বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। শিশুদের কোলাহলে চারপাশ মুখরিত। একে একে সবাই তাদের বাসায় ফিরছে। কারো মা এসে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে, কারো বাবা হাসিমুখে অপেক্ষা করছে স্কুল গেটের সামনে। মেঘু দাঁড়িয়ে আছে স্কুলের বারান্দায়। তার চুলের ফাঁক দিয়ে হালকা রোদ এসে চোখে পড়ছে, কিন্তু সে খেয়াল করছে না। তার দৃষ্টি বারবার স্কুল গেটের দিকে।
"বাবা এখনও এল না কেন?" নিজেকে প্রশ্ন করে মেঘু। বুকের ভেতর একধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। বাবা তো প্রতিদিন এই সময়েই আসে। আজ কেন দেরি হচ্ছে?
তার পাশে দাঁড়ানো বান্ধবী সুমি জিজ্ঞেস করল, "মেঘু, তোর বাবা আসেনি?" মেঘু মাথা নাড়ল। "না, এখনো আসেনি।"
সুমির মা তাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। মেঘু একা হয়ে গেল। সময় যেন থেমে গেছে। একজন একজন করে সবাই চলে যাচ্ছে। চারপাশ ফাঁকা হতে শুরু করল। মেঘু আর গেটের দিকে তাকাতে পারে না। চোখে পানি চলে আসে।
মেঘু বিশ্বাস, বাবা আসবে। বাবা কখনোই তাকে স্কুলে দাঁড় করিয়ে রাখে না। কিন্তু আজকের এই অপেক্ষা যেন শেষ হতে চায় না। স্কুলের দারোয়ান এসে বারবার বলছে, "তুমি একা দাঁড়িয়ে আছ কেন? তোমার বাড়ি যাও না?"
মেঘু কোনো উত্তর দেয় না। ঠোঁট চেপে ধরে আবার গেটের দিকে তাকায়। বাবার দেখা নেই।
শেষমেশ অভিমান আর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। মেঘু একা একা বাসার পথে হাঁটতে শুরু করে। তার ব্যাগটা ভারী মনে হচ্ছে, পায়ের নীচের পথটাও যেন দীর্ঘ হয়ে গেছে। প্রতিটি ধাপের সঙ্গে তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন: "বাবা কেন এল না? বাবা কি আমাকে ভুলে গেছে?"
হাঁটতে হাঁটতে সে বাসায় এসে দরজার কাছে দাঁড়ায়। ভেতর থেকে মানুষের ফিসফাস কানে আসে। দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। প্রথমেই তার চোখ পড়ে বাবার বিছানার দিকে। বাবা শুয়ে আছেন। কিন্তু তার ভঙ্গি অদ্ভুত। মুখটা স্থির। পাশে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে। কেউ বসে আছে, কেউ মাথা নিচু করে কাঁদছে।
মেঘু কিছু বুঝতে পারে না। বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বাবার ঠান্ডা হাত ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। মা এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। মায়ের কাঁধে মুখ গুঁজে মেঘু শুনতে পায় মায়ের কথা: "তোমার বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, মেঘু। তিনি আর কখনো আসবেন না।"
মেঘুর পৃথিবী যেন থেমে যায়। সেদিন তার ছোট্ট জীবন বদলে যায় চিরতরে।
মেঘু মায়ের কোল থেকে সরে এসে বাবার শিয়রের কাছে দাঁড়াল। তার ছোট্ট মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। বাবা কেন উঠে বসছেন না? কেন কেউ তাকে ডাকছে না? বাবার চোখ বন্ধ কেন?
পাশে বসা এক প্রতিবেশী তাকে কাছে টেনে বললেন, "মেঘু মা, বাবা তো অনেক দূরে চলে গেছে।"
"দূরে? কোথায় গেছেন?" মেঘু বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল।
চাচি মনের ভেতর জমে থাকা কষ্ট চেপে রেখে হাসার চেষ্টা করলেন। "যেখানে সবাই যায়, জান্নাতে। তোমার বাবা এখন আল্লাহর কাছেই থাকবেন।"
মেঘুর ছোট্ট মন এ কথাগুলো বুঝতে পারল না। বাবাকে স্পর্শ করতে চাইল। ঠান্ডা শরীরটা যেন তাকে আরেকবার বলে দিল, কিছুই আগের মতো নেই।
মেঘু মাকে জিজ্ঞেস করল, "মা, বাবা কথা বলছেন না কেন?"
মা আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লেন। মেঘুর চোখ দিয়ে তখনো পানি পড়েনি। সে চুপ করে বাবার পাশে বসে রইল। সে ভাবছে, বাবা উঠবেন। তাকে কোলে নেবেন। স্কুলে কেন দেরি হল তা ব্যাখ্যা করবেন।
কিন্তু কিছুই হলো না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল। মেঘুর বাবার মৃত্যুর খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবেশীরা ছুটে এলেন। সবাই যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। সদা হাসিখুশি, পরিবারকে আগলে রাখা মানুষটির এমন বিদায় কেউই মেনে নিতে পারছিল না। বাড়ির উঠোনে মানুষের ঢল নেমে এল।
মেঘু তখনও বাবার বিছানার পাশে বসে নিস্তব্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল। মা তাকে অনেকবার ডাকলেও সে সাড়া দিচ্ছিল না। যেন বুঝতেই পারছিল না কী ঘটে গেছে। বাড়ির এক কোণে মেঘু দাঁড়িয়ে দেখছিল আত্মীয়-স্বজনরা বাবার দেহ গোসল করাচ্ছেন, তারপর সাদা কাফনে মুড়িয়ে রাখলেন। তার ছোট্ট মন বুঝতে পারছিল না, বাবাকে কেন এভাবে সাদা কাপড়ে মুড়ে ফেলা হলো।
পাশের মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা শোনা গেল, "আজ বাদ মাগরিব জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সবাইকে জানাজায় অংশগ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।"
মাগরিবের নামাজের পর গ্রামের মাঠে বাবার জানাজার নামাজ পড়ানো হলো। জানাজার আগে ইমাম সাহেব বললেন,
"আমাদের গ্রামের অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। তার প্রস্থানে শুধু তার পরিবার নয়, পুরো গ্রাম শোকাহত। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।"
জানাজায় পুরো মাঠ ভরে গেল। গ্রামের ছোট-বড় সবাই এসেছিল। মেঘু দেখল, সবাই বাবার জন্য কাঁদছে। তার চোখ দিয়ে আর কোনো জল বেরোচ্ছিল না, কেবল হৃদয়ে এক প্রচণ্ড শূন্যতা অনুভব করছিল।
জানাজার পর বাবাকে কবরস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। মেঘু দেখতে পেল, কবর খোঁড়া হয়েছে। বাবার দেহ ধীরে ধীরে কবরের ভেতর নামানো হলো। সেই দৃশ্য মেঘুর ছোট্ট হৃদয়কে যেন টুকরো টুকরো করে দিল। সে দৌড়ে মায়ের কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল।
মেঘুর মা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললেন,
"তোর বাবা চলে গেল, মেঘু। কিন্তু তার শেখানো আদর্শ আর ভালোবাসা আমাদের সঙ্গে থাকবে চিরকাল। আমরা তার স্বপ্ন পূরণ করব। তুই শক্ত হ।"
বাবার দাফন শেষে সবাই ধীরে ধীরে ফিরে গেল। তবে মেঘু আর তার মা উঠোনে বসে থাকল দীর্ঘ সময় ধরে। আজ থেকে তাদের জীবনটা এক নতুন সংগ্রামের পথে যাত্রা শুরু করল।
সেই রাতে মেঘু বাবার স্পষ্ট অভাব বুঝল। ঘুম ভেঙে মাঝরাতে বাবাকে খুঁজল। কিন্তু কোনো উত্তর পেল না। বাবাহীন প্রথম রাতটা ছিল মেঘুর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাত।
সকাল হলো। ঘুম ভাঙতেই মেঘু বাবাকে খুঁজতে শুরু করল। প্রতিদিন সকালে বাবা তাকে ঘুম থেকে তুলে দিতেন। কিন্তু আজ তার ঘর নিস্তব্ধ। বাবার ঘরটাও ফাঁকা। মেঘু দৌড়ে মায়ের কাছে গেল। মা তখন কাঁদতে কাঁদতে রান্নাঘরে বসে আছেন।
"মা, বাবা কোথায়?"
