বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
“অবরুদ্ধ জীবনের গল্প” পর্ব-২
সন্ধ্যার আকাশে একফালি চাঁদ নির্মল জোসনা ছড়াচ্ছে হয়ত তাই আব্দুল্লাহর মনটাও বেশ উৎফুল্ল, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আবেগ আপ্লুত। আব্দুল্লাহ বলে- শোন্ আবিয়ার মাও, তোর কি মনে আছে? বিয়ার দিন তুই গরুর গাড়িতে গোটা রাস্তাখান কান্দিতে কান্দিতে আসছিলু, বাড়ি আসিয়াও তোর কান্দোন থামে না। আর তোর সেই কান্দন থামাইতে মোর গোটায় রাইতখান চলি গেলো।
কুলসুম, আব্দুল্লাহর পেটে একটা চিমটি কেটে বুঝিয়ে দিলো যে থামো, মেয়েরা বড় হয়েছে, ওদের সামনে কি আর সবকিছু বলা যায়?
কুলসুম একটা ছেড়া কাঁথা আর সুঁই সুতো নিয়ে আঙ্গিনায় আব্দুল্লাহর পাশে বসে বলে- মা ছাবিহা এ্যাটেকোনা এ্যাকনা ধরতো। কাইল রাইতোত তোর বাপ পায়ের আঙ্গুল দিয়া অর্ধেকখান কাঁথা ছিঁড়ি ফেলাইছে। সেলাই করি না দিলে তো বাদ বাকিখানও আর থাকবে না। কাঁথাখান সেলাই না করলে ঝড়-বৃষ্টির দিনোত তোর বাপ ফির কি গায়োত দিবে।
আব্দুল্লাহর বোউ কুলসুম, মাঝে মধ্যে তিনকুড়ি মহাজনের বাড়িতে যায়, টুকি-টাকি কাজ কর্ম করে। গতদিনে মহাজনের বাড়িতে মেহমান আসায় অনেক কাজ বাড়ে, শরীরের উপর খুব ধকল যায়। তাই কুলসুমের চোখে যেন রাজ্যের সব ঘুম এসে জড়ো হয়, সে কিছুই টের পায়না। আব্দুল্লাহ ঘুম থেকে ওঠে কাজে যাবার জন্য, হাত-মুখ ধুঁয়ে এসে হাড়ি-পাতিল গুলোর দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে, হাড়ির তলায় সামান্য একটু দলাপাঁকা ভাত, সেটুকুও যদি সে খেয়ে যায় তাহলে অবুঝ বাচ্চাগুলো কি খাবে? সারাদিন তাদের না খেয়ে থাকতে হবে। এই ভেবে সে কুয়ো থেকে একবালতি পানি তুলে, তাতে মুখ লাগিয়ে ঢোক ঢোক করে অর্ধেক বালতি পানি গিলে ফেলে। তারপর হুক্কায় আগুন দিয়ে দু’তিনবার টেনে খক্-খক্ করে কাশি দিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায় কাজের সন্ধানে।
বেলা অনেক হয়ে গেছে শরীরটাও ম্যাচ ম্যাচ করছে, সারা গায়ে ব্যথা, তবুও যেতে হবে কাজে। অনেক থালা বাসন হয়তো তার জন্য এখনও পড়ে আছে। সে গুলো পরিষ্কার করতে হবে, ঘর-উঠান ঝাড়– দিতে হবে, রান্না করতে হবে আরও কতো কাজ তার পড়ে আছে। আবিয়া-ছাবিয়া স্কুলে যাওয়ার জন্য জামা কাপড় পড়ছে, মাকে ঘুম থেকে উঠতে দেখে আবিয়া বলে- মা, তোমার কি আজ কাজে যাওয়া নাগবে?
হ্যাঁ, যাবার নাগবে-রে -মা।
তোমার না শরীর খারাপ, গায়োত জ্বর আছে? একদিন কাজোত না গেইলে কি হয়?
না রে মা, কাইল অনেকগুলা থালা বাসন থুইয়া আচ্চু। আর আইজ যদি কাজোত না যাঁও, তাহলে রহিমা বুবু রাগ করি আর কোন দিন মোক কাজোত ডাকবার নয়। ছোট হাড়িটায় এ্যাকনা ভাত আছে, তোমা দুই বোইনে খাও।
বই হাতে নিয়ে মেয়েকে স্কুলে যেতে দেখে বহুদিন আগের কথা কুলসুমের মনের ভেতর উঁকি দিয়ে ওঠে। ছোট বেলার সেই আনন্দঘণ দিনগুলো, সেই আবেগ উচ্ছ্বাস। ওরকম বয়সে সঙ্গী সাথিদের নিয়ে গলা ধরাধরি করে লাফাতে লাফাতে স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে সাঁকোয়া নদীর হাটু জলে নেমে শাপলা ফুল তুলে মাথায় গুঁজে নাচতে নাচতে বাড়ি আসা। আরও কত কি? সেই এতদিন পর পুরোনো লোহায় জঙ ধরার মতো ভোঁতা আবেগ আজ ধুঁয়ে মুছে চকচকে হয়ে বুকের ভেতর উঁপচে পড়লো। তার সারাটা শরীর কেমন যেন শিরশির করে ওঠে। বাপের অনেক জমি জায়গা ছিলো, ঘরে ধান পচে যেত, খাওয়া-দাওয়ার কোন অভাব ছিলো না। গরু ছাগল, হাঁস মুরগী বাড়িতে কি উৎপাত করত? দুধভাত খাওয়ার ভয়ে তারা পালিয়ে বেড়াতো আর মা তাদের খাওয়ানোর জন্য পিছে পিছে লেগেই থাকতো।
বিয়ের বয়স হতে না হতেই আব্দুল্লাহর সংসারে আসে কুলসুম, শুরু হয় সংসারের ঘানি টানা। খুব বড় সংসার শ্বশুর শাশুড়ি, দেবর ননদ আরও দু’চার জন কাজের লোকতো থাকেই সারা বছর। এখানেও কোন কিছুর অভাব ছিলো না। গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, ক্ষেত ভরা শাক সব্জি। কতো মানুষ এসে এমনিতেই চেয়ে চেয়ে নিয়ে যেতো।
রাতে কুলসুম, মেঝেতে একটা মাদুর পেতে আবিয়া, ছাবিয়া ও তার বাবাকে খেতে দেয়। আবিয়া তার মাকে তাদের সাথে খাওয়ার জন্য টানা টানি করে, কিন্তু কুলসুম খেতে বসে না। আবিয়া খুব বেশি পিড়া-পিড়ি করলে, কুলসুম বলে- ‘মা-রে তুই বুঝবু না, তোর বাপক প্যাট ভরে না খাওয়াইলে মোর যে প্যাটোত ভাত যা-য়ে না?’
কুলসুমের বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস আসে তার দুই ছেলের একটিও কাছে নেই, তারা যে কোথায় আছে, কি খাইতেছে, মায়ের মন সন্তাদের চোখের সামনে না দেখলে সায় দেয় না। অভাবের তাড়ণায় বড় ছেলে বেলাল ভারতে যেয়ে চা বাগানে কাজ করে। আর ছোট ছেলেটা মানুষের বাড়িতে বাৎসরিক চুক্তিতে কাজ-কর্ম করে, মালিকের বাড়িতেই খায়, সেখানেই থাকে। অনেকদিন বাড়িতে আসে না, মালিক নাকি ছুটি দেয় না।
আজকের দিনটা কোন রকমে আধপেটে পার হলে আবার কালকে কি হবে এই ভেবে রাতে আব্দুল্লাহর ঘুম আসে না। এ পাশ ওপাশ করে কখনো চোখের পাতা দু’টো এক হলে পরোক্ষণে আবার গা ঝিমিয়ে ওঠে। হাত-পায়ের শিরাগুলো টন-টন করে। শিরার ভেতর দিয়ে ক’ফোটা রক্ত যায়-আসে, সেটাও বলতে পারে সে। তার একমাত্র সম্পদ দু’টো বকরি, শত কষ্টের মধ্যেও সে বিক্রি করে নাই কিন্তু এবার বুঝি আর রক্ষা করা যায় না। বাচ্চা কাচ্চা যদি তার না খেয়ে মরে যায়, তবে বকরি দিয়ে কি হবে? ছেলে দুটো বাড়িতে নেই। অভাবের সংসারে কিইবা করার আছে তারা কাজে কাজে থাকে। যে যার মতো পায় দু’চারটাকা আয় করার চেষ্টা করে। সংসারে তবুও অভাব পিছু ছাড়ে না। আব্দুল্লার আয়-রোজগার বলতে মানুষের বাড়িতে দিনমজুরি করা, এতেই কোন খেয়ে না খেয়ে দিন চলে যায়।
