বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আঁখি এবং আমরা ক'জন (২০)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (৩০ পয়েন্ট)



X মুহম্মদ জাফর ইকবাল যখন আমরা জানতে পারলাম ছোট একটা ঘুপচি ঘরে বন্দি হয়ে থাকতে কেমন লাগে আমাদেরকে একটা ঘরের মাঝে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা মেরে দিয়েছে। ঘরের ভেতরে কোনো আলো নেই। একটা ছোট জানালা আছে, সেই জানালা দিয়ে বাইরের আবছা আলো ভেতরে একটুখানি এসে মনে হয় অন্ধকারটাকে আরো জমাট বাঁধিয়ে দিয়েছে। ঘরের ভেতরে সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম, কী বলব কেউ কিছু বুঝতে পারছি না। সবার আগে কথা বলল রিতু। আমাদের দিকে ঘুরে বলল, “তিতু আর সুজন তোরা আমাদের বলবি কী হয়েছে? কেন কাদের বক্স আমাদের ধরে এনেছে?” মামুন বলল, “হ্যাঁ। আমরা কেউ কিছু জানি না, শুধু তোরা দুইজন জানিস।” শান্তা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “তোরা কোনো একটা ঝামেলা করবি আর তার জন্যে আমরা সবাই বিপদে পড়ব? কী করেছিস তোরা?” আমি বললাম, “আমরা কিছুই করিনি–” শান্তা রেগে গিয়ে বলল, “নিশ্চয়ই করেছিস। তা না হলে আমাদেরকে কেন ধরে এনেছে। বল কী করেছিস?” সুজন বলল, “আমরা কিছু করি নাই।” মামুন বলল, “মিথ্যা কথা বলবি না। কী করেছিস বল?” সুজন বলল, “দেখতে চাচ্ছিলাম টুকরিতে কী আছে। আগে জানলে কি দেখার চেষ্টা করি? গ্রেনেড কেন নিবে টুকরিতে-বুড়ো মানুষটা কীরকম বেয়াদপের মতো কথা বলছিল দেখিসনি, জাবেদ চাচাকে খুঁজছিলাম–” সুজনের এই ছাড়া ছাড়া মাথামুণ্ডুহীন কথাবার্তা শুনে কেউ কিছু বুঝতে পারল তাই আমাকে পুরো ব্যাপারটা বলতে হল। তখন সবার রাগটা আমার উপর থেকে সরে গিয়ে পুরোপুরি সুজনের উপর পড়ল। শান্তা চিৎকার করে বলল, “তুই তুই তুই–” তারপর রেগে সুজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল, আমরা কোনোমতে তাকে থামালাম। তখন শান্তা হঠাৎ হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল, বলতে লাগল, “আমাদের এখন কী হবে! হায় ভগবান! কী হবে আমাদের?” আমরা কী বলব বুঝতে পারলাম না। মামুন বলল, “কী হবে? আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে! তা না হলে হাত-পা ভেঙে লুলা বানিয়ে বিক্রি করে দেবে–” শান্তা বলল, “এই অন্ধকারের মাঝে আমাদের ফেলে রেখেছে, কিছু দেখতে পাই না” আঁখি এতোক্ষণ কোনো কথা বলেনি, এই প্রথম সে কথা বলল। শান্তার হাত ধরে বলল, “কাঁদে না শান্তা। ছিঃ! কাঁদে না।” “কেন কাঁদব না? এখন আমাদের কী হবে?” “আমাদের যে ধরে এনেছে সেটা এতক্ষণে জানাজানি হয়নি? নিশ্চয়ই হয়েছে। পুলিশ মিলিটারি কি আমাদের খুঁজতে শুরু করেনি? নিশ্চয়ই করেছে। আগে হোক পরে হোক তারা আমাদের পেয়ে যাবে।” শান্তা কান্না একটু কমিয়ে বলল, “সত্যি?” “হ্যাঁ সত্যি। আমি তো আমার আব্বুকে জানি, আমার আব্বু এদের ছেড়ে দেবে ভেবেছিস? ছাড়বে না, খুঁজে