বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকের নাম- মাজহারুল মোর্শেদ
ঘল্পের নাম- ফুলির বিস্ময়কর পৃথিবী
জোছনাহীন অন্ধকার চারিদিকে থমথমে কুয়াশা তার সাথে ঠান্ডা বাতাসের কনকনে শীত। রাতের নীরবতায় ব্যস্ত শহরটা একেবারে জনশূন্য হয়ে হয়ে পড়েছে। কোথাও কোন সাড়া শব্দ নেই। মাঝে মধ্যে দু”একটা বেবীটেক্সি আর অটোরিক্সা ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না। নেহাত জরুরী প্রয়োজনে আটকে পড়া দু”একজন মানুষ ছাড়া কেউ নেই। রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান। সেখানে কয়েকজন চা খোর লোক ওভারকোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বেশ মেতে উঠেছে তাদের স্বভাব চারিত আড্ডাবাজি গল্প গুজবে। তাদের দেখে মনে হয় এতো তারা তারি বাড়ি ফেরা টা নেহাত অন্যায় ছাড়া কিছু নয়।
আমার ভীষণ চায়ের নেশা পেয়ে বসল। লোভ সামলাতে না পেরে আমিও যোগ দিলাম তাদের দলে। একজন রসিক লোক হাত পা নেড়ে অভিনয়ের ভঙ্গিতে অতীতের সুখ-দুঃখের গল্প শোনাচ্ছে। তার গল্পের মনোযোগী শ্রোতারা হাসতে হাসতে একেক জনার পেটে খিল লাগার অবস্থা হয়ে গেছে।
এর মধ্যে কোন একজন রসিকতা করে বলে উঠল, এই মনু? নুন চায়ে লেবুর টুকরোটা একটু বড় করে দিও কিন্তু! তার কথা শুনে অনেকে হাহা করে হেসে উঠল।
একজন বৃদ্ধ গোছের মানুষ একটু নড়ে চড়ে বসে গলা কাঁপাতে কাঁপাতে বললো-
উহুঃ হুঃ বুঝলেন ভাইয়া? এতো শীত নয় যেন গরীরের মরণ ব্যধী। ওপারে যাওয়ার অসনি সংকেত। আর মনে হয় বেশীদিন বাঁচা যায় না, এভাবে কি বেঁচে থাকা সম্ভব?
তাদের বিভিন্ন জনের বিভিন্ন রকম রসিকতা পূর্ণ আলাপ চারিতা শুনতে আমার মন্দ লাগছিল না। এরই মধ্যে আমিও তাদের একজন মনোযোগী শ্রোতা হয়ে গেছি। এমন সময় একটা অসহায় ক্ষীণ শব্দ আমার নিমগ্নতা ভেঙ্গে দেয়।
স্যার দুইডা ট্যাকা দেন রাতে কিছুই খাই নাই।
আমি পিছনে ফিরে কুয়াশায় ভেজা চশমাটা চোখ থেকে খুলে তাকিয়ে দেখি ছোট্ট একটি মেয়ে, কি এমন বয়স হবে তার! ছয় কিংবা সাত বছর, মাথায় উসকো-খুসকো চুল হাত-পা খালি, গায়ে একটা বোতাম হীন ছেড়া সোয়েটার, তার একাংশ বাতাসের সাথে লড়াই করে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে তাকে ঠাÐার হাত থেকে বাচার জন্য। আহা! কি নিষ্পাপ একখানা মুখ, প্রচণ্ড ঠান্ডায় একেবারে কালো হয়ে গেছে। টাকা বের করার জন্য মানিব্যাগটা হাতে নিলাম কিন্তু মানিব্যাগে কোন খুচরা টাকা না থাকায় একটা বিশ টাকার নোট তার হাতে দিলাম।
নতুন চকচকে নোটটি সে এপিঠ ওপিঠ উলটিয়ে বারবার দেখতে লাগল। আমিও তার নিষ্পাপ মুখ খানার দিকে তাকিয়ে আছি। একবার সে মাথা তুলে আমার দিকে তাকালো আমি দেখলাম তার চোখ দুটো পানিতে ছল ছল করছে।
পাশের ফুটপাতে একটা ছেড়া কম্বলের তলে হাত পা গুটিয়ে একেবারে জড়সড় হয়ে বসে আছে তার সঙ্গী-সাথীরা। সে বার বার তাদের দিকে তাকাচ্ছে। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না হয়তো এই খোলা আকাশের নিচেই কাটবে তাদের রাত। এটাই তাদের একমাত্র আশ্রয় স্থল।
আমি দু‘পা এগিয়ে তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম-তোমার নাম কি ?
