বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন

বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা

আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আঁখি এবং আমরা ক'জন (১৮)

"ছোটদের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান TARiN (১০২৯ পয়েন্ট)



X মুহম্মদ জাফর ইকবাল যখন সবকিছুই ঠিক ঠিক চলছিল কিন্তু না বুঝেই আমরা একটা খুব বড় বিপদে পা দিয়ে ফেললাম খুব সকালে আমার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ বুঝতে পারলাম না আমি কোথায়। হঠাৎ করে মনে পড়ল তখন আমি উঠে বসে চারিদিকে তাকালাম। রাত্রিবেলা উজ্জ্বল আলোতে ঘরটাকে এক রকম লেগেছিল, সকালের আবছা আলোতে আবার অন্যরকম লাগছে। আমি বিছানা থেকে নেমে অন্য দুটি বিছানায় শুয়ে থাকা মামুন আর সুজনকে দেখলাম। প্রত্যেকটা মানুষের মনে হয় ঘুমানোর নিজস্ব একটা স্টাইল আছে। মামুন দুই হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমিয়েছে–সুজন ঘুমিয়েছে একেবারে গুটিসুটি মেরে। আমি তাদেরকে ঘুম থেকে না জাগিয়ে বাইরে বারান্দায় গিয়ে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম। চারিদিকে অনেক গাছ, সেই গাছে হাজার হাজার পাখি কিচিরমিচির করছে। আমি নিচে তাকালাম, অনেক নিচ দিয়ে একটা নদী এঁকেবেঁকে যাচ্ছে, এটা নিশ্চয়ই শঙ্খ নদী। পাহাড় জঙ্গল নদী কোথাও কোনো মানুষ নেই। নির্জন সুনসান দেখে কী অবাক লাগে। আমি চুপচাপ অনেকক্ষণ বসেছিলাম তখন খুট করে শব্দ হল। তাকিয়ে দেখি দরজা খুলে ঘুম ঘুম চোখে রিতু বের হয়ে আসছে। আমাকে দেখে বলল, “তুই এখানে বসে আছিস? কতক্ষণ থেকে?” “ঘুম ভেঙে গেল, তাই বসে আছি।” রিতু বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওমা! কী সুন্দর।” “হ্যাঁ, খুব সুন্দর।” ”সবচেয়ে সুন্দর কোন জিনিসটা, বল দেখি?” “কোনটা?” “কোনো টেম্পো গাড়ি নাই। মানুষজন নাই। চিৎকার চেঁচামেচি নাই।” আমি মাথা নাড়লাম। বললাম, “ঠিকই বলেছিস।” রিতু কিছুক্ষণ আমার পাশে চুপচাপ বসে থেকে বলল, “এই হোটেলটা কি সুন্দর দেখেছিস?” আমি বললাম, “হোটেল না! এইটা হচ্ছে রিসোর্ট!” “দুইটার মাঝে পার্থক্য কী?” আমি বললাম, “জানি না। মনে হয় হোটেল হচ্ছে বড়লোকদের জন্যে আর রিসোর্ট হচ্ছে আরো বেশি বড়লোকদের জন্যে।” রিতু হাসল। বলল, “হ্যাঁ এখানে সবকিছুর মাঝে একটা বড়লোক বড়লোক ভাব। কালকে রাতে যখন আমরা খাচ্ছি তখন নিশ্চয়ই কয়েক হাজার টাকা বিল হয়েছে!” “আমাদের এই ঘরগুলোও নিশ্চয়ই এক দিনে কয়েক হাজার টাকা ভাড়া।” রিতু মাথা নাড়ল, বলল, “ঠিকই বলেছিস। বড়লোকেরা কীভাবে থাকে সেটা একটু আন্দাজ হল!” আমরা হি হি করে