বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
কায়রোর এক বিকেল ছিল সেদিন অদ্ভুত শান্ত। সূর্যের আলো শহরের পুরোনো অলিগলিতে সোনালি রঙ ঢেলে দিচ্ছিল, অথচ মানুষের চোখে ছিল অজানা এক শঙ্কা। সেই নীরবতা হঠাৎ ভেঙে গেল পুলিশি গাড়ির সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দে। গাড়িটি থামল এক পুরনো বইয়ের দোকানের সামনে। দোকানের দরজার কাছে মাটিতে ছড়িয়ে পড়া বই আর কাগজের উপর রক্তের দাগ। ভিড়ের মাঝে কাতর কণ্ঠে কান্না করছেন মোহাম্মদ হাশেম—দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক, যিনি বিতর্ক, সমালোচনা, এমনকি হুমকিও হাসিমুখে সহ্য করতেন। আজ তাঁর শরীরে ছুরির আঘাত, রক্তে ভিজে গেছে জামা।
ছুরি হাতে ধরা পড়েছে আবদুল্লাহ নামে এক যুবক। বয়স মাত্র বাইশ, চোখে কড়া দৃঢ়তা, মুখে তৃপ্তির এক রেখা হাসি। পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার চোখে কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই, বরং যেন কাজটি করে সে নিজের কর্তব্য সম্পন্ন করেছে বলে বিশ্বাস করছে।
দুই সপ্তাহ পর ঘটনাটি পৌঁছাল আদালতে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহর মুখে অনুশোচনার ছায়া নেই। বিচারক সালেম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মনস্তত্ত্ব পড়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, ধীরে ধীরে তাঁর দিকে তাকালেন।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হাশেমকে কেন ছুরিকাঘাত করেছিলে। আবদুল্লাহ বলল, ওই লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে বই লিখেছে। বিচারক জানতে চাইলেন, কোন বই? আবদুল্লাহ নির্দ্বিধায় উত্তর দিল—‘শহরের দেবতা’। বিচারকের ভ্রু কুঁচকে গেল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বইটা পড়েছ? আবদুল্লাহ মাথা নাড়ল, না।
তাহলে কিভাবে জানলে, এতে ধর্মবিরোধী কথা আছে? আবদুল্লাহ বলল, এলাকার ইমাম বলেছেন। তাঁর কথায় বিশ্বাস করেই কাজটি করেছে। বিচারক জানতে চাইলেন, ইমাম সাহেব কি বইটি পড়েছেন? কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবদুল্লাহ বলল, ইমাম বলেছেন পড়ার দরকার নেই, শিরোনামই বলে দেয় এটা শয়তানের লেখা।
বিচারক গভীরভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি বুঝলেন, এখানে শুধু এক ব্যক্তির অপরাধ বিচার হচ্ছে না, বরং এক প্রজন্মের অন্ধ বিশ্বাসের শিকড় কত গভীরে গেঁথে আছে, সেটিই চোখে পড়ছে।
আবদুল্লাহর শৈশব কেটেছে নীলনদের তীরের এক দরিদ্র গ্রামে। বাবা কৃষিকাজ করতেন, মা সেলাই করে সংসার চালাতেন। স্কুলে ভর্তি হয়েছিল বটে, কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণি পেরোতেই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বাবা-মা ভেবেছিলেন, মসজিদে গিয়ে কোরআন শেখাই যথেষ্ট। সেই মসজিদের ইমাম ছিলেন হাফেজ হাশিম—গম্ভীর মুখ, তীক্ষ্ণ জবান, আর অদম্য একরোখা বিশ্বাস। তিনি প্রায়ই বলতেন, আজকালকার লেখকরা ইসলাম ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছে, তাদের বই শয়তানের কালি দিয়ে লেখা।