মা মেঘুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, মা। তোমার বাবা তো আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।"
মেঘু এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। মা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুধু বললেন, "তোমার বাবা তোমার পাশে আছেন, মেঘু। তিনি সবসময় আছেন, শুধু দেখতে পাবে না।"
মেঘুর ছোট্ট মন এই কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারছিল না। সে বাবাকে দেখতে চায়, স্পর্শ করতে চায়। কিন্তু চারদিকে শুধু শূন্যতা।
দিনগুলো কেটে যেতে লাগল। প্রতিবেশীরা এসে সান্ত্বনা দিয়ে যায়। কেউ বলে, "মেঘু বড় হয়ে অনেক কিছু করবে।" কেউ বলে, "মেঘু তার বাবার জায়গা পূরণ করবে।"
কিন্তু মেঘুর কাছে এই কথাগুলো অর্থহীন। তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন: "বাবা আমাকে কেন ছেড়ে চলে গেল?"
স্কুলে যাওয়ার সময়ও বাবার অভাব তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার যে অনুভূতিটা ছিল, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় শূন্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেঘু জানে, বাবা আর কখনো আসবে না। তবু প্রতিদিন সকাল-বিকেল তার মনে হয়, হয়তো আজ বাবা ফিরবেন।
দিনগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, কিন্তু মেঘুর জীবনে বাবার শূন্যতা যেন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বাবা চলে যাওয়ার পর তার মা যেন অন্য এক মানুষ হয়ে গেছেন। মায়ের চোখে প্রতিনিয়ত লুকানো বিষণ্নতা। মা দিনের বেশিরভাগ সময় কাজ আর চিন্তায় মগ্ন থাকেন। মেঘু বুঝতে পারে, তার মা সংসারের ভার একা কাঁধে নিয়েছেন।
মেঘু অনেক সময় চুপচাপ মায়ের পাশে বসে থাকে। মা তখন কখনো তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, কখনো বলেন, "মেঘু, তুই এখন আমার একমাত্র শক্তি। তুই যদি ভালো থাকিস, আমি সব সহ্য করতে পারব।"
মেঘু বোঝার চেষ্টা করে, তার মাকে কতটা কষ্ট করতে হয়। বাবা যখন ছিলেন, তখন সবকিছু এত সহজ ছিল। এখন মাকে একা একা সব সামলাতে হয়। বাবার অবর্তমানে মেঘু আর তার মা যেন একে অপরের আশ্রয় হয়ে উঠেছে।
স্কুলে মেঘুর বন্ধুরা যখন বাবার কথা বলে, তাদের বাবা কী নিয়ে এসেছে, কোথায় ঘুরতে নিয়ে গেছে, তখন মেঘু চুপ করে থাকে। তার বাবার গল্প করার কিছু নেই। সে শুধু জানে, তার বাবা নেই।
একদিন স্কুলে শিক্ষক বললেন, "আগামীকাল বাবা দিবস। সবাই তার বাবাকে নিয়ে একটা ছবি আঁকবে আর তার বাবাকে নিয়ে একটা ছোট গল্প লিখবে।"
মেঘু তখন চুপ করে বসে থাকল। অন্যরা যখন উৎসাহ নিয়ে কাজ শুরু করল, মেঘুর হাতে খাতাটা যেন ভারী হয়ে গেল। বাবাকে নিয়ে তার কোনো গল্প নেই। সে জানে, সে কিছুই লিখতে পারবে না।
স্কুল থেকে ফেরার পথে মেঘু চুপচাপ হাঁটছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে অন্যদের মতো নয়। তার একটা বড় অভাব আছে, যা কেউ পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু একসময় তার মনে হলো, তার মায়ের কথাগুলো মনে রাখতে হবে। সে মায়ের শক্তি। আর শক্তি হতে হলে তাকে বাবার অভাব মেনে নিতে হবে।
সেদিন থেকে মেঘু ধীরে ধীরে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করল। বাবার স্মৃতি না থাকলেও বাবার অনুপস্থিতি তাকে অন্য রকমভাবে বড় করে তুলছিল।
দিনের পর দিন মেঘু নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে, বাবার অভাব তাকে ভেঙে ফেলতে পারবে না। কিন্তু অভাবের সেই অনুভূতিটা যেন প্রতিদিন আরও গভীর হয়। একদিন বিকেলে মেঘু বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে ছোট ছোট মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল। ঠিক তখন পাশের বাড়ির ছোট্ট রাহিমের বাবা তাকে কাঁধে তুলে খেলছিলেন। রাহিম হাসছিল, তার বাবা হাসছিল।
মেঘু চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিল। তার মনে পড়ে গেল, বাবার কাঁধে চড়ে মেলায় যাওয়ার দিনগুলো। বাবা তখন তাকে বলেছিলেন, "তুই অনেক বড় হবি, অনেক দূরে যাবি।"
মেঘুর চোখ ফেটে জল বের হয়ে এল। সে মাটির দিকে তাকিয়ে নিজেকে বলল, "বাবা কেন চলে গেল? কেন আমাকে এত ছোট করে ফেলে রেখে গেল?"
মা তখন মেঘুকে বারান্দা থেকে ভেতরে ডেকে নিলেন। মেঘুর মুখ দেখে বুঝতে পারলেন, তার মনের মধ্যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মেঘুকে কোলে বসিয়ে মা বললেন, "মেঘু, জানিস? তোর বাবা তোর জন্য সবসময় স্বপ্ন দেখত। সে বলত, আমাদের মেয়ে একদিন বড় মানুষ হবে। এই পৃথিবীতে সবাই তাকে চিনবে।"
মেঘু বিষণ্ন গলায় বলল, "কিন্তু মা, বাবা যদি দেখতে না পারে, তাহলে বড় হয়ে লাভ কী?"
মা মৃদু হেসে বললেন, "বাবা তো আকাশের তারাদের মাঝে বসে আছে। সে তো সব দেখতে পায়। তুই যখন ভালো কিছু করবি, তখন আকাশের তারা আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলবে।"
মায়ের কথা শুনে মেঘুর মনে একটু সাহস এল। সে ভাবল, বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। তাকে বড় হতে হবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে মেঘুর মনে একটা ভয়ও জাগল। বাবার অনুপস্থিতি তাকে যে প্রতিদিন আরও দুর্বল করে দিচ্ছে, তার থেকে কি কখনো মুক্তি পাবে?
মেঘু আবার বারান্দায় গিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। মেঘেদের আড়ালে কোথাও যেন তার বাবা তাকিয়ে আছে—এই অনুভূতিটা তাকে কিছুটা শান্তি দিল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, বাবার দেওয়া প্রতিটা কথা পূরণ করবে, তার জীবনের প্রতিটা কাজ যেন বাবার প্রতি শ্রদ্ধা হয়ে ওঠে।
মেঘুর জীবনে বাবার শূন্যতা ছিল এক বিশাল অভাব। তবে এই অভাবের মাঝেও তার মা হয়ে উঠলেন তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। মা প্রতিদিন তাকে সাহস যোগাতেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। বাবার চলে যাওয়ার পর সংসার চালানোর জন্য মেঘুর মা গ্রাম থেকে শহরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
একদিন সকালে মা মেঘুকে ডেকে বললেন, "মেঘু, শহরে আমাদের নতুন জীবন শুরু করতে হবে। এখানে সবকিছু চলছে না। তুই কি রাজি?"
