বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
পুরান ঢাকার বকশিবাজারে সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই ব্যস্ত। রাস্তায় ভিড়, চায়ের দোকানে রাজনীতি থেকে ক্রিকেট—সব নিয়ে তর্ক। কিন্তু কারা অধিদপ্তরের ভেতরে সে দিন অন্যরকম এক সজাগতা ছড়িয়ে ছিল। কক্ষে কক্ষে অফিসাররা নথি গোছাচ্ছিলেন, নিরাপত্তাকর্মীদের চোখে অস্বাভাবিক কড়া দৃষ্টি। সবার কানে গুঞ্জন—আজ মহাপরিদর্শক নিজে সংবাদ সম্মেলন করবেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন যখন কক্ষে প্রবেশ করলেন, তার পদক্ষেপের শব্দ যেন দেয়ালের গায়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কক্ষভর্তি সাংবাদিকরা কলম আর ক্যামেরা হাতে প্রস্তুত। তিনি বসার আগেই ফিসফিসানি থেমে গেল। কণ্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন,
— “গত তিন মাসে শুধু কেরানীগঞ্জ কারাগারেই ২৭৫টি ঝটিকা অভিযান চালানো হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে বিপুল নগদ অর্থ, অসংখ্য মোবাইল ফোন আর মাদকদ্রব্য। কারাগারকে দুর্নীতিমুক্ত করতে গোয়েন্দা ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।”
শব্দগুলো যেন কেবল সাংবাদিকদের জন্য নয়—বরং কারা ব্যবস্থার প্রতিটি অন্ধকার গলির জন্য সতর্ক সংকেত।
এই খবর পৌঁছে যায় কারাগারের ভেতরে, যেখানে কড়া শীতল দেয়ালের আড়ালে গোপনে বয়ে চলেছে এক অন্তঃস্রোত। ৩৫ বছরের রফিক, এক সময়ের কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী, এখন কেরানীগঞ্জ কারাগারের এক কয়েদি। সে কেবল নিজের শাস্তিই ভোগ করছে না—কারা ব্যবস্থার ভেতরের দুর্নীতির অন্ধকারও প্রত্যক্ষ করেছে।
রফিক মনে পড়ে তিন মাস আগের এক সকাল। তখনও কারাগারের ভেতরে অনিয়ম ছিল একপ্রকার রুটিন। কিছু টাকা দিলে বাড়তি খাবার, মোবাইলে কথা বলার সুযোগ—সবই মিলত। কিন্তু হঠাৎ একদিন রাতের আঁধারে তুমুল হৈচৈ শুরু হয়। টর্চের আলোয় ভরে যায় করিডর, সশস্ত্র পাহারা, অফিসারদের দ্রুত পদক্ষেপ।
— “সব কক্ষে তল্লাশি করো!”—এক অফিসারের গম্ভীর নির্দেশ।
রফিকের সেলের দরজা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকে পড়ল অভিযান দল। কাপড়ের ভাঁজে, বালিশের ভেতর, এমনকি টয়লেটের গর্তেও তারা হাত ঢুকিয়ে খুঁজছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে পাশের কয়েদির কাছ থেকে পাওয়া গেল একটি মোবাইল আর কয়েকটি ইয়াবার প্যাকেট। রফিকের বুক ধড়ফড় করছিল—সে জানত, সময় বদলাচ্ছে।
কিন্তু বদলটা শুধু অভিযানে সীমাবদ্ধ ছিল না। এক সপ্তাহের মধ্যে কয়েদিদের সাক্ষাৎকারের জন্য চালু হলো ডিজিটাল ভিজিটর ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। আগে যেখানে আত্মীয়স্বজনদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, এখন অনলাইনে আবেদন করলেই নির্ধারিত সময়ে সাক্ষাৎ সম্ভব। রফিকের মা প্রথম দিন এভাবে আসেন। কাচের দেয়াল আর ইন্টারকমের ভেতর দিয়ে ছেলের মুখ দেখে তিনি কেঁদে ফেলেন।
— “তুই ভালো আছিস তো, বাবা?”
রফিক নীরবে মাথা নেড়ে জানায়, “আগের চেয়ে ভালো।”
কারণ সে জানত, এবার আর খাবারের জন্য কারও হাতে টাকা ধরাতে হচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী তিনবেলা খাবার মিলছে—যেটা আগে শুধু কাগজে ছিল।
অভিযানের খবর বাইরে ছড়িয়ে পড়তেই ভেতরের অনেক কর্মকর্তা ঘাবড়ে গেলেন। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমেছিল, তারা জানতেন—সময় ফুরিয়ে আসছে। সাত মাসে ১২ জন চাকরিচ্যুত, ৬ জন বাধ্যতামূলক অবসর, ৮৪ জন সাময়িক বরখাস্ত, ২৭০ জনকে শাস্তি আর ২৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা—এমন কঠোর হিসাব কেউ কল্পনাও করেনি।
মাঝে মাঝে রাতের ডিউটিতে বডি ক্যাম লাগানো পাহারাদারদের দেখা যেত। আরএফআইডি প্রযুক্তি দিয়ে বন্দিদের গতিবিধি নজরে রাখা হচ্ছিল। একদল অফিসার ফিসফিস করে বলছিলেন—“এইবার কেউই রেহাই পাবে না।”
রফিকের সেলের পাশেই ছিল করিম নামের এক কয়েদি, যিনি ঘুষ দিয়ে বারবার ভালো সেলে থাকার সুযোগ পেতেন। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় তার বিশেষ সুবিধা উঠে যায়। করিমের মুখে রাগের ছাপ,
— “সব বদলে দিচ্ছে তারা… টাকা দিলেও আর কিছু পাওয়া যায় না।”
রফিক শান্তভাবে বলল,
— “হয়তো এই বদলটাই আমাদের জন্য ভালো।”
করিম তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে মাথা ফিরিয়ে নিলেও, গভীরে কোথাও যেন স্বীকার করে নিল—রফিকের কথায় সত্য আছে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ মুহূর্তে মহাপরিদর্শক একথা বলেন,
— “নিয়ম ভঙ্গকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দ্রুততম সময়ে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।”
এই ঘোষণা যেন দেয়ালের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হলো। কয়েদিদের মনে এক অদ্ভুত আশা—যে সিস্টেম এতদিন কেবল শাস্তি দিয়েছে, হয়তো এবার তা ন্যায়বিচারের হাতও বাড়াবে।
তিন মাস পরে, রফিকের সাজা শেষ হয়। কারাগারের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে সে গভীর শ্বাস নেয়। বাইরে মুক্ত বাতাসে প্রথমবারের মতো মনে হলো—অন্যায়কে ঠেকাতে যদি ভেতরের দেয়াল নড়ে ওঠে, তবে মানুষও বদলাতে পারে।
পেছনে তাকিয়ে সে দেখে কেরানীগঞ্জ কারাগারের উঁচু দেয়াল। সেই দেয়ালের ভেতরে এখনও চলছে অভিযান, সংস্কার, শুদ্ধি—এক ঝড়, যা হয়তো একদিন পুরো ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ আর জবাবদিহিমূলক করে তুলবে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now