সে এদিক ওদিক তাকিয়ে মৃদু স্বরে বললো ফুলিবানু। নামটা বলতে সে কেমন যেন লজ্জা পাচ্ছিল। হয়তো এর আগে কেউ তার নামও জিজ্ঞাসা করে নি।
কোথায় থাক তোমরা?
ডান হাতটা উচু করে ইশারায় দেখিয়ে দিল ঐ ফুটপাথে।
তোমার আর কে কে আছে?
বারবার তাকে প্রশ্ন করায় মনে মনে সে একটু বিরক্ত বোধ করছে মনে হয়, তারপর মাটি থেকে কিছু একটা কুড়িয়ে নিয়ে দু‘হাত দিয়ে সেটা নাড়া নাড়ি করতে করতে বলে-ভুলু আর আমি।
আমি ধরে নিলাম যে ভুলু তার ভাই কিন্তু নাম ধরে সম্বোধন করায় সে ছোট না বড় ঠিক বোঝা গেল না। তাকে বিরক্ত করতে আমিও আর সে প্রশঙ্গে গেলাম না।
কেন তোমার মা বাবা নেই?
না। বাবারে আমি দেখি নাই তয় মা ছিলো। গত বছরে ডেঙ্গুজ্বরে হ্যায়ও মইরা গেলো। তারপর যেন ফুলির মুখে কথার ফুলঝুড়ি খইয়ের মতো ফুটতে লাগলো। মুহূর্তের মধ্যে আমাকে আপন করে নিলো।
জানেন স্যার, মা যে মইরা গেছে আমরা কেউ জানতাম না। আমি আর ভুলু দু‘জনেই মায়ের বুকে শুইয়া ঘুমাইছিলাম। সকাল বেলা দেখি মার ঘুম ভাঙ্গেনা। মা-মা কইরা এতো ডাকতাছি হ্যায় আর জাগে না। তখন পাশের ঘর থাইক্কা রহিমা খালারে লইয়া আসি। হ্যায় মারে ভালো কইরা দেইখা চিক্কুর দিয়া কাইন্দা ওঠে আর বলে ফুলিরে, ও মা ফুলি, তর মা আর বাইচ্চা নাই, হ্যায় মইরা গেছে। আমাগোরে ছাইরা চিরেিনর লাইগ্যা হ্যায় ঘুমাইয়া গেছে। আর কোন দিনই আমাগোর লগে আইবো না রে। ও আল্লা, আমার আল্লাগো এত্তোবড় দুনিডায় তুমি কি নেওনের মতো মানুষ পাইলা না। বাবা নাই, মাওডারও তুমি লইয়া গেলা। এহোন এই এতিম পোলা মাইয়াগোর কি অইবো গো আল্লাহ। হ্যারা কি খাইবো, ক্যামনে থাকবো, হ্যাগোরে কে দেখা শুনা করবো গো আল্লাহ!