জীবনের হাল ছেড়ে দেওয়ার মানুষ আব্দুল্লাহ নয়। কষ্টি পাথরে গড়া তার দেহ, মন। তার ধৈর্য্যরে সীমা যেন আকাশ স্পর্শ করে, তবু ধৈর্য্যরে কাঁটা নড়ে না। গ্রামটা দিনের পর দিন কেমন বৃষ্টিহীন, মরা শস্যশূন্য হয়ে যাচ্ছে। এবার বর্ষায় বৃষ্টি হবে, আশ-পাশের খাল বিল, নদী-নালা থই-থই পানিতে ভরে যাবে-তারা জমিতে ফসল বুনবে, কোন জমি পতিত থাকবে না। এ আশায় বুক বেঁধে আব্দুল্লাহ গামছাটা ঘাড়ে নিয়ে বাইরে বেড়িয়ে পড়ে। জীবনের অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজ যা কিছুই তার স্বাক্ষাত হয় কেবলি উড়ন্ত মেঘের মতো মনের কোণে থেকে ছায়া সম্পাদ করে।
আব্দুল্লাহ সেই কাক ডাকা ভোরে বেড় হয়ে যায় মানুষের বাড়ি, সারাদিন কাজ করে মজুরি হিসেবে যা পায় তা দিয়ে চাল ডাল তরি তরকারি কিনে নিয়ে আসে। আর এভাবেই চলে তার গরিবের সংসার। আব্দুল্লাহ মনে মনে ভাবে মেয়েদু’টো স্কুলে সারাদিন না খেয়ে থাকে, এমন হতভাগা বাবা সে, দুপুরে কিছু একটা কিনে খেয়ে যে এক গ্লাস পানি খাবে সেই জন্য দ’একটি টাকাও কোনদিন তাদের হাতে সে দিতে পারে নাই। তার বন্ধু-বান্ধবীরা টাকা-পয়সা নিয়ে যায় এটা-সেটা কিনে খায়, মেয়ে আমার মনের দুঃখে ক্লাসেই বসে থাকে। সে এক হতভাগ্য বাবা যে মেয়ের নূন্যতম চাহিা পূরণ করতে পারে না। মাঝে মাঝে মরে যেতে ইচ্ছে করে তার কিন্তু পরক্ষণে ভাবে, সে মরে গেলে তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যাবে এমনকি তার পড়া-শুনাও সারা জীবনের তরে বন্ধ হয়ে যাবে। তার চেয়ে ভালো কষ্ট করে হলেও সে পড়া লেখাটা চালিয়ে যাক, নিজের জীবনটাকে নিজের মতো করে গড়ে তুলুক।
ফজরের আজান দেওয়ার সাথে সাথে ঘুম থেকে উঠে আব্দুল্লাহ জাল ও খলাই (মাছ রাখার পাত্র) নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে নদীর দিকে। নদীতে নতুন জোয়ার আসায় পানি ফুলে উঠেছে, ঘোলাও একটু বেশি মাছ দেখা যাচ্ছে না। আব্দুল্লাহ জাল খলাই রেখে নদীর ধারে বসে ভাবে-মানুষের গোটা জীবনটা আস্ত একটা নদীর মতো। নদীর চলার পথে বাঁকের মাথায় যেয়ে আছাড় খায়, তখন চলার গতি বদলে দিয়ে অন্যদিকে যায়। মানুষের জীবনেও কত বাঁক! পদে পদে তার চলার গতি বদলায়। কত মানুষে মাছ ধরে একদিন তার বাড়িতে দিয়ে যেত, কত বড় বড় মাছ। কচির মিয়া প্রায় প্রতিদিনই মাছ ধরে নদী থেকে সোজা চলে আসত আমাদের বাড়ি বড় বড় মাছগুলো বেড় করে আমাদেরকে দিত আর ছোটগুলো সে বাড়ির নিয়ে যেত নিজে খাওয়ার জন্য। পরে এসে কোন দিন টাকা পয়সা আবার কোন দিন চাউল নিয়ে যেত। কচির মিয়া মারা গেছে কিন্তু আজ সে নিজেই কচির মিয়া হয়ে বেঁচে আছে।