হাসলাম। . কিছুক্ষণের মাঝে অন্যেরাও ঘুম থেকে উঠে গেল, তখন সবাই মিলে হইচই করে বাথরুমে গিয়ে রেডি হতে থাকি। আমরা যখন স্কুলে একজন আরেকজনকে দেখি তখন একভাবে দেখা হয়, আর যখন এভাবে একসাথে থাকি তখন অন্যভাবে দেখা হয়। যেমন মামুন হচ্ছে আমাদের মাঝে সায়েন্টিস্ট মানুষ, তার হওয়ার কথা ভুলাভালা টাইপের কিন্তু সে হচ্ছে সবচেয়ে চটপটে। সুজন হচ্ছে দুষ্টু নাম্বার ওয়ান তার হওয়ার কথা সবচেয়ে চটপটে সে হচ্ছে সবচেয়ে ঢিলে! বাথরুমে ঢুকলে বেরই হতে চায় না। এর মাঝে একসময় নিশাত আপু এসে আমাদের খোঁজ নিয়ে গেলেন। বলেছেন আটটার ভিতরে ডাইনিং হলে চলে আসতে, নাস্তা খেয়ে আমরা বের হব। আমরা আটটার আগেই সবাই ডাইনিং রুমে চলে এসেছি। ভোরবেলা অনেকে নাস্তা করেই বের হয়ে যাবে। সকালেও আঁখি ঠিক স্বাভাবিক মানুষের মতো হেঁটে এসেছে। আমরা এবারে আরেকটা মজার ব্যাপার লক্ষ করলাম, রিসোর্টের ম্যানেজার নিশ্চয়ই আঁখির ব্যাপারটা জানে কিন্তু কোন জন আঁখি ধরতে পারছেন না। রিতু তখন দুষ্টুমি করে ভান করতে লাগল সে দেখতে পায় না। কোনো কিছু ধরার আগে একটু হাত বুলিয়ে জিনিসটা দেখে সোজা একদৃষ্টে একদিকে তাকিয়ে থাকে। কথা বলার সময় কারো দিকে তাকায় না! ম্যানেজার সাহেব তখন ধারণা করে নিলেন রিতুই হচ্ছে আঁখি। ডাইনিং টেবিলে খাবার দেওয়ার সময় তখন রিসোর্টের সবাই মিলে রিতুর যত্ন করতে লাগল! নাস্তা করেই আমরা বের হয়ে গেলাম। বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করছিল, জাবেদ চাচা গাড়িতে ওঠার আগে ড্রাইভার চাচাকে জিজ্ঞেস করলেন, “রতন, পাহাড়ি রাস্তায় তুমি গাড়ি চালাতে পারবে তো? অসুবিধে হলে বল, তা হলে আমরা লোকাল ড্রাইভার নিয়ে একটা চান্দের গাড়ি ভাড়া করে নিই!” ড্রাইভার চাচা এমনভাবে হেসে উঠলেন যে তার থেকে বোঝা গেল কেউ তার জীবনে এরকম হাস্যকর কথা বলেনি। তিনি থাকতে আরেকজন গাড়ি চালাবে সেটি কিছুতেই হতে পারে না। এ ধরনের একটা কথা বলাই তার জন্যে বড় ধরনের অপমান। আমরা আবার গাড়িতে উঠে বসেছি। আগের মতোন ড্রাইভারের পাশের সিটে জাবেদ চাচা। পিছনে নিশাত আপু। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে গাড়ি যেতে থাকে। আমরা শহরে মানুষ হয়েছি কখনো বনজঙ্গল দেখিনি, রাস্তার দুই পাশে জঙ্গল দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। পাহাড়ি রাস্তা, কখনো উঁচু কখনো নিচু হঠাৎ হঠাৎ দূরে একটা নদী চিকচিক করে ওঠে দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই। একটা বড় টিলাঘরে যাবার সময় হঠাৎ দেখি রাস্তার পাশে বেশ কিছু পুলিশ মিলিটারি দাঁড়িয়ে আছে। তারা হাত তুলে আমাদের গাড়ি থামাল। কঠিন চেহারার