বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মনোহারিণী

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান PRINCE FAHAD (১১১৪ পয়েন্ট)



X লেখক আবিদুর রহমান একটু আগে আমি শ্বশুরবাড়িতে এসেছি,একদম সাদামাটা এক ছোট্ট বাসায়!আমি যে আসবো এখানের কেউ জানতো না,অবশ্য কিভাবেই বা জানবে?আমার তো বিয়ে করে আজ সাফিনের বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল।ওখানে সবাই বরণডালা সাজিয়ে নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে! মধ্যবয়স্ক একজন মহিলা সম্ভবত আমার শাশুড়ি আমাকে দেখে অবাক হবার বদলে খুশিতে হৈচৈ শুরু করে দিলেন,কিশোরী বয়সের এক মেয়ে এসে আমাকে এক রুমে নিয়ে বসিয়ে বললো,আমি আনজুমান নিখিল ভাইয়ের ছোট বোন।আপনি যে আমার ভাবী হবেন আমি তো কল্পনাই করিনি।তবে মাগরিবের নামাযে পর্যন্ত দোআ করেছি আপনি যেন আমার ভাবী হন।আল্লাহ আমার দোআ কবুল করেছে, অবিশ্বাস্য!! আমি অবাক হলেও মুখে কিছু বললাম না।আমার মনের ভেতর তখন চলছে অন্যরকম ঝড়! আমি অনন্যা চৌধুরি।শহরের বড় দশ বিজনেসম্যানের মধ্যে একজন ওমর চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে।একটু আগ পর্যন্ত আমি ভাবিনি আমার বিয়ে এমন নিম্নবিত্ত ছেলের সাথে হবে! কথায় বলে "কপালের লিখন খন্ডাবে কোনজন",আসলেই নিয়তির উপহাস ছাড়া এটা কি আদৌ সম্ভব ছিল? সাফিনের সাথে আমার দীর্ঘ পাঁচ বছরের সম্পর্ক শেষে আজ আমাদের বিয়ে হবার কথা।কত সুন্দর পরিণতি হবার ছিল,অথচ সব মুহূর্তে ধুলিসাৎ! ফ্ল্যাশব্যাক, নিধিঃআজ তোকে দেখে সাফিন জিজু মার্ডার হয়ে যাবে রে অনু!! সোমাঃএকদম ঠিক বলেছিস।এমনিতেই অনন্যা অনেক সুন্দরী,তার উপর মেরুন লেহেঙ্গাতে ওকে তো আগুন লাগছে!দোস্ত আমার তো তোর জন্য ভয় হচ্ছে রে। বলেই ওরা হাসতে শুরু করলো। আমিঃতোরা আমার প্রশংসা করছিস নাকি ভয় দেখাচ্ছিস তাই তো বুঝলাম না!হ্যাঁরে রিমি কই? নিধিঃএখানেই তো ছিল,বোধহয় নীচে গেছে। এমন সময় সাফিন টেক্সট করলো,রাজকুমারী কে নিয়ে আসতে রওয়ানা হচ্ছি! আমি মুচকি হাসি দিতেই নিধি ফোন কেড়ে নিয়ে বললো,ওহো রাজকুমার রওয়ানা হচ্ছে তাহলে রাজকুমারীকে নিতে! রিমি আসতেই আমি ওকে বললাম,কই ছিলি এতোক্ষণ? রিমি মিথ্যে হাসি দিয়ে বললো,আরেহ ছিলাম আর কি আশেপাশেই। :কি হয়েছে তোর চেহারা এমন লাগছে কেন? :কই কিছু হয়নি তো।তোর কিছু লাগবে?খুঁজছিলি কেন? :মা-বাবা কোথায়?কেউ তো একবারো দেখতে এলোনা আমাকে? :সাফিনের বড় চাচা আর বাবা এসেছেন।উনাদের সঙ্গে কথা বলছেন। :বরযাত্রীর আগে এসেছেন কেন?Anything serious? :আরে না,হয়তো কোনো জরুরি কথা বলছে। :একদম মিথ্যে বলবি না রিমি।