মেঘু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার গ্রাম, স্কুল, বন্ধু—সব ছেড়ে যেতে হবে। কিন্তু বাবার কথা মনে পড়ল। বাবা বলতেন, "সবচেয়ে কঠিন সময়ে সাহসী হওয়া শেখ।"
মেঘু মৃদু মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ, মা। আমি রাজি।"
পরের কয়েকটা দিন ছিল অদ্ভুত। মা তার সামান্য জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলেন। প্রতিবেশীরা এসে বিদায় জানাল। মেঘু বাড়ির প্রতিটা কোণায় হাঁটল। প্রতিটা জায়গা তাকে বাবার স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
শহরে যাওয়ার দিন সকালে মেঘু উঠেই বারান্দায় দাঁড়াল। চারদিকে পাখির ডাক, গ্রামের পরিচিত গন্ধ। সবকিছু এত আপন, অথচ আজই তাকে এগুলো ছেড়ে যেতে হবে।
মা তাকে হাত ধরে গাড়িতে উঠালেন। মেঘু জানালার পাশে বসে গ্রামকে বিদায় জানাল। তার চোখে জল চলে এল। কিন্তু মনের ভেতর একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা ছিল।
শহরে পৌঁছে তারা একটা ছোট বাসায় উঠল। মা কাজ খুঁজতে বেরিয়ে পড়লেন। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ—সবকিছুই মেঘুর কাছে একেবারে অচেনা। কিন্তু মেঘু জানত, এখানে তাকে লড়াই করতে হবে। তার বাবার স্বপ্ন পূরণের জন্য তাকে এই নতুন জীবনে মানিয়ে নিতে হবে।
প্রথম দিনেই শহরের কোলাহল আর ভিড় তাকে ভড়কে দিল। স্কুলের কথা ভেবে তার বুক কেঁপে উঠল। কিন্তু মায়ের হাসিমুখ দেখে সে সাহস পেল। সে ভাবল, বাবার অভাব যেমন মেনে নিয়েছে, তেমনি নতুন এই জীবনও মেনে নিতে হবে। বাবার দেখানো পথে এগিয়ে যেতে হবে।
শহরের জীবন মেঘুর জন্য সহজ ছিল না। নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ, আর মায়ের ব্যস্ততা—সবকিছু মিলিয়ে তার জীবন যেন অগোছালো হয়ে গেল। মেঘুর মনে সবসময়ই বাবার অভাব অনুভূত হতো। শহরের স্কুলে প্রথম দিনই সে বুঝতে পারল, এখানকার জীবন গ্রামের মতো সরল নয়।
ক্লাসের অন্য ছেলেমেয়েরা তাকে নতুন দেখে দূরে দূরে থাকত। কেউ কেউ তার পোশাক বা কথা বলার ভঙ্গি নিয়ে ফিসফাস করত। মেঘু চুপচাপ সহ্য করত। তার মনের ভেতর শুধু একটাই কথা ঘুরত: "বাবা বেঁচে থাকলে এসব কিছুই হতো না।"
একদিন স্কুল থেকে ফিরে মেঘু মায়ের কাছে গিয়ে বলল, "মা, আমার খুব কষ্ট হয়। সবাই আমাকে নিয়ে মজা করে। আমি আর স্কুলে যাব না।"
মা মেঘুকে কাছে টেনে বললেন, "তুই কি জানিস, তোর বাবা আমাদের জীবনের কত বাধা পেরিয়ে এত দূর এসেছিল? মানুষ কী বলল, সেটায় কান না দিয়ে নিজের কাজ করত। তুইও তোর বাবার মতো হবি, তাই না?"
মায়ের কথাগুলো মেঘুর মনে দাগ কেটে গেল। সেদিন থেকে সে ঠিক করল, কারো কথায় কান না দিয়ে সে শুধু নিজের পড়াশোনায় মন দেবে।
ক্লাসে ধীরে ধীরে সে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে শুরু করল। তার লেখাপড়ার দক্ষতা আর চুপচাপ দৃঢ় মনোভাব শিক্ষক-সহপাঠীদের নজর কাড়ল। যারা আগে তাকে নিয়ে মজা করত, তারাই এখন তার সঙ্গে মেশার চেষ্টা করত।
তবুও মেঘুর একাকীত্ব কাটত না। স্কুলে সবাই যখন বাবা-মাকে নিয়ে গল্প করত, তখন সে নীরবে বসে থাকত। তার মনে হতো, এই অভাবের কোনো সমাধান নেই।
কিন্তু একদিন স্কুলে এক অনুষ্ঠানে যখন শিক্ষকেরা তাকে "সেরা শিক্ষার্থী" হিসেবে পুরস্কৃত করলেন, তখন তার মনে হলো, বাবার জন্য সে কিছু একটা করেছে। সে বাড়ি ফিরে মাকে বলল, "মা, আমি বাবার স্বপ্ন পূরণ করব। আমি বড় হব।"
মা মেঘুর মাথায় হাত রেখে বললেন, "তুই যে এত বড় মনের মেয়ে, তোর বাবা জানলে খুব খুশি হতো।"
সেদিন থেকে মেঘুর মনে একটাই প্রতিজ্ঞা: বাবার স্মৃতিকে শক্তি বানিয়ে জীবনে এগিয়ে যাওয়া। বাবার শূন্যতা তাকে আরও শক্ত আর সাহসী করে তুলছিল।
শহরের জীবনে কিছুটা মানিয়ে নেওয়ার পরও মেঘুর আর মায়ের জীবনে আর্থিক সংকট কাটছিল না। মায়ের সেলাইয়ের কাজ থেকে যা আয় হতো, তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মাঝে মাঝে মেঘু দেখত, মা চুপচাপ বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন।
একদিন রাতে মেঘু মায়ের পাশে গিয়ে বসে বলল, "মা, তুমি এত চিন্তা করো কেন? আমি বড় হয়ে অনেক টাকা উপার্জন করব। তখন তুমি আর কাজ করতে হবে না।"
মা মৃদু হেসে বললেন, "মেঘু, তুই তো এখনই আমার সবচেয়ে বড় ভরসা। আমি জানি, তুই একদিন আমাদের সব কষ্ট দূর করবি। কিন্তু তার আগে তো আমাদের এখন টিকে থাকতে হবে।"
মেঘু বোঝে, মায়ের জন্য এই সংগ্রাম কতটা কঠিন। তার মনে একটা তাগিদ আসে—সে এখন থেকেই মাকে সাহায্য করতে চায়। কিন্তু কীভাবে?
একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে মেঘু রাস্তার ধারে এক বাচ্চাকে কাগজের ফুল বিক্রি করতে দেখল। বাচ্চাটির হাসিমুখ দেখে মেঘুর মনে হলো, সেও তো কিছু করতে পারে।
সেদিন রাতে সে মাকে বলল, "মা, আমিও কাজ করতে চাই।"
মা বিস্মিত হয়ে বললেন, "তুই কী বলছিস, মেঘু? তুই তো এখনো অনেক ছোট। তোর কাজ হলো পড়াশোনা করা, আর কিছু না।"
মেঘু জেদ ধরে বলল, "কিন্তু মা, আমি যদি তোমাকে একটু সাহায্য করি, আমাদের জীবন সহজ হবে।"
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "দেখ, মেঘু। কাজ করতে চাও তো একটা শর্ত মানতে হবে। তোর পড়াশোনা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।"
মেঘু উৎসাহ নিয়ে মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেল। এরপর মা তাকে ছোটখাটো কিছু কাজ খুঁজে দিলেন—পড়ালেখার ফাঁকে যা সে করতে পারবে।
এভাবেই শুরু হলো মেঘুর সংগ্রামের নতুন অধ্যায়। নিজের বয়সের তুলনায় সে যেন অনেক বড় হয়ে উঠল। প্রতিদিন স্কুল, বাড়ির কাজ, আর সেই সঙ্গে নিজের ছোটখাটো কাজের মধ্যে দিয়ে সে সময় কাটাতে লাগল। তার মনে শুধু একটাই ইচ্ছা—মায়ের কষ্ট কমানো।
কিন্তু এই পথটা সহজ ছিল না। অনেকেই তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। কেউ কেউ বলত, "এত ছোট বয়সে কাজ করছিস কেন? এটা তো ভুল।"
মেঘু তাদের কথায় পাত্তা দিত না। তার মনে ছিল একটাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা: বাবার দেখানো পথ অনুসরণ করে নিজের আর মায়ের জীবনে পরিবর্তন আনা।
মেঘু ধীরে ধীরে তার ছোট কাজগুলোতে মনোযোগ দিতে শুরু করল। সে মায়ের সাহায্যে কিছু হাতের কাজ শিখে নিল—কাগজের ফুল বানানো, মাটির পুতুল রঙ করা, আর ছোট ছোট সেলাইয়ের কাজ। এগুলো সে বিক্রি করতে শুরু করল।
প্রথম দিন, সে একটা কাগজের ফুলের তোড়া বানিয়ে পাশের দোকানে রেখে এল। দোকানদার বললেন, "তোমার বয়স তো ছোট। এগুলো কে কিনবে?"
মেঘু মৃদু হেসে বলল, "চাচা, আপনার দোকানে যদি জায়গা দেন, একদিন দেখবেন এগুলোই বিক্রি হবে।"
দোকানদার তার আত্মবিশ্বাস দেখে রাজি হলেন। পরদিন বিকেলে দোকানে গিয়ে মেঘু দেখল, তার তোড়াগুলো বিক্রি হয়েছে। দোকানদার বললেন, "তোমার বানানো জিনিস ভালো লেগেছে ক্রেতাদের। আর কয়েকটা নিয়ে এসো।"
মেঘুর মুখে হাসি ফুটল। সে বাড়ি ফিরে মাকে বলল, "মা, দেখো, আমি পারছি! এখন থেকে আমি আরও বানাব।"
মা তাকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, "মেঘু, তুই আমার গর্ব।"
কাজের মধ্যে দিয়েই মেঘু জীবনের প্রথম লড়াইয়ের স্বাদ পেল। সে বুঝতে পারল, ছোট ছোট কাজ করেও নিজের জীবনে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তবে এই লড়াইটা সহজ ছিল না। স্কুলে কয়েকজন সহপাঠী তাকে নিয়ে মজা করত। তারা বলত, "মেঘু তো এখন দোকানদার হয়েছে। বই ছেড়ে ফুল বিক্রি করছে!"
মেঘু প্রথমে মন খারাপ করত। কিন্তু তারপর মনে পড়ত, বাবা বলতেন, "নিজের কাজকে কখনো ছোট ভেবো না। যেটা তুমি মন থেকে করবে, সেটা তোমার জন্য সবচেয়ে বড়।"
এই কথাগুলো তাকে শক্তি দিত। মেঘু সিদ্ধান্ত নিল, কেউ যা-ই বলুক, সে তার পথ থেকে সরবে না। স্কুলে ভালো ফলাফল করবে এবং নিজের কাজ চালিয়ে যাবে।
তার এই দৃঢ় মনোভাব ধীরে ধীরে চারপাশের মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করল। যারা একসময় তাকে অবহেলা করত, তারাই এখন বলত, "মেয়েটা ছোট হলেও কত কিছু করে! একদিন সে অনেক বড় হবে।"
মেঘু জানত, এই প্রশংসাগুলো আসলে তার মায়ের জন্য। তার মা যদি তাকে সাহস না দিতেন, তাহলে এই পথ শুরু করা সম্ভব হতো না। তাই প্রতিদিন রাতে মায়ের সামনে বসে সে তার নতুন নতুন পরিকল্পনার কথা বলত।
মা শুধু হাসিমুখে বলতেন, "তুই যেভাবে এগোচ্ছিস, তোর বাবা তুইকে দেখে খুব গর্বিত হতো।"
মেঘুর নতুন জীবনের পথে যখন ধীরে ধীরে একটু আলোর দেখা মিলছিল, তখনই আবার এক নতুন প্রতিকূলতা এসে হাজির হলো। স্কুলের বেতন সময়মতো দিতে না পারায় একদিন শিক্ষক মেঘুকে ক্লাসের সামনে দাঁড় করালেন।
শিক্ষক বললেন, "মেঘু, তোমার বেতন জমে যাচ্ছে। যদি আগামী সপ্তাহের মধ্যে বেতন না দেওয়া হয়, তবে তোমাকে ক্লাসে বসতে দেওয়া হবে না।"
সারাটা ক্লাস মেঘু মাথা নিচু করে বসে থাকল। সহপাঠীরা ফিসফিস করতে লাগল, "দেখেছ? মেঘুর তো টাকাই নেই।"
মেঘু সেদিন বাড়ি ফিরে কোনো কথা বলল না। মা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "কী হয়েছে, মেঘু? তুই এত চুপচাপ কেন?"
মেঘু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "মা, স্কুলের বেতন দিতে হবে। আর কিছুদিন পর হয়তো আমাকে ক্লাস করতে দেবে না।"
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, "তুই চিন্তা করিস না, মেঘু। আমি কিছু একটা করব।"
মা সেদিন রাতেই সেলাইয়ের কাজের অর্ডার নিতে আরও কয়েকটা বাড়িতে গেলেন। কিন্তু হাতে কাজের সময় বেশি ছিল না। মা কাজ করতে করতে প্রায় ভোর হয়ে গেল।
মেঘু মায়ের ক্লান্ত মুখটা দেখে বলল, "মা, এত কষ্ট করছ কেন? আমি তো স্কুল ছাড়তে রাজি আছি। তুমি এত চাপ নিও না।"
মা মৃদু হাসলেন। বললেন, "তুই কখনোই এভাবে ভাববি না। তোর বাবার স্বপ্ন ছিল তুই বড় হয়ে পড়াশোনা শেষ করবি। আমি তোর বাবার স্বপ্ন ভাঙতে দেব না।"
এই কথাগুলো মেঘুর মনে আরও শক্তি জোগাল। সে নিজেও সিদ্ধান্ত নিল, কিছু না কিছু করে নিজের বেতন নিজে তুলতে হবে।
পরের দিন সে স্কুল থেকে ফিরে আবার কাগজের ফুল বানানো শুরু করল। সে মায়ের কাছ থেকে কয়েকটা পুরনো শাড়ি নিয়ে রঙিন ব্যাগ বানানোর চেষ্টা করল। এসব জিনিস বিক্রি করার জন্য সে কিছু পরিচিত দোকানে গিয়ে কথা বলল।
শহরের মানুষজন তার উদ্যোগ দেখে অবাক হয়ে গেল। কেউ কেউ তার জিনিস কিনে উৎসাহ দিতে লাগল। তার হাতখরচের টাকা দিয়ে ধীরে ধীরে বেতনের টাকা জমতে লাগল।
মেঘুর এই অধ্যবসায় দেখে মা বললেন, "তুই আসলেই বাবার মেয়ে। তোর ভেতরেও তোর বাবার মতো লড়াই করার ক্ষমতা আছে।"
এই ছোট ছোট লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে মেঘু জীবনের সবচেয়ে বড় পাঠ শিখছিল—প্রতিকূলতা যতই আসুক, হাল না ছেড়ে এগিয়ে যেতে হয়। বাবার অনুপস্থিতি তার জীবনে যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, সেই শূন্যতাই যেন তাকে আরও সাহসী আর দায়িত্ববান করে তুলছিল।
মেঘু সবসময়ই অনুভব করত, বাবাকে নিয়ে তার স্মৃতিগুলো যেন ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে। মায়ের কাছে বাবার কথা শুনতে চাইত, কিন্তু মা সবসময় তাকে কাজ আর পড়াশোনায় ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করতেন।
একদিন রাতে মেঘু মাকে বলল, "মা, বাবাকে আমি খুব কম মনে করতে পারি। তার সঙ্গে আমার কোনো স্মৃতিই যেন ঠিকভাবে মনে নেই। তুমিই বলো, বাবা কেমন ছিলেন?"