বের করবেই। তাই কাঁদিস না। শুধু শান্ত হয়ে অপেক্ষা কর।” “এই ঘুটঘুঁটে অন্ধকার–” আঁখি বলল, “তোদের কাছে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। আমার কাছে কোনো পার্থক্য নেই। তাই বলছি আয় আমরা সবাই মিলে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করি কী করা যায়। কেঁদে লাভ নেই।” “এই পাজি সুজনটার জন্যে–” আঁখি বলল, “কেন সুজনকে দোষ দিচ্ছিস? এটা তো সুজনের দোষ নয়। এই বদমাইশ মানুষগুলোর দোষ। এরা খারাপ মানুষ।” আঁখির কথায় শেষ পর্যন্ত শান্তা একটু শান্ত হল। আমরা সবাই তখন গোল হয়ে বসলাম কী করা যায় চিন্তা করার জন্যে। বসে বসে আমরা পুরো ব্যাপারটা নিয়ে কথা বললাম, কিন্তু ঠিক কী করা যাবে ভেবে পেলাম না। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার থাকল না। তাই আমরা ছোট ঘরটার দেয়ালটায় পিঠ দিয়ে হেলান দিয়ে বসে বসে সকাল হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। সেই রাতটা ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর রাত। মাত্র একদিন আগেই আমরা নিজেরা নিজেরা কথা বলছিলাম যে আমরা কী আনন্দে আছি! কী সুন্দর রিসোর্ট, ডাইনিং রুমে কী মজার খাবার, কী সুন্দর নরম তুলতুলে বিছানা, কী চমৎকার পরিষ্কার বাথরুম। আমাদের কোনো কিছুই নিজেদের করতে হচ্ছে, কেউ না কেউ আমাদের জন্যে সবকিছু করে দিচ্ছে। সেই অবস্থা থেকে আমরা এসে পড়েছি এই জায়গায়। পেটে খিদে নিয়ে অন্ধকার ঘরে বসে আছি। ঘরের ভেতর দিয়ে পোকামাকড় ইঁদুর ছুটে বেড়াচ্ছে। মশার কামড়ে চুপ করে বসে থাকা যায় না। কুটকুটে দুটো কম্বল দিয়েছে সেই কম্বলে দুর্গন্ধ, শরীরের কোথাও ঘষা লাগলে মনে হয় শরীরের ছাল উঠে যাবে। সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে বাথরুমটা। ঘরের এক কোনায় মাটিতে একটা গর্ত। সামনে একটা ছালা টানিয়ে রেখেছে। সেটাই হচ্ছে বাথরুম। সেখানে ভয়ংকর একটা দুর্গন্ধ। সারা ঘরে সেই দুর্গন্ধ পাক খেয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা সারা রাত ঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে রইলাম। মাঝে মাঝে দুই-এক মুহূর্তের জন্যে চোখ বন্ধ হয়েছে আবার চমকে জেগে উঠেছি। যখন চোখ বন্ধ হয়েছে তখন ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছি। স্বপ্ন দেখেছি কাদের বক্স রাইফেল তাক করে হা হা করে হাসছে, কী ভয়ংকর সেই হাসি। যখন নিশুতি রাত তখন আমরা জঙ্গলের নানা পশুপাখির শব্দ শুনতে পেলাম, কী বিচিত্র তাদের ডাক। কোনো কোনো পশুর গলার আওয়াজ শুনলে মনে হয় বুঝি কেউ চিৎকার করে কাঁদছে। পাখি ডানা ঝাঁপটে উড়ে যায় এবং মাঝে মাঝে বহু দূর থেকে কোনো এক ধরনের ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে পাই, মনে হয় বহু দূরে নদী দিয়ে স্পিড বোট যাচ্ছে। আমাদের খুঁজতে পুলিশ বের হয়েছে কী না কে জানে। আমি ভেবেছিলাম সারা রাত নিশ্চয়ই আমি ঘুমাতে পারব না