বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কোথাও কেউ নেই (৪)

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (০ পয়েন্ট)



X ০৪. পাল বাবু অবাক হয়ে বললেন পাল বাবু অবাক হয়ে বললেন, এ কি অবস্থা ম্যাডাম! মুনা বলল, ক’দিন খুব ভুগলাম। টনসিলাইটিস। আপনার ভাল তো? ভালই। তিন দিনের জ্বরে কারো এমন অবস্থা হয় জানতাম না। আপনার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। গেছো পেত্নীর মত লাগছে। রাগ করলেন নাকি? মুনা রাগ করল না, তবে বিরক্ত হল। পাল বাবু বড় বিরক্ত করতে পারেন। মেয়েদের টেবিল বেছে বেছে বসবেন, সামান্য জিনিস নিয়ে বকবক করে মাথা ধরিয়ে দেবেন। আপনার ভাবী স্বামী এসেছিলেন। তারও দেখলাম মুখ শুকনো। সিক লিভের দরখাস্ত করেছেন শুনে মুখ আরো শুকিয়ে গেল। উনি গিয়েছিলেন নাকি আপনাদের ওখানে? না যায়নি। সেটাই ভাল, ঘন ঘন শ্বশুর বাড়ি যাওয়া ভাল না। এই আমাকে দেখেন, প্রতি বৃহস্পতিবার শ্বশুরবাড়ি যাই–শুক্র, শনি দু’দিন থাকি। এতে লাভটা কী হয়েছে জানেন? শ্বশুরবাড়িতে প্রেস্টিজ আমার কিছুই নেই। মুনা শুকনো গলায় বলল, তাই নাকি? হ্যাঁ। গত সপ্তাহে শ্বশুরমশাই আমাকে বললেন, বাবা রেশনটা একটু তুলে দিতে পারবে? চিন্তা করেন অবস্থা, জামাইকে বলছে রেশন তুলতে। মুনা সবচেয়ে উপরের ফাইলটা খুলল। দশটা এখনো বাজেনি। অফিস ফাঁকা। ইলিয়াস সাহেব আর আখতারুজ্জামান সাহেব এসেছেন। ওদের টেবিল ঘরের শেষ প্রান্তে। মুনার সঙ্গে তাদের তেমন আলাপ নেই। তবু আখতারুজ্জামান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন–শরীর ঠিক হয়েছে? খুব কাহিল হয়েছে দেখি। মুনা বলল, আপনার ভাল ছিলেন সবাই? বলেই মনে হল কথাটা খুব মেয়েলি হয়ে গেল। তিন দিন পর এসেই আপনার ভাল ছিলেন সবাই জিজ্ঞেস করাটা আদিখ্যেতার মত। কী হয়েছিল। আপনার, ফু? মুনা জবাব দেবার আগেই পাল বাবু বললেন ম্যাডামের হয়েছে টনসিলের ব্যারাম, হা হা হা। কিছু কিছু লোক থাকেন এমন বিশ্ৰী স্বভাবের। পাল বাবুর মত আরেকজন আছে সিদ্দিক সাহেব। সব সময় গলা নিচু করে এমন ভাবে কথা বলবেন যেন মনে হয় ষড়যন্ত্র করছেন। ম্যাচের কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাবেন এবং কাঠিগুলো টেবিলের ওপর ফেলে রেখে যাবেন। অসহ্য। বড় সাহেবের বেয়ারা মুনির এসে বলল, আপনারে স্যার ডাকে। পাল বাবু ভ্রূ কুঁচকে বললেন, অফিস তো এখন শুরু হয় নাই, এখনই কিসের ডাকাডাকি? যাও, বল দশ মিনিট পরে আসবে। না না ম্যাডাম, ডাকা মাত্রই ছুটে যাওয়া ঠিক না। বসেন চা খান, তারপর যান। চায়ের কথা বলে এসেছি। চা তো আমি বেশি খাই না। আরে খান না। খাওয়ার পর একটা পান খান, মাইল্ড একটা জর্দা আছে। মুর্শিদাবাদ থেকে আমার এক মামা-শ্বশুর পাঠিয়েছেন। মুনাদের অফিসের বড় সাহেব লোকটি ছোটখাটো। বালক বালক