মা চুপ করে বসে রইলেন। কিছুক্ষণ পর মৃদু গলায় বললেন, "তোর বাবা খুব হাসিখুশি মানুষ ছিলেন। তোর প্রতি তার ভালোবাসার কোনো সীমা ছিল না। তুই যখন ছোট ছিলি, তখন বাবার হাত ধরে হাঁটতে গিয়ে বারবার পড়ে যেতি। আর তোর বাবা প্রতিবার তোকে উঠিয়ে বলত, 'পড়ে গেলে কী হয়েছে? উঠে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় কাজ।'"
মায়ের কথায় মেঘুর চোখে জল চলে এল। সে বলল, "মা, বাবা আমাকে কেন এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে চলে গেল?"
মা জবাব দিলেন না। শুধু বললেন, "তোর বাবা আজ নেই, কিন্তু তার দেখানো পথ তো তোর সামনে রয়ে গেছে। তুই যদি শক্ত থাকিস, তাহলে তোর বাবার অস্তিত্ব তোর মধ্যে সবসময় বেঁচে থাকবে।"
মেঘু সেদিন রাতে বাবার পুরোনো একটা ছবি নিয়ে বসে রইল। ছবিতে বাবার মৃদু হাসি যেন তাকে আশ্বস্ত করছিল। তার মনে হলো, বাবার এই হাসিটাই তাকে সাহস যোগাচ্ছে।
পরের দিন সকালে মেঘু একটা নতুন সিদ্ধান্ত নিল। সে বাবার মতোই মায়ের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করবে। পড়াশোনা, কাজ—সবকিছু সমানভাবে চালিয়ে যাবে।
এমন সময় একদিন স্কুলের লাইব্রেরিতে সে "জীবন সংগ্রামের গল্প" নামে একটা বই পেল। বইয়ের প্রতিটা পাতায় সে নিজেকে খুঁজে পেল। বইয়ের মূল চরিত্রও বাবাকে হারিয়ে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছিল।
বইটা পড়ে মেঘুর মনে নতুন অনুপ্রেরণা এলো। সে বুঝতে পারল, জীবনের প্রতিটা লড়াই আসলে তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে। তার বাবার মতোই সে একদিন অন্যদের জন্য একটা উদাহরণ হবে।
বাবার স্মৃতি আর নতুন পাওয়া অনুপ্রেরণা নিয়ে মেঘু যেন আরও শক্তভাবে নিজের জীবনের পথে এগিয়ে যেতে শুরু করল। বাবার নামকে সম্মান জানিয়ে সে প্রতিটা কাজ করত আরও ভালোভাবে, যেন তার জীবনের প্রতিটা সফলতা বাবার জন্য উৎসর্গিত হয়।
মেঘু যখন ধীরে ধীরে নিজের জীবনের ভার সামলাতে শিখে গিয়েছিল, তখনই সমাজের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলো। আশপাশের মানুষজন মেঘু আর তার মাকে নিয়ে নানা কথা বলতে শুরু করল।
একদিন পাশের বাসার এক মহিলা মায়ের কাছে এসে বললেন, "আপনার মেয়ে তো এখন স্কুলের পাশাপাশি কাজও করে। মেয়ে বড় হচ্ছে, এসব ভালো দেখায় না।"
মা মৃদু হেসে বললেন, "আমার মেয়ে যা করছে, সেটা নিজের জীবন গড়ার জন্য। আমরা অন্য কারো কথা ভাবার সময় পাই না।"
মহিলা চটে গিয়ে বললেন, "তাহলে ভবিষ্যতে দেখবেন, এই মেয়েকে নিয়ে কত কথা হবে। বাবা ছাড়া মেয়ে, কেউ তাকে ভালোভাবে নেবে না।"
মেঘু ভেতর থেকে কথাগুলো শুনতে পেল। তার মনে খুব কষ্ট হলো। সে মায়ের কাছে গিয়ে বলল, "মা, এরা কেন আমাদের নিয়ে এত কথা বলে? আমরা তো কাউকে ক্ষতি করিনি।"
মা তার মাথায় হাত রেখে বললেন, "মেঘু, এই সমাজ সবসময় মেয়েদের ছোট করে দেখতে চায়। আর যদি বাবা না থাকে, তাহলে তো কথার শেষ নেই। কিন্তু আমরা জানি, আমরা কী করছি। তাই এসব কথায় কান দেওয়ার দরকার নেই।"
মায়ের কথা শুনে মেঘু কিছুটা শান্ত হলো। কিন্তু পরের দিন স্কুলে সে আরও বড় একটা ধাক্কা খেল। ক্লাসের এক ছাত্রী তাকে দেখে বলল, "তোর তো বাবা নেই। তুই কীভাবে এত আত্মবিশ্বাসী থাকিস? আমি হলে তো লজ্জায় কাউকে দেখাতেই পারতাম না।"
মেঘু শক্ত গলায় বলল, "বাবা নেই বলে আমি অন্যদের থেকে ছোট নই। বরং আমি যা অর্জন করেছি, সেটা আমার নিজের পরিশ্রমে। আমি গর্বিত, আমি আমার মায়ের মতো শক্তিশালী।"
তার এই কথা শুনে কিছু সহপাঠী অবাক হয়ে চুপ করে গেল। কিন্তু মেঘুর মন আবার ভারী হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, সমাজের চোখে বাবার অভাব তার পরিচয়ের একটা বড় অংশ।
সেদিন রাতে মেঘু নিজের মনের ভেতর প্রতিজ্ঞা করল—এই সমাজের ধারায় ভেসে যাবে না। সে এমন কিছু করবে, যাতে তার পরিচয় হবে তার নিজের যোগ্যতায়, বাবার অনুপস্থিতি দিয়ে নয়।
এভাবেই মেঘু নিজেকে আরও দৃঢ় করতে লাগল। সমাজের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য উপেক্ষা করে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করল। বাবার অনুপ্রেরণাই ছিল তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
সমাজের বাঁধা আর মানুষের তির্যক মন্তব্য মেঘুকে ভেঙে দিতে পারেনি। বরং প্রতিটা অবজ্ঞা তাকে আরও জেদি আর আত্মবিশ্বাসী করে তুলছিল। সে ভেতরে ভেতরে একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল—যে কাজেই হাত দেবে, সেটা এমনভাবে করবে, যেন সবাই তাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
একদিন স্কুলে বার্ষিক প্রদর্শনী আয়োজন করা হলো। এই প্রদর্শনীতে ছাত্রছাত্রীরা তাদের তৈরি জিনিসপত্র প্রদর্শন করবে। শিক্ষকরা ঘোষণা দিলেন, যার প্রদর্শনী সবচেয়ে ভালো হবে, তাকে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হবে।
মেঘুর ভেতরে একটা আগ্রহ জাগল। সে মনে মনে ভাবল, "এটাই আমার সুযোগ। আমি যদি এখানে ভালো কিছু করতে পারি, তাহলে সবাই আমার প্রতিভা দেখতে পাবে। আর মায়ের মুখেও হাসি ফোটাতে পারব।"
সে প্রদর্শনীর জন্য একটি প্রজেক্ট বানানোর সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু কী নিয়ে কাজ করবে, তা ঠিক করতে পারছিল না। তখন তার মাথায় একটা ভাবনা এল—সে এমন কিছু বানাবে, যা পরিবেশবান্ধব এবং সাধারণ মানুষের উপকারে আসবে।
মেঘু পুরনো কাগজ, মাটির পাত্র আর কাপড় ব্যবহার করে ছোট ছোট খেলনা ও ঘরের কাজে ব্যবহৃত জিনিস বানাতে শুরু করল। মা তাকে সাহায্য করছিলেন। মা বললেন, "তুই এটা বানিয়ে অন্যদের দেখিয়ে দে, আমাদের অবস্থাও কিছু করতে পারে।"
প্রদর্শনীর দিন মেঘুর স্টল সবার নজর কাড়ল। তার বানানো খেলনা আর পাত্রগুলো দেখে শিক্ষক ও অভিভাবকরা খুব প্রশংসা করলেন। মেঘুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক তার কাজ দেখে বললেন, "মেঘু, তোমার মতো সৃজনশীল মেয়ে খুব কম দেখা যায়। তুমি আমাদের স্কুলের গর্ব।"