কিন্তু ভোর রাতের দিকে আমার চোখে ঘুম নেমে এল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আমি স্বপ্নে দেখলাম আমি বাসায় আমার বিছানায় আধশোয়া হয়ে একটা গল্পের বই পড়ছি, আমার আম্মু তখন প্লেটে করে আমার জন্যে ঝাল করে মাখানো মুড়ি নিয়ে এসেছেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা তিতু তোদের না কি কাদের বক্স ধরে নিয়ে গিয়েছিল?” আমি হি হি করে হেসে বললাম, “কী বলছ আম্মু? কাদের বক্স কেন আমাদের ধরে নেবে? এই দেখ না আমি বাসায় আমার বিছানায় বসে আছি?” ঠিক তখন আমার ঘুম ভেঙে গেল আর আমি বুঝতে পারলাম আমি বাসায় আমার বিছানায় বসে নাই। আমাকে আর অন্য সবাইকে কাদের বক্স ধরে এনেছে। আমি বুকের ভেতর ভয়ংকর এক ধরনের চাপা আতঙ্ক অনুভব করলাম। বাইরে নিশ্চয়ই আলো হয়েছে কারণ ঘরের ভেতরেও এখন আবছা আলো। ঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে অন্যেরা গুটিশুটি মেরে বসে আছে। আমার মতোন সবাই নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমি উঠে জানালার কাছে এগিয়ে গেলাম, জানালা না বলে সেটাকে বরং একটা ফুটো বলা ভালো, আমি সেই ফুটো দিয়ে বাইরে তাকালাম। আমাদের রাতেরবেলা চোখ বেঁধে এনেছে তখন কিছু দেখতে পাইনি। এখন দেখা যাচ্ছে জায়গাটা দুটো টিলার মাঝখানে, চারপাশে গাছগাছালি দিয়ে ঢাকা। সামনে আরেকটা ঘর, সেই ঘরের বারান্দায় একটা মানুষ বসে সিগারেট খাচ্ছে। এই মানুষটা নিশ্চয়ই পাহারা দিচ্ছে, তার ঘাড়ে একটা ভয়ংকর দেখতে রাইফেল। এটাকে নিশ্চয়ই এ কে ফোর্টি সেভেন বলে। আমি তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ঘরের দরজাটি খুলে গেল এবং ভিতর থেকে খালি গায়ে একজন মানুষ বের হয়ে আসে, আমি মানুষটিকে চিনতে পারি-কাদের বক্স। কাদের বক্স বগলের তলা দিয়ে ঘ্যাস ঘ্যাস করে খানিকক্ষণ চুলকায় তারপর পাহারায় থাকা মানুষটির কাছ থেকে একটা সিগারেট নেয়। সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে সে আবার ভিতরে ঢুকে গেল। আমি খানিকটা ধমকাধমকির শব্দ শুনলাম তখন ভেতর থেকে আরো কয়েকজন মানুষ ঘুম ঘুম চোখে বের হয়ে এল। এই ঘরটায় কাদের বক্স মনে হয় তার বডি গার্ডদের নিয়ে ঘুমায়। “কী দেখছিস?” গলার স্বর শুনে আমি ঘুরে তাকালাম, রিতু আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। “কিছু না। জায়গাটা কীরকম, কারা কোথায় থাকে এইসব।” “দেখি?” আমি সরে দাঁড়িয়ে বললাম, “দেখ কিন্তু মনে রাখিস তুই কিন্তু আসলে দেখতে পাস না।” “জানি।” রিতু বলল, “ঐ মানুষগুলোর সামনে আমি সবসময়ই না দেখার ভান করব। চিন্তা করিস না।” যখন খানিকটা বেলা হল এবং আমরা সবাই উঠে জড়সড় হয়ে বসে আছি তখন হঠাৎ করে দরজায় শব্দ হল। আমরা টের পেলাম কেউ একজন দরজার তালা খুলছে। কাঁচক্যাচ শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল এবং আমরা দেখলাম ভয়ানক চেহারার একজন মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটা হুংকার দেওয়ার মতো শব্দ করল, বলল, “কানা মেয়েটা কই?” রিতু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “এই যে।” “তুই আয়। অন্যেরা খবরদার ঘর থেকে বের হবি না।” রিতু জিজ্ঞেস করল, “কেন?” “নাস্তা নিয়ে আসবি।” “আমি?” “হ্যাঁ।” আমি বললাম, “ও তো চোখে দেখতে পায় না, ওর বদলে আমি আসি?” “ও চোখে দেখে না বলেই ওরে আনতে বলছি। তুই চোখে দেখিস তাই চোখ না বেঁধে তোকে ঘর থেকে বের করব না। বুঝেছিস?” আমি কোনো কথা বললাম না। লোকটা রিতুর হাত ধরে বাইরে নিয়ে আবার দরজা বন্ধ করে দিল। আমরা ঘরের ফুটো দিয়ে তাকালাম, দেখলাম রিতু চোখে দেখতে পায় না এরকম অভিনয় করে খুব সাবধানে মানুষটার সাথে সাথে হেঁটে কয়েকটা গাছের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সে হাতে একটা মাঝারি সাইজের গামলা নিয়ে খুব আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে আসে। তার পিছনে পিছনে সেই ভয়ানক চেহারার মানুষটা আসছে। মানুষটা ঘরের দরজা খুলে দিল, রিতু সাবধানে গামলাটা মেঝেতে রাখল। মানুষটা বলল, “যা এখন থালা বাসন নিয়ে আয়। পারবি না?” রিতু মাথা নাড়ল, বলল, “পারব। একটা লাঠি হলে আরো ভালো হত।” মানুষটা বেঁকিয়ে উঠে বলল, “নবাবজাদির লাঠি লাগবে! যা যা এমনি এমনি যা।” রিতু তখন এমনি এমনি রওনা দিল। মানুষটা এবারে আমাদের ঘরের দরজায় বসে রিতুর দিকে তাকিয়ে থাকে। রিতু পা ঘষে ঘষে হাত দিয়ে সামনে কী আছে অনুভব করার চেষ্টা করতে করতে এগিয়ে যায়। আবার কয়েকটা গাছের আড়ালে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার সে হাতে কয়েকটা টিনের প্লেট আর চামচ নিয়ে ফিরে এলো। চোখে না দেখার নিখুঁত অভিনয়–আমরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। রিতুকে আরো একবার যেতে হল, এবারে সে একটা পানির জগ আরেকটা গ্লাস নিয়ে এল। ঘরের ভেতরে আবার আমাদের তালা মেরে বন্ধ করার আগে মানুষটা রিতুকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, তোর চোখ তো ভালো আছে, দেখিস না কেন?” “অপটিক নার্ভ নষ্ট।” “সেটা আবার কী?” “চোখ থেকে যে নার্ভ ব্রেনে সিগন্যাল পাঠায় সেটা নষ্ট।” “কীভাবে নষ্ট হল?” “যখন ছোট ছিলাম তখন একবার অসুখ হয়েছিল। ডাক্তার ভুল ওষুধ দিয়েছিল। সেই ওষুধের রি-একশান।” মানুষটা জিব দিয়ে চুক চুক শব্দ করে বলল, “হারামজাদা ডাক্তার।” রিতু বলল, “ইচ্ছা করে তো দেয় নাই। ভুল করে দিয়েছিল।” “একই কথা।” বলে লোকটা ধরাম করে দরজা বন্ধ করে ঘটাং করে তালা মেরে দিল। সাথে সাথে আমরা রিতুকে ঘিরে ধরলাম, “বাইরে কী দেখলি?” “ঐ গাছগুলোর পিছনে আরেকটা ছোট ঘর। কাঠের চুলা আছে, সেখানে রান্নাবান্না হয়। একজন বুড়ো মানুষ রান্না করছে। কয়েকজন মানুষ বন্দুক হাতে জায়গাটা পাহারা দিচ্ছে। দূরে আরো একটা ঘর আছে।” “সব মিলিয়ে তোজন মানুষ?” “এখন দশ জনের মতো। কয়েকজন খাচ্ছে। খেয়ে বের হবে।” “রাস্তা আছে?” “হ্যাঁ। একটাই