তারপর রহিমা খালা আমাগোরে খাওন দিছিল, কিন্তু হ্যায়তো নিজেই ভিক্ষা কইরা তার পোলাপানদের খাওন জোগার করে। আর আমাগোরে খাওয়াইবো কি? আমাগোর লাইগা সবার কষ্ট হইতাছিল। আমাগোর বস্তিতে একডা ছোট চালা ছিলো সেইখানেই আমরা থাকতাম, একদিন পুলিশ আইসসা সব ভাইঙ্গা দিয়া গেলো। তহন থাইক্কা আমরা এই ফুটপাতেই থাকি।
বিরতিহীনভাবে কথাগুলো সে বলে ফেলে মনের অজান্তেই তার দু‘চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে সমুদ্রের লোনাজল। অনেক কষ্টে জোর করে সে তার নিজেকে সামলে নিলো, পুরো শরীরটা যেন অবস হয়ে গেছে। চেতন আর অবচেতনের দোলাচলে নিষ্পাপ অবুঝ মন তার হারিয়ে যায় কষ্টের গহীণ অন্ধকারে।
নিরানন্দ ও নিরবিচ্ছিন্ন জীবনের গøানি, মাতৃহীন নরকীয় বলয়ে এক যন্ত্রণাদগ্ধ শৈশব, ফুটপাথে পড়ে থাকা পৃথিবীর অন্ধকার, মধ্যরাতে টহলদার পুলিশের ইতরামি, অথৈ অন্ধকারের বন্যায় থমকে থাকে বিস্ময়! মাতৃহীন শৈশবে বির্পযস্ত বিপন্ন জীবন কোথাও কোন স্বস্থি নেই, শান্তিনেই, স্নেহ নেই, ভালোবাসা নেই, ভেঙ্গেপড়া আকাশ, বিদ্ধস্ত পৃথিবী কি বিভৎস জীবনের মুখোমুখি দাড়িয়ে এরা তবুও হাসে। ঠোটের কোণে বিবর্ণ হাসিতে ফুটে থাকে টকটকে লাল পলাশের দুঃখ। কি ভীষণ স্বার্থপর এই পৃথিবী। কেউ তাকায়না কারো দিকে।
শৈশবের আঙ্গুল ভাঙ্গা কষ্টের ভেতরে প্রতিনিয়ত ভোর হয় তারস্বরে ডেকে ওঠা কাকের ডাক শুনে। আজও কোন সৌভাগ্য প্রসূত দোয়েলের শিষ কিংবা শালিকের হাসি সে দেখতে পায়নি তারা। রঙহীন বিবর্ণ জীবনে ছেড়া কাঁথার আষ্টে গন্ধ মাঝে মাঝে তাকে আগর বাতির সুবাস দেয়। তখন সে চঞ্চল হয়ে ওঠে। প্রতিনিয়ত কষ্টের সিড়ি ভেঙ্গে সাবলম্বি পাখিদের মতো নিজের আহার নিজেই খোঁজার জন্য বের হয়ে পড়ে। কুসুম ছড়ানো শৈশবের স্বপ্নকে লাথি মেরে দুরে ফেলে দেয় কষ্টের অভিলাসে দুরন্ত গতির সুখের স্বপ্নকে নিজ হাতে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলে। মায়াবি মুখে ঘাস ফড়িঙের মতো উপরে ভেসে ওঠা জোরা চোখ বিস্ময় ভরা অবিচল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে এ আজব শহরের লক্ষ কোটি মানুষে দিকে। তাজ্জব ব্যাপার কেউ কারদিকে ফিরেও তাকায় না, সবাই শুধু ছুটছে সামনের দিকে।
আমরা মানুষ, আর এই মানুষ নামের দু”পা বিশিষ্ট প্রাণী গুলো যতো বিচিত্র স্বভাবের হয়। মানুষের এই বৈচিতা যতো না কল্যাণের তার চেয়ে অকল্যাণেই অনেক বেশি। নিজেকে সৃষ্টিসেরা জীব ভেবে আমরা কতোইনা অহ্কংার বোধ করি কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন কর্মকাÐে সেরা জীবের কোন চিহ্ন কি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়? নিজে বাঁচার জন্য আমরা অন্যকে প্রতিনিয়ত ঠকাই, নিজের পকেট ভারী করার জন্য আমরা যা নয় তাইকরি অবলিলায়।
দুনিয়ার সবচেয়ে সুবিধাবাদি প্রাণী এখন মানুষ, নিজেদের ভোগ বিলাসিতা আর ঐশ্বর্য বৈভব তাকে এতোবেশি নিচে নামিয়েছে যে, সে আর অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সময় পায় না। আদিমযুগে বন্যপ্রাণিরা যেমন নিজেরা সুবিধা নিয়ে মানুষদের তাড়িয়ে বেড়াত ঠিক তেমনি আমাদের সমাজের একশ্রেণির মানুষ বন্যপ্রাণির মতো নিজের আদর্শ, নীতি নৈতিকতা, বিবেকবোধকে পদদলিত করে শুধু নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সবাইকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কেহই তার কড়াল গ্রাস থেকে রক্ষা পায় না। লজ্জা, ঘৃণা , অপমান তার কাছে কোর বিবেচ্য বিষয় নয়। নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সে সবকিছুকে জলাঞ্জলী দিয়ে থাকে।
হায় মানবতা! একি বিভৎস রূপ তোমার? সবাই যদি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তবে যারা অসহায়, দীন-দুখি, সুবিধা বঞ্চিত যারা তাদের হবে কি?