মেঘু জীবনে প্রথমবারের মতো নিজের কাজের জন্য এত বড় প্রশংসা পেল। তার চোখে আনন্দের জল এসে গেল। পুরস্কার হিসেবে সে স্কুলের সেরা ছাত্রীর সম্মাননা পেল।
সেদিন সে মায়ের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, "মা, দেখো, আজ সবাই আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর এটাই আমার শুরু। আমি একদিন তোমার স্বপ্ন পূরণ করব।"
মা তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "তোর বাবা যদি আজ বেঁচে থাকত, সে তোর জন্য খুব গর্ব করত। কিন্তু মনে রাখিস, এই লড়াইটা আরও কঠিন হবে। তুই কখনো হাল ছাড়বি না।"
মেঘু প্রতিজ্ঞা করল, সে মায়ের কথামতো তার যাত্রা চালিয়ে যাবে। বাবার অভাব তাকে পিছিয়ে দিতে পারেনি, বরং সেই অভাবই তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগাচ্ছিল।
স্কুলের প্রদর্শনীতে সফল হওয়ার পর মেঘুর প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা বদলাতে শুরু করল। আগে যারা তার জীবনসংগ্রামকে উপহাস করত, তারাই এখন বলত, "মেয়েটা নিজের যোগ্যতায় উঠে দাঁড়াচ্ছে।" কিন্তু প্রশংসার পাশাপাশি তার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
স্কুলের পড়াশোনার চাপ বাড়ছিল। আর মায়ের কাজের বোঝাও দিনে দিনে বেশি হচ্ছিল। মা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন, কিন্তু মেঘুকে বলতেন না। একদিন মেঘু মায়ের ক্লান্ত মুখ দেখে জিজ্ঞেস করল, "মা, তুমি কী এতটা অসুস্থ? আমাকে কেন বলছ না?"
মা মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, "আমি ঠিক আছি, মেঘু। তুই শুধু পড়াশোনায় মন দে।"
কিন্তু মেঘু মায়ের কথায় বিশ্বাস করল না। সে জানত, মায়ের অসুস্থতা দিন দিন বাড়ছে। তাকে কিছু একটা করতে হবে। সে মায়ের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল।
পরদিন স্কুল থেকে ফিরে সে তার বানানো জিনিস নিয়ে বাজারে গেল। কয়েকটা নতুন দোকানে গিয়ে জিনিস দেখাল। অনেক দোকানদার তাকে ফিরিয়ে দিলেন, কেউ কেউ মজার ছলে বললেন, "মেয়েটা ছোট, এটা কি কোনো কাজের জিনিস?"
কিন্তু এক দোকানদার তার কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে বললেন, "তোমার বানানো খেলনা আর পাত্রগুলো পরিবেশবান্ধব। এগুলো মানুষ পছন্দ করবে। তোমাকে নিয়মিত আমাদের দোকানে জিনিস দিতে হবে।"
মেঘু বাড়ি ফিরে মাকে খবরটা জানাল। মা বললেন, "তুই এত কিছু করছিস, কিন্তু নিজের পড়াশোনার ক্ষতি করবি না। তুই তোর স্বপ্ন পূরণ কর, আমি তোর পাশেই আছি।"
কিন্তু মেঘু জানত, মা আর একা সব সামলাতে পারছেন না। পড়াশোনা চালানোর পাশাপাশি কাজ চালিয়ে যাওয়া যে কতটা কঠিন হবে, তা সে বুঝতে পারছিল।
একদিন মেঘু মায়ের কাছে গিয়ে বলল, "মা, আমি পড়াশোনা ছাড়ব না, কিন্তু কাজটা আরও সিরিয়াসলি করব। তুমি আমাকে অনুমতি দাও।"
মা তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "মেঘু, তুই যা করছিস, সেটা নিজের ইচ্ছায় কর। তোর বাবা যদি আজ থাকত, তোর প্রতিটা সিদ্ধান্তে তারও সম্মতি থাকত।"
মেঘু জানত, এই সিদ্ধান্ত তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। সে পড়াশোনা আর কাজকে একসঙ্গে সামলে জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেকে আরও শক্ত করে তুলল।
মেঘু তার সিদ্ধান্তের পর জীবনকে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করল। সে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের কাজকে আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করতে শিখল। সকালে স্কুলে যেত, আর বিকেলে কাজ করত। মায়ের জন্য রান্না করত, আর রাতে বসে পড়ত।
তবে এই নতুন সূচনায় এক বড় বাঁধা এল, যখন স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার ফরম ফিলাপের সময় হলো। পরীক্ষার ফি দেওয়ার মতো টাকা মেঘুর কাছে ছিল না। মা খুব চেষ্টা করলেন, কিন্তু সেলাইয়ের কাজ থেকে যথেষ্ট টাকা আসেনি।
মেঘু মায়ের চিন্তিত মুখ দেখে চুপচাপ রইল। পরদিন সকালে সে নিজের বানানো জিনিসপত্র নিয়ে স্থানীয় একটি বড় দোকানে গেল। দোকানের মালিক তার কাজ দেখে বললেন, "তোমার এই জিনিসগুলো খুব ভালো। আমি এগুলো bulk-এ কিনে নেব, যদি তুমি নিয়মিত সরবরাহ করতে পারো।"
মেঘু এত বড় সুযোগ পেয়ে খুশি হয়ে গেল। দোকানদারের দেওয়া অগ্রিম টাকায় সে তার পরীক্ষার ফি জমা করল। যখন মা জানতে পারলেন, তখন তার চোখে জল চলে এলো। তিনি বললেন, "মেঘু, তুই সত্যি আমার গর্ব। তোর এই চেষ্টা আমাকে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।"
পরীক্ষার সময় মেঘু তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করল। রাতে কাজ করে ক্লান্ত হলেও সে কখনো পড়াশোনায় ছাড় দেয়নি। ফল প্রকাশের দিন মেঘু স্কুলে গিয়ে জানতে পারল, সে শুধু পাশ করেনি, বরং পুরো স্কুলে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে।
মেঘুর এই সাফল্যে পুরো স্কুল তার প্রশংসা করল। প্রধান শিক্ষক বললেন, "মেঘু, তুমি আমাদের প্রেরণা। বাবা ছাড়া তুমি যে এতদূর এসে পৌঁছেছ, এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।"
মেঘুর সাফল্য শুধু তার নিজের ছিল না, এটি ছিল তার মায়ের, তার বাবার এবং তাদের সম্মিলিত লড়াইয়ের প্রতিফলন। সেদিন মেঘু মায়ের কাছে গিয়ে বলল, "মা, আমি বাবার স্বপ্ন পূরণ করব। আমি আরও বড় হতে চাই, যেন কেউ আর আমাদের ছোট করে না দেখে।"
মা মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, "তুই যে আজ এতদূর এসেছিস, সেটাই তো তোর বাবার স্বপ্নের শুরু। তুই যা কিছু করবি, মনে রাখবি, তোর মায়ের দোয়া আর বাবার আশীর্বাদ সবসময় তোর সঙ্গে আছে।"
এভাবেই মেঘুর জীবনে এক নতুন সূচনা হলো। বাবার অনুপস্থিতি তাকে শক্তি জোগাল, মায়ের সাহচর্য তাকে পথ দেখাল। আর নিজের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সে জীবনের প্রতিটা বাধা অতিক্রম করতে শিখল।
