বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আগুন আর বৃষ্টি

"ইসলামিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। কুমিল্লার তিতাস নদীর ধারে ছোট্ট গ্রামটির নাম শালিখা। নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুল গাছগুলো যেন প্রতিদিন ভোরে লাল ফুলের আগুন ছড়িয়ে দেয়। সেই গ্রামেই থাকত রহিম উদ্দিন। বয়স চল্লিশের কোঠায়, পেশায় কৃষক। চেহারায় সহজ-সরল ভাব থাকলেও তার স্বভাব ছিল অন্য রকম। গ্রামের সবাই তাকে বলত—“রহিম ভাই ভালো মানুষ, কিন্তু রাগটা বড্ড বেশি।” রহিমের স্ত্রী জাহানারা কতবার যে এই রাগের জন্য কেঁদেছে, তার হিসাব নেই। ছোটখাটো বিষয়েও রাগ ফেটে উঠত রহিমের বুকে। কখনো চাষের জমিতে বীজ ঠিকমতো না পড়লে, কখনো গরুর রশি খুলে গেলে, আবার কখনো প্রতিবেশীর একটুখানি কথায়। একবার তো শুধু গরুর খুঁটি বাঁধা নিয়ে প্রতিবেশী করিম মিয়ার সঙ্গে এমন ঝগড়া হয়েছিল যে, লাঠি হাতে নেমে এসেছিল দুজন। গ্রাম্য লোকজন এসে তাদের আলাদা না করলে সেদিন হয়তো রক্ত ঝরত মাঠে। তবুও গ্রামের মানুষ রহিমকে সম্মান করত, কারণ সে পরিশ্রমী, সৎ, আল্লাহভীরু। কিন্তু তার রাগ যেন তার সব ভালো গুণকে ঢেকে রাখত। একদিনের ঘটনা—গভীর বিকেলে মাঠ থেকে ফেরার পথে রহিমের ছোট ছেলে সামিউল মাকে বলল, “মা, আব্বু তো খুব রাগ করে। কেন করে?” জাহানারা মৃদু হেসে বলল, “তোর আব্বু মানুষটা খারাপ নয়, বাপ। কিন্তু রাগ নামের যে আগুন আছে, ওটা ওর ভেতরে বেশি। তুই বড় হলে বুঝবি—আসল শক্তি রাগ দমন করা।” কথাগুলো ছেলেটির মনে গেঁথে গেল। কিছুদিন পরেই ঘটল এমন এক ঘটনা, যা রহিমের জীবন পুরো পাল্টে দিল। রহিমের একমাত্র ভাই ফজলু শহরে কাজ করত। ছুটিতে গ্রামে এলে প্রায়ই টাকার ঝামেলা নিয়ে তাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হতো। সেদিনও তেমনই হলো। জমির ভাগাভাগি নিয়ে ফজলু রহিমকে কটু কথা বলল। “তুই সব দখল করে বসে আছিস। আমি শহরে খেটে খাই, আর তুই সব গিলে খাচ্ছিস।” কথাটা শুনে রহিমের রক্ত গরম হয়ে উঠল। চোখ লাল হয়ে গেল। সে লাঠি হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল ফজলুর দিকে। চারপাশে গ্রামের মানুষ জড়ো হলো। ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের মসজিদের মাইকে আযান শুরু হলো। রহিমের কানে ভেসে এলো—“হাইয়া আলাল ফালাহ…” অর্থাৎ, “এসো সফলতার পথে।” কেমন যেন কেঁপে উঠল তার বুক। মনে পড়ল একদিনের কথা, যখন মসজিদের ইমাম হাফেজ মালেক হুজুর তাকে বলেছিলেন নবীর সেই হাদিস—“লা তাগদাব—রাগ কোরো না।” হঠাৎ তার হাত থেকে লাঠি পড়ে গেল। ফজলু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। লোকজনও থমকে গেল। রহিম কেঁপে কেঁপে বলল, “ভাই, তুই যদি জমি চাস, নে। আমার প্রাণ চাইলে তাও নে। কিন্তু আজ আমি লাঠি তুলব না। আমি শয়তানের আগুনে পুড়ব না।” গ্রামের লোকজন বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। ফজলুর চোখ ভিজে উঠল। সে