একজন মিলিটারি গাড়ির ভিতরে আমাদেরকে একনজর দেখে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাবেন?” জাবেদ চাচা বললেন, “এখনো জানি না, বাচ্চাগুলো যতদূর যেতে চায়।” নিশাত আপু বললেন, “কোনো সমস্যা?” মিলিটারি মানুষটা কোনো উত্তর না দিয়ে গাড়ির ভিতরে উঁকিঝুঁকি দিতে লাগল। এরকম সময় কমবয়সী আরেকজন মিলিটারি এল, তাকে দেখে কঠিন চেহারার মানুষটা একটা সেলুট দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তার মানে কমবয়সী এই মানুষটা নিশ্চয়ই অফিসার। নিশাত আপু তখন জানালা দিয়ে মাথা বের করে বললেন, “এখানে কী কোনো কিছু হয়েছে? কোনো সমস্যা?” কমবয়সী অফিসারটি বলল, “না! আপনাদের কোনো সমস্যা না।” “তা হলে আপনাদের সমস্যা?” অফিসারটি হাসার চেষ্টা করে বলল, “আমাদের তো সবসময়ই সমস্যা। আমাদের কাজই হল সবাইকে সন্দেহ করা, সবার গাড়ি চেক করা।” রিতু জানালা দিয়ে মাথা বের করে জিজ্ঞেস করল, “আপনারা কী চেক করেন?” “এই তো! কেউ ড্রাগস নিচ্ছে কি না, আর্মস নিচ্ছে কি না এই সব দেখি।” রিতু হেসে বলল, “আমরা এসব কিছু নিচ্ছি না।” অফিসারটি বলল, “জানি! তবু দেখতে হয়। এটাই হচ্ছে আমাদের ডিউটি!” তারপর হাত নেড়ে ড্রাইভারকে চলে যেতে বলল। আঁখি বলল, “আহা বেচারা।” শান্তা জিজ্ঞেস করল, “কেন আহা বেচারা?” “এই যে এরকম একটা সুন্দর জায়গায় থাকে, কিন্তু তাদের কাজটা হচ্ছে সবাইকে সন্দেহ করা!” আমরা মাথা নাড়লাম, আঁখি ঠিকই বলেছে। . গাড়ি করে ঘুরে ঘুরে আমরা উপরে উঠতে থাকি। আমাদের মতো আরো অনেকে বেড়াতে এসেছে, মাঝে মাঝেই তারা পথের ধারে গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলছে। আমরাও একটা সুন্দর জায়গায় গাড়ি থামালাম। এক পাশে পাহাড়ি ঢাল তাই আঁখিকে শান্তা ধরে রাখল। আমরাও কিছু ছবি তুলোম, নিশাত আপুর কাছে একটা ভিডিও ক্যামেরা, সেটা দিয়ে ভিডিও করলেন। আমরা আবার গাড়িতে উঠেছি, আবার গাড়ি করে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি পথের পাশে একটা জায়গায় অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, অনেক মানুষের ভিড়। শান্তা জিজ্ঞেস করল, “ওখানে কী হচ্ছে?” নিশাত আপু বললেন, “একটা ছোট বাজারের মতোন। পাহাড়ি মানুষদের হাতে তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি হয়।” রিতু বলল, “আমরা থামি?” নিশাত আপু বললেন, “ঠিক আছে।” আমরা গাড়ি থেকে নেমে আবিষ্কার করলাম, মানুষের ভিড় ঠেলে আমরা যেতে পারব কিন্তু আঁখির বেশ অসুবিধে হবে। সে চোখে দেখতে পায় না বলে তাকে সবকিছু হাত বুলিয়ে দেখতে হয়। এখন যে ঠেলাঠেলি হচ্ছে হাত বুলানো দূরে থাকুক ভালো করে কেউ চোখ দিয়েও