চেহারা কিন্তু লোকটি কাজ জানে এবং কাজ করতেও পারে। কাজ জানা সমস্ত মানুষদের মত সেও অফিসের খুব অপ্রিয়। তার নামে নানান রকম গুজব ও আছে। টিফিন টাইমে সে নাকি মেয়েদের ঘরে ডেকে নিয়ে যায়। এবং কাজের প্রশংসা করবার ছলে পিঠ চাপরায় কিংবা হাত ধরে। একবার নাকি ডিসপ্যাস সেশনের নিনু খানের ব্লাউজ খুলে ফেলেছিল। বিরাট কেলেংকারি। মুনির সেই সময় চা নিয়ে ঢুকেছিল বলে তার চাকরি যায় যায় অবস্থা। মুনার সঙ্গে এরকম কিছু এখন পর্যন্ত ঘটেনি। তবু যতবারই সে বড় সাহেবের ঘরে ঢোকে ততবারই দারুণ অস্বস্তি ভোগ করে। আজও সে ঢুকাল ভয়ে ভয়ে। ইসরাইল সাহেব তীক্ষ্ণ চোখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, খুব কাহিল হয়েছে তো? জি স্যার। টনসিল ফুলে গিয়েছিল। ভালমত চিকিৎসা করান। কেটে ফেলে দিন। নয়ত রেগুলার অফিস কামাই হবে। গত তিন মাসে আপনি নয় দিন ছিলেন সিক লিভে। ফাইলটা সেদিন দেখলাম। মুনা কিছু বলল না। ইসরাইল সাহেব গম্ভীর স্বরে বললেন, বসুন দাঁড়িয়ে আছেন কেন? মুনা আড়ষ্ট হয়ে সামনের একটি চেয়ারে বসল। ইসরাইল সাহেব থেমে থেমে বললেন, না দেখে চিঠিতে সই করেন কেন? টাইপিস্টরা ভুল করেই। কাজেই এদের টাইপ করা প্রতিটি শব্দ চেক করতে হয়। বিশেষ করে ফিগারগুলো মুনা ঠিক বুঝতে পারল না ঝামেলাটা কি। বড় রকমের কিছু হওয়ার কথা না। সে চিঠিপত্র দেখেই সই করে। এনকো কর্পোরেশনের কাছে লেখা চিঠিতে স্পষ্ট লেখা হয়েছে এগার হাজার নয়শ ছত্ৰিশ। একচুয়েল ফিগার হবে এগার হাজার ছয়শ ছত্রিশ। কমন মিসটেক, ছয় হয়েছে নয়। আমি জাস্ট আউট অব কিউরিওসিটি ফাইলটা আনিয়ে দেখি এই ব্যাপার। মুনা সাবধানে একটি নিঃশ্বাস ফেলল। ইসরাইল সাহেব বললেন, এর জন্যেই ডেকেছিলাম, যান। স্নামালিকুম স্যার। ওয়ালাইকুম সালাম। শুনুন, আপনার শরীর বেশি খারাপ মনে হচ্ছে। আজ দিনটা বরং রেস্ট দিন। ঘণ্টা খানিক থেকে ফাইলপত্র অন্য কাউকে বুঝিয়ে দিয়ে চলে যান। মুনা থ্যাংক ইউ বলতে গিয়েও বলতে পারল না। এই লোকটির সামনে সে ঠিক সহজ হতে পারে না। মুনা ক্ষীণ স্বরে বলল, স্যার যাই। ঠিক আছে যান। তারেক সাহেব থাকলে একটু পাঠিয়ে দেবেন। জি আচ্ছা স্যার। ঘণ্টা খানিক থেকে চলে যেতে বললেও মুনা লাঞ্চ ব্রেক পর্যন্ত থাকল। জমে থাকা কাজগুলি নিখুঁতভাবে করতে চেষ্টা করল। মাথা হালকা হয়ে আছে। খুব মন দিয়ে কিছু পড়তে গেলেই আপনাতেই চোখ বন্ধ হয়ে আসে। চোখ বন্ধ করে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিতে হয়। তারেক একবার বলেই ফেলল, ঘুমাচ্ছেন নাকি আপা? নারে ভাই। মাথা ঘুরছে। বড় সাহেব যেতে বলেছে চলে যান না। জরুরি কাজ যা আছে দিয়ে যান আমার টেবিলে, অবসর পেলে করে দেব। কাজ তেমন নেই কিছু। তাহলে শুধু শুধু বসে আছেন কেন? মুনিরকে বলেন একটা রিকশা ডেকে দেবে। মুনা মুনিরকে ডাকল। অফিসের