ স্যার জানতেন, যদি তিনি কোনোদিন রিমিকে বেত্রাঘাত করতেন—যেমনটা পুরোনো দিনের শিক্ষকেরা করতেন—তাহলে আজ সোশ্যাল মিডিয়া জ্বলেপুড়ে যেত। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ত হাজারো ফেসবুক পেজে। শিরোনাম হতো—
“শিক্ষকের অমানবিকতা! কোমলমতি ছাত্রীর উপর নির্যাতন!”
সন্ধ্যার মধ্যে স্যারের নাম হয়ে যেত সারা দেশের আলোচনার কেন্দ্র। টেলিভিশনের স্ক্রলে চলত ব্রেকিং নিউজ, অনলাইনে উঠত প্রতিবাদ। শিক্ষক মানেই হতো অপরাধী। প্রশাসনও তাকে জেলখানায় ঠেলে দিত কোনো দ্বিতীয় চিন্তা ছাড়াই।
কিন্তু আজ—এক ছাত্রী যখন শিক্ষকের ঘাড়ে ছুরি বসালো—তখন কি হলো? কোথায় গেল সেই সোশ্যাল মিডিয়ার আওয়াজ? কোথায় গেল সেই হাজারো প্রতিবাদমুখর কণ্ঠ? নীরবতা যেন আকাশ ঢেকে দিল। মানুষজন দু-একদিন ফিসফিস করল, তারপর ভুলে গেল।
নওশাদ স্যার বিছানায় শুয়ে এই নীরবতার ভার অনুভব করলেন। মনে হলো, সমাজের কাছে শিক্ষক সবসময় দায়ী, কিন্তু ছাত্র বা অভিভাবকরা দায়মুক্ত। যেন শিক্ষকের কাজ শুধু সহ্য করা, দোষ চাপানো আর নীরবে রক্ত ঝরানো।
তিনি ভাবলেন—“আমি যদি রিমিকে বেত্রাঘাত করতাম, আজ হয়তো আমার সন্তানরা স্কুলে মুখ দেখাতে পারত না। স্ত্রী সমাজের কাছে লজ্জিত হতো। অথচ আজ আমি রক্তাক্ত, তবু সমাজ নিশ্চুপ। শিক্ষক মানুষেরও সন্তান, পরিবার, স্বপ্ন আছে—তা কেউ মনে রাখে না।”
রাত গভীর হলো। হাসপাতালের জানালার বাইরে আকাশে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে তার ব্যান্ডেজ বাঁধা ঘাড়। তিনি চোখ বন্ধ করলেন। মনে ভেসে উঠল ছাত্রদের মুখ, যাদের তিনি মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। মনে হলো, এই সমাজের মুখোশ আর নীরবতা—তার শিক্ষকতার জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত।
একসময় হয়তো রিমিও বড় হবে। একদিন আয়নায় তাকিয়ে দেখবে তার ভেতরের অন্ধকার। তখন হয়তো সে বুঝবে, শিক্ষক তাকে আঘাত করেননি—বরং বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন আর হয়তো নওশাদ স্যার থাকবেন না।
তবু ইতিহাস একদিন লিখবে—একজন শিক্ষক রক্তাক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু প্রতিশোধ নেননি। তিনি কেবল সমাজকে প্রশ্ন করে গেছেন—
“শিক্ষকের হাতে বেত্রাঘাত হলে সমাজ তোলপাড় হয়, কিন্তু শিক্ষকের ঘাড়ে ছুরির আঘাত পড়লে সমাজ নীরব থাকে কেন?”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now