নদীর পানিটা একটু কমতে শুরু করেছে আর পানি কমলে মাছগুলো চঞ্চল হয়ে ওঠে, এদিক সেদিক দৌড়া-দৌড়ি করে তখন দু’চারটা মাছ জালে ধরা পড়ে। আব্দুল্লাহ এবার আল্লাহর নাম নিয়া নদীতে জাল ফেলে দিলো আর অমনি একটা বড় মাছ এসে তার জালে ধরা পড়লো। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় আজ অনেক মাছ ধরা পড়ে তার জালে। মাছ খেয়ে তো আর পেটের ক্ষুধা মিটে না? তাই একবার মনে মনে ভাবে বড় বড় মাছগুলো বাজারে বিক্রি করে চাল, ডাল নিয়ে আসবে। কাল থেকে বাচ্চারা শিঁকায় তোলা এতোটুকু চাউলভাজা খেয়ে আছে। হঠাত ভরা পূর্ণিমার অ¤øান জোছনাকে যেমন- গ্রহণ লেগে ঝাঁঝাঁলো অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয় তেমনি আব্দুল্লার মুখটা যেন কেমন ফ্যাকাশে হয়ে যায় এতো বড় গেরস্তের ছেলে, সে কি না আজ মাছ বিক্রি করবে? এটি তার আত্মসম্মানে বাজে। কিন্তু পেটের ক্ষুধা তো দোজখের চেয়েও ভয়ঙ্কর! অনাহারে, অভাব-অনটনের ভেতর দিয়ে চলতে চলতে বংশ মর্যাদা আর পরিবারের ঐতিহ্যের কথা সে ভুলে যেতে বসেছে। বোউ বাচ্চা নিয়ে দিন-রাত না খেয়ে, ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে আত্মসম্মানের কথা সে ভুলে যায়। যাদের ঘরে চাল আছে তরকারী না হলেও তো ভাত রান্না করে আলু ভর্তা দিয়ে খেতে পারে, এতে অন্তত প্রাণটা বেঁচে যায়। তার মতো যাদের ঘরে চালও নাই তাদেরতো না খেয়ে মরা ছাড়া আর কোন উপায় নাই।
সুধারাম (ভেরকেশা) জেলে মাছ ধরা শেষ করে বালুচরে জালখানা রোদে বিছিয়ে দিয়ে এদিক-ওদিক টানা-টানি করে তাড়াতাড়ি শুকানোর চেষ্টা করছে। আব্দুল্লাহকে এদিকে আসতে দেখে সুধারাম (ভেরকেশা) জিজ্ঞাসা করে-কি আব্দুল্লাহ দা, আজ কতগুলা মাছ পাইলেন? তোমার খলাই (মাছ রাখার পাত্র) যে ক্যানেভালা নড়ে না দাদা।
হ্যাঁরে সুধা, ভালোই পাইছি আর মাছও বেশ বড় বড়, দুইটা আইড় মাছও আছে। সবে সেইজনের ইচ্ছা-রে সুধা নইলে যে গরিব মানসি না খ্যায়া মরিবে।
তোমা ঠিক কথাই কইছেন দাদা। ভগবান কাউকে না খেয়ে মারে না। দাদা নিত্যদিন তোমা যে কার মুখ দেখি আইসেন, ভাল্-ভাল্ মাছগুলা খালি তোমায় পান।
হ্যাঁরে সুধা, তোর সাথে একনা কথা কবার জন্য আসিনু।
কি কথা দাদা? তাড়াতাড়ি কও? বাজারের বেলা শ্যাষ হয়া যাবার নাকচে। মোকতো মাছগুলা ব্যাচা নাগবে।
সুধা, তুইতো জানিস, মোর আগের দিন আর নাই। লজ্জা-শরমের কথা চিন্তা করিলে মোক বোউ-ছওয়া ধরি না খ্যায়া মরির নাগবে।
দাদা, লজ্জা শরমের ভিত্তি দেখি তোমা কি করিবেন? যাক দেখি তোমা শরম পান, তায় কি তোমাক দশটাকা দিবে? একদিন না খ্যায়া থাকিলে কি কোন শালা আসি তোমাক এক মুঠি চাউল দিয়া যাবে দাদা?