আশপাশে রিকশা পাওয়া যায় না। মোড় থেকে ডেকে আনতে হয়। এ রকম এক অন্ধগলিতে এত বড় অফিস কোম্পানি কেন বানাল কে জানে। অফিস থাকবে মতিঝিলে। তারেক, যাই ভাই। ঠিক আছে আপা যান। কাল কথা হবে। বাসার দিকেই তো যাবেন? হুঁ। মুনা অফিসের এই একটিমাত্র ছেলেকে নাম ধরে ডাকে এবং তুমি বলে। যদিও সে নিশ্চিত তারেক বয়সে বড়ই হবে। তুমি ডাকার ব্যাপারটিও কিভাবে শুরু হয়েছে মুনা নিজেও জানে না। প্রায় অবাক হয়েই এক’দিন সে লক্ষ্য করেছে তারেক আপনি বললেও সে নিজে বলছে তুমি। মামুনের সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারটা এত পাকাপাকি না থাকলে অফিসে এই নিয়ে একটা আলোচনা হত। পাল বাবু সস্তা ধরনের কিছু রসিকতা করারও চেষ্টা করতেন। রিকশায় উঠেই মুনার মনে হল বাসায় এই সময় ফিরে কোনো লাভ নেই। দুপুরে ঘুমুলেই সারাটা বিকাল এবং সারাটা সন্ধ্যা তার খুব খারাপ কাটে। রাতের বেলা ঘুম আসে না। রাত দুটো তিনটে পর্যন্ত জেগে থাকতে হয়। মুনা রিকশাওয়ালাকে বলল মগবাজারের দিকে যেতে। এ সময় মামুনের মেসে থাকার কথা নয়। তাকে পাওয়া যাবে না এটা প্রায় একশ ভাগ সত্যি। তবু একবার দেখে গেলে ক্ষতি নেই কোনো। না পাওয়া গেলে কলেজে গিয়ে খোঁজ নেয়া যাবে। কোন বইতে যেন পড়েছিল পুরুষরা সবচে খুশি হয় যখন তারা মেয়েদের কাছ থেকে সিগারেট উপহার পায়। মামুনকে সে আগেও কয়েকবার সিগারেট দিয়েছে, কোনোলারই মনে হয়নি সে খুব খুশি হয়েছে। এমন ভাবে প্যাকেট খুলেছে যেন এটা তার প্রাপ্য। আজও তাই করবে। মামুন মেসে ছিল না। তার পাশের রুমের আলম সাহেব বললেন, উনি তো টেলিগ্রাম পেয়ে দেশে গেছেন। তার এক বোন মারা গেছে, আপনি কিছু জানেন না? না। অনেক দিন ধরে অসুস্থ ছিল। উনার সবচে ছোট বোন। মুনা একটু বিব্রত বোধ করতে লাগল। এত বড় একটা ব্যাপার মামুন তাকে কোনোদিন বলেনি। তার একটি ছোট বোন আছে তা সে জানত কিন্তু এই বোনের এমন একটা অসুখ তা মামুন কোনোদিন বলেনি। বসবেন আপনি? জি না, বসব না। ও দেশে গেছে কবে? পরশু সকালে। টেলিগ্রাম এসেছে তার আগের রাত্রে। ট্রেন ছিল না, যেতে পারেনি। কবে আসবে কিছু বলে গেছে? জি না কিছু বলেনি। আজ-কালের মধ্যে এসে পড়বে। মরবার পর তো আর কিছু করার থাকে না, শুধু শুধু ঘরে বসে থেকে হয়টা কি? মুনা ক্লান্ত ভঙ্গিতে এসে রিকশায় উঠল। কড়া রোদ এসেছে। চকচক করছে চারদিক। তাকালেই মাথা ধরে যায়। মুনা হ্যান্ড ব্যাগ খুলে সানগ্লাস বের করল। রোদটা খুব চোখে লাগছে। সানগ্নাস ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। চোখে পরিবার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক কেমন মেঘলা হয়ে যায়। একটু যেন মন খারাপ ও লাগে। মুনা ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। অস্পষ্ট ভাবে তার মনে হতে লাগল–মামুন কখনো তার নিজের