বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম--মাজহারুল মোর্শেদ।
শান্তিনিকেতনে হৃদয়ের প্রশান্তি- ৩য়পর্ব
পরের দিন ডাকবাংলো থেকে একটু সকাল সকাল বের হলাম। কারণটাছিলো হাতে সময় খুবই কম। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি হিসেবে অধিদপ্তর মাত্র পাঁচটি দিন আমার জন্য বরাদ্দ করে দিয়েছেন। প্রসারিত দৃষ্টিতে যার পরিমান সাদা কাগজের বুকে বিন্দুর মতো ক্ষুদ্র। আর শান্তিনিকেতন এমন একটি জায়গা যেখানে পুরো ক্যাম্পাসটা ঘুরতে হলে মোটামুটি দুইদিন লেগে যাবে, কমিয়ে আনার কোন সুযোগ নাই। তাতেও যে শারীরিক ধকল যাবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলতে পারি- শারীরিক ধকল কিংবা ক্ষুধা-তৃষ্ণা আপনার মনকে কাবু করতে পারবে না। শান্তিনিকেতনের পুরো ক্যাম্পাসটা এতাটাই দৃষ্টি নন্দন যে, একবার দৃষ্টি প্রসারিত হলে তা ফেরানোর উপায় নেই। এখানে খারাপ লাগার কোন অবকাশ নেই। আমরা আগে থেকে এক একটা টোটো ভাড়া করেছিলাম আটশত রুপি দিয়ে। টোটো ওয়ালার সাথে কথা হয়েছিলো সে আজ আমাদের সঙ্গে থাকবে।
শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি ঘেরা রাস্তা ধরে আমরা চললাম শান্তিনিকেতন ভবনের দিকে। রাস্তার দু’ধারে উঁচু গাছপালা আর চির সবুজের সমারোহ, দেখে মন ভরে যায়। সেখানে গাছের নিচে বসে থাকা একজন বৃদ্ধ মানুষ আমাকে জানালেন যে, “শান্তিনিকেতন ভবন অনেক পুরনো বাড়ি। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির আদলইে এই বাড়িটি তৈরি হয়। বাড়ির উপরিভাগে সংস্কৃত অক্ষরে খোদাই করা ‘সত্যাত্ম প্রাণারামং মন আনন্দং‘ মর্হষির প্রয়ি উপনিষদের এই উক্তিটি। ব্রহ্মার্চয বিদ্যালয় স্থাপনরে সময় ও রবীন্দ্রনাথ কিছুকাল সপরবিারে এই বাড়িতে বসবাস করেন। বর্তমানে এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগ্রহশালা হসিেেব ব্যবহৃত হয়। এখানে কবির ব্যবহার করা অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র সংরক্ষিত আছে”। এখন বাড়িটির সামনে বিখ্যাত শিল্পী রামকঙ্কির বেইজ নির্মিত একটি ভার্স্কয রয়েছে। ভাস্কর্যটির নাম ‘অনির্বাণ শখিা’।
এরপর আমাদের গন্তব্য হলো ছাতিমতলা। সেখানে যেতে যেতে আমি ভাবলাম যে, একটা জায়গায় এতোবেশি সময় দিলে আমরা বেশিকিছু দেখতে পারবো না, তারআগেই সময় ফুরিয়ে যাবে। তাই সব কিছুতেএকটু সময় বাঁচানোর চেষ্টা করছি। কবি আরাধন দাদা পথ চলতে চলতে ছাতিমতলার বর্ণনা দিলেন। ছাতিমতলায় রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ধ্যানমগ্ন থাকতেন এবং পরে এখানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন প্রতষ্ঠিা করনে। মর্হষি দবেন্দ্রেনাথ ঠাকুর যখন রায়পুরের জমদিার বাড়িতে নিমন্ত্রন রক্ষা করতে আসছিলেন তখন এই ছাতিমতলায় কছিুক্ষনরে জন্য বিশ্রাম করেন। এখানইে তিনি পেয়েছিলেন প্রাণের আরাম মনের আনন্দ ও আত্মার শান্তি। সে সময়ে তিনি জমিদার বাবুর কাছে ষোল আনা দিয়ে ২০ বিঘা জমি পাট্টা করেন। সেই ছাতিম গাছদুটি এখন আর বেঁচে নেই রয়েছে একটি বেদি।