হায় বিধাতা ! এইকি তোমার সৃষ্টিলীলার শ্রেষ্ঠ বিধান? সর্বোশ্রেষ্ঠ নিয়মের মাঝে কেবলি অনিয়মের বিশাল বৈষম্য। কেবলি ব্যবধানের কনক্রিটে নির্মাণ করা হাজারো দেয়াল। তোমার আর্শিবাদ কি শুধু ঐ আকাশ চুম্বি বহুতল ইমারতের মার্বেল পাথরে সাজানো চকচকে দেয়ালের ভিতরে? তোমার আর্শিবাদ কি, শুধু ঐ মখমলে সাজানো ঝকঝকে নরম সজ্জায়? তোমার আর্শিবাদ কি, শুধু ঐ কোর্মা পোলাও আর চিকেন বিরিয়ানির রান্না ঘরে? এ সকল ভাগ্যহত শিশু যারা ক্ষুধার যন্ত্রণায় দগ্ধ পিপাসায় কাঁতর, শীতে বস্ত্রহীন বর্ষায় আশ্রয়হীন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পরাজিত হয়ে ফুটপাথে পড়ে থাকে। আজ কেউ নেই ওদের পাশে কেউ ফিরে তাকায় না।
হে মানবতার শ্রেষ্ঠ বিবেক, হে আশরাফুল মাখলুকাত? তোমরা কি শুনতে পাওনা? এ সকল নিগৃহিত নিপিড়িত অসহায় শিশুদের হাহাকার! বুকফাটা আর্তনাদ। যারা প্রচন্ড শীতে ছিন্নবস্ত্র গায়ে জড়িয়ে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকে। তোমরা কি শুনতে পাওনা? এ সকল আশ্রয়হীন শিশুদের ডুকরে ওঠা গগন বিদারি কান্না? যারা ক্ষুধার যন্ত্রণায় চটফট করে, ভিক্ষার শূন্যথালা হাতে নিয়ে তোমাদের দারে দারে ঘুরে বেড়ায়? যারা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে ফুটপাথে পড়ে থাকে।
পৃথিবীর লক্ষকোটি এমন শিশু হয়তো আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে পড়ে থাকে কিন্তু তাদের বিবেচনায় এখন আসছে না, শুধু পরীর ভাগ্যহতা জীবনের অলঙ্ঘনীয় দুঃখ দুর্দশা দুর করার জন্য প্রয়োজন একটু আশ্রায়, একটু মাথা গোজার ঠাই, জীবনের কাছ থেকে একটা মমতামুগ্ধ স্নেহপূর্ণ ব্যবস্থা আহরণ করে পরিতৃপ্ত মঙ্গলের জন্য যদি কিছু করতে না পারা গেল, তাহলে আমার মৃত্যুর পড়েও সেই অকর্মের তিক্ততা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আশা নেই। অতৃপ্ত মনের তৃপ্ততাকে পরিপূর্ণ করার প্রয়াসে গভীর মমতার বন্ধনে জড়িয়ে পরী আর ভুলু সমস্ত পৃথিবীর দুঃখ কষ্টগুলোকে হাতের মুঠোয় জড়ো করে এখন মুক্ত বিহঙ্গের মতো নীল আকাশের বুকে মিশিয়ে দেয়। আর যা হোক অন্ন বস্ত্রের জন্য কার কাছে হাত পাততে হবে না, কারো ধমক খেতে হবে না। জীবনের নতুন পথে আজ তারা শান্তি ও নিস্তার খুজে পেয়েছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now