ভাই-বোন-মা-বাবার কথা নিয়ে তার সঙ্গে গল্প করেনি। এমন একজন অসুস্থ বোন ছিল তার এটাও পর্যন্ত বলেনি। না বলার পেছনে কোনো যুক্তি নেই। মুনার খুব জানতে ইচ্ছে হল এই বোনটি কি ওর খুব আদরের ছিল? নামই বা কি তার? নাম মামুন বলেছিল, খুবই কমন একটা নাম বলে এখন মনে পড়ছে না। রোকেয়া বা সাবিহা জাতীয়। মুনার মনে হল একটা চিঠি লিখে রেখে এলে ভাল হত। অল্প কয়েক কথার সুন্দর একটা চিঠি– হঠাৎ করে তোমার বোনের মৃত্যু সংবাদ শুনলাম। সে যে অসুস্থ তা তো তুমি কখনো বলনি।… চিঠিটা ঠিক হচ্ছে না। অভিযোগের ভঙ্গি এসে পড়েছে। কেন অসুস্থতার খবর আগে বলা হয়নি। সেই নিয়ে অভিযোগ। পুরোপুরি মেয়েলি অভিযান। মৃত্যুর মত এত বড় একটা ব্যাপারের পাশে মেয়েলি অভিযোগ একেবারেই মিশ খায় না। মুনা মনে মনে চিঠিটা অন্যভাবে লিখতে চেষ্টা করল। এবং এক সময় খুবই অবাক হয়ে লক্ষ্য করল। তার চোখ ভিজে উঠেছে। কেন মামুন তাকে আগে বলল না? বকুলদের স্কুলে কোনোদিনই পুরোপুরি ক্লাস হয় না। প্রায় দিনই সেভেনথ পিরিয়ডে ছুটি হয়ে যায়। আজ সেভেনথ পিরিয়ডে রেহানা। আপার ক্লাস। এই ক্লাসটা হবে না ধরেই নেয়া যায়। কারণ রেহানা আপার অনেক রকম যোগাযোগ আছে। সে সব নিয়ে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। মেয়েদের টিফিন এবং কোঅপারেটিভদের দোকান তিনিই চালান। গার্লস গাইড এবং সবুজ সেবিকার ব্যাপারগুলিও তাকে দেখতে হয়। নিয়মিত ক্লাস নেবার সময় কোথায় তার! কিন্তু আজ তাকে ক্লাসে আসতে দেখা গেল। তাঁর মুখ গম্ভীর, হাতে প্রকাণ্ড একটা গ্লোব। তিনি ক্লাসে ঢুকেই ব্ল্যাকবোর্ডে বড় বড় করে লিখলেন, জলবায়ু। জলবায়ু তিনি গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে পড়িয়েছেন, কেউ অবশ্যি তাকে সেটা বলল না। ফরিদা তুই বল জলবায়ু মানে কি? ফরিদা ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে রইল। তিনি তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ছাত্রীদের মোট সংখ্যা গুণতে লাগলেন। সব মিলিয়ে আটত্রিশ জন ছাত্রী উপস্থিত। তিনি মুখ অন্ধকার করে বললেন, আটত্রিশ জন প্রেজেন্ট, কিন্তু টিফিন এনেছিস একচল্লিশটা, কেন? ক্লাস ক্যাপ্টেন অনিমার মুখ শুকিয়ে গেল। বল একচল্লিশটা টিফিন কেন? অনিমা আমতা আমতা করতে লাগল। চুরি শিখে গেছিস এই বয়সে, বাবা কি করে? অনিমার মুখে কথা জড়িয়ে গেল। রেহানা আপা আরো গম্ভীর হয়ে বললেন, জলবায়ু কাকে বলে বল দেখি? এটি একটি কাঁচা কাজ হয়ে গেল। কারণ অনিমা খুবই ভাল ছাত্রী। জলবায়ু কি এটি সে তার চেয়েও অনেক গুছিয়ে বলল। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জলবায়ু কী বল? আপা এটা এখনো পড়ানো হয়নি? সব কিছু পড়িয়ে দিতে হবে? নিজে নিজে পড়া যায় না? তুই আজ ক্লাস শেষে আমার সঙ্গে দেখা করবি। বসছিস কি জন্যে? বসতে বলেছি? দাঁড়িয়ে থােক। ফরিদা তুইও দাঁড়িয়ে থাক। তিনি প্ৰায় দশ মিনিট ধরে মেয়েদের মিথ্যা বলার অভ্যাস এবং চুরি করার অভ্যাসের ওপর বক্তৃতা দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। ক্লাসে টু শব্দও হল না। তিনি কপালের ঘাম মুছে ক্লান্ত স্বরে বললেন, বকুল ক্লাসে এসেছে? সবচে পেছনের বেঞ্চ থেকে বকুল ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়াল। তোকে গতকাল টিফিন পিরিয়ডে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলাম, করেছিলি? আপা, আমি গিয়েছিলাম, আপনি হেড আপার সঙ্গে কথা বলছিলেন। কথা কি আমি সারা জীবন ধরে বলেছিলাম? পাঁচ মিনিট দাঁড়ানো গেল না? বকুল প্রায় আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু সে কিছু বলল না। আজ ক্লাস শেষ হবার সাথে সাথে আসবি। বাংলাদেশের জলবায়ু কি রকম বল? বকুল ঘামতে লাগল। বইয়ের সঙ্গে কারো কোনো সম্পর্ক নেই? মৌসুমী বায়ু কাকে বলে? কেউ জানো না? কে জানে? হাত তোল। শুধু অনিতা হাত তুলল। তিনি অনিমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। বিমর্ষ মুখে বাংলাদেশের জলবায়ুর কথা বলতে লাগলেন। গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহেও একই কথা বলেছিলেন। তার মনে নেই। ক্লাসের মেয়েরা ঘণ্টা পড়ার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। ঘণ্টা আর পড়ছে না। তাদের মনে হল তারা অনন্তকাল ধরে ক্লাসে বসে আছে। বকুল টিচার্স কমন রুমে ভয়ে ভয়ে উঁকি দিল। রেহানা আপা হাত নেড়ে নেড়ে অংক আপার সঙ্গে কথা বলছে। তিনি ইশারায় বকুলকে অপেক্ষা করতে বললেন। কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে কে জানে। অন্য ছাত্রীরা সব চলে যাচ্ছে। স্কুল ঘর দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আজ তার একা একা যেতে হবে। বকুল কিছুক্ষণ পর পর্দা ফাঁকা করে আবার উঁকি দিল। রেহানা আপা এবং অংক আপা দুজনেই খুব হাসছে। অংক আপা কখনো হাসেন না। তার হাসি দেখে বকুল খুবই অবাক হল। ংক আপা বকুলকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলেন। রেহানা আপার মুখ অবশ্যি এখনো হাসি হাসি। তিনি চটের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। বকুল তুই আয়, হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি। রাস্তার মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দেব। তারপর রিকশা নিয়ে চলে যাবি। কাল যখন স্কুলে আসবি তখন মনে করে তোর একটা ছবি নিয়ে আসবি। বকুল অবাক হয়ে তাকাল। রেহানা আপা বললেন, শাড়ি পরা ভাল ছবি আছে? জি না আপা। তাহলে এক কাজ কর, আজ বিকেলেই একটা তুলিয়ে ফেল। চুলগুলি সামনে ছড়িয়ে দিবি। যাতে কত লম্বা সেটা টের পাওয়া যায়। বকুল ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, জি আচ্ছা। খুব দরকার, ভুলে যাবি না যেন আবার। বকুল কথা বলল না। রেহানা। আপা বললেন, তুই তো সবার বড়, তাই না? জি আপা। ক ভাই-বোন তোরা? এক ভাই এক বোন। বাহ ছোট ফ্যামিলি তো। এক’দিন যাব তোদের বাসায়। তোর মাকে বলিস। জি আচ্ছা। পড়াশুনা করছিস তো ঠিকমত? করছি। লাস্ট বেঞ্চে বসিস কেন সব সময়? ফাস্ট, বেঞ্চে বসবি। মনে থাকবে? থাকবে। রেহানা। আপা রাস্তার মোড়ে বকুলের জন্যে একটা রিকশা ঠিক করে, রিকশাওয়ালার হাতে দুটাকা ভাড়া দিয়ে দিলেন। বকুল হুঁড় তুলে দে। হুঁড না তুলে মেয়েদের রিকশা করে যাওয়া আমার পছন্দ না। বকুল সারা পথ অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। মেয়েদের কাছে রেহানা। আপার ছবি চাওয়া কোনো নতুন ব্যাপার না। তিনি উপরের ক্লাসের সুন্দরী মেয়েদের কাছে (বেছে বেছে, সবার কাছে না) ছবি চান এবং তার দিন দশেকের মধ্যে সেই সব মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। আজেবাজে বিয়ে নয়, ভাল বিয়ে। রেহানা। আপার ধারণা ক্লাস টেনে পড়া মেয়েরা হচ্ছে বিয়েব পাত্রী হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ। এই সময়টা মেয়েরা ছেলেদের সম্পর্কে প্রথম কৌতূহলী হয় এবং প্রেম করবার জন্যে ছোক ছোক করে। বিয়ের পর হাতের কাছে স্বামীকে পায় বলেই প্রথম প্ৰেম হয়। স্বামীর সঙ্গে। সে প্ৰেম দীর্ঘস্থায়ী হয়। ক্লাস টেনে পড়া মেয়েদের সম্পর্কে তার নানা রকম থিওরি আছে। এই সব থিওরি তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে প্রচার করে থাকেন। শওকত সাহেব বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বকুলকে রিকশা থেকে নামতে দেখে অবাক হলেন। তাকে রিকশা ভাড়া দেয়া হয় না। স্কুল এত দূরে নয় যে, রিকশা করে যাওয়া-আসা করতে হবে। সংসারে কোনো কাঁচা পয়সা নেই। বকুল বোধ হয় মুনার কাছ থেকে নিচ্ছে। মুনা এই সংসারে নানান ভাবে টাকা খরচ করে। এটা তার পছন্দ নয়। কোন বইতে যেন পড়েছিলেন, যে সংসারে মেয়েদের রোজগারের টাকা খরচ হয় সেই সংসারের কোনো আয়উন্নতি হয় না। বকুল ঘরে ঢুকলা খুব ভয়ে ভয়ে। তার ধারণা ছিল বাবা অকারণেই তাকে একটা ধমক দেবে। দেরি হল কেন? রিকশা করে এসেছিস কেন? কিন্তু শওকত সাহেব তেমন কিছুই করলেন না। মেয়ের দিকে ভালমত তাকালেনও না। চারদিক ফাঁকা ফাঁকা। মুনা আপা বা বাবু কেউ নেই। সে মার ঘরে উঁকি দিল। লতিফা হাত ইশারায় তাকে আসতে বললেন। তার চোখ জুলজুল করছে, যেন বড় একটা কিছু ঘটেছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন, তোর বাবার কি হয়েছে? কেন? হবে। আবার কি? মিষ্টি কিনে এনেছে। কোথায় মিষ্টি? ঐ দেখা ড্রেসিং টেবিলের উপর। বকুল অবাক হয়ে দেখল সত্যি সত্যি এক প্যাকেট মিষ্টি। সে বলল, তুমি জিজ্ঞেস করণি কিছু? না, তুই জিজ্ঞেস করে আয়। মুনা। আপা আসুক, সে জিজ্ঞেস করবে। লতিফা নিজের মনে বললেন, আজ তোর বাবা চেঁচামেচি রাগারগি কিছু করেনি। অফিস থেকে এসেছেও সকাল সকাল। বকুল বলল, আজ তোমার শরীর কেমন? ভালই। যা তোর বাবাকে চা বানিয়ে দে। ঘরে মুড়ি আছে। পেয়াজ-মরিচ দিয়ে মেখে দে। বকুল বারান্দায় গেল। বাবা আগের মতই হাঁটাহাঁটি করছেন। কারো জন্যে অপেক্ষা করছেন বোধ হয়। বকুল ক্ষীণ স্বরে ডাকল বাবা। কি? চা আনি? আন। চায়ের সঙ্গে কিছু খাবে? ঘরে মুড়ি আছে। মেখে দেই। দে। বেশি করে ঝাল দিবি। আর শোন, মিষ্টি এনেছি। তোর মাকে দে। তুইও খা। বকুল ভয়ে ভয়ে বলল, মিষ্টি কি জন্যে? এমনি আনলাম। শওকত সাহেব সিগারেট ধরিয়ে বিব্রত ভঙ্গিতে কাশতে লাগলেন। মিষ্টি এনে তিনি যেন একটা অপরাধ করে ফেলেছেন। বকুল ছবির কথা তুলাল রাতের খাবার সময়। অন্য সবার খাওয়া হয়ে গেছে। মুনা এবং সে বসেছে। শেষে। এ-কথা সে-কথার পর বকুল খুব স্বাভাবিক ভাবে রেহানা আপার ছবি-চাওয়ার কথা বলল। মুনা খাওয়া বন্ধ করে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, কেন, ছবি দিয়ে কি হবে? আমি কি করে জানব। আপা? তুই কিছু জিজ্ঞেস করিাসনি? না। ঠিক কি কি কথা হয়েছে তোর সাথে? বকুল কথাগুলো গুছিয়ে বলতে চেষ্টা করল। কিন্তু ঠিকমত বলতে পারল না। মুনা বলল, শাড়ি পরা ছবি চেয়েছে? হ্যাঁ। তোকে বিয়ে দিতে চায় নাকি? বকুল কোনো জবাব দিল না। কি, কথা বলছিস না কেন? বোধ হয়। আপা এ রকম মেয়েদের কাছে ছবি চায়। তারপর ওদের বিয়ে হয়ে যায়। শায়লার এ রকম বিয়ে হল। ডাল নাও আপা। ডাল নিয়ে খাও। খেতে ইচ্ছা করছে না। মুনা প্লেট ঠেলে উঠে দাঁড়াল। তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ। আপা? তোর ওপর বাগ করব কেন? তুই আয়, তোব সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে। বাবু বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল। পড়ার ভঙ্গি দেখে মনে হতে পারে গল্পের বই। কিন্তু গল্পের বই না। বাবা যে কোনো সময় ঘরে ঢুকতে পারেন রাত দশটার আগে হাতে গল্পের বই দেখলে সৰ্ব্বনাশ হয়ে যাবে। মুনা ঘরে ঢুকতেই বাবু হাসিমুখে বলল, ফ্যান দেখেছি আপা? নতুন ফ্যান। বাকের ভাই বলে গেছেন। পুরানটা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত এটা থাকবে। মুনা বিরক্ত চোখে ফ্যান দেখল। কিছু বলল না। বাবু বলল, আরাম করে ঘুমানো যাবে, ঠিক না। আপা? হুঁ। তোর মাথাব্যথা হয়নি? না! বিকেলে খেলতে গিয়েছিলি? হুঁ। এখন থেকে রোজ যাবি। নিয়মিত খেলাধুলা করলে মাথাব্যথা থাকবে না। ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক, যাবি। আচ্ছা যাব। যা তো আমার জন্যে একটা পান নিয়ে আয়। কেমন যেন বমি বমি আসছে। বাবু পান আনতে গিয়ে আর ফিরল না। শওকত সাহেব তাকে আটকে ফেললেন। ইংরেজি বানান ধরতে লাগলেন। মসকুইটো, এমব্রয়ডারি, ইনকুইজিটিভনেস এই জাতীয় বানান। বাবু তালগোল পাকিয়ে ফেলতে লাগল। যেটাতেই সে আটকাচ্ছে সেটাই ডিকশনারি খুঁজে বের করতে হচ্ছে। এবং বিশবার করে সশব্দে বানান করতে হচ্ছে। রান্নাঘর গুছিয়ে বকুল যখন শোবার ঘরে উঁকি দিল তখন রাত দশটা বাজে। মুনা ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। বকুল মৃদু স্বরে ডাকল, আপা। কি? ঘুমোচ্ছ নাকি? না। কি যেন বলবে বলেছিলে আমাকে? মুনা একটা লম্বা বক্তৃতা তৈরি করে রেখেছিল। কিন্তু বক্তৃতাটা দেয়া গেল না। সে শুধু বলল, তুই রেহানা আপাকে বলিস, আমার বাবা ছবি দিতে রাজি হলেন না। বকুল বলল, এটা কেমন করে বলব? অন্য কথাগুলি যেমন করে বলিস ঠিক তেমনি বলবি। আপা দারুণ রাগ করবে। রাগ করলে করবে। রাগ কমানোর জন্যে বাচ্চা একটা মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবে? তুই কী বুঝিাস বিয়ের? আপা আস্তে। বাবা শুনবে। মাস্টারদের দায়িত্ব হচ্ছে পড়ানো। বিয়ে দেয়া না। যখন সময় হবে তখন আপনাতেই বিয়ে হবে। এই নিয়ে তোর এত চিন্তা কিসের? আমি আবার কখন চিন্তা করলাম? ছবি দেয়ার ব্যাপারে তোর এত আগ্রহ কেন? তুমি বুঝতে পারছি না। আপা খুব রাগ করবে। রাগ করলে করবে। যা আমার জন্যে একটা পান বানিয়ে আন। বাবুকে পাঠিয়েছিলাম, সে আর ফিরবে না। আটকে গেছে। আপা নতুন ফ্যান দেখেছ? দেখলাম। বাকের ভাই নাকি এসে অনেকক্ষণ ছিল। অনেক গল্পটল্প করল। কার সঙ্গে করল? বাবার সঙ্গে। বাবা আজ সকাল ফিরেছিলেন। বাকের ভাই এসেই গল্প জুড়ে দিল। কালপরশুর মধ্যে একটা কাজের লোকও এনে দেবে বলেছে। এনে দিলে তো ভালই। তুই যা, পানটা নিয়ে আয়। আমার সাহসে কুলাচ্ছে না। বাবার সামনে দিয়ে যেতে হবে। তুমি নিজেই যাও না আপা। মুনা উঠে বসল। বকুল বলল, মিষ্টি কি জন্যে আনলেন এটাও একটু জিজ্ঞেস করবে। জানতে ইচ্ছা করছে। জানতে ইচ্ছে হলে তুই নিজেই জিজ্ঞেস কর। আমার এত সাহস নেই। বসার ঘর থেকে শওকত সাহেব ডাকলেন, বকুল বকুল। বকুল মুখ অন্ধকার করে উঠে গেল। শওকত সাহেবের সামনে বাবু কানে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ লাল। বকুল এসে ঢুকতেই শওকত সাহেব বললেন, পাটিগণিত নিয়ে আয়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২৭৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ কোথাও কেউ নেই (৪৫) (শেষ পর্ব)
→ কোথাও কেউ নেই (৪৪)
→ কোথাও কেউ নেই (৪৩)
→ কোথাও কেউ নেই (৪২)
→ কোথাও কেউ নেই (৪১)
→ কোথাও কেউ নেই (৪০)
→ কোথাও কেউ নেই (৩৯)
→ কোথাও কেউ নেই (৩৮)
→ কোথাও কেউ নেই (৩৭)
→ কোথাও কেউ নেই (৩৬)
→ কোথাও কেউ নেই (৩৫)
→ কোথাও কেউ নেই (৩৪)
→ কোথাও কেউ নেই (৩৩)
→ কোথাও কেউ নেই (৩২)
→ কোথাও কেউ নেই (৩১)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...