ছাতিমতলা থেকে বেশখানিকটা দূরে বিশ্বভারতী বশ্বিবদ্যিালয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কতৃক প্রতিষ্ঠিত ভারত ও বিশ্বের অন্যতম শিক্ষাকেন্দ্র। এখানে পাঠভবন, কলাভবন, এবং নানা সাংস্কৃতকি কেন্দ্র রয়েছে। করোনা মহামারীর আগে ক্যাম্পাসের যত্রতত্র প্রবেশ করা যেতো কিস্তু এখন সেটা যায়না। বাহির থেকে দেখতে হয়। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম নিদর্শন এই সিংহ সদন। দ্বিতল এই বাড়ির একপাশে আছে ঝুলন্ত ঘন্টা আর অপর প্রান্তে রয়েছে ঘড়ি। অদ্ভূত ব্যাপার হলো ঘন্টার ধ্বনি শুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রীরা জানতে পারে।
গৌর প্রাঙ্গণ ও ঘন্টাতলা সিংহসদনের সামনে বিশালাকার মাঠটি গৌরপ্রাঙ্গন। আর ওখানে বটবৃক্ষের নিচে বৌদ্ধস্তুপের মতো তৈরি এই ঘন্টাতলা। এছাড়াও চীনা ভবন, বাংলাদেশ ভবন, সংগীতকলা ভবন, চিত্রভানু স্টুডিও, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, রামকিঙ্কর বেজের ভাষ্কর্য সমূহ। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো কলাভবন। সকাল থেকে দুপুর ২.০০ টা পর্যন্ত জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ। কলাভবন প্রবেশদ্বারে রয়েছে এক অসাধারণ ভাষ্কর্য। শান্তিনিকেতন ভ্রমণে কলাভবন দর্শন করতেই হবে নয়তো যে পুরো ভ্রমণটা বৃথা মনে হবে। আমার বন্ধু- ড.সীমা রয় যেহেতু ওখানকারই মানুষ কাজেই শান্তিনিকেতনে প্রবেশ করতে আমার কোন সমস্যা হয় নি। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে আমার খুব চা খেতে ইচ্ছে করলো কিন্ত এর আশেপাশে তা খুঁজে পেলাম না। জায়গাটা পরিপাটি হওয়ায় এখানে হয়তো দোকানের অনুমতি দেয়া হয় নাই।
এদিকে বেলা প্রায় পড়েই এলো, সূর্যের আলো আর বেশি সময় দেবে না।
শান্তিনিকেতেনের আশ্রমের উত্তরদেিক পাঁচটি বাড়ি নিয়ে গড়ে উঠেছে উত্তরায়ণ প্রাঙ্গন। এছাড়াও এখানে রয়েছে চিত্রভানু-গুহাঘর এবং বিচিত্রিা বাড়ি। কবি গুরুর ব্যবহৃত জিনিসপত্র, নোবেল পুরস্কারের রেপ্লিকা, উপহার সামগ্রী, বাদ্যযন্ত্র সব কিছুই ‘উদয়ন’ বাড়িটিতে সাজানো আছে। উত্তরায়নের গোটা এলাকা জুড়ে রয়েছে অসংখ্য ভাস্কর্য ও নানা প্রজাতির গাছ-গাছালি। এটি শান্তিনিকেতেনের মিউজিয়াম নামেও পরিচিত। এখানে ৭০ টাকা করে টিকিট কিনে আমরা ভেতরে ঢুকেছিলাম।