এগিয়ে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলল, “ভাই, আমি ভুল করেছি। তোকে কষ্ট দিয়েছি। আমাকে মাফ কর।” সেদিন গ্রামে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। যেন কেউ আগুন নিভিয়ে দিয়ে হঠাৎ বৃষ্টি নামিয়েছে। এরপর থেকে রহিম বদলে গেল। তার রাগ আস্তে আস্তে কমতে লাগল। যখনই মনে হতো বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠছে, তখনই সে বসে পড়ত, অথবা ঠাণ্ডা পানি খেত। গ্রামের শিশুরা তাকে আগে ভয় পেত, এখন তারা তাকে ডাকত “রহিম চাচা, শান্ত মানুষ।” একদিন এক বৃদ্ধা মহিলা তার কাছে এসে বলল, “বাবা, তোর মধ্যে এখন শান্তি দেখি। আগে তোকে দেখলে ভয় পেতাম, এখন মনে হয় তুই আগুন থেকে বৃষ্টিতে রূপ নিয়েছিস।” রহিম হেসে বলল, “আম্মা, আগুনে শুধু ধ্বংস হয়। বৃষ্টিতে ফসল জন্মায়। আমি এখন বৃষ্টিই হতে চাই।” সময় গড়িয়ে গেল। রহিম গ্রামের মসজিদে প্রায়ই বসে তরুণদের উপদেশ দিত। সে বলত, “রাগ আমাদের ভেতরে আগুনের মতো। নবী করিম (সা.) বলেছেন—আসল বীর তো সেই, যে নিজের রাগকে বশে রাখতে পারে। ভাইয়েরা, এক মুহূর্তের রাগ তোমার ঘর ভেঙে দিতে পারে, দেহ ভেঙে দিতে পারে, এমনকি তোমার আখিরাতও পুড়িয়ে দিতে পারে। তাই রাগ উঠলে বসো, শুয়ে পড়ো, ওযু করো, ঠাণ্ডা পানি খাও। আর সবচেয়ে বড় কথা—ক্ষমা করো। কারণ ক্ষমা ছাড়া শান্তি আসে না।” তরুণরা অবাক হয়ে শুনত। তারা জানত—এই মানুষটাই একসময় রাগের আগুনে জ্বলত। এখন সেই মানুষই শীতল বৃষ্টির মতো কথা বলে। এক রাতে রহিম আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল, অগণিত তারা ঝলমল করছে। তার মনে হচ্ছিল—যেমন আল্লাহ ক্ষমা করে দেন বান্দার অগণিত পাপ, তেমনি মানুষকেও উচিত একে অপরকে ক্ষমা করা। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোয়া করল, “হে আল্লাহ! আমাকে রাগের আগুন থেকে রক্ষা করুন। আমাকে এমন করুন, যাতে আমি ক্ষমা করে দিতে পারি, যেমন তুমি আমাদের ক্ষমা করো।” বছর কয়েক পরে গ্রামের সবাই একমত হলো—রহিম বদলে গেছে। সে এখন সত্যিই বীর। কুস্তির ময়দানে নয়, বরং নিজের অন্তরের ময়দানে সে জয়ী হয়েছে। গ্রামের কিশোর সামিউল, যে একদিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিল কেন তার বাবা রাগ করে, সেই সামিউল এখন বন্ধুদের বলে, “আমার আব্বু আগে আগুন ছিলেন, এখন বৃষ্টি। আমি চাই, আমিও একদিন বৃষ্টি হবো।” রহিম উদ্দিনের গল্পটা ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। মানুষ শিখল—রাগ হলো অন্তরের দাবানল, যা দেহ-মন-আত্মা সব পুড়িয়ে ফেলে। আর ক্ষমা হলো শীতল বৃষ্টিধারা, যা সেই দাবানল নিভিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত রহিম প্রমাণ করল—মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু শক্তি বা প্রতিপক্ষকে হারানোতে নয়, বরং নিজের রাগকে বশে রাখাতেই প্রকৃত মহত্ত্ব।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৬৯ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now