দেখতে পাবে না! জাবেদ চাচা বললেন, “সকালে এখানে খুব ভিড় হয়। তোমরা বিকালের দিকে এসো তখন নিরিবিলি ঘুরে দেখতে পারবে।” আমরা রাজি হয়ে গেলাম। বান্দরবানের পাহাড়ে এসে কারো ভিড় ঠেলাঠেলি করতে ইচ্ছে করছে না। প্রায় তিন ঘণ্টা পাহাড়ে ঘোরাঘুরি করে আমরা টের পেলাম আমাদের বেশ খিদে পেয়েছে। নিশাত আপু বললেন, “চল এখন রিসোর্টে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করে নিই!” লাঞ্চের কথা শুনে খিদেটা এক মুহূর্তে চাগিয়ে উঠল। খানিকটা দূরে না কী একটা জলপ্রপাত আছে, আমরা আপাতত সেটা না দেখেই ফিরে আসতে শুরু করি। পেটে খিদে থাকলে কোনো কিছুই ভালো লাগে না, কোনো কিছুই সুন্দর দেখায় না। আসার পথে আবার পুলিশ মিলিটারির দলটা আমাদের গাড়িকে থামাল। এবারে আগের অফিসারটি নেই। তাই আবার জাবেদ চাচাকে আমাদের নিয়ে একটু প্রশ্ন করল। আমাদের একনজর দেখে গাড়ির ভিতরে একটু চোখ বুলিয়ে আমাদের ছেড়ে দিল। রিসোর্টে পৌঁছে প্রথমেই আমরা ধড়াস করে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মামুন বলল, “ঘুরে বেড়ানোর সময় কেউ কোনো কাজ করে না। কিন্তু কেমন পরিশ্রম হয় দেখেছিস?” আমি বললাম, “হ্যাঁ! বান্দরবান এখনো শুরুই করিনি। রাঙামাটি কক্সবাজার বাকি, এখনই টায়ার্ড হলে কেমন করে হবে?” সুজন বিছানায় উঠে বসে বলল, “কে বলেছে টায়ার্ড হয়েছি। মোটেই টায়ার্ড হইনি! কী মজা হচ্ছে দেখেছিস? কোনো কিছু নিজেদের করতে হচ্ছে না। খাওয়ার সময় খাওয়া, ঘুমের সময় ঘুম! এই দেখ সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানাটা উল্টাপাল্টা করে গেছিলাম, বাথরুমটা নোংরা করে গেছিলাম কেউ এসে বিছানাটা বানিয়ে দিয়েছে, বাথরুমটা পরিষ্কার ঝকঝকে তকতকে করে দিয়েছে! কেউ বকা দিচ্ছে না, টেবিল পরিষ্কার করতে দিচ্ছে না। যা ইচ্ছে তাই করতে পারি! কী মজা।” মামুন উঠে বসে বলল, “আসলেই! এবারে বেশি মজা হচ্ছে। আরেকবার বেড়াতে গিয়েছিলাম সাথে বড় মানুষেরা ছিল তারা সবসময় ধমক দিচ্ছে, এটা করো না সেটা করো না। এবারে সেগুলো নাই।” সুজন বলল, “ইচ্ছে হলে বরং আমরাই ধমক দিয়ে দিতে পারব।” আমিও তাদের সাথে সাথে মাথা নাড়লাম, কিন্তু আমি আগে কখনোই একা একা কোথাও যাইনি। অনেক মজা আর অনেক আরাম হচ্ছে ঠিকই কিন্তু আমার মাঝে মাঝেই আম্মুর কথা মনে হচ্ছে। সেটা অবশ্যি ওদেরকে বলা যাবে না তা হলে আমাকে নিয়ে নিশ্চয়ই হাসাহাসি করবে। ডাইনিং রুমে খাবার টেবিলে বসে খাবারের জন্যে অপেক্ষা করছি তখন নিশাত আপু জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা সবাই মজা করছ তো?” “করছি।” শান্তা একটু থেমে বলল, “তবে মাঝে মাঝেই বাসার কথা মনে হচ্ছে।” আমি