বিশ্বভারতী বশ্বিবদ্যিালয় ক্যাম্পাস থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরত্বে শ্রীনিকেতন রোডের উপর অবস্থিত সৃজনী শিল্পগ্রাম। এটি শান্তিনিকেতনের একটি পর্যটনকেন্দ্র। টিকিট কিনে এখানে প্রবেশ করতে হয়। পুরো গ্রামটা ছবির মতো দেখতে। আমাদের যেতে যেতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেলো তাই গোধুলির রঙে সৃজনী শিল্পগ্রামের নানা রকমের দর্শনীয় জিনিসগুলো যেন রঙিন হয়ে উঠেছে। এখানে রং বেরঙের চূড়ি,গলার মালা, কানের দুল আর বাহারি জামা-কাপড়ের পসরা সাজিয়ে ছোট এক হাট বসেছে। কিছুটা দূরে বাউল তার দো-তারা নিয়ে আপন মনে গেয়ে চলেছে গান। ভারী সুন্দর সেই গান। সত্যিই শান্তির স্বর্গ এই সৃজনী শিল্পগ্রাম।
আমাদের বিদায়ে ঘন্টা বেজে উঠেছে, রাত পোহালেই ট্রেন। কিন্তু শান্তিনিকেতনকে ছেড়ে যেতে কোন ভাবেই মন সায় দিচ্ছিলো না। আমার সাথে ভারতীয় অনেক কবিই ছিলেন বিশেষ করে কবি ড.সীমা রায়। আমার খুব কাছের বন্ধু। ‘আর্ন্তজাতিক বাংলাভাষা পরিষদ’ নামে আমাদের একটি সংগঠন আছে নদীয়ার কল্যাণীতে, ড. সীমা রায় তার কর্ণধার। আর আমি ‘আর্ন্তজাতিক বাংলাভাষা পরিষদ’ সাধারণ সম্পাদক (রংপুর বিভাগ)। সেই থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব বছরে দু’একবারতো দেখা হয়ই। ড.সীমা রায় খুব জোর দিয়েই বললো- শান্তিনিকেতনে এসে সোনাঝুরির হাটে নাগেলে এখানে আসার কোন মানেই হয়না। যেহেতু শান্তিনিকেতনে আমার আসাটা প্রথম তাই হয়তো তার এতোটা জোর। এদিকে সোনাঝুরির হাট জমে সন্ধ্যা থেকে রাত যতো গভীর হয়। তার মানে হলো আমাকে আরোও একটি রাত থাকতে হচ্ছে সেখানে। তবুও সীমার কথা ফেলতে পারলাম না। বিশ্বভারতী বশ্বিবদ্যিালয় থেকে প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরে প্রকৃতি ভবনের কাছে ও খোয়াই নদীর কাছে সোনাঝুরি হাট প্রতিদিন বসলেও আজ শনিবার হওয়ায় এখানকার সাপ্তাহিক আয়োজনে অনেক দূর দূরান্তর থেকে লোকজন ও দোকানদারেরা এসেছে। লাল মাটিতে কাপড় বিছিয়ে বসে খোলা আকাশের নিচে চলছে বেচা-কেনা। যেখানে কোনও ঢাকনাযুক্ত দোকান নেই। গোটা এলাকাটি পুরোপুরি শাল, সাগুন এবং ইউক্যালিপটাস গাছ দিয়ে ঘেরা। বেশিরভাগ দোকান মালিকই মহিলা ও শিশু। শীতকালে সোনাঝুরির গাছগুগুলো থেকে ছোট ছোট হলুদ ফুল সোনার ফোঁটার মতো ঝরে পড়ে বলে এর নাম সোনাঝুরির হাট। সোনাঝুরির হাটের প্রধান আকর্ষণ হল সাশ্রয়ী মূল্যের হস্তনির্মিত শিল্পকর্ম, যেমন সূচিকর্ম করা স্কার্ফ, কুর্তা, শার্ট, বিভিন্ন ধরণের ব্যাগ এবং পার্স, হস্তশিল্প, নেকলেস, কানের দুল, দেয়ালে ঝুলানো ইত্যাদি।
দোকনপাট থেকে সামান্য একটু দূরে দেখতে পেলাম সাঁওতালি উপজাতিরা তাদের লোকনৃত্য অর্থাৎ রঙ-বেরঙের কলস মাথায় দিয়ে গানের তালে লুঙ্গি পাঁচি নৃত্য পরিবেশন করছে। আমি ও সীমা রায় তাদেও সাথে নৃত্য করতে চাইলে তারা রাজি হয়ে যায়। তবে আমাদের মাথায় কলস দিতে রাজি হলো না, কারণ এটা পড়ে ভেঙে যাবে। এটা প্রশিক্ষণের ব্যাপার একদিনে সম্ভব নয়। যদিও তারা শাঁওতাল কিন্তু ভাঙা-ভাঙা বাক্যে বাংলা বলতে পারে।