আসলে তুই ঠিক কথাই কইছিস সুধা, কোন শালাও দিবে না।
সুধারামের খাঁচায় মাছ গুলো ঢেলে দেয়ার সময় আব্দুল্লাহ নিজের অজান্তেই এদিক ওদিক তাকায়, যদি কেউ দেখে ফেলে। কিন্তু না, আপাতত ধারে কাছে কেউ নেই। তাই মনের দিক থেকে সে অনেকটা হাফ ছেড়ে বাঁচে।
আব্দুল্লাহ ছোট ছোট কয়েকটা পুটি, খলসে আর ট্যাংনা মাছ বাড়ির জন্য নিয়ে, বাদ-বকি সব মাছ বিক্রি করার জন্য সুধারামকে দেয়। সামান্য কয়েকটা মাছ নিয়ে যখন সে বাড়িতে আসে, কুলসুম তাকে দেখে মনে মনে ভীষণ রাগ হয়। সে ভাবে-‘কাল থেকে বাচ্চাগুলো এক রকম না খেয়ে আছে, আর আজও যদি ভাতের কোন ব্যবস্থা না হয়, তাহলে কি হবে?’ অনাহারে থেকে থেকে মেজাজটাও কেমন রুক্ষ ও খটখটে হয়ে যায় কুলসুমের। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলে-“হ্যাঁ আবিয়ার বাপ, আইজ যে শিঁকার কৌটাগুলাও খালি হয়া পড়ি আছে, পাক-শাক করাও কোন কিছু নাই, কি হবে আইজ?”
আব্দুল্লাহ মনে মনে একটু ভাব নেয়, যেমন পৃথিবীর সব পুরুষেরাই বোউয়ের উপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করার জন্য, বীরপুরুষ হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য, যতো রকমের কৌশল আছে সব প্রয়োগ করতে চায়। সেও এমন ভাব দেখায় যে, বোউয়ের কোন কথাই তার কানে পৌছেনি।
আব্দুল্লাহ বোতামহীন জামাটা গায়ে জড়াতে জড়াতে বলে-বোউ বাজারের ব্যাগটা এ্যাকনা দে’তো? তাড়াতাড়ি র্ক, দেরি হয়া যাবার নাগছে।
কুলসুম ধড়ফড় করে বাজারের ব্যাগটা এনে আব্দুল্লাহর হাতে দিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ চিন্তাহীন উৎফুল্লতার একটা ছাপ খুঁজে পায়। যেহেতু আব্দল্লাহ নিজে থেকে কোন কিছু বললো না তাই কুলসুমও বিষয়টা নিজের মধ্যে চেপে রাখলো।
আব্দল্লাহ ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেড় হয়ে গেলে কুলসুম চুলা থেকে ছাই বের করে মাছগুলো মেখে উঠানে বসে কুটতে শুরু করে। এমন সময় পাশের বাড়ির এরফানের বোউ হাতে একটা পোটলায় কেজিখানেকের মতো চাউল নিয়ে এসে কুলসুমকে বলে-চাচি চাউলগুলা এ্যাকনা নেওতো।
চাউল ফির ক্যানে বোউমা?
ক্যানে চাচি, তোমা ভুলি গেইছেন? শুকুরবার হামার বাড়িত সাগাই (মেহমান) আসছিলো সেই জন্য না মুই তোমার চাউল ধার নিয়া গেনু?
কুলসুম নিজের জিহবা নিজেই কামড় দিয়ে বলে-“না বোউমা, মোর এ্যাকনাও মনে নাই। আজকাল যে কি হইছে বোউমা, কোন কিছুই মোর মনে থাকে না।”
এরফানের বোউ চলে গেলে কুলসুম মনে মনে সে কথা ভেবে নিজের উপর ভীষণ রাগ হয়, তার চাউল মানুষের ঘরে আর সে কি না চাউলের অভাবে কাল থেকে বাচ্চা-কাচ্চাসহ না খেয়ে আছে? এক মুহুর্ত দেরি না করে কুলসুম একটা চুলোয় ভাত আর অন্য চুলোয় মাছ বসিয়ে দেয়। খুব অল্প সময়ে রান্না হয়ে গেলে আবিয়া-ছাবিহাকে খেতে দেয় কুলসুম। এমন সময় আব্দুল্লাহও চলে আসে বাজার করে।
কুলসুম বলে-আবিয়ার বাপ? খরচপাতিগুলা থুইয়া হাত মুখখান ধুইয়া খাবার আইসো, সবাই এক সাথে বসি খাই।
আব্দুল্লাহ ভাতের থালা নিয়ে বসে ভাবে- কি সুন্দর পরীর মতো ছওয়া দুইটা তার, সারাদিন না খ্যায়া আছে, একবারের জন্য খাবার চায় নাই। ক্ষুধার জ¦ালায় তাদের মুখগুলো কালো হয়া গেইছে। হায় খোদা! কোন পাপের শাস্তিতে তুই জ্বলি-পুড়ি মারিবার নাগছিস মোক। মাছের ঝোল মাখা এক লোকমা ভাত মুখে তুলে দেবে এমন সময় পিছন থেকে বেলাল এসে ডাকে- মা, ও মা? এক লাফ দিয়ে কুলসুম উঠে দাঁড়ায়, অনেক দিন পর ছেলেকে দেখে তার চোখ অশ্রæসিক্ত হয়ে পড়ে। কুলসুম বোলাকে বলে-হ্যাঁরে বাবা, এতোদিন পর তোর মা’র কথা মনে পড়িল?
মা, মালিক ছুটি না দিলে মুই করিম?
যা বাবা হাত-মুখখান ধুইয়া আয় আগোত এ্যাকনা খাই।
ছাবিয়া ভাতের থালা ছেড়ে উঠে চুপি চুপি কূয়োর পারে যেয়ে বেলালের কানের কাছে মুখ লাগিয়ে দিয়ে বলে-এই ভাইয়া, মোর জন্য কি আনছিস? আগোত ক’ নইলে মুই ভাত খাইম না।
বেলাল আর হাসি থামাতে না পেরে উচ্চস্বরে হো-হো করে হেসে ওঠে। তারপর ছাবিয়াকে কোলে নিয়ে ভাত খেতে আসে।
আবিয়া আর ছাবিয়ার মাঝখানে বসে বেলাল। আবিয়া চুপিচুপি বলে-ভাইয়া, ছাবিয়া তোক কানে কানে কি কইল?
বেলাল হেসে ওঠে বলে-আচ্ছা আগোত ভাতটা খাবারদে, তারপর কঁও।
অনেক দিন পর ভাই-বোনের মুখে হাসি দেখে কুলসুমের চোখের কোণে আনন্দের অশ্রæ এসে গেলো। তার মনে হলো, ছোট্ট এই ভাঙা কুঁড়ে ঘরে যেন স্বর্গ নেমে এসেছে আজ।
এখন শরৎকাল আকাশে ভাঙ্গা ভাঙ্গা মেঘের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। চারিেিক অ¤øান জোছনা। সেই চাঁদের আলোয় তার তিন সস্তানের মুখগুলো যেন তিনটা চাঁদের মতো জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। মাঝে মাঝে দক্ষিণা বাতাস ঝিরি ঝিরি করে বইছে। অনেকদিন পর জীবনটাকে একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে কুলসুমের।
বেলাল তার জন্য কি এনেছে এটা ভেবে গাপুস-গুপুস করে এক নিমিশে থালার ভাতগুলো শেষ করে ফেলে ছাবিয়া। হাত না ধুয়ে এক দৌড়ে ঘরে চলে যায়, ব্যাপারটা কুলসুমের চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না। কুলসুম হাসতে হাসতে বলে- এই ছাবিয়া, এটো হাতখান আগোত ধুইয়া যা।
আবিয়া ভাত খেতে খেতে বামহাত দিয়ে মুখটা ঢেকে হাসে। মেয়ের কীর্তি কলাপ দেখে আব্দুল্লাহও বাঁকা চোখে কুলসুমের দিকে তাকায়। জোয়ান ছেলের সামনে আব্দুল্লাহর এমন চাহনিতে কুলসুম ভীষণ লজ্জা পায়। ভেতরে ভেতরে বিব্রত হয়ে পানির জগটা হাতে নিয়ে আব্দুল্লাহর ভরা গøাসে আবার পানি ঢালে এতে গøাস উছলে সব পানি নিচে পড়ে পাতানো মাদুর ভিজে যায়। এবার সত্যি সত্যি যেন লজ্জা পেল কুলসুম, ঠোঁটে ঠোঁট কামড়ে ধরে আঁচলে নিজের মুখটা ঢেকে ঘরে চলে যায়।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now