বললাম, “আমারও!” “সেটা খুবই স্বাভাবিক। তোমরা প্রত্যেকদিন একেবারে নিয়ম করে বাসায় কথা বলবে। ঠিক আছে?” “বলব।” “যখন কথা বলার ইচ্ছে করবে আমাকে বলবে।” সুজন বলল, “বজলুর সাথে কথা বলে দেখি, ওর নানার কী খবর।” আঁখি বলল, “আহা বেচারা।” নিশাত আপু বললেন, “বজলুর টেলিফোন নম্বর আছে কারো কাছে?” শান্তা বলল, “আছে।” তারপর ব্যাগ থেকে ছোট একটা নোট বই বের করে বজলুর আব্বুর টেলিফোন নম্বর বের করে নিশাত আপুকে দিল। নিশাত আপু ফোন ডায়াল করে টেলিফোনটা সুজনকে ধরিয়ে দিলেন। ফোনে কথা বলার একটু ভদ্রতা আছে সুজন তার ধারেকাছে গেল না, সোজাসুজি জিজ্ঞেস করল, “বজলু আছে?” একটু পর বজলু ফোন ধরল, সুজন জিজ্ঞেস করল, “তোর নানা মারা গেছেন?” সুজনের কথা বলার ধরন দেখে আমরা রীতিমতো চমকে উঠলাম। অন্য পাশ থেকে বজলু কী বলেছে শুনতে পেলাম না কিন্তু শুনলাম সুজন অবাক হয়ে বলছে, “এখনো মারা যান নাই! মনে হচ্ছে মারা যাবেন না। ভালো হয়ে যাবেন। কী সর্বনাশ!” সুজনের কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করলাম। সুজন নিশাত আপুকে ফোনটা দিয়ে বলল, “বজলুর খুবই মন খারাপ।” “কেন?” “নানা মারা যাবেন সেই জন্যে বজলু আসতে পারল না। এখন ওর নানা না কী ভালো হয়ে যাচ্ছেন! বজলু খুবই বিরক্ত।” রিতু কিছুক্ষণ সুজনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “তুই কি সবসময় এভাবে কথা বলিস?” সুজন অবাক হয়ে বলল, “কীভাবে কথা বলি?” শান্তা জিজ্ঞেস করল, “তুই জানিস না তুই কীভাবে কথা বলিস?” “জানব না কেন? এই যে কথা বলছি।” রিতু বলল, “না সুজন তোর কথা বলার ধরন ভালো না। তোকে সুন্দর করে কথা বলা শিখতে হবে।” সুজন মুখ শক্ত করে বলল, “আমাকে তোদের কথা বলা শিখাতে হবে না। আমি অনেক সুন্দর করে কথা বলি।” ঠিক তখন টেবিলে খাবার দিতে শুরু করল আর আমরা খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তাই সুন্দর করে কথা বলার ব্যাপারটা চাপা পড়ে গেল। অনেক ভালো ভালো খাবার, চিকেন টিকিয়া, শিককাবাব, পোলাও, সবজি, ঘন ডাল, খাবার পর দই এবং মিষ্টি। খাওয়া শেষ করে নিশাত আপু বললেন, “বেশি খেয়ে ফেলেছি। এখন বিছানায় শুয়ে টানা ঘুম দিতে পারলে হত।” রিতু বলল, “আপনি ঘুমান নিশাত আপু।” “না, না–তোমরা বিকেলে ঐ মার্কেটে যাবে মনে নাই। জাবেদ চাচাকেও শহরে যেতে হবে। তোমাদের সাথে যেতে পারবেন না।” আমি বললাম, “আমরা নিজেরা নিজেরা যেতে পারব।” শান্তা বলল, “ড্রাইভার চাচা থাকবেন। আমরা তো অন্য কোথাও যাচ্ছি –মার্কেটে যাব একটু দেখব তারপর চলে আসব। আপনার কষ্ট করে আমাদের সাথে যেতে হবে না।” নিশাত আপু তার পরেও খুঁতখুঁত করতে লাগলেন, “না না, চাচা একশবার বলে