তোর চেহারা বলে দিচ্ছে কিছু একটা ঘটেছে।সত্যি করে বল? আমার চিৎকার শুনে সোমা আর নিধিও বলতে লাগলো,হ্যাঁ রে রিমি কি হয়েছে জানিস কিছু? রিমি আমার হাত ধরে বললো,রিয়েক্ট করিস না অনু,বাড়িভর্তি গেস্ট।কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। :ওকে ফাইন রিয়েক্ট করবোনা তুই বল কি হয়েছে। রিমি দম নিয়ে বললো,সাফিনের বাবা আর চাচা এসেছেন বিজনেসের ব্যাপারে কথা বলতে।উনাদের নাকি ব্যবসায় ক্রাইসিস চলছে তাই আঙ্কেল লাস্ট যে টেন্ডার টা পেয়েছেন ঐটা .... আমি স্থির গলায় বললাম,Is it as dowry? রিমি মাথা নীচু করে ফেললো।আমি একছুটে রুম থেকে বেড়িয়ে বাবারা যেখানে আছেন সেখানে গেলাম। বাবা তাঁর একমাত্র মেয়ের জন্য এমন একটা কেন দশটা টেনডার পাস করে দিতে পারবেন অনায়াসে।কিন্তু আমার ইগোতে লেগেছে অন্য কিছু!আমি বরাবরই আত্মসম্মানকে বড় করে দেখি,সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যধি যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে কত আন্দোলন করেছি কত স্লোগান তুলেছি ।আজ কিনা আমার বিয়েতে যৌতুক দিতে হচ্ছে!আমার বাবার টাকা আছে বলে তাঁর হয়তো গায়ে লাগছেনা কিন্তু এই জঘন্য রীতির অনুসরণ অন্য সাধারণ মেয়েদের জীবন তো জাহান্নাম করে দিবে।ধনীদের এসব কার্যকলাপের জন্যই আজ এতো মেয়ে দগ্ধ হচ্ছে এই ভয়ঙ্কর যৌতুকের দাবানলে।না আমি সেটা কিছুতেই মেনে নেব না। সাফিন তো জানতো আমি এসবকে কত ঘৃণা করি তা সত্ত্বেও কিভাবে পারলো ওর বাবা-চাচা এমন করতে? বাবা সবে সাইনটা করছিল আমি তখনই রুমে ঢুকলাম।আমাকে দেখে মা কিছুটা ভয় পেয়েছেন। বাবা হেসে বললো,হেই মাই প্রিটি প্রিন্সেস!তোমাকে দেখতে দারুণ লাগছে। আমি হেসে বাবার কাছে গিয়ে বললাম,ধন্যবাদ বাবা!তা তোমার প্রিন্সেস বুঝি এতোই অযোগ্য যে তাঁকে বিয়ে দিতে যৌতুক দিতে হচ্ছে? সাফিনের চাচা হেসে বললো,কি যে বলছো মা তুমি অযোগ্য হবে কেন।এগুলো জাস্ট একটা ডিল।সাফিনদের ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেলেই ফেরত দেওয়া হবে। :আঙ্কেল এগুলো যদি জাস্ট একটা ডিল হতো তাহলে আপনারা নিশ্চয়ই ছেলের বরযাত্রীর সঙ্গে না এসে বিয়ের আগে জরুরিভিত্তিতে এটা সাইন করাতেন না? বাবাঃ আহা মামণি আমার সবকিছুই তো তোমার।এটা তো ক্ষুদ্র ব্যাপার।তুমি এসব নিয়ে ভেবোনা বিয়েতে ফোকাস করো। :বাবা তুমি হয়তো ভুলে গেছ তোমার মেয়ে কেমন চিন্তাচেতনা লালন করে আসছে!এই বিয়ে আর হচ্ছে না।আপনারা আসতে পারেন। মাঃ কি বলছিস তুই এসব।বিয়ে না হলে এতোগুলো গেস্টের সামনে তোর বাবা অপমানিত হবেন।সমাজে সবাই ছিঃ ছিঃ করবে। আমি মৃদু হেসে বললাম:ওমর চৌধুরীর মেয়েকে তুমি এসব ভয় দেখাচ্ছ মা?