যাহোক তাদের দলনেত্রী আমাদেরকে নৃত্যের কৌশল শিখিয়ে দিলেন এভাবে গানের তালে একপা সামনে দিয়ে মাঝে থামিয়ে আবার এক পা পিছনে দিয়ে এভাবে তাল বজায় রেখেই সামনে আগাতে হবে। প্রথমটায় একটু কঠিন মনে হলেও পরে ঠিক হয়ে গেলো। তাদের সাথে তাল মিলিয়ে আমরাও তিন পাক ঘুরে আসলাম। আমাদের দেখে তারা একটু হাসাহাসিও করছিলো তাতে বুঝে নিলাম যে, আমাদের কোথাও ভুল হয়েছে। ধন্যবাদ জানিয়ে তাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় একশত রুপি দলনেত্রীর হাতে দিলাম। তারা খুব খুশি হলো। আবার আসবেন বলে অভিবাদন জানালো।
এরই মধ্যে গোধুলির আভা ক্রমশঃ সরে গিয়ে রাতের আঁধার নেমে এসেছে। মাথার উপর একফালি চাঁদ উজ্জল হয়ে উঠেছে। বনের ভেতর বলে হয়তো সেখানে পর্যাপ্ত বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। আমার খুব চায়ের তৃষ্ণা পেলো তাই সীমা সহ আমরা একটি চায়ের স্টলে গেলাম। তার ঠিক উল্টোদিকে একটা বড় গাছের তলে বসে কয়েকজন বাউল শিল্পী তাদের একতারার সুরে ঐতিহ্যবাহী লোকগীতির দেহতত্বমূলক গান পরিবেশন করছেন। একজন বসে হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন, হয়তো তিনি দলের গুরু হবেন। আর কয়েকজন বাউল দাঁড়িয়ে কারও হাতে একতারা, কারও হাতে খঞ্জনী, কারও হাতে মন্দিরা। তারা সবাই গানের তালে এক হাতে একতারাটি উপরে তুলে ঘুরে ঘুরে নাচছে। আমার মন আর তাদের পাশে না গিয়ে পারলোনা। যিনি হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন তার পাশে গিয়ে তাদেও মতো করে বসে পড়লাম। ড.সীমাও আমার পাশে গিয়ে বসলো। দু’টো গান শোনার পর আমি হারমোনিয়াম ওয়ালা দাদুকে গোষ্ট গোপাল দাসের গাওয়া ‘গুরু না ভজি মুই- সন্ধ্যা সকালে মন-প্রাণও দিয়ারে,
ফুরাইয়া গেলো মোর সাধের জনম আপন কর্ম দোসেরে
প্রাণের বান্ধবরে--দাও দেখা দয়া করে”।
গানটি গাওয়ার জন্য অনুরোধ করলাম। উনি রাজি হয়ে গানটি গাইতে শুরু করলেন তার সাথে একজন বাউল এসে আমাকে টেনে তুলে একটা একতারা হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাদের সাথে নাচতে বললেন। আমি তাদের মতো করে নাচতে না পারলেও একতারা নিয়ে গানটি গাইলাম। আহা ! কি মধুময় সে ক্ষণ, কি মধুর সে রাত। জীবনে কি আর ভোলা যায়?
সৃষ্টিকর্তার আপন সৃষ্টির আলোয় আলোকিত ভূবন। তার সৃষ্টির পরতে পরতে উৎসারিত হয়েছে মানব জীবনের সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনা, হাসি কান্না, তেমনি প্রকৃতির সাথে মানব হৃদয়েরও এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন তিনি। প্রকৃতির মাঝেই আমরা খুঁজে পাই ভালোবাসা ও প্রেমের এক অবিমিশ্র উপাদান।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now