দিয়েছেন তোমাদেরকে যেন একা ছাড়া না হয়।” আঁখি হি হি করে হেসে বলল, “আমরা ছয়জন একা হলাম কেমন করে?” সুজন বলল, “সাথে ড্রাইভার চাচা।” নাদুসনুদুস মোটাসোটা মানুষের ঘুম খুব প্রিয়, তাই নিশাত আপু শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলেন। আমাদেরকে গাড়িতে তুলে অনেক রকম উপদেশ দিয়ে নিশাত আপু ঘুমাতে গেলেন। ড্রাইভার চাচা আমাদের ছয়জনকে নিয়ে রওনা দিলেন মার্কেটে। আমরা গাড়িতে চেঁচামেচি করে যেতে থাকি। বেসুরো গলায় গান গাইতে থাকি, সেই গান শুনে আঁখি হেসে কুটি কুটি হয়ে যায়। রাস্তায় আবার সেই পুলিশ আর মিলিটারির ব্যারিকেড-এবারে আমরা সকালের অফিসারটাকে পেয়ে গেলাম। আমাদেরকে দেখে এগিয়ে এসে বলল, “তোমরা আবার?” আমরা বললাম, “জি।” “কোথায় যাচ্ছ?” “মার্কেটে।” “যাও।” রিতু জিজ্ঞেস করল, “আপনি গিয়েছেন মার্কেটে?” অফিসারটি হাসল, “ঘুমানোর সময় পাই না–আর মার্কেট!” “আপনার কিছু লাগবে মার্কেট থেকে?” অফিসারটি হাসল, “না, মা লাগবে না।” ড্রাইভার চাচা তখন গাড়ি ছেড়ে দিল। রিতু কতো সহজে সুন্দর করে কথা বলতে পারে, এই কথাটাই যদি আমি বলতাম কী বেখাপ্পা শোনাতো। আর সুজন যদি বলত তা হলে নির্ঘাত একটা মারামারি লেগে যেত। জাবেদ চাচার কথা সত্যি। এখন মার্কেটে সেরকম ভিড় নেই। আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম আর মেয়েরা একটু কেনাকাটা করল। সুজন শুধু একটা তামাক খাবার বাঁশের পাইপ কিনল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কেন কিনেছিস? তুই কি পাইপ খাস?” “বড় হয়ে খাব তাই কিনে রাখলাম।” এই কথার আর কী জবাব দেওয়া যায়? . আমরা যখন ফিরে আসছি তখন একটা মোড় ঘুরতেই দেখলাম পথের মাঝে একটা ভ্যান উল্টে পড়ে আছে, রাস্তায় কয়েকটা টুকরি, টুকরিতে শাকসবজি, কিছু শাকসবজি টুকরিতে কিছু রাস্তায় পড়ে আছে। ভ্যানের পাশে একজন বুড়ো মতো মানুষ হতাশভাবে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। শান্তা বলল, “আহা বেচারা।” আঁখি বলল, “কী হয়েছে?” “একজন বুড়ো মানুষের ভ্যান উল্টে তার শাকসবজি রাস্তায় পড়ে গেছে!” তখন আঁখিও বলল, “আহা বেচারা। বুড়ো মানুষটা আমাদের গাড়ি দেখে হাত তুলল, ড্রাইভার চাচা গাড়ি থামিয়ে বললেন, “কী হল?” “আমার সবজিগুলো একটু তুলে পৌঁছে দেবেন?” ড্রাইভার চাচা কী একটা বলতে যাচ্ছিল, আমরা তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই গাড়ি থেকে নেমে সবজিগুলো টুকরিতে তুলে দিলাম। রিতু জিজ্ঞেস করল, “আপনি ব্যথা পেয়েছেন?” বুড়ো মতোন মানুষটা একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “একটু পেয়েছি। তারপর