রাস্তা, ডানদিক দিয়ে। নিচে নেমে গেছে।” “আর আমাদের ঘরে তালা মেরে বাইরে একটা খুঁটির সাথে চাবি ঝুলিয়ে রাখে।” আঁখি বলল, “আয় আমরা আগে খেয়ে নিই।” রিতু বলল, “হ্যাঁ। সবাই ভালো করে খা।” গামলা বোঝাই খিচুড়ি। মানুষগুলো খাবার নিয়ে কিপটেমি করেনি, নিজেরা যে পরিমাণ খায় সে হিসেবে দিয়েছে। আমরা যে অনেক কম খাই সেটা লোকগুলো জানে না। আমরা সবাই একটা করে টিনের প্লেট নিলাম, শান্তা বড় একটা চামচ দিয়ে আমাদের প্লেটে খাবার তুলে দিল। খিচুড়িটা বিস্বাদ। লবণ নেই এবং ভয়ানক ঝাল। মাত্র একদিন আগেই আমরা ডাইনিং রুমের বিশাল টেবিলে বসে নাস্তা করেছি, ঝকঝকে গ্লাস, ধবধবে সাদা ন্যাপকিন। অরেঞ্জ জুস, টোস্ট, মাখন, জেলি, ডিম পোচ, দুধ, সিরিয়াল, আপেল, কলা আর গরম চা দিয়ে নাস্তা করেছি। এখন নাস্তা করছি শুধু খিচুড়ি দিয়ে! সেটাও বিস্বাদ আর ঝাল। সবার জন্যে একটা মাত্র পানির গ্লাস, যে পানিটা দিয়েছে সেটা কোথা থেকে এনেছে জানি না। তারপরেও আমরা পানি খেলাম, যখন তেষ্টা পায় তখন পানি খেয়ে থাকা যায় না। খাওয়া শেষ হবার পর আমি লক্ষ করলাম আঁখি খিচুড়ির বড় চামচটা হাতে নিয়ে সেটা হাত দিয়ে পরীক্ষা করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী করছিস?” “এই চামচটা পরীক্ষা করছি। বেশ বড় আর শক্ত।” “তাতে কী হয়েছে?” “আমাদের এই ঘরের মেঝেটা মাটির। তাই না?” “হ্যাঁ।” “আমরা গর্ত করে বের হয়ে যাই না কেন?” আমরা সবাই আঁখির দিকে তাকালাম। আঁখি চামচটা ঘ্যাঁচ করে মাটিতে বসিয়ে এক খাবলা মাটি তুলে ফেলল। বলল, “দেখলি, মাটি কাটা যায়।” সুজন বলল, “গর্ত করব? সেই গর্ত দিয়ে বের হওয়া যাবে?” “হ্যাঁ।” আমি বললাম, “চোরেরা যেভাবে সিধ কেটে ঢুকে?” আঁখি বলল, “হ্যাঁ।” “যদি ধরা পড়ি?” “ধরা পড়া যাবে না।” শান্তা বলল, “এই চামচটা তো ফিরিয়ে দিতে হবে।” রিতু বলল, “এখানে আরো চামচ আছে। আমাকে যদি বের হতে দেয় আমি চুরি করে আরেকটা নিয়ে আসব।” আমি হাতে কিল দিয়ে বললাম, “ফ্যান্টাস্টিক। ফাটাফাটি বুদ্ধি!” শান্তা জিজ্ঞেস করল, “মাটিগুলো কী করব? গর্ত করলে যে মাটি বের হবে সেগুলো?” আমরা থতমত খেয়ে গেলাম, সত্যিই তো, এতগুলো মাটি কী করব? লোকগুলো যদি দেখে ঘরের ভিতর এতো মাটি তা হলেই বুঝে যাবে। আমরা সবাই মাথা চুলকাতে থাকি তখন মামুন বলল, “আমরা যদি দুই ফুট ব্যাসে একটা গর্ত করি, গর্তটা যদি তিন ফুট লম্বা হয় তা হলে মোট মাটি কাটা হবে দশ কিউবিক ফুট। এই ঘরটা হচ্ছে আনুমানিক চার থেকে পাঁচশ বর্গফুট। যদি আমরা মাটিটা সারা ঘরে সমানভাবে ছড়িয়ে দিই তা হলে মেঝেটা বড় জোর এক ইঞ্চির চারভাগের একভাগ উঁচু হবে! কেউ বুঝতে পারবে না।” রিতু বলল, “ভেরি গুড, সায়েন্টিস্ট সাহেব!” আঁখি বলল, “তা হলে দেরি করে কাজ নেই। কাজ শুরু করে দিই।” আমি বললাম, “হ্যাঁ, চুপ করে বসে বসে অপেক্ষা করা খুব কঠিন।” রিতু বলল, “তা হলে ঠিক করে নে, ঠিক কোথায় গর্ত শুরু করব।” “দেয়ালের খুব কাছ থেকে গর্ত করতে হবে। তা হলে তাড়াতাড়ি বের হওয়া যাবে। যেদিকে বের হব সেদিকে যেন মানুষজন হাঁটাহাঁটি না করে।” রিতু বলল, “সামনে আর ডান পাশে মানুষ থাকে। পিছনে জঙ্গল, মানুষ নেই।” কাজেই আমরা পিছনের দিকে একটা জায়গা বেছে নিয়ে কাজ শুরু করলাম। একজন চামচ দিয়ে মাটি কাটে অন্যজন মুঠি করে মাটিটা নিয়ে ঘরে ছিটিয়ে দেয়। আরেকজন সেটা পা দিয়ে চেপে সমান করে দেয়। একজন হাতে একটা কম্বল নিয়ে রেডি থাকে-হঠাৎ করে কেউ যদি চলে আসে তা হলে গর্তের উপর কম্বলটা বিছিয়ে দেবে। বাকি দুজন পাহারা, আশেপাশে কাউকে আসতে দেখলেই ইশারা করে তখন আমরা থেমে যাই। কেউ যেন কোনো রকম শব্দও শুনতে না পায়। এর মাঝে সবচেয়ে কঠিন মাটি কাটা। চামচ না হয়ে যদি একটা খন্তা কিংবা কোদাল পেতাম তা হলে কী সহজে কাজটা করা যেত। যদি খন্তা কোদাল না হয়ে একটা খুরপিও পেতাম তা হলেও কাজটা দশগুণ সহজ হয়ে যেত। কিন্তু আমরা সেগুলো নিয়ে এখন মাথা ঘামালাম না-হাতের কাছে যেটা পেয়েছি সেটা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। কাজ শুরু করার দুই ঘণ্টা পর্যন্ত এমন কোনো গর্তই হল না, আমাদের সন্দেহ হতে লাগল আসলেই আমরা মাটি কেটে সত্যিকারের একটা গর্ত করতে পারব কি না। তৃতীয় ঘণ্টা শুরু করার পর প্রথমবার মনে হতে লাগল যে কাজটা আসলেই শেষ করা সম্ভব। আমরা যে গতিতে মাটি কেটে যাচ্ছি তাতে মনে হয় রাত বারোটার ভিতরেই আমরা গর্তটা শেষ করে ফেলতে পারব। যদি কোনোভাবে আরো একটা চামচ বা ধারালো কিছু পেয়ে যেতাম তা হলে কাজটা আরো তাড়াতাড়ি শেষ করা যেত। দুপুরের ভিতর বেশ বড় একটা গর্ত হয়ে গেল। এখন আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে সত্যিই একটা গর্ত তৈরি করে ফেলতে পারব। এরকম সময় দরজায় শব্দ হল এবং বেশ কয়েকজন মানুষ ঘরের ভিতরে ঢুকল। আমরা খুব তাড়াতাড়ি কম্বল দিয়ে জায়গাটা ঢেকে দিয়েছি। যারা ঢুকেছে তাদের সবার সামনে কাদের বক্স, তার হাতে একটা ক্যামেরা। ভিতরে ঢুকে সে চারিদিকে তাকাল, ভয়ে আমাদের বুক ধুকপুক করতে থাকে। কম্বল দিয়ে যেখানে গর্তটা ঢেকে ফেলা হয়েছে, তার সামনে আঁখি বসে আছে যেন কেউ ওদিকে না যায়। কাদের বক্স বলল, “সবাই এদিকে আয়।” আমরা তার কথামতো পাশাপাশি এসে দাঁড়ালাম। তখন সে ক্যামেরা দিয়ে একজন একজন করে আমাদের সবার ছবি তুলল। তারপর জিব দিয়ে সন্তুষ্টির একটা শব্দ করে বলল, “তোদের ছবি নিয়ে নিলাম।” আমরা কোনো কথা বললাম না। তখন কাদের বক্স বলল, “তোদের বাপ মায়ের কাছে পাঠাব। কী মনে হয়, তোদর বাপ-মা টাকা-পয়সা কিছু দেবে? না কী তোরা সব বাপে খেদানো মায়ে খেদানো ছেলেমেয়ে? তোদের কী হল সেটা নিয়ে বাপ-মায়ের কোনো মাথাব্যথা নেই?” এবারেও আমরা কোনো কথা বললাম না। কাদের বক্স তখন একটু গরম হয়ে বলল, “কী হল, কথা বলিস না কেন?” আঁখি বলল, “উল্টোটাও তো হতে পারে?” “উল্টোটা? সেটা আবার কী?” “আমাদের বাবা-মা খুঁজে আপনাদের বের করে ফেলে। পুলিশ মিলিটারি আপনাদের এরেস্ট করে ফেলে।” কাদের বক্স এরকম একটা উত্তরের জন্যে প্রস্তুত ছিল না, সে থতমত খেয়ে যায়। তারপর হঠাৎ করে রেগে উঠে, “কী বললি তুই? আমি এরেস্ট হব? আমি? কাদের বক্স? শুনে রাখ, পুলিশের বাবার সাধ্যি নাই আমাকে এরেস্ট করে। বুঝেছিস?” কাদের বক্সের সাথে যে মানুষগুলো এসেছে তাদের একজন বলল, “কতো বড় বেয়াদপ মেয়ে। এক চড় মেরে দাঁতগুলো খুলে ফেলা দরকার। ওস্তাদ দিব না কি একটা চড়?” কাদের বক্স হাত নেড়ে বলল, “বাদ দে। মজা তো এখনো টের পায় নাই, সেই জন্যে এতো তেজ!” কাদের বক্স তার লোকজনকে নিয়ে বের হয়ে গেল আর সাথে সাথে আমরা আবার কাজে লেগে গেলাম। দেখতে দেখতে আমাদের হাত লাল হয়ে উঠল। হাতের চামড়া উঠে গেল, ফোঁসকা পড়ে গেল কিন্তু আমরা থামলাম না। আমরা মাটি খুঁড়ে যেতেই লাগলাম। খুঁড়ে যেতেই লাগলাম। . মাঝখানে দুপুরে আমাদের খেতে দিল, আগেরবারের মতো রিতুকে আনতে হল না, তাদের একজন নিজেই দিয়ে গেল। খাবারের মেনু খুবই সহজ, শুকনো মোটা রুটি আর বুটের ডাল। আমাদের বাসায় কেউ এরকম একটা খাবার আমাদের জোর করেও খাওয়াতে পারত না। কিন্তু এখানে আমরা গপগপ করে রীতিমতো কাড়াকাড়ি করে খেলাম। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে আমাদের সবারই পরিশ্রম হয়েছে, সবারই পেটে খিদে! সত্যি কথা কী এই মোটা রুটি আর বুটের ডালকে মনে হল অসাধারণ! দেখতে দেখতে অন্ধকার হয়ে গেল। অন্ধকারে আমরা হাতড়ে হাতড়ে কাজ করি। আঁখির মাঝে আর আমাদের মাঝে তখন আর কোনো পার্থক্য থাকে না। আঁখি তখন গর্তটা পরীক্ষা করে আমাদের বলে দেয় কোনদিকে কতোটুকু গর্ত করতে হবে। আমরা সেদিকে গর্ত করি। রাতে আমাদের কিছু খেতে দিল না। একেবারে কিছু দিল না সেটা সত্যি নয়, ঘরের জানালা দিয়ে কিছু কলা ধরিয়ে দিল। মোটা মোটা কলা, খেতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম পুরোটাই বিচি দিয়ে ভরা। কলার যে বিচি থাকে আমরা সেটাই কোনোদিন জানতাম না। এক কামড় কলা খেতে হলে পুটুর পুটুর করে একশটা বিচি মুখ থেকে ছুঁড়ে দিতে হয়–ভারি যন্ত্রণা। বাসায় রাত্রি বেলা ভালো করে খাওয়ার জন্যে আম্মু কতোরকম সাধাসাধি করেন–আর এখানে রাতের খাবার হচ্ছে জন প্রতি একটা করে বিচিকলা, কপাল আর কাকে বলে। তবে সেই বিচিকলা খেয়েই আমরা কাজ করে গেলাম। গভীর রাতে যখন বাইরের মাটি ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ে গর্তটা বের হয়ে এলো আমরা তখন ঘরের ভেতরে এতোটুকু শব্দ না করে আনন্দে নাচানাচি করতে থাকি। কাদের বক্স আর তার দলের নাকের ডগা দিয়ে আমরা এখন পালিয়ে যাব!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩৮ জন


এ জাতীয় গল্প


Warning: mysqli_fetch_array() expects parameter 1 to be mysqli_result, boolean given in /var/sites/g/golperjhuri.com/public_html/story.php on line 344

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...