সিরিয়াসলি! তারপর নীচে এসে গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম এই মুহূর্তে এখান দিয়ে যে ছেলেই আসবে আমি তাঁকেই বিয়ে করবো যদিও সে ভিখারি হয়! আমার এমন এনাউন্সে সবাই হা করে চেয়ে রইলো।রিমি,সোমা,নিধি এসে বললো, অনু এমন পাগলামি করছিস কেন?সাফিন তো তোকে ভালোবাসে,তোদের এতো বছরের সম্পর্ক নষ্ট করে দিবি? ছোট মামী এসে বললো,অনন্যা মাথা ঠান্ডা কর মা,ঠিক আছে সাফিনকে তোর বিয়ে করতে হবেনা। এখানে এমন অনেকেই আছে যাঁরা তোকে বিয়ে করতে মরিয়া তাঁদের মধ্যে কাউকে চুজ কর?তোর জন্য ছেলের অভাব পড়বেনা।তুই কি না এই ধরনের শর্ত জুড়ে দিচ্ছিস! আমি হেসে বললাম,তবে তো হবেনা মামানী।সাফিন আমাকে পাঁচ বছর চিনেও বুঝেনি এরা কি বুঝবে।সবাই ওমর চৌধুরীর মেয়েকে বিয়ে করতে রাজী অনন্যাকে নয়!তারচেয়ে আমি এমন কাউকে বিয়ে করবো যে আমাকে চেনে না! এমন সময় এক ছেলে এলো,আমি দৌড়ে গিয়ে বললাম,আমাকে বিয়ে করবেন প্লিজ?যৌতুকের অভাবে আমার বিয়ে ভেঙে গেছে।এখন বাড়িভর্তি মেহমানদের সামনে আমার বাবার মানসম্মান ধুলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।প্লিজ আমাকে বিয়ে করুন... সাফিন যখন বরযাত্রী নিয়ে এলো আমার সাইন করা শেষ।সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমি সেই অচেনা ছেলের সঙ্গে চলে এসেছি তাঁর বাড়ি। । কারো ডাকে আমার ধ্যান ভাঙলো,তাকিয়ে দেখি নিখিল দাঁড়িয়ে আছে। :আমার বাসাটা খুব ছোট আপনার নিশ্চয়ই অসুবিধা হচ্ছে?আচ্ছা কয়েলে আপনার সমস্যা আছে নাকি মশারি টাঙাবো? :মশারি টাঙালে ফ্যানের হাওয়া লাগবে গায়ে? :কম লাগবে।তবে একটু নীচু করে টাঙালে আরামেই ঘুমাতে পারবেন আশা করি। :ঠিক আছে।মশারি টানান তবে। তারপর ট্রলি থেকে কাপড় নিয়ে আমি ওয়াশরুমে চলে গেলাম।সবকিছু বড় দেখে দেখে অভ্যাস আমার তাই এই বাসাটাকে খুপড়ি মনে হচ্ছে!লেহেঙ্গা পাল্টে সুতির শাড়ি পড়লাম।।তারপর ফ্রেশ হয়ে রুমে এসে দেখি আনজুমান বেশ কিছু খাবার নিয়ে হাজির।নিখিলের মা বললো,বৌমা আজ কষ্ট করে এসব দিয়ে খেয়ে নাও,আমি আগে জানলে ভালোমন্দ কিছু রান্না করতাম!যাই হোক রিযিকের মালিক আল্লাহ। আমি মেনু দেখে বললাম,আলু ভাজি আর ডাল আমার খুব প্রিয় আন্টি!বাসায় লেবু আছে? তিনি খুশি মনে লেবু কেটে আনলেন সাথে একটা ডিম ও ভেজে এনেছেন।আমি বেশ তৃপ্তিসহকারে খেলাম।আমার মা ছোট থেকেই আমাকে সবার সঙ্গে মিশতে শিখিয়েছেন,ধনীগরীব নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে উঠাবসা করার অভ্যাস আছে আমার।তাই এসবে আমার একটু সমস্যা হয়নি। ঘুমানোর সময় নিখিল বললো,আপনার এসব খেতে খুব কষ্ট হয়েছে তাইনা?মায়ের মন রাখতে মিথ্যে বলেছেন? :মোটেই না।আমি মিথ্যা বলা পছন্দ করিনা। :তবে তখন মিথ্যে বললেন কেন?যৌতুকের জন্য আপনার বিয়ে ভেঙেছে এটা কেউ বিশ্বাস করবে? :না করবে না।এখন কি প্রশ্ন করে মারবেন নাকি ঘুমাতে দেবেন? :ঠিকাছে ঘুমান আপনি। :আপনি কোথায় যাচ্ছেন? :খাটটা ছোট এখানে দুজনের জায়গা হবে না। :এটা এতোটাও ছোট না।আপনি কি এখানে শুতে আনইজি ফীল করছেন? সে কিছু না বলে পাশে একদম কিনারা ঘেষে শুয়ে পড়লো।আমি পুরো রাত চোখের পানি ফেলে কাটিয়ে দিলাম।বাসার সবাই নিশ্চয়ই জেগে আছে,বাবা টু শব্দটুকু করেনি।সাফিন হয়তো কল্পনাই করেনি এসে এমনকিছু দেখবে,কেমন আহত দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছিল! সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেশ বেলা হয়ে গেল,ঘড়িতে দেখি এগারোটা বাজে!এরা কেউ আমায় ডেকে তুললো না দেখে অবাক হয়েছি।সাইডটেবিলে একটা লাল গোলাপ আর চিরকুট পেলাম।"সারারাত ঘুম হয়নি জানি,তাই সবাইকে বারণ করেছি আপনাকে ডাকতে।আমি অফিসে যাচ্ছি ,কিছু লাগলে ফোন করবেন।" আমি ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ গেলাম,জিনিসপত্র কিছুটা পুরনো হলেও বেশ পরিচ্ছন্ন করে গুছিয়ে রাখা।আমাকে দেখে আনজুমান বললো,ভাবী উঠেছেন!চা দিবো নাকি কফি? :চা দাও।আন্টি কোথায়? :মা তো পাশের বাসায় গেছে সবাইকে দাওয়াত দিতে। :কিসের দাওয়াত? :ওমা ভাইয়া বিয়ে করেছে সবাইকে জানাতে হবেনা?নতুন বৌ দেখবে দোআ করবে এটাই তো নীতি। :ওহ আচ্ছা,ভুলেই গেছি।তা আনজুমান তুমি পড়াশোনা করো? :হ্যাঁ।আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। :বাহ!আমার খুব খিদে পেয়েছে নাস্তা দাও তো। নাস্তা শেষ করতেই রিমি,সোমা,নিধি হাজির।তাদের দেখে আমি জড়িয়ে ধরে বললাম,তোরা এখানে কিভাবে? রিমিঃ নিখিল ভাই এড্রেস দিয়েছে।উনিই আসতে বললো আমাদের। সোমাঃ এ বুঝি তোর ননদ?ভারী মিষ্টিতো দেখতে। আনজুমানঃআপনারা বসেন আমি মা কে ডেকে আনছি। আনজুমান যেতেই নিধি আমায় বললো,তোর কষ্ট হচ্ছে এখানে তাইনা?এতো বড় বাড়ি ছেড়ে এখানে চলে এলি!তুই কিভাবে পারলি এমন করতে? সোমাঃসাফিন খুব কষ্ট পেয়েছে অনু!তুই চলে আসার পর সবটা শুনে ওর বাবা আর চাচাকে অনেক কথা বলেছে।কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি গিয়েছিল।তুই এমনটা না করলেও পারতি ওর তো কোনো দোষ ছিল না। রিমিঃ ওর দোষ ছিল না বলছিস?ও কি জানতো না অনু কেমন মেয়ে?এসব ব্যাপারে ওর সিরিয়াসনেস সবাই জানে,ও কেন ওর পরিবারকে এলার্ট করেনি?যদিও এভাবে বিয়েটাকে আমি সাপোর্ট করিনা ,তবে নিখিল ছেলেটাকে আমার খারাপ মনে হয়নি। আমিঃ বাবা মা ঠিক আছে তো রিমি? রিমিঃ কেউই ঠিক নেই।তুই চিন্তা করিস না সব ঠিক হয়ে যাবে।আমি খোঁজখবর নিয়েছি এরা খুব নম্র মানুষ।টাকাপয়সার অভাব হলেও এদের সম্মানবোধ খুব বেশি।নিখিলের বাবা নাকি স্কুলের স্বনামধন্য টিচার ছিলেন,এখানের সবাই তাঁদেরকে সম্মান করে। নিধিঃতবে যাই বলিস না কেন সাফিনের চেয়ে নিখিল ভাই বেশি হ্যান্ডসাম।শ্যামলা হলে কি হবে চেহারায় কি মায়া!ম্যানলি বডি, হাইট নিশ্চিত 6' হবে।আর হাসিটা তো দারুণ! আমিঃ তোর চোখ আছে বলতে হয়।কত কি খেয়াল করেছিস! আন্টি এসে সবাইকে চা বিস্কুট আর শিঙারা দিলো। রিমিঃআন্টি আপনারা অনু কে মেনে নিয়েছেন তো? আন্টিঃ এমন চাঁদের মতো বৌ পেলে কে না মেনে নিবে বলো?আমার ছেলে কালো বলে সবাই ওকে ক্ষেপাতো তখন আমি বলতাম দেখিস তোর চাঁদের মতো বৌ হবে। আনজুমান বলবো,মা কি খুশি হয়েছে জানেন আপু?কাল যখন ভাবীকে দেখলো সাথে সাথে দু'রাকাত শোকরানার নামায পড়েছে। রিমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। যাওয়ার আগে নিধি টাকার বান্ডেল দুটো দিয়ে বললো,ছোট মামানী দিয়েছে।চিন্তা করিস না এগুলো তোর বিয়েতে পাওয়া প্রাইজ মানি।কোনো দরকার হলে খবর দিস। রাতে নিখিল এলো বক্স খাট আর রিচার্জেবল টেবিল ফ্যান নিয়ে,লোকদের দিয়ে খাট ফিট করিয়ে গোসলে ঢুকলো।আমি ওখন আন্টির রুমে বসে ছিলাম।আনজুমান শরবত এনে বললো,ভাবী ভাইয়াকে শরবত টা দিবেন? আমি বুঝলাম আন্টি তাঁকে বলেছে এটা বলতে।আমি শরবত নিয়ে রুমে ঢুকতেই নিখিল বললো,এখানে অনেক লোডশেডিং হয়,তাই এই ফ্যান টা এনেছি।কারেন্ট না থাকলেও আপনার সমস্যা হবেনা। আমি শরবত বাড়িয়ে দিতেই বললো, ভালো করেছেন শরবত এনে যা গরম পড়েছে।আপনার কোনো অসুবিধা হয়নি তো? :না।ধন্যবাদ আপনাকে আমার ফ্রেন্ডদের ইনভাইট করলেন.. :আরেহ কি যে বলেন।মা কোথায়? :আন্টি কিচেনে বোধহয়। :একটা কথা বলি কিছু মনে করবেন না?আপনি মা কে আন্টি বলবেন না প্লিজ।উনার পুত্রবধূ নিয়ে অনেক কল্পনা জল্পনা ছিল। :আচ্ছা সমস্যা নেই। তারপর সে হালকা নাস্তা খেয়েই বেড়িয়ে পড়লো।আমি কিচেনে গিয়ে বসতেই আন্টি বললো,কিছু লাগবে বৌমা?আনজুকে বললেই পারতে এই গরমে রান্নাঘরে আসতে গেলে কেন? :না আম্মু কিছু লাগবেনা।এমনিই মা মেয়ে গল্প করতে এসেছি! উনি আনন্দে আটখানা হয়ে বললো,তুমি আমাকে মা বলে ডাকলে!আহা গল্প করবে আগে বলতে দেখি চলো চলো সামনের রুমে বসি।এখানে চুলার গরমে কেমন ঘেমে যাচ্ছ। ।। দেখতে দেখতে প্রায় তিনমাস কেটে গেল।প্রথম প্রথম বাবা মা মেনে না নিলেও পরবর্তীতে তাঁরা মেনে নিয়েছেন।মেয়ে সুখে আছে দেখে তাঁরাও নিশ্চিন্ত হলেন।নিখিল আর তাঁর মা বোন আমায় খুব যত্ন করে।এর মধ্যে নিখিল আমার সুবিধার জন্য টুকটাক অনেক কিছু কিনেছে।আমার মা জিনিসপত্র পাঠাতে চেয়েছিল তখন ও সাফ সাফ বলেছে,শ্বশুরবাড়ির একটি সুতোও সে গ্রহণ করবেনা। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করতেই বললো,যে মেয়েটাকে যৌতুকে বিয়ে ভেঙেছে বলে বিয়ে করেছি তাঁর বাড়ি থেকে কিছু আনবো বলে মনে হয়? আমি নিখিলের ব্যক্তিত্বে বেশ মুগ্ধ হয়েছি। মায়ের সাথে থেকে থেকে টুকটাক রান্না শিখেছি,আনজুমানের সাথেও বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।এতো কিছুর মাঝেও রাত হলে আমি সাফিনকে মিস করতাম।শতো হোক এতো বছরের ভালোবাসাকে তো সহজে ভোলা যায় না!মাঝেমধ্যে মনে হতো সাফিনের সাথে অন্যায় করেছি।নিখিলের সাথে আমার স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক না হলেও বেশ ভালোই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।একদিন আনজুমানকে নিয়ে শপিং এ গেলাম কিছু কেনাকাটা করতে,তখন সাফিন সবে কার থেকে নামছে।আমাকে দেখেই দৌড়ে এসে বললো,অনন্যা !কেমন আছ তুমি? :ভালো আছি।আপনি কেমন আছেন? :এখন আমি আপনি হয়ে গেলাম?সেদিন কি দোষ ছিল আমার?আমাকে একটিবার কিছু বলার সুযোগ পর্যন্ত দিলেনা! :দেখুন যা হবার তা হয়ে গেছে এখন সেসব বলেতো লাভ নেই তাইনা?তাছাড়া আপনি ভালো করেই জানতেন আমি কেমন ধাঁচের মেয়ে।তবে দেনাপাওনার কথা এসেছিল কেন?আর আপনি তো বলেন নি আপনাদের ব্যবসায় ক্রাইসিস চলছিল?তবে কি সেজন্যই আমাকে বিয়ে করার এতো তাড়া ছিল? :ব্যবসায় ক্রাইসিস ছিল আমি মানছি,তবে এর সাথে বিয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। :তাই বুঝি?সম্পর্ক না থাকলে আপনার বাবা নিশ্চয়ই বিয়ে আগে এসে এসব বলতেন না?আপনারা ভালো করেই জানতেন আগে বললে আমি বিয়ে ভেঙে দিবো,তাই এমন সময়ে বলেছেন যখন আমার বাবাও মেয়ের ভালো ভেবে সাইন করতে দেরি করতো না! :তুমি সবকিছু নিজের মতো করে ভাবছো অনন্যা! :শুনুন মিঃ সাফিন!আমার বাবার সততা নিষ্ঠাবোধ আমার চেয়ে বেশি কেউ জানেনা।তিনি নিজেও যৌতুকের বিরোধী,সেদিন শুধুমাত্র অন্তিমক্ষণে মানসম্মান রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এসব খবর আপনার চাচা বা বাবার জানার কথা না,আপনি সবটা জানতেন এবং আপনিই তাদেরকে এভাবে এগোতে বলেছেন। :হাহাহা! তুমি বুদ্ধিমতি সেটা আমি জানতাম,তবে এতো তুখোড় আগে বুঝিনি!তুমিই বলো তোমাকে বিয়ে করতে কেই বা চাইতো যদি তুমি ওমর চৌধুরীর মেয়ে না হতে?তোমার সৌন্দর্যের প্রশংসা আমি করি,আমি কেন যে কেউ করবে।কিন্তু তোমার মেন্টালিটি ব্যাকডেটেড! কি করতে তুমি? গরীব দুঃখীদের সাথে খেতে,উঠতে বসতে!জাস্ট বিকজ তুমি রিচ ফ্যামিলিতে বিলং করো কেউ তোমাকে কিছু বলতো না।বাট এসব আমার মতো ক্লাসি মানুষদের পছন্দ না তা একদিন ও কি ভেবেছ? কথায় বলে না, "যে যেমন তাঁর সাথেও মিলেও তেমন"? তোমার সাথে নিখিলের মতো ছোটলোকই মানিয়েছে.... আমি হেসে বললাম,ঠিক বলেছেন মিঃ সাফিন!আমার সাথে ছোটলোক নিখিলই মানিয়েছে,কারণ আপনার মতো ছোট মানসিকতার বড়লোক ছেলের চেয়ে নিখিলের মন অনেক অনেক বড়।And I'm proud to have him in my life. আনজুমান কে নিয়ে ওখান থেকে চলে আসলাম,তখন কঠিন ভাষায় কথা বললেও পরে মেনে নিতে কষ্ট হলো সাফিন আমাকে এসব ভাবতো!আমি আন্দাজে কিছু ঢিল ছুড়তেই সে যে এভাবে খোলস খুলে বের হবে কল্পনাও করিনি।আমাকে কাঁদতে দেখে আনজুমান চলে গেল,সারাটা দিন ঘরেই পরে ছিলাম। মা ও ডাকতে আসেননি।কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা।পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর সাইডটেবিলে হাত বাড়াতেই দেখি ফুল নেই! রোজ নিখিল একটা করে গোলাপ ফুল রেখে যায়,আমি জেগেই ফুল হাতে নেই।আজ ফুল না পেয়ে মেজাজটাই বিগড়ে গেল।ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ যেতেই মা বললো,কি রে মা মন ভালো হয়েছে তোর?সারাটাদিন না খেয়ে ছিলি রাতেও খেলি না!নিখিল কতো রাগ করেছে জানিস? (এজন্যই তাহলে ফুল রাখেনি হুহ!) :এখন তো খিদে পেয়েছে অনেক। কি আছে খেতে দাও। খাওয়ার পর আনজুমানকে বললাম,আনজু তোমার মনে আছে প্রথম যেদিন আমি এসেছিলাম তুমি কি বলেছিলে? :কোন কথাটা? :ঐ যে মাগরিবের সময় ও দোআ করেছিলে?তুমি আমাকে আগে থেকে চিনতে?আর ঐ দোআই বা কেন করতে? :ওহ এই ব্যাপার!ভাইয়া তোমাকে এখনো কিছু বলেনি? :না।কি বলবে? :আরে তোমাকে ভাইয়া অনেক আগে থেকে পছন্দ করতো,তুমি একদিন আমাদের পাশের পাড়ায় এসেছিলে।কোন মেয়েকে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা যৌতুকের জন্য মারছিল বলে!সেখানে ভাইয়াও ছিল।সেদিন তোমার কথা শুনে ভাইয়া তোমার প্রেমে পড়ে গেছিল।আমাকে রোজ বলতো,জানিস আনজু এমন মেয়ে আমি আগে দেখিনি।কি তেজী গলা! সেই প্রতিবাদী মেয়েটা আমার মন হরণ করে নিয়ে গেছে,আমার ♡মনোহারিণী♡! কিন্তু যখন ভাইয়া জানতে পারলো তুমি চৌধুরী বাড়ির মেয়ে ,তোমার আশা ছেড়ে দিলো।অতো বড়লোকের মেয়ে কি আর তাঁর বৌ হবে?তোমার বিয়ে উপলক্ষে গেইট সাজানোর পর থেকেই ভাইয়া রোজ গিয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতো।আমাকে সবসময় বলতো,আল্লাহ যদি একটা মিরাকেল ঘটিয়ে দিতো রে জীবনের সব অপূর্ণতার দুঃখ ঘুচে যেত! তাই আমি আল্লাহর কাছে আমার প্রিয় ভাইটার জন্য দোআ করতাম। :হুহ তোমাদের ভাইবোনের দোআর চক্করে আমার এতোবছরের ভালোবাসা হারিয়ে গেল! :ভালোই হয়েছে হারিয়েছে।