গাড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভ্যানটা তো গেছে সবজিগুলো বাজারে নেওয়া দরকার, তোমাদের গাড়ি করে একটু পৌঁছে দেওয়া যাবে মা?” রিতু বলল, “আমাদের হোটেল পর্যন্ত যেতে পারেন।” মানুষটা বলল, “তা হলেই হবে। আমি বাকিটা নিয়ে যেতে পারব।” ড্রাইভার চাচা কেন জানি পুরো ব্যাপারটাতে খুবই বিরক্ত হলেন, কিন্তু আমরা বুড়ো মানুষটাকে তার সবজিসহ তুলে নিলাম। মানুষটা বারবার বলতে লাগল, “বুড়ো মানুষ, শরীরে আর জোর পাই না। তোমরা তুলে না নিলে কী করতাম কে জানে! আজকাল মানুষের মনে দয়া মায়া নাই।” যখন গাড়ি ছেড়েছে তখন বুড়ো মানুষটা সবজির টুকরিগুলো ধাক্কা দিয়ে সিটের নিচে ঠেলে দিতে লাগল। আমি বললাম, “সিটের নিচে ঢুকাতে হবে না। বাইরে থাকুক।” বুড়ো মানুষটা বলল, “না, না, একটু চোখের আড়াল করে দিই। তোমাদের এতো সুন্দর গাড়িতে এই শাকসবজি, আলু, কদু দেখতে কি ভালো লাগবে?” আমরা মানুষটাকে বোঝাতে পারলাম না যে সবজির টুকরি বাইরে থাকলে কিছুই আসে যায় না! আমরা যখন বেশ অনেক দূর চলে এসেছি তখন হঠাৎ করে বুড়ো মানুষটা কেমন জানি চমকে উঠল, একবার নিজের কোমরে হাত দিল তারপর এদিক সেদিক কী একটা খুঁজতে লাগল। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?” “আমার ব্যাগ।” “কী ব্যাগ?” “টাকা-পয়সার ব্যাগ-মনে হয় ওখানে পড়ে গেছে!” মানুষটা কেমন জানি ব্যস্ত হয়ে গেল, “ড্রাইভার সাহেব! গাড়িটা একটু থামান।” ড্রাইভার চাচা বিরক্ত হয়ে বললেন, “কেন?” “আমাকে নামিয়ে দেন, আমার ব্যাগ ফেলে এসেছি।” রিতু বলল, “আপনার সবজির টুকরি?” “গাড়িতে থাকুক। আমার লোক গাড়ি থেকে নিয়ে নেবে।” ড্রাইভার চাচা গাড়ি থামালেন, বুড়ো মানুষটা হুড়মুড় করে গাড়ি থেকে নেমে গেল। বেচারা গরিব মানুষ, এখন তার টাকার ব্যাগটা খুঁজে পেলে হয়। ড্রাইভার চাচা বিরক্ত হয়ে বুড়ো মানুষটাকে একটা গালি দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল। একটু সামনেই আবার পুলিশ ব্যারিকেড, অনেকগুলো গাড়ি থামিয়ে চেক করছে। গাড়ির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে দেরি হত। কিন্তু মিলিটারির সেই অফিসারটা আমাদের দেখল। বলল, “মার্কেটিং করেছ?” “জি। করেছি।” “গুড। যাও। তোমরা চলে যাও। ড্রাইভার চাচা অন্যদের পাশ কাটিয়ে চলে এলেন। আমরা যখন আমাদের রিসোর্টের কাছে এসেছি তখন হঠাৎ দেখলাম রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বুড়ো মানুষটা হাত নাড়ছে। ড্রাইভার চাচা গাড়ি থামালেন, জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি না পিছনে গেলেন, এখন সামনে চলে এসেছেন কেমন করে?” বুড়ো মানুষটাকে তার উত্তর দেবার জন্যে খুব