মেঘুর জীবন এখন এক নতুন গতিতে চলছে। পড়াশোনা এবং কাজের মধ্যে সমন্বয় করে সে আগের চেয়ে আরও দৃঢ় হয়ে উঠেছে। স্কুলের শেষ বর্ষে সে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিল—কলেজে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে নিজের অবস্থান আরও মজবুত করবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। মায়ের সামান্য উপার্জন থেকে তার পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ছিল। একদিন রাতে মা তাকে বললেন, "মেঘু, তোর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে তুই নিজের মতো করে একটা পথ খুঁজে নে। আমি তোকে সবসময় সমর্থন করব, কিন্তু খরচ চালানোর জন্য হয়তো আরও কাজ করতে হবে।"
মেঘু মায়ের কথা শুনে সেদিন গভীরভাবে চিন্তা করল। সে বুঝতে পারল, তাকে এখন নিজের দায়িত্ব আরও বাড়াতে হবে। পরদিন সকালে সে স্থানীয় একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গেল। সেখানকার প্রশিক্ষক তাকে বললেন, "তুমি যদি কম্পিউটার চালানো শিখতে চাও, তবে কিছুটা খরচ লাগবে। তবে ভালো শিখতে পারলে তোমার কাজের সুযোগ হবে।"
মেঘু প্রশিক্ষকের প্রস্তাব মেনে নিল। সে দিনের বেলা পড়াশোনা করত, সন্ধ্যায় কাজ করত, আর রাতে কম্পিউটার শিখতে যেত। ধীরে ধীরে তার দক্ষতা বাড়তে লাগল।
কয়েক মাস পর, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সনদপত্র পাওয়ার সময় এল। প্রশিক্ষক বললেন, "তুমি এত ভালো শিখেছ যে আমাদের এখানে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতে পারো। এতে তোমার উপার্জনও হবে, আর তোমার পড়াশোনার খরচ সহজ হবে।"
মেঘু এই সুযোগ লুফে নিল। সে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করল এবং সেখান থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কলেজে ভর্তি হল। তার মায়ের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর মেঘুর জীবন আরও ব্যস্ত হয়ে উঠল। সকালে কলেজে ক্লাস করত, বিকেলে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিত, আর রাতে পড়াশোনা করত। এই কঠিন রুটিনেও সে নিজের স্বপ্ন পূরণে অবিচল ছিল। কিন্তু নতুন পরিবেশে তাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হলো।
কলেজে অনেক সহপাঠী ছিল যারা মেঘুকে অবজ্ঞার চোখে দেখত। তারা বলত, "বাবা ছাড়া মেয়ে, কেমন করে এত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে? আমাদের মতো পরিবারের মেয়েরা যেখানে সহজে সুযোগ পায়, ওর মতো একটা মেয়ের এত বড় স্বপ্ন দেখা মানায় না।"
মেঘু এসব কথায় মনোযোগ দিত না। বরং নিজের কাজে আরও মনোযোগী হয়ে উঠত। কিন্তু একদিন এক ক্লাসমেট তার সামনে এসে সরাসরি বলল, "তুমি তো ক্লাসে ভালো করছ, কিন্তু জানো কি, আমাদের সমাজে এমন মেয়ে কখনো বড় কিছু করতে পারে না। তোমার মতো মেয়েদের জন্য এই দুনিয়ায় জায়গা খুবই সীমিত।"
মেঘু এই কথায় ক্ষুব্ধ না হয়ে শান্ত গলায় বলল, "আমি জানি, আমাদের সমাজের সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যে এগিয়ে যেতে পারে, সে-ই আসলে বড় হয়। আর আমার সাফল্য আমার নিজের চেষ্টার ওপর নির্ভর করে, কারও অনুমতির ওপর নয়।"
তার জবাবে সেই ছেলেটি চুপ করে গেল। কিন্তু মেঘু জানত, সমাজের এই মানসিকতা তাকে বারবার বাধা দেবে।
তবে এসব বাধা তাকে দমাতে পারেনি। বরং তার ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছিল। ক্লাসের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করায় শিক্ষকরাও তার প্রশংসা করতে লাগলেন। প্রধান শিক্ষক একদিন তাকে বললেন, "তোমার সংগ্রাম আর সাফল্য আমাদের কাছে অনুপ্রেরণা। তোমার মতো মেয়েদেরই সমাজ বদলানোর ক্ষমতা আছে।"
এই কথাগুলো মেঘুর মনে নতুন আশা জাগাল। সে বুঝতে পারল, সমাজের নেতিবাচক মনোভাবের চেয়েও বড় তার নিজের লক্ষ্য আর তার বাবা-মায়ের স্বপ্ন। এই চ্যালেঞ্জগুলোকেই সে সাফল্যের সিঁড়ি বানাবে।
কলেজে পড়াশোনা চলাকালীন একদিন মেঘু জানতে পারল, একটি আন্তঃকলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। বিতর্কের বিষয় ছিল, "প্রতিবন্ধকতা জীবনের সেরা শিক্ষক।" বিষয়টি মেঘুর মনে গভীরভাবে নাড়া দিল। সে মনে করল, এই প্রতিযোগিতা তার জীবনের সংগ্রামকে প্রকাশ করার একটা সুযোগ।
মেঘু কলেজের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণ করার জন্য নাম দিল। অনেকেই বলল, "তুমি কি পারবে এত বড় মঞ্চে নিজের কথা তুলে ধরতে? যারা বিতর্কে অভিজ্ঞ, তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সহজ নয়।"
মেঘু মৃদু হেসে বলল, "আমার জীবনে যা শিখেছি, সেটা অন্যদের মতো অভিজ্ঞতা থেকে নয়, সংগ্রাম আর বাস্তবতা থেকে। আমি চেষ্টা করব।"
প্রতিযোগিতার দিন এসে গেল। প্রতিটি প্রতিযোগী তাদের যুক্তি উপস্থাপন করছিল। মেঘু ধীর ও আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলল, "জীবনের প্রতিকূলতাই আমাদের প্রকৃত শিক্ষক। আমি বাবাকে হারিয়েছি ছোটবেলায়। সেই শূন্যতা আমার চারপাশে এক অন্ধকার তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই অন্ধকারেই আমি আলোর সন্ধান পেয়েছি। শিখেছি কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়। সমাজের বাঁধা আমাকে থামাতে পারেনি, বরং এগিয়ে যেতে শিখিয়েছে। আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করছি যে প্রতিবন্ধকতাই জীবনের সেরা শক্তি।"
তার বক্তব্য শুনে পুরো হলরুম মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বিচারকরা মুগ্ধ হয়ে গেলেন তার যুক্তি ও অনুভূতির গভীরতায়।
বিচারকদের ঘোষণায় জানা গেল, মেঘু প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। তার কলেজের শিক্ষক ও সহপাঠীরা উল্লাসে ফেটে পড়ল। সবার প্রশংসা আর অভিনন্দনে মেঘুর চোখে জল চলে এলো। সে ভাবল, "বাবা আজ বেঁচে থাকলে এই সাফল্য দেখে কত খুশি হতেন!"
সেদিন মেঘু বাড়ি ফিরে মাকে বলল, "মা, তোমার আর বাবার স্বপ্ন পূরণ করার পথে আমি আরেক ধাপ এগোলাম। আমি থামব না। যত বাধা আসুক, আমি লড়াই চালিয়ে যাব।"
মা তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "তুই আমার গর্ব, মেঘু। তুই দেখিয়ে দিচ্ছিস, মেয়েরা চাইলে সবকিছু করতে পারে।"
সেই প্রতিযোগিতা মেঘুর জীবনে নতুন দিগন্তের দরজা খুলে দিল। তার আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল, আর সে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।
বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সাফল্য পাওয়ার পর মেঘু আরও পরিচিত হয়ে উঠল। কলেজের শিক্ষকরা তার প্রতিভা ও আত্মবিশ্বাসের প্রশংসা করছিলেন। একদিন প্রধান শিক্ষক তাকে ডেকে বললেন, "মেঘু, তোমার প্রতিভা ও আত্মবিশ্বাস দেখে আমরা গর্বিত। শহরে একটি বড় সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা তাদের ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প শেয়ার করবে। আমি চাই, তুমি আমাদের কলেজের প্রতিনিধি হয়ে সেখানে অংশগ্রহণ কর।"
মেঘু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এত বড় মঞ্চে নিজের কথা বলার কথা ভেবে তার বুক কাঁপছিল। কিন্তু সে বুঝতে পারল, এই সুযোগ তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় হতে পারে। মেঘু স্যারকে সম্মতি জানাল।
সম্মেলনের দিন, শহরের বড় এক মিলনায়তনে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা প্রতিভাবান ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মেঘুর দেখা হলো। সবাই তাদের সংগ্রামের গল্প শেয়ার করছিল। মেঘু মঞ্চে উঠে তার জীবনের কথা বলল, "আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা ছিল আমার বাবার অনুপস্থিতি। কিন্তু সেই শূন্যতাই আমাকে লড়াই করতে শিখিয়েছে। বাবার অভাব আমাকে কখনো থামাতে পারেনি, বরং আরও শক্ত করে জীবনকে আঁকড়ে ধরতে শিখিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের জীবনযুদ্ধে সংগ্রামই আমাদের আসল শিক্ষক।"
তার এই বক্তব্য সবাইকে নাড়া দিয়ে গেল। অনুষ্ঠানের শেষে আয়োজকরা ঘোষণা করলেন, "মেঘু, তোমার গল্প আমাদের হৃদয় ছুঁয়েছে। আমরা চাই তোমার পড়াশোনার দায়িত্ব আমরা বহন করব। তোমার সাফল্যের পথে আর কোনো বাধা যেন না আসে।"
মেঘু এই কথাগুলো শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে গেল। সে ভাবল, "আজ বাবা থাকলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হতেন। এই সাফল্য বাবার জন্যই উৎসর্গ করব।"
বাড়ি ফিরে মা যখন সব শুনলেন, তখন তার চোখে জল এসে গেল। তিনি মেঘুকে বললেন, "তুই যা করেছিস, সেটা তোর বাবার কাছে সবচেয়ে বড় প্রার্থনা। তুই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।"
সেই সম্মেলনের পর থেকে মেঘুর পথ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নতুন সুযোগ ও স্বীকৃতি তার জীবনে এক নতুন আশা নিয়ে এল।
সম্মেলনের সাফল্যের পর মেঘুর জীবন যেন একটি নতুন মোড় নিল। শহরের বিভিন্ন কলেজ ও প্রতিষ্ঠান তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করল। তাকে বক্তৃতার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো। প্রতিটি জায়গায় মেঘু নিজের সংগ্রামের গল্প বলত, আর সেটা শোনার পর অনেকেই অনুপ্রাণিত হতো।
একদিন, একটি সেমিনারে মেঘু কথা বলার পর এক উদ্যোক্তা তার কাছে এসে বললেন, "তোমার জীবনসংগ্রাম আর প্রতিভা দেখে আমি মুগ্ধ। আমাদের প্রতিষ্ঠান পরিবেশবান্ধব পণ্য নিয়ে কাজ করে। আমরা চাই তুমি আমাদের সঙ্গে যুক্ত হও। তোমার কাজ আমাদের ব্যবসার নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।"
মেঘু একটু ভেবে সম্মতি জানাল। তার শৈশবে বানানো খেলনা আর হাতের কাজের পণ্যগুলো এখন আরও পরিপক্কভাবে তৈরি হচ্ছিল। উদ্যোক্তা তার এই কাজকে নতুন মাত্রা দিতে সাহায্য করলেন।
ধীরে ধীরে মেঘুর তৈরি পণ্য শহরের বাজারে পরিচিতি পেতে শুরু করল। সেই সঙ্গে তার পড়াশোনাও চলছিল। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাকে বৃত্তি দিতে শুরু করল। মেঘু আর্থিক চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি পেল।
কিন্তু এই সাফল্যের মাঝেও তার একটাই লক্ষ্য ছিল—নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সে চেয়েছিল, সমাজে এমন অবস্থান তৈরি করতে, যেখানে আর কেউ তাকে "বাবাহীন মেয়ে" বলে অবজ্ঞা করবে না।
একদিন একটি বড় শিল্প প্রদর্শনীর জন্য তার প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে মনোনীত করা হলো। সেখানে সে তার কাজ প্রদর্শন করল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজন বিদেশি উদ্যোক্তা মেঘুর কাজ দেখে বললেন, "তোমার কাজ শুধু সৃজনশীল নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও অনন্য। আমি চাই তোমার এই পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যেতে।"
মেঘুর চোখে সেই দিন ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের মুহূর্ত। রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত হয়ে মেঘু ভীষণ খুশি। মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন মেঘু পুরস্কার গ্রহণ করছিল, তখন মনে মনে বলছিল, "বাবা, আজ তোমার স্বপ্ন পূরণ হলো। মা, আমি তোমার মুখে হাসি দেখতে চাই।"
অনুষ্ঠান শেষে মেঘু দ্রুত বাসায় ফিরতে চাইছিল। এতদিনের সংগ্রামের সাফল্যের কথা মাকে সরাসরি বলতে চাইছিল। টেলিভিশনে পুরস্কার গ্রহণের মুহূর্ত দেখতে না পেলে মাকে ফোন করে জানিয়েছিল, "মা, আমি পুরস্কার পেয়েছি! তুমি গর্বিত তো?"
মা তখন শান্ত গলায় বলেছিলেন, "আমি সব সময়ই গর্বিত, মেঘু। তুই আমার জীবনের আলো।"
এই কথাগুলো মেঘুর মনের মধ্যে বারবার ঘুরছিল। সে বাসার দরজায় পা দিয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, "মা! আমি এসেছি। সব বলব তোমাকে। তুমি কোথায়?"
কিন্তু কোনো সাড়া পেল না। ঘরে ঢুকে দেখল, মা বিছানায় শুয়ে আছেন। মেঘু কাছে গিয়ে দেখল, মায়ের মুখে শান্তির হাসি। কিন্তু তার শরীর নিস্তব্ধ।
মেঘুর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে এলো। সে মায়ের কাঁধে হাত রেখে ডাকল, "মা! উঠে বসো। আমি তোমার কাছে এত বড় খবর নিয়ে এসেছি। মা!"
কিন্তু মা আর কোনো সাড়া দিলেন না। মেঘু বুঝতে পারল, মা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন।
তার মনে হলো, পৃথিবীটা হঠাৎ করে শূন্য হয়ে গেল। বাবা চলে যাওয়ার দিনটি আবার মনে পড়ে গেল। মেঘু ঘরের মেঝেতে ধপাস করে বসে পড়ল, তার চোখ দিয়ে অশ্রুধারা নেমে এলো।
তবে কাঁদতে কাঁদতে সে ভাবল, "মা সব সময় বলত, শক্ত থাকতে। বাবা-মা দুজনেই আমার জন্য যা যা করেছেন, তার ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না। কিন্তু আমি তাদের স্মৃতি আর স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখব। তারা আমাকে যোদ্ধা হতে শিখিয়েছে। আমি লড়াই চালিয়ে যাব।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now