এমন কথার মধ্যে বড় হয়ে ওঠা আবদুল্লাহর মনে গেঁথে যায়—বই লেখা মানেই বিপদ। শহরে আসার পরও সে এই বিশ্বাস বয়ে নিয়ে আসে। একদিন মসজিদের এক সভায় এক বক্তা চিৎকার করে বলল, মোহাম্মদ হাশেম নামের এই লোক আল্লাহর শত্রু, তাঁর লেখা ‘শহরের দেবতা’ ঈমান ধ্বংস করে, আর যে কেউ তাকে শিক্ষা দেবে সে জান্নাতি হবে। এই কথাগুলো যেন তার বুকের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দিল।
ঘটনার দিন দুপুরে সে দোকান থেকে চুপিচুপি বেরিয়ে এল। পকেটে লুকানো ধারালো ছুরি। বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দেখল, হাশেম কয়েকজন তরুণ পাঠকের সাথে হাসিমুখে কথা বলছেন। সেই হাসি তার কাছে অবজ্ঞা আর চ্যালেঞ্জ মনে হলো। মুহূর্তের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে বুকের ভেতর ছুরি বসিয়ে দিল। চিৎকার, বিশৃঙ্খলা, রক্তের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেপ্তার করল।
আদালতের কক্ষে বিচারক শান্ত গলায় বললেন, জ্ঞানের শত্রু আসলে লেখক নয়, অজ্ঞতাই শত্রু। তুমি যদি বইটি পড়তে, হয়তো একমত হতে বা না-ও হতে, কিন্তু নিজের চোখে সত্য দেখার সুযোগ পেতে। অন্যের কথায় অন্ধ হয়ে কাজ করাটা ঈমানের পরিচয় নয়, এটা অজ্ঞতার প্রমাণ।
আবদুল্লাহ নীরব হয়ে রইল। বাইরে থেকে ভেসে আসা হাওয়া যেন আদালতের ভারী বাতাসে আটকে গেল। রায়ের দিন ঘোষণা হলো—যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
কারাগারে প্রথমবারের মতো তার হাতে দেওয়া হলো বই। সহজ ভাষায় কোরআনের অনুবাদ, আর কিছু সাধারণ সাহিত্য। শুরুতে পড়তে পারত না, কিন্তু ধীরে ধীরে শিখে নিল। কয়েক মাস পর জেলের লাইব্রেরি থেকে তুলে নিল ‘শহরের দেবতা’। পড়তে গিয়ে অবাক হয়ে গেল—যে বইকে সে কুফরি ভেবেছিল, সেখানে মানুষের দুঃখ, অন্যায়, ন্যায়বিচারের তৃষ্ণার কথা লেখা। চোখ ভিজে গেল তার। মনে হলো, যদি আগে পড়ত, হয়তো আজ এই শিকলবন্দি জীবন তাকে কাটাতে হতো না।
মোহাম্মদ হাশেম সুস্থ হয়ে আবার লেখালেখি শুরু করলেন। তিনি আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁর ইচ্ছে ছিল, আবদুল্লাহ যেন শেখে—নিজের চোখে দেখা, নিজের মস্তিষ্কে বিচার করা, সেটাই সত্যিকার ঈমানের শক্তি। একদিন তিনি কারাগারে গিয়ে আবদুল্লাহর সাথে দেখা করলেন। বললেন, আমি তোমার প্রতি কোনো রাগ পুষে রাখিনি। শুধু চাই তুমি সত্যকে নিজের চোখে দেখো। আবদুল্লাহ নিচু গলায় উত্তর দিল, আপনি আমাকে ক্ষমা করেছেন, কিন্তু আমি কি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব?
গল্পের শেষ হয় এখানেই, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—যতদিন সমাজ মানুষের হাতে ছুরি ধরিয়ে বই কেড়ে নেবে, ততদিন আবদুল্লাহরা জন্ম নেবে। অন্ধের হাতে ছুরি দেওয়ার মানে, আলোকে হত্যা করার অনুমতি দেওয়া।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now