বেশি আগ্রহ দেখা গেল না, হাত নেড়ে বলল, “ঐ তো একজনকে পেয়ে গেলাম, হোন্ডায় নামিয়ে দিল!” ড্রাইভার চাচা বললেন, “দেখলাম না তো কোনো হোন্ডা।” বুড়ো মানুষটা বলল, “খুলেন, খুলেন, টুকরিগুলো দেন।” বলে নিজেই দরজা খুলে তার টুকরিগুলো নিতে থাকে। সুজনকে হঠাৎ কেমন জানি উত্তেজিত দেখায়। সে কী একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। আমি তার দিকে তাকালাম, এর আগে কখনো দেখিনি যে সুজন কোনো কথা বলতে গিয়ে থেমে গেছে। বুড়ো মানুষটা একা নয়, হঠাৎ করে কোথা থেকে বেশ অনেকগুলো মানুষ জড়ো হয়েছে, তারা সবাই মিলে খুব তাড়াতাড়ি টুকরিগুলো নামিয়ে নিল। কাছেই একটা”চান্দের গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, সেটাতে তুলে গাড়িটা দ্রুত সামনের দিকে চলে যায়। ড্রাইভার চাচা গজগজ করতে করতে বললেন, “আমরা তার মাল সামান এনে দিলাম, সেই জন্যে একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিল না, সেটা খেয়াল করেছ?” আমরা আসলে সেটা খেয়াল করিনি, ড্রাইভার চাচার কথা শুনে মনে হল তার কথা সত্যি। আমরা যখন প্রথম গাড়িতে সবজির টুকরিগুলো তুলেছি তখন বুড়ো মানুষটার খুবই কাঁচুমাচু ভাব ছিল, যখন টুকরিগুলো নামানোর সময় হল তখন বুড়ো মানুষটার হাবভাব রীতিমতো রুক্ষ। তবে সেটা নিয়ে আমরা বেশি মাথা ঘামালাম না, একটা মানুষকে বিপদের সময় সাহায্য করেছি সেটাই বড় কথা। সেই মানুষের যদি দ্রতা বা কৃতজ্ঞতা না থাকে আমরা কী করব? রিসোর্টের সামনে গাড়ি থামল, প্রথমে মামুন নামল। তারপর আঁখি, তারপর রিতু আর শান্তা। আমি যেই নামতে যাব সুজন তখন খপ করে আমার হাত ধরল। আমি অবাক হয়ে বললাম, “কী হয়েছে সুজন?” সুজন তার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল, “শ-স-স-স।” আমি গলা নামিয়ে বললাম, “কী হয়েছে?” সুজন ফিসফিস করে বলল, “বুড়ো মানুষটার সবজির টুকরিতে কী ছিল জানিস?” “কী?” “এই দেখ।” সুজন তার ব্যাকপেকের মুখটা খুলে দেখাল, আমি তাকিয়ে দেখলাম সবুজ রংয়ের গোল মতোন একটা জিনিস। আমি ভালো করে তাকালাম, তারপর ভয়ানকভাবে চমকে উঠলাম, “গ্রেনেড!” “হ্যাঁ।” “তুই কেমন করে পেলি?” “হাত দিয়ে দেখছিলাম কী আছে, দুটি সরিয়েছি।” “কেন?” সুজন ঢোক গিলে বলল, “জানি না।” আমি সুজনের দিকে আর সুজন আমার দিকে তাকিয়ে রইল!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৪০ জন


এ জাতীয় গল্প


Warning: mysqli_fetch_array() expects parameter 1 to be mysqli_result, boolean given in /var/sites/g/golperjhuri.com/public_html/story.php on line 344

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ...