বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম - মাজহারুল মোর্শেদ
“অবরুদ্ধ জীবনের গল্প” পর্ব -১
গভীর রাত নিঝুম প্রকৃতি কোথাও কোন সাড়া-শব্দ নেই। চারিদিকে অন্ধকার সুনসান নীরবতা। মাঝে মাঝে দু’একটি ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। বাঁশবাগানের ভেতরে জোনাকি পোকাগুলো মিটি-মিটি করে জ্বলছে। গোটা আকাশ কালো মেঘে ঢেকে আছে। হঠাৎ একটা বিকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকালো অমনি দরজা জানালার কপাটগুলো থরথর করে কেঁপে উঠলো। কোথা হতে একটা দমকা হাওয়া এসে টেবিলের উপরে সাজানো গোছানো আমার অসমাপ্ত উপন্যাসের পাতাগুলোকে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এলোমেলো করে দিলো। হ্যারিকেনের ভাঙ্গা চিমনির ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকে আগুন নিভিয়ে দিলো। আমি ধড়ফড় করে উঠে গিয়ে দরজা জানালা সব বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করছি কিন্তু গোটা ঘরজুড়ে অন্ধকার, এতটাই অন্ধকার যে, নিজের হাতটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। সেই মুহুর্তে দিয়াশলাইও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাই অন্ধের মতো হাত বাড়িয়ে কোন রকমে বিছানাটা খুঁজে পেলাম। তারপর বিছানার উপরে উঠে হাত পা গুটিয়ে ঝড়-বাদল সেরে যাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকলাম। মনে হচ্ছে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি পড়ছে। কি অদ্ভুত রকমের বৃষ্টি! অঝর ধারায় ঝরছে। আজ যেন গোটা পৃথিবীকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। বৃষ্টির ঝাপটার ভারি যবনিকা ভেদকরে বাহিরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। জানালার ওপারে অশান্ত বর্ষণ আর মেঘের গর্জনে সব কিছু কেঁপে উঠছে বারবার। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে মনে হচ্ছে, যেন হাজার বছরের নিঃসঙ্গতা নিয়ে আমি বন্দি হয়ে আছি।
কোন কাজে অমনোযোগী হলে নিজের ব্যর্থতার কবর নিজেকেই খুঁড়তে হয়, এটা সবারই জানা। আমার ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই হলো। আমার দীর্ঘদিনের সাধনায় অমানসিক শ্রমযোগে যে উপন্যাসের পাণ্ডলিপি তৈরি হয়েছিল তা এক পলকের ঝড় বৃষ্টিতে ভেসে গেলো। গা থেকে ঘাম মুছতে কপালে ভাঁজ পড়ে এমন যে কারও ক্ষেত্রে সেটা হা-হুতাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হাজারও প্রতিক্রিয়া বুকের ভিতর তোলপাড় করছে। আমার ঘুম আসছে না, আমি একদম ঘুমোতে পাচ্ছি না।
ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেলে প্রকৃতিটা একটু ঝিমিয়ে পড়ে, চারিদিকটা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। আমার মাথায় হাজারও ভাবনা কিলবিল করছে, এরই মধ্যে অনেক দূর থেকে একটা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। আমার বুকের ভিতরটা কেমন যেন ধক্ধক্ করে উঠলো। প্রচণ্ড ঝড়ের তাণ্ডবে ভেঙ্গে পড়া ঘরবাড়ির নিচে চাপা পড়ে কেউ হয়ত মরে গেছে। বালিশ থেকে মাথাটা একটু উঁচুকরে স্পষ্টভাবে শোনার চেষ্টা করলাম, মনে হলো দক্ষিণ দিক থেকে সেই কান্নার আওয়াজটা আসছে। কান্নার শব্দে মনটা কেমন ব্যাকুল হয়ে উঠলো, তাই ঘর থেকে বের হয়ে এক পা-দু’পা করে হাঁটতে শুরু করলাম। একটু সামনে এগিয়ে গেলে শব্দটা আরও স্পষ্ট হয়ে আসে, আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে, আব্দুল্লাহর বাড়ি থেকেই কান্নার শব্দটা আসছে। আমার উদ্বিগ্নতা আরও বেড়ে গেলো, আমি একটু জোর কদমে এগিয়ে তার বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। ঘরে গিয়ে দেখি আব্দুল্লাহ পেটের ব্যথায় বিছানায় গড়া-গড়ি দিচ্ছে। মুখ দিয়ে আবোল তাবোল বকছে আর গানের সুরে তার স্ত্রী-সন্তানদের ডাকছে-
“আবিয়া, ছাবিয়ার মাও, বেল্লাল উদ্দিন জালালরে, সকলে দেখিয়া যাও আমারে”।
আবিয়া, ছাবিহা, বেলাল এবং জালাল আব্দুল্লাহর সন্তানদের নাম। তার পত্নি কুলসুম মাথায় বালতির পর বালতি পানি ঢালছে। আবিয়া হাতপাখা দিয়ে তার বাবার মাথায় বাতাস করছে। আব্দুল্লাহর নিজের আবিষ্কৃত ঔষধ “খাওয়ার সোডা” খেয়েও আজ তেমন কাজ করছে না। পেটের ব্যথা কেন জানি তার সাথে ভীষণ গাদ্দারি করছে, এতক্ষণ কোন দিনই জ্বালায় না। যা হোক কিছুক্ষণের মধ্যে আব্দুল্লাহ চোখ বন্ধ করে একটু ঝিমিয়ে পড়লো। হয়ত ব্যথাটা আজকের জন্য তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। একটা দীর্ঘম্বাস ছেড়ে কুলসুম নিজের আঁচলের এক প্রান্ত দিয়ে আব্দুল্লাহর ভেজা মাথা ও মুখখানা ভালো করে মুছে দিয়ে পানির বালতিটা সেখান থেকে সরিয়ে নিল তারপর আব্দুল্লাহকে ঠিকঠাক ভাবে বিছানায় শুয়ে দিলো।
বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে মানুষের বাড়িতে কাজ কর্ম করতে গিয়ে কখন যে শরীরের ভেতর মরণ ব্যাধি বাসা বাঁধে, সেটা নিজেও টের পায় না আব্দুল্লাহ। লোহার মতো শক্ত খেটে খাওয়া শরীর তার এমনিতে কোন অসুখ-বিসুখ নেই, শুধু পেটের ব্যথাটা তাকে মাঝে মাঝে একটু কাবু করে ফেলে। যখন এ ব্যথা তীব্র আকার ধারণ করে আর সহ্য হয় না, তখন প্রতিষেধক হিসেবে সে এক মুঠো খাওয়ার সোডা খেয়ে ঢোক-ঢোক করে দু’এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেয়ে নেয়। এতে সাময়িক কালের জন্য হলেও ব্যথা খানিকটা উপশম হয়। তবুও পেটের ঝিম-ঝিম ব্যথা নিয়ে সে মানুষের বাড়িতে, ক্ষেতে খামারে কাজ করে। কাজ না করলে পেটের জোগানই বা আসবে কোথা থেকে? সংসারে পাঁচ-ছয় খানা মুখ হাঁ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এমতবস্থায় কি বা করার আছে তার? কাজ-কর্মের ব্যস্ততায় দিনটা কেটে গেলেও কোন এক সময় প্রকৃতির নিষ্ঠতায় তায় দিশেহারা হয়ে পড়ে আব্দুল্লাহ। যতদূর চোখ যায় কেবল মেঘমুক্ত সুনীল আকাশ কিন্তু সে নীলাকাশের দিকে তাকিয়ে তার চোখ জুড়োয় না বরং সে চোখে এখন তীব্র জ্বালা ধরে।
আব্দুল্লাহর জন্ম যে গ্রামে সেটিও তার নিজের মতো একটি ভাগ্যহত, আবহেলিত গ্রাম “ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা”। চারিদিকে ভারত বেষ্টিত বাংলাদেশের একটি ছোট্ট ভুখণ্ড তারও অর্ধেকটা গ্রাস করেছে তিস্তা নদী। চির অবহেলিত এই গ্রামটি গোটা বিশ্বের কাছে “ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতা ছিটমহল” নামে পরিচিত। এটি একটি স্বাধীন দেশের ভৌগলিক সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং অন্য একটি স্বাধীন দেশের ভৌগলিক সীমানার অভ্যন্তরে বিরাজমান ভূখণ্ড। এখানে যেতে হলে অন্য দেশের ভুমির উপর দিয়ে যেতে হয়। এ ভুখণ্ডটি সম্পূর্ণরূপে নিজদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। এখানকার নাগরিকরা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে নিজেস্ব স্বাধীনতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে পচা কাষ্ঠখণ্ড ভিতরে থাকা পোকার মতো পূর্ব পুরুষদের পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে তারা এখানে বসবাস করে।
আব্দুল্লাহ খুবই নিরিহ প্রকৃতির মানুষ। হয়তো সোনার চামুচ মুখে নিয়ে জন্ম হয়নি তার, কিন্তু ঝিনুক থেকে ঠিকই মুক্তা হতে পেরেছে সে। এক কালে তাদের অঢেল সম্পদ ছিলো, প্রচুর জমি জমাও ছিলো। প্রাচুর্যের হাত ধরে সে বড় হয়েছে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি তাকে কখনো হতে হয়নি। বাস্তবতার কাছে কল্পনার যে কোন স্থান নেই, সেটা আব্দুল্লাহ কোনদিনও বুঝতে পারে নি। তিস্তা নদীর কোলে হেসে খেলে তার শৈশব গেছে, কৈশোর গেছে। যৌবনের তীক্ষ্ণ ধারালো মৌসুমে এ নদীর বুকে কতো রঙ-বেরঙের সময় কেটেছে তার। এই তিস্তা নদীকে মনে প্রাণে ভালোবেসে, নিজের জীবনের সাথে তার সুখ-দুঃখকে ভাগা ভাগি করে দিনগুলো অতিবাহিত করে চলেছে। এতকিছুর পরেও মনে কোন সুদূর প্রসারি দুঃখ নেই তার, নেই কারও উপর কোন মান অভিমান।
ভারত সরকার দুরভিসন্ধিমূলক চিন্তা থেকে হঠাৎ করেই তিস্তা নদীর উজানে জলপাইগুড়ি জেলার ‘গজলডোবা’ নামক স্থানে ‘গজলডোবা বাঁধ’ নির্মাণ করেন। ফলে নদী তার গতিবিধি হারিয়ে ফেলে। অথৈ বর্ষায় ভারত সেই বাঁধের সুইস গেইট খুলে দিলে তিস্তা নদী বেসামাল হয়ে পড়ে, বয়ে যায় ডাহাগ্রাম-অঙ্গারপোতার অর্ধাংশের ওপর দিয়ে। তিস্তা নদীর অথৈ পানি, দু’কুল ছাপিয়ে বড় বড় ঢেউ উছলে পড়ে। পার ভেঙ্গে বাড়ি ঘর গাছ পালা সে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আব্দুল্লাহর মতো হাজারো মানুষের ঘর-বাড়ি, জমি-জমা, বিষয়-সম্পত্তি নিমিষে বিলিন হয়ে যায় নদীর বুকে। তাদের আশ্রয় হয় রাস্তার ধারে কিংবা কোন উঁচু জায়গায়। গৃহহারা, অনাহারী মানুষগুলোকে বাঁচাতে গ্রামের মানুষ নিজেরাই না খেয়ে তাদের একবেলার খাবার তুলে দেয় অনাহারিদের মুখে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন বাঁচা যায়? এমনিতেই ভাগ্যহত তারা, না খেয়ে মরলেও তাদের দেখার কেউ নেই। এখানে তাদের সাহায্য করার মতো কোন সরকারি-বেসরকারি সাহায্য সংস্থা নেই। তাদের কোন রাষ্ট্র নেই, সরকার নেই, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের কোন দায়িত্বও নেই। তাদের দেশ আছে নামে মাত্র, মানচিত্র আছে বইয়ের পাতায়, সরকার আছে কাগজে কলমে, কিন্তু বাস্তবে কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই। দুর্ভিক্ষে অনাহারে, রোগ-বালাই মহামারিতে হাজার লোক মরে গেলেও তাদের সাহায্য করার কেউ নেই, চিকিৎসা করার কেউ নেই, ডাক্তার নেই, হাসপাতাল নেই। কেবল সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা করে তাদের বেঁচে থাকতে হয়। তাঁরা যে বাংলাদেশের নাগরিক সেটার কোন প্রমাণ তাদের হাতে নেই। এখন তারা নিজদেশেই পরগাছা হিসেবে বসবাস করছে। তাদের ঘরের ছাউনি নেই, পেটে ভাত নেই, গৃহস্থলির কাজ নেই, সব মিলিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে তারা। ইতোমধ্যে অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় কতো জনের যে মৃত্যু হয়েছে তার কোন সঠিক হিসেব কেউ দিতে পারবে না।
আব্দুল্লাহর বোউ কুলসুম মুরগীর খাঁচাটা হাতে নিয়ে বাইরে যেয়ে মুরগীগুলোকে ছেড়ে দেয়। আব্দুল্লাহও তার পিছে পিছে বাইরে যেয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘দ্যাখ বোউ, সকাল সকালে রৌদের কি ত্যাজ। মনে হয় সব গাছপালা পুড়ি ছাই হয়া যাবার নাগচে। চৈত-বৈশাখ মাসের খরা পার হয়া আষাঢ়-শান মাস আসিল কিন্তু এলাও বৃষ্টি হবার কোন নাম-গন্ধো নাই। ক্ষ্যাতের জমিগুলা খা-খা করির নাগচে, একফোটা পানি নাই, মানসির কোন কাজ-কামও নাই। মানসি কাজে না ডাকাইলে হামা খামো কি? বাঁচমো কেমন করি? মাথার উপরোত চাল নাই, ঘরোত খাবার নাই, হালোত পানি নাই, নদীতে মাছ নাই, বাঁচি থাকার নিরাপত্তা নাই, চারিদিকে খালি নাই আর নাই। এতো কষ্ট, এতো অশান্তির মধ্যে কি বাঁচি থাকা যায়?
এটেকার মানসি বাঁচি থাকে আল্লার দান জমির ফসলের উপর। সেই জমিতেও যদি ফসল না ফলে তাহলে মানসি খাবে কি? গোটা গ্রামে খাবার অভাবে হাহাকার পড়ি যাবে। হেঁউতি (আমন) ধানের বিচন (বীজ জন্মান চারা) পানির অভাবে মরি যাবার নাগচে। গ্যালো দু’বছরও তাই হইছে পানির অভাবে বেশীভাগ জমি অনাবাদী পড়ি আছিলো, তাই আকাল পাছ ছাড়ে নাই। প্যাটের জ্বালায় মানসি আইলের কচু, জঙ্গলের ঢেঁকিয়া শাক কোনটাও খাওয়া বাদ দেয় নাই। জুয়ান মানুষগুলা এক-আধদিন না খ্যায়া থাকিলেও সেই কষ্ট সহ্য করির পায় কিন্তু ছোট ছোট ছওয়াগুলাকতো মানায় যায় না। এক বেলা খাবার না দিলে পরের বেলায় বিছানায় পড়ি নিঢাল হয়া যায়। কোন মাও-বাপ কি নিজের ছওয়ার কষ্ট সহ্য করির পায়? সেই কষ্টে বুক ফাটি যায়।
কথায় আছে “কৃষকের ভালো আগামি বছর” আর সেই আশায় বুক ঁেবধে গ্রামের কৃষকেরা চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে চেয়ে থাকে, কবে বৃষ্টি হবে আর কবে তাদের দুঃখের দিন কেটে যাবে। এভাবে অর্ধাহারে অনাহারে থেকেও সুদিনের আশায় বুকে স্বপ্ন নিয়ে দিন গুণে। তারপরেও মাঝে মাঝে চোখের জল ঝরে, বুকরে ভেতরটা ডুকরে ওঠে, ছোট ছোট বাচ্চারা, অতশত বোঝেনা ক্ষিদে পেলে নিজেরাও কাঁদে আর মা-বাবাকেও কাঁদায়। অভাগী মা মিছেমিছি ভ’ত পেতনীর ভয় দেখিয়ে তাদের অনাহারি শিশুকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। অবুঝ শিশু ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে। মায়ের মন তখন কি যে বলে সেটা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ জানে না।
কয়েকদিন পর আকাশের দু’পশলা বৃষ্টি নামে, গ্রাম বাসীর মুখে শত কষ্টের মাঝেও একটু স্বস্তির হাসি ফোটে। তারা জীবনের হাল ছাড়েনা, লাঙ্গল-জোঁয়াল নিয়ে সবাই নেমে পড়ে ক্ষেতে প্রাণপনে চেষ্টা কর ফসল বুনতে। মাঝে মাঝে আকাশে প্রচুর মেঘ জমে কিন্তু বাতাস এসে সব মেঘ ভাসিয়ে নিয়ে যায়, বৃষ্টি হয় হয় করেও হয়না। জমিতে যেটুকু পানি জমে সেটুক দিয়েই কোন রকমে মাটি কাঁদা করে তাতেও কাঁদা না হলে পুকুর থেকে পানি সেচে জমি তৈরি করে আমন ধানের চারা লাগায়।
আজ আবার সারাদিন ধরে ঝমঝমে বৃষ্টি পড়ছে, ঘর থেকে বের হওয়ার উপায় নেই। কুলসুম চুলোয় ভাত তুলেদিয়ে উঠোনের কোণে ছিলো কয়েকটা বেগুন আর মরিচের গাছ, তাতে বেশ কয়েকটা বেগুন ও মরিচ ধরেছে কিন্তু বেগুনগুলোর অর্ধেকটা করে দখল করেছে পোকায়। সেগুলো ছিঁড়ে এনে বাছা-বাছি করে তার ভর্তা বানিয়ে তাই দিয়ে দুপুরটা চালিয়ে দেয়। গরিবের ভাবনা একটাই, সেটা হলো তাদের পেট। পেট ঠাণ্ডা তো দুনিয়া ঠাণ্ড, তাদের আর অন্যকোন চিন্তা থাকে না।
আব্দুল্লাহ, মা-বাবার চার ছেলের মধ্যে বড়। তাই কুলসুমও সেই বাড়ির বড় বোউ। আর বড় বোউ হিসেবে তাকে অনেক দ্বায়িত্ব পালন করতে হতো। বৃদ্ধা শাশুড়ির সেবা শুশ্রুষা থেকে শুরু করে সংসারের সব দিকে তাকে নজর দিতে হতো। এক কথায় গোটা সংসারের চাবি ছিল তারই হাতে। বাড়ির মেজ ও ছোট বোউ এটা কোন ভাবে মেনে নিতে পারত না। মুখে মুখে ঠিক থাকলেও ভেতরে ভেতরে তাদের ঘোর বিবাদ লেগেই থাকত। তারাও এ বাড়ির বোউ তাদেরও সব কিছুতে সমান অধিকার আছে, তবে কুলসুম একাই সব হাতের মুঠোয় নেবে কেন? সে একাই সর্বেসর্বা হবে আর আমরা হবো হুকুমের গোলাম? তাদের ধারণা যে, শাশুড়ির মৃত্যুর আগে টাকা-পয়সা, গহনা-গাট্টি সব বড় বোউয়ের হাতে দিয়ে গেছে। আর কুলসুম সে কথা গোপন রেখে একাই সেগুলো ভোগ করছে। তাই শাশুড়ির মৃত্যুর সময় তারা একফোঁটা চোখের জলও ফেললো না। শোকের নুন্যতম ছায়া তাদের মধ্যে দেখা গেলো না। পাড়ার মহিলারা কানা কানি করতে লাগলো ভাগ্যিস বড় বোউটা ছিলো নইলে ঐ বুড়িক গু-মুতের উপরে পড়ি মরা নাগতো। ছোট বোউ অস্পষ্ট ভাবে বিড়বিড় করে বলেতে লাগলো ‘শাশুড়ি নটি মরি যাবার আগেও বেইমানের মতো একটা কাম করি গ্যালো, কবরেও তায় শান্তি পাবে না, দোজখে জ্বলির নাগবে। আর বড় নটিটাও বা কেমন? শাশুড়িকে সেবা করার ছুঁতো করি, তার টাকা-কড়ি, গয়না-গাটি তামান একেবারে হাত করি নেইল’। মেজ বোউ সহ সে পরামর্শ করে যে, এই বাড়িতে শাশুড়ি নামে মুনসি তো দূরের কথা তারা একটা কুকুরকেও ভাত খাওয়াবে না।
আব্দুল্লাহ বাড়ির বড় ছেলে বংশ গৌরবে সম্ভ্রান্ত স্বভাবের শেষ চিহ্নটুকু তার রক্তে মিশে আছে। সময়ের ব্যবধানে, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, অবস্থার দায়ে পড়ে তাকে আজ বেঁচে থাকার জন্য মানুষের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহন করতে হয়। বিয়ের পর মা-বাবার সাথে একই সংসারে সুখে-দুঃখে বেশ ভালোই কাটছিলো দিনগুলো। যদিও অনেক বড় সংসার তাদের কিন্তু সেখানে কারো ভালোবাসার অভাব ছিলো না। বড় ছেলের বোউ হিসেবে কুলসুমকে সবাই মাথায় করে রাখতো।
আব্দুল্লাহ অনেক কষ্টকরে কামাই রোজগার দিয়ে এই বাড়ির ভিটে অর্ধবিঘা জমি কিনতে পেড়েছিলো। তারই এককোণে ছোট ছোট তিনটি খড়ের ঘর। ছাউনি দেওয়ার অভাবে বর্ষা এলে সেই ঘরের চাল দিয়ে দরদর করে বৃষ্টির পানি পড়ে। যেখানে পানি পড়ে সে যায়গায় হাড়ি-পাতিল থালা বাটি রেখে বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা করে। ঘরের চালে যে জায়গা দিয়ে পানি পড়ে সেখানে পুরোনো ছেঁড়া কাঁথা বিছিয়ে দেয়। এতেকরে একটু হলেও বৃষ্টির পানি কম পড়ে। এর উত্তর পাশের বড় ঘরটিতে থাকে আব্দুল্লাহ ও কুলসুম, অন্যটিতে আবিয়া ও ছাবিহা আর একটি ছিলো রান্নার ঘর, তারই মাঝখানে একটা বেড়া দিয়ে অর্ধেকটাতে রাখা হয় গরু, ছাগল, মুরগী। রান্না ঘরে ভাত খেতে বসলে গরু-ছাগলের মল-মুত্রের গন্ধ আসে। তাই আবিয়া ছাবিহা ভাতের থালা নিয়ে ঘরে চলে যায়। কয়েকদিন আগে একটা ছাগলের তিনটি বাচ্চা হয়। তিনটি বাচ্চাই এক সাথে প্রতিযোগিতা করে তাদের মায়ের দুধ খাওয়ার জন্য লাফালাফি করে, কিন্তু তাদের মায়ের দুধের বাট তো দু’টো কাজেই প্রতিযোগিতায় শক্তি খাটিয়ে যে টিকে থাকে কেবল সেই বেশী দুধ খেতে পারে আর যে টিকতে পারে না তাকে না খেয়ে থাকতে হয়। আবিয়া আর ছাবিহার কাজ হলো, একটি বাচ্চাকে ধরে পালাক্রমে তাদের সবাইকে সমান ভাবে দুধ খাওয়ায়।
বাড়ির ভিটেটা অন্যান্য জমিগুলো থেকে একটু উঁচু হওয়ায় সেখানে মরিচ, কুমড়ো, ঢেঁড়স, পটোল ও বিভিন্ন রকম সব্জির দু’চারটা করে গাছ লাগায়। এক সময় বৃষ্টি কমে গেলে আব্দুল্লাহ ও কুলসুম দ’ুজনে মিলে সব্জি ক্ষেতে হাটতে যায়। আবিয়া ও ছাবিহাও মা বাবাকে অনুসরণ করে তাদের পিছে পিছে হ্াঁটে। ছাবিয়া আব্দুল্লাহকে ডেকে বলে-বাবা দ্যাখো, কুমড়াগুলা কেমন পাকি লাল টকটকা হইছে, এইটা কুমড়া আধখান ক্যান বাবা?
নারে মা, ওটা পাখি খাইছে।
পাখি ফির কুমড়া খায় বাবা?
খায়রে মা-খায়, প্যাটোত ভোগ নাগলে শুধু কুমড়া ক্যান, চোখের সামনোত যা পায় তাই খায়। প্যাটের ভোগ খুব খারাপ জিনিসরে মা।
আব্দুল্লাহ পাকা পাকা দেখে কয়েকটা কুমড়ো গাছ থেকে ছিঁড়ে নিয়ে আসে। তারপর এগুলো নিয়ে নয়ারহাটে যাওয়ার জন্য বের হয় এমন সময় পাশের বাড়ির আমির উদ্দিন মিয়া এসে বলে, ‘আব্দুল্লাহ, নয়ার হাটোত যাবার নাগচিস তা মোর দুইদোন ধান (বারো কে.জি সমান এক দোন) ধরি যাতো। কাইল টাকার খুব দরকার আছে, তুইয়ো এ্যালায় দশ-বিশ টাকা নেইস।
ডাহাগ্রাম অঙ্গারপোতার হাট-বাজার বলতে নয়ারহাট, যেখানে সবাই বিক্রেতা কেনার মানুষ নাই। অনেকটা পন্য বিনিময়ের মতো করে তারা পরস্পর লেনদেন করে। যেমন আব্দুল্লাহ কুমড়ো বিক্রি করে চাউল কেনে আর একজন হয়তো চাউল বিক্রি করে কুমড়ো কেনে। মানুষের হাতে তো কোন টাকা-পয়সা নেই। গরু, ছাগল, ধান, পাট এ গুলো বিক্রি কারার কোন উপায়ও নেই।
প্রায় মাসখানক হয়ে গেলো, একটা প্রাণিও ভারতের মাটিতে পা দিতে পাচ্ছে না, ভারতের হাট বাজারে যেতে পাচ্ছে না। ডাহাগ্রাম অঙ্গারপোতার মানুষের কাছে এটা নতুন কোন বিষয় নয়, প্রতি বছরে দু’চারবার এমন ঘটনা ঘটেই থাকে। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনবিঘা হস্তান্তরের কথা উঠলেই ব্যাস! শুরু হয়ে গেলো ডাহাগ্রাম অঙ্গারপোতার মানুষের উপর স্বহিং¯্র নির্যাতন, অত্যাচার। ভারতের মাটিতে পা দেয়া বন্ধ। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার জিনিস যেমন লবন, চিনি, কেরসিন ইত্যাদি ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের ধাপড়া-মেখলীগঞ্জের হাটে পাঠিয়ে দিয়ে আনা হয়। তবে হিন্দু ধর্মাবলম্বিরা অবাধে ভারতে যাতায়াত করে তাদের ভারতে যেতে কোন বাধা নেই। মাঝে মাঝে গ্রামের হিন্দু প্রতিবেশীদের সাথে যাদের ভালো সম্পর্ক, তাদেরকে দিয়ে ছাগল-গরু ভারতের হাটে বিক্রি করে।
স্কুল থেকে এসে বইগুলো বিছানার উপর রেখে আবিয়া দেখে মা বাবা কেউ বাড়িতে নেই, নিত্যদিনের মতো হয়তো তারা বেড়িয়ে পড়েছে দু’মুঠো আহার সংগ্রহ করার জন্য। ছাবিয়াকেও আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না, হয়তো খেলতে গেছে। গোটা বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে, উদাস দুপুর কিংবা পড়ন্ত বিকেল তাদের কোন বাদবিচার নেই। আজ ভীষণ একাকি মনে হচ্ছে তার, চোখ জুড়ে কান্না পাচ্ছে। এমন সময় ছাবিয়া, কোথা থেকে যেন দৌড়ে এসে ঘরের ভেতর কেউ আছে কি না এদি-সেদিক খুঁজছে। আকিয়াকে ঘরের পিছনে দেখতে পেয়ে বলে-বুবু মোক খাবার দে, খুব ভোগ (ক্ষুধা) নাকচে।
ছোট্ট একটি মেয়ে ছাবিয়া, কি এমন বয়স হবে তার! সাত-আট বছর, মাথায় উসকো-খুসকো চুল। কি নিষ্পাপ একখানা মুখ, ক্ষুধার জ্বালায় সে বারবার আবিয়ার দিকে তাকাচ্ছে, সে নিজেও জানে ঘরে এক মুঠো খাবারও নেই, বুবু তাকে কোথায় পেয়ে খেতে দেবে। মনের উপলব্ধি যেন আজ তার বয়সকে ছাড়িয়ে গেছে, তাই সে হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যায়। ছাবিহার মুখের দিকে তাকিয়ে মনের অজান্তেই আবিয়ার দু‘চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে লোনাজল। অনেক কষ্টে জোর করে সে তার নিজেকে সামলে নিলো, পুরো শরীরটা যেন অবস হয়ে গেছে। চেতনা আর অবচেতনের দোলাচলে অবুঝ মন তার হারিয়ে যায় কষ্টের গহীন অন্ধকারে। নিরানন্দ জীবনের গ্লানি, যন্ত্রণাদগ্ধ শৈশব, বির্পযস্ত জীবনে কোথাও কোন স্বস্থি নেই, শান্তিনেই, মাথার উপর ভেঙ্গেপড়া আকাশ, বিদ্ধস্ত পৃথিবী কি বিভৎস জীবনের মুখোমুখি দাড়িয়ে আছে তারা। কি ভীষণ স্বার্থপর এই পৃথিবী। কেউ ভাত খায় না আর কেউ ভাত পায় না।
আবিয়া এটা ওটা খুঁজতে শুরু করে, কোন খাবার পাওয়া যায় কি না। শেষে একটা টিনের কৌটোর তলায় দু’মুঠো ভাজা চাউল পেলো। খড়খড়ে ঠাণ্ডা চাউল ভাজাগুলো ছাবিয়ার হতে দিলো। মরুভুমির উত্তপ্ত বালুচরে আটকে পড়া ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর পথিকের কাছে এক মশক পানি যেমন পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি দামি, ঠিক তেমনি খড়খড়ে ঠাণ্ডা চাউল ভাজাগুলো ক্ষুধার্ত ছাবিয়ার কাছে তাই মনে হলো। ছাবিয়া চাউল ভাজাগুলো নিয়ে ঘরের মেঝেতে মাটির উপর পাগুলো লম্বা করে ছড়িয়ে দিয়ে বসে আবিয়াকে ডাকে- ‘বুবু আয় তুইয়ো এ্যাকনা খা’।
দু’মঠো চালভাজা খেয়ে বেশী করে পানি খেল আবিয়া, পানিটা গলাবেয়ে নিচে নেমে যেন শিরা-উপশিরা দিয়ে ছড়িয়ে পড়ল শরীরের সর্বত্র। কিন্তু মা আজ এখনও আসছেনা কেন? আবিয়া বিছানায় শুয়ে ছোট্ট খিড়কি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল পাতা কুড়ানী দু’টো মেয়ে এদিকে আসছে ওদের এজনের নাম আলেয়া। আবিয়া ডাকলো- এই আলেয়া, এ্যাকনা শুনি যা তো? তুই কি মাক দেখছিস?
হ্যাঃ বুবু, সকাল বেলা মহাজনের বাড়ির ওদিকোনা যাবার দেখছিনু। কথা শেষ হতে না হতেই আলেয়া কালো ঝকঝকে চোখে ফুরফুরে চুলগুলো ওড়াতে ওড়াতে চঞ্চলা হরিণীর মতো লাফাতে লাফাতে এক নিমিশে হাওয়া হয়ে গেলো।
আবিয়ার মা কুলসুম বাড়ি এসে দেখে ছাবিয়া মাটিতে বসে চালভাজা খাচ্ছে আর একা একাই কথা বলছে। মাকে দেখে খাওয়া বাদ দিয়ে দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। কুলসুম সাবিয়ার কপালে একটা চুমু দিয়ে মা-মেয়ে মিলে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আবিয়াকে খুঁজছে- এমন সময় দেখে একটা বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে আব্দুল্লাহ বাড়ির দিকে আসছে। ছাবিয়া মায়ের হাত ছেড়ে দিয়ে দিয়ে একদৌড়ে আব্দুল্লাহর কাছে যায়। তারপর বাবার হাত ধরে লাফাতে লাফাতে বাড়ি আসে।
আব্দুল্লাহ বাজারের ব্যাগটা কুলসুমের হাতে দিয়ে বলে-এই ছাবিয়ার মাও? ব্যাগোত একখান পাউরুটি আছে, ধরি আয়তো আর পানির জগটাও আনিস।
কুলসুম বাড়ির আঙ্গিনায় মাদুর বিছিয়ে সবাইকে বসতে দিয়ে পাউরুটি আর পানির জগটা এনে দেয়।
আব্দুল্লাহ বলে- আবিয়ার মাও তুইয়ো আয়, সবাই মিলে এ্যাকনা করি খাই।
গরিবের সংসারে সামান্য একটু আয়োজন যেন স্বর্গীয় সুখ এনে দেয়। অতি অল্পেই সবার মন ভরে দেয়। তাদের চাওয়া পাওয়া এতটাই অল্প, এতটাই সীমিত যে, কার কোন অতৃপ্তি থাকে না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now