ওমন বদ ছেলে তোমার যোগ্য না।আমার ভাই তোমাকে কত ভালোবাসে তা যদি দেখতে জীবনেও ঐ লোকের জন্য আফসোস হতো না। :ওরে পাকনা বুড়ি। (বলেই কান মলে দিলাম) ।। মাকে বলে আজ নিখিলের প্রিয় খাবার তৈরি করলাম।তারপর ওর প্রিয় সবুজ রঙের শাড়ি পড়লাম,হাতে সবুজ কাঁচের চুড়ি,চোখে গাঢ় করে কাজল,আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক দিয়ে তৈরি হয়ে গেলাম।মায়ের রুমে গিয়ে বললাম,দেখো তো আম্মু তোমার ছেলের পছন্দসই লাগছে কি না? আনজুমান হেসে বললো,ভাইয়া আজকে জ্ঞান হারাবে! মা আমার কপালে চুমু খেয়ে বললো,তুই এমনিতেই আমার ছেলের পছন্দসই!আজকে তোকে একদম হুরপরীর মতো লাগছে।মাশাআল্লাহ! আনজুমান আমার প্ল্যান বুঝতে পেরে কোত্থেকে গোলাপ ফুল জোগাড় করে পাপড়ি দিয়ে বেড সাজিয়ে ফেললো।নিখিল রাগী মুডে ঘরে ফিরলো,হাতমুখ ধুয়ে ডাইনিং এ বসতেই মা ভেতরে চলে গেলেন।আমি ওকে ভাত বেড়ে দিয়ে বসে আছি।ও একটাবারও আমার দিকে তাকালো না।আমি আগ বাড়িয়ে সব দিচ্ছি কোনো রেসপন্স ই করলো না।আমিও সুযোগে বেশি করে খাবার দিচ্ছি,হুহ অনন্যার সাথে রাগ দেখানো! বুঝুক মজা। সে আর খেতে না পেরে আমার দিকে অসহায় ভঙ্গিতে চেয়ে লোকমা তুললো,আমিও খুশীমনে তাঁর হাতে খেতে লাগলাম। রুমে ঢুকতেই ও হেচকি দিতে লাগলো,আমি দরজা লক করে বেডে গিয়ে বসতেই ও বললো,এসবের মানে কি অনন্যা?বেডে এতো ফুল এসেছে কোত্থেকে? আমি উঠে গিয়ে নিখিলের গলা জড়িয়ে বললাম,পরী এসে সাজিয়ে দিয়ে গেছে।আমাকে বলে,তোদের তো বাসর হলো না,এ জীবনে হবে বলে মনেও হচ্ছে না। তাই আমিই সাজিয়ে দিয়ে গেলাম। নিখিল ফ্যানের নীচেও ঘামতে শুরু করলো বললো,আপনি ঠিক আছেন তো অনন্যা? আমি গাঢ় গলায় বললাম,উহু একদম ঠিক নেই।আপনার প্রেমে আমি পাগল হয়ে গেছি!দেখুন কি জোরে হার্ট বিট করছে!এতো কথা না বলে আমায় আদর করুন তো। নিখিল কাঁপা হাতে আমার গালে হাত রেখে বললো,আমি স্বপ্ন দেখছি না তো!আপনি সত্যি বলছেন? আমি ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে বললাম,এতোদিন কেন বলেন নি ভালোবাসেন? :বলার সাহস হয় নি তো।তাছাড়া আপনিতো সাফিন সাহেবের প্রেমে মত্ত ছিলেন। :হুহ ঢং!এখনো তো বলছেন না। সে আমায় শক্ত করে ধরে বললো,ভালোবাসি অনেক অনেক ভালোবাসি। :আমিও আপনাকে অনেক ভালোবাসি। :আপনি জানেন না অনন্যা আপনি আমার এমন এক পূর্ণতা যা হাজার অপূর্ণতাকে ঘুচে দিয়েছে।আমার প্রাণ প্রিয় মনোহারিণী